কর্মবিমুখ বাঙালির আলস্যবিলাসী জীবন নিয়ে কত কথাই না উঠে আসে, তার ইয়ত্তা নেই। ঘরকুনো হিসাবে তার ভাববিলাস আর ভাবুকতায় তার স্বপ্নবিলাস। শুয়ে শুয়ে লাখ টাকা স্বপ্নে বিভোর বাঙালির বাড়িঘরই তার আপনার একান্ত আপন। সেখানে ভ্রমণ করা তার কাছে ভ্রান্তিবিলাস মনে হয়, বানপ্রস্থের আগেই সন্ন্যাসের ভাব জেগে ওঠে। ‘ভ্রমণ’ শব্দের ‘ভ্রম’ কাটাতেই তার অনেকদিন লেগেছে। অবশ্য বেড়ানোর অভাব নেই, বরং তা তার স্বভাব। ঘুরে আসতে বললে বেড়িয়ে আসা তার বাতিক। অন্যদিকে ভাবুক বাঙালি জেগে স্বপ্নচারিণী, ঘুমিয়ে স্বপ্নসুখ। সেখানে তার ঘোড়া টগবগ করে যতই ছুটুক দিনের আলোতে তা বাড়ির উঠোনে বাঁধা গরু হয়ে ওঠে। একে বাঁধা, তায় আবার জাবরকাটার আয়োজন। সেদিক থেকে আধুনিক শিক্ষাবিস্তারের মাধ্যমে গাড়িঘোড়ায় চড়ার আয়োজন চলে, নিষিদ্ধ কালাপানি পার করার হাতছানিও আন্তরিক হয়ে ওঠে, অচেনা-অজানা জগতের পরশ উন্মনা করে তোলে। অবশ্য তখনও ভ্রমণের অভিমুখ আভিজাত্যে মোড়া, বনেদিয়ানায় আবর্তিত। শুধু তাই নয়, সেখানে বাঙালি তার চারিত্রিক প্রকৃতিতেই গৃহকোণেই সুখী। সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তাঁর অসাধারণ ভ্রমণকাহিনি ‘পালামৌ’র (১২৮৭-৮৯) মধ্যেই তা আন্তরিক করে তুলেছেন, ‘বন্যরা বনে সুন্দর, শিশুরা মাতৃক্রোড়ে’।
সেদিক থেকে বাঙালির সুখী গৃহকোণে পায়ে সর্ষের কোনো অবকাশ ছিল না। উল্টে মামার বাড়িই ছিল মধুর হাড়ি, মেলাই ছিল তার সব পেয়েছির দেশ। বাঙালির অলসযাপনের মধ্যেই তার ভ্রমণ বেশিদূর অগ্রসর হতে পারেনি। সেদিক থেকে জাতিগত ভাবেই বাঙালির কর্মবিমুখ নিদ্রাবিলাসী অলসপ্রকৃতিতে ভ্রমণবিমুখতার কথা স্বয়ং কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরই তাঁর ‘মানসী’(১৮৯০) কাব্যের ‘দূরন্ত আশা’ কবিতায় প্রকট করে তুলেছেন। ‘অন্নপায়ী বঙ্গবাসী/স্তন্যপায়ী জীব’ বাঙালিকে নিয়ে কবির সরস উক্তি, ‘ভদ্র মোরা, শান্ত বড়ো, পোষমান এই/বোতাম-আঁটা জামার নীচে/শান্তিতে শয়ান।’ অন্যদিকে সুদীর্ঘকাল ধরে সমুদ্র পেরিয়ে বিদেশে পাড়িতেইই ছিল সামাজিক নিষেধাজ্ঞা। সেক্ষেত্রে ধর্মভীরু বাঙালির ভ্রমণেও সেই ধর্মীয় যোগ সুপ্রাচীন কাল থেকেই প্রবাহিত। তীর্থভ্রমণেই তার মনের অভিলাষ শ্রীবিলাস হয়ে ওঠে। অবশ্য রবীন্দ্রনাথ সেখানেও স্বতন্দ্র বাঙালি। কেননা কবিই জানিয়েছেন, ‘পথের প্রান্তে আমার তীর্থ নয়/পথের দুধারে মোর দেবালয়।’ সেদিক থেকে বিশ্বপথিক রবীন্দ্রনাথ যে তাঁর প্রয়োজনের আয়োজনেই ভ্রমণকে আপন করে নেননি, প্রিয়জনের প্রয়োজনেও ভ্রমণরসিক হয়েছিলেন, তা তাঁর জীবনে ক্রম প্রকাশ্যেই প্রতীয়মান। শুধু তাই নয়, তাঁর ভ্রমণরসিক প্রকৃতি তাঁর ভ্রমণসাহিত্যের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনি, সৃজনবিশ্বের বহুমুখী বিস্তারে আজীবন সক্রিয় থেকেছে। সেদিক থেকে বাংলা আধুনিক ভ্রমণসাহিত্যে তাঁর অতুলনীয় ভূমিকা তাঁকে স্বতন্ত্র পথপ্রদর্শকের আসনে সমাসীন করেছে। এজন্য বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের পথটিকে একবার দেখে নেওয়া দরকার।
‘ভ্রমণ’-এর সঙ্গে প্রয়োজনের যোগ আপনাতেই শিথিল। সেখানে বিনোদনী চেতনাই প্রকাশমুখর। ছুটির আয়োজন, কর্মবিমুখ অবসরে বেরিয়ে পড়া, উদ্দেশ্যহীন নান্দনিক বিহার বা অচেনা-অজানার অতৃপ্তিকে সহচর করে বেরিয়ে পড়া প্রভৃতি নানা পরিসরের তার বিস্তার। অবশ্য একঘেয়েমির জীবন থেকে সময় বের করে অচেনা-অজানা জায়গায় নিজেকে খুঁজে ফেরার মধ্যেও উদ্দেশ্য বর্তমান। বিনোদনযাপনের মধ্যেও কর্মময় জীবনকে মানিয়ে নেওয়ার সদিচ্ছাও সক্রিয় থাকে, প্রয়োজনে ভ্রমণের হাতছানি আন্তরিক হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, কর্ম উপলক্ষ্যে দেশদেশান্তরে ঘুরে বেড়ানো থেকেও ভ্রমণের আয়োজন ছড়িয়ে পড়ে। ‘পথের পাঁচালী’র হরিহরের মতো কথকতা করতে করতে উত্তর ভারত থেকে পেশোয়ার যাওয়ার খবর স্বাভাবিক মনে হয়। আবার তীর্থদর্শনের নামে বিভিন্ন ধর্মীয় স্থানে ঘুরে বেড়িয়ে পড়ার মধ্যেও সেই ভ্রমণের বিস্তার লক্ষণীয়। সেদিক থেকে বাঙালিমানসে ভ্রমণের চাহিদা ধর্মীয় মাধ্যমেই সবচেয়ে বেশি প্রভাব বিস্তার করে। তার ধর্মীয় মাহাত্ম্যেই দুর্গম ভ্রমণ আরও বেশি আবেদনক্ষম হয়ে ওঠে। সেখানে তীর্থভ্রমণের পুণ্যচেতনা তার ভ্রমণবৃত্তান্তকেও বিপুল জনপ্রিয়তা দান করেছে। এখনও সেই ধারা সমান সচল। অন্যদিকে উনিশ শতকে আধুনিক শিক্ষার সোপানে পরিযায়ী মনের চলনে মানুষের মধ্যে যখন ‘দেখব এবার জগৎটা’কে জেগে উঠল, তখন সেই অচেনা-অজানা পৃথিবীর পরশও ভ্রমণকথায় উঠে এল। সেখানে অবশ্য সেই চেনা-জানার কৌতূহলী মননে শুধু তীব্র তৃষ্ণাই নেই, ভ্রমণকারীর আভিজাত্যবোধেও ভ্রমণকাহিনি লেখার সদিচ্ছাও বর্তমান। সেক্ষেত্রে বিদেশ ভ্রমণের অভিজ্ঞতা সাধারণ্যে রসদ জুগিয়ে চলে। বহু দূর বা দুর্গম দেশদেশান্তরের ব্যয়বহুল ভ্রমণ সাধারণের ধরাছোঁয়ার বাইরে। সেদিক থেকে দুধের সাধ ঘোলে মেটানোর ক্ষেত্রেও ভ্রমণকথা উপাদেয় হয়ে ওঠে। অন্যদিকে ভ্রমণের নিত্যনতুন চলনে তা অ্যাডভেঞ্চার বা অভিযানেও সামিল হয়ে পড়ে। সেখানে দুর্গম পর্বতশিখর অভিযান থেকে রহস্যমুখর প্রাকৃতিক বিস্ময় বা রোমাঞ্চকর ঐতিহাসিক জনপদের পরশ ভ্রমণকে নানাভাবেই আমন্ত্রণ জানায়। আর সেই সব ভ্রমণের অভিজ্ঞতা যখন সাহিত্যের আধারে পরিবেশিত হয়ে পাঠকের দরবারে হাজির হয়, তখন তার মধ্যে শুধু ভ্রমণবৃত্তান্ত উঠে আসে না, সাহিত্যেরই একটি ধারা সৃষ্টি করে।
সেদিক থেকে বাঙালিমানসে যেভাবে ভ্রমণের পরিসর বিস্তৃত হয়েছে, তার সঙ্গে তার সাহিত্যের যোগ নিবিড় হয়ে উঠেছে। সেখানে ভ্রমণের অভাব পূরণে ভ্রমণকারীর অভিজ্ঞতা সাহিত্যের বর্ণরঙিন হাতছানিতে আবেদনক্ষম হয়ে ওঠে। অন্যদিকে দেশেবিদেশে ভ্রমণকারীর আভিজাত্যবোধের মধ্যেও সেই ভ্রমণের আবেদন প্রকাশমুখর মনে হয়। তাতে ‘কেমন লাগল, লিখে জানানো’র চেয়ে ‘আমি দেখেছি’র চেতনাও কম যায় না। বিচিত্র অভিজ্ঞতা পাইয়ে দেবার ক্ষেত্রেও ভ্রমণসাহিত্যের আবেদন সরব হয়ে ওঠে। এজন্য প্রথম থেকেই দেশবিদেশের অভিজ্ঞতার আলোয় বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের বিস্তারের ধারা আজও অব্যাহত। বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের ধারায় তারই পরিচয় নানাভাবে উঠে এসেছে। অন্যদিকে উপন্যাসের নামকরণের সঙ্গে ‘ভ্রমণ’ শব্দের সংযোগ নানাভাবেই উঠে এসেছে। সেখানেও চলমান জীবনের বিচিত্র অভিজ্ঞতার আস্বাদ বয়ে আনে। অথচ তার সঙ্গে ভ্রমণসাহিত্যের কোনো যোগ নেই। যেমন, কৃষ্ণকমল ভট্টাচার্য্যের ‘দুরাকাঙ্খের বৃথা ভ্রমণ’(১৮৫৮) বা শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘শ্রীকান্ত’(১৯১৭) উপন্যাসের প্রথম নামকরণ ‘শ্রীকান্তের ভ্রমণ কাহিনী’ প্রভৃতি। সেদিক থেকে ভ্রমণের বহুমাত্রিক চেতনা নানাভাবেই মননের সহচর হয়ে উঠেছে।
বাঙালি যত ভ্রমণকে আপন করে যাপন করায় সক্রিয় হয়েছে, ততই তার ভ্রমণের বৃত্তান্ত বা কাহিনি সাহিত্যের আধারে বর্ণরঙিন হয়ে উঠেছে। ঘরকুনো বাঙালিও পর্যটকের দৃষ্টি মেলে, ডানা মেলার অপেক্ষায় অস্থির হয়ে ওঠে। সেখানে পর্যটন শিল্পেও শিল্পী হওয়াটা ছিল সময়ের অপেক্ষা। অনুকরণপ্রিয় বাঙালি পাহাড়-পর্বত থেকে সাগর-দ্বীপে ছড়িয়ে পড়ে তার ভ্রমণক্ষেত্র। ছুটি পেলেই ছোটা। সেখানে ভ্রমণপিপাসু বাঙালির কাছে ভ্রমণের গাইডবুক যেভাবে বেড়েছে, তেমনই তার সাহিত্যসঙ্গীও আন্তরিক হয়েই ওঠেনি, জনপ্রিয়ও হয়েছে। ভ্রমণসঙ্গীর সঙ্গে মানসভ্রমণের আয়োজন সমান সক্রিয়। অবশ্য ভ্রমণসাহিত্যের মধ্যেও সেই অচেনা-অজানার প্রতি আগ্রহই উপজীব্য হয়ে ওঠে। সেদিক থেকে তীর্থদর্শনের পাশাপাশি অজানা খনির পরশমণিও জায়গা করে নিয়েছে। শুধুমাত্র হিমালয়কে নিয়েই পুণ্যকামী বাঙালির দরবারে অসংখ্য ভ্রমণসাহিত্য উঠে এসেছে। দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘হিমালয় ভ্রমণ’ বিষয়ক রচনাদি থেকে স্বামী রামানন্দ ভারতীর ‘কৈলাস ও মানস সরোবর’ (১৮৯৮), জলধর সেনের ‘হিমালয়’ (১৯০০), প্রমোদকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ‘হিমালয় পারে কৈলাস ও মানসযাত্রা’ (১৯৩৪), প্রবোধকুমার সান্যালের ‘দেবাত্মা হিমালয়’ (১৯৫৫), উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ের ‘গঙ্গাবতরণ’ (১৯৭৭), ‘হিমালয়ের পথে পথে’ প্রভৃতি তার বনেদি আয়োজন। শুধু তাই নয়, অনেকেই একক ভাবেই হিমালয় ভ্রমণের কথা নানাভাবে তুলে ধরেছেন। জলধর সেনই হিমালয়কে নিয়ে অসংখ্য ভ্রমণের বই লিখেছেন। যেমন, ‘প্রবাসচিত্র’ (১৯০০), ‘পথিক’ (১৯০১), ‘হিমাচল বক্ষে’ (১৯০৪) প্রভৃতি।
অন্যদিকে সেই হিমালয়ের ভ্রমণকথা লিখতে গিয়েই চৌত্রিশ বছরের প্রবোধকুমার সান্যালই তাঁর তীব্র সাড়াজাগানো ভ্রমণকাহিনি ‘মহাপ্রস্থানের পথে’ (১৯৩৪)-র মধ্যে তাঁর ভ্রমণের উদ্দেশ্য অলক্ষ্যে জানিয়ে দেন, ‘আপনারা সবাই এসেচেন তীর্থে, আমি এসেছি বেড়াতে।’ উল্লেখ্য, স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ প্রবোধকুমার সান্যালের প্রকাশমাত্রেই জনপ্রিয় বইটির উচ্ছ্বসিত প্রশংসা করেছেন। শরৎচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, প্রমথ চৌধুরী, সুভাষচন্দ্র বসু মতো অনেকেই লেখকের ব্যতিক্রমী ভ্রমণকাহিনিতে সাহিত্যের আস্বাদে প্রশংসায় মুখর হয়েছেন। আসলে সেখানে তীর্থদর্শনের মোহে আচ্ছন্ন না হয়ে লেখক তাঁর ভ্রমণকে কল্পনার মাধ্যমে আরও উপাদেয় করে তুলেছেন। সেই ধারাই ক্রমে সম্প্রসারিত হয়েছে নানাভাবে, নানা রঙে। তীর্থভ্রমণের সঙ্গে গল্পের অপূর্ব সমন্বয়ে অবধূতের(দুলাল চন্দ্র মুখোপাধ্যায়ের ছদ্মনাম কালিকানন্দ অবধূত থেকে) ‘মরুতীর্থ হিংলাজ’ (১৯৫৪), কালকূটের (সমরেশ বসু) ‘অমৃতকুম্ভের সন্ধানে’ (১৯৫৪), শঙ্কু মহারাজের (জ্যোতির্ময় ঘোষ দস্তিদার ও কমলকুমার গুহ’র ডাকনাম ‘শঙ্কু’ ও ‘মহারাজ’ মিলিয়ে) ‘বিগলিত করুণা জাহ্নবী যমুনা’ (১৯৬১) অভিনব আস্বাদ বয়ে আনে। শুধু তাই নয়, প্রবোধকুমার সান্যাল, অবধূত, শঙ্কু মহারাজ(কমলকুমার গুহ নয়, শুধু জ্যোতির্ময় ঘোষ দস্তিদার), উমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় বা কালকূট ছদ্মনামে সমরেশ বসু প্রমুখের মতো অনেকেই আজীবন তাঁদের ভ্রমণসাহিত্যের ধারায় নিমগ্ন থাকায় বাংলা ভ্রমণসাহিত্যই স্বতন্ত্র ধারায় প্রবাহিত হয়েছে।
অন্যদিকে দেশদেশান্তরে ভ্রমণের অভিজ্ঞতাও নানাভাবে উপাদেয় হয়ে উঠেছে। সঞ্জীবচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়ের ‘পালামৌ’, কৃষ্ণভাবিনী দাসের ‘ইংলণ্ডে বঙ্গমহিলা’১৮৯১) স্বামী বিবেকানন্দের ‘পরিব্রাজক’, সৈয়দ মুজতবা আলীর ‘দেশে-বিদেশে’ (১৯৪৯), অন্নদাশঙ্কর রায়ের ‘পথে প্রবাসে’ (১৯২৭), সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়ের ‘ইউরোপ ১৯৩৮’, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘আভিযাত্রিক’ (১৯৪১), তারাশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘মস্কোতে কয়েকদিন’, বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যায়ের ‘কুশী প্রাঙ্গণের চিঠি’, ‘দুয়ার হতে অদূরে’, সুরেশচন্দ্র সাহার জাপান ভ্রমণের অভিজ্ঞতায় লেখা ‘চেরি ফুলের দেশে’, দেবেশ দাসের ‘ইউরোপা’, রামনাথ বিশ্বাসের ‘লাল চীন’, মনোজ বসুর ‘চীন দেখে এলাম’, সুনীল গঙ্গোপাধ্যায়ের ‘ছবির দেশে কবিতার দেশে’ প্রভৃতির পাশাপাশি গৌরকিশোর ঘোষের ‘নন্দকান্ত নন্দাঘুন্টি’ বা বীরেন্দ্রনাথ সরকারের ‘রহস্যময় রূপকুণ্ড’ প্রভৃতির মধ্যে পর্বত অভিযানের কথা উঠে এসেছে। আবার সুবোধ চক্রবর্তীর ভারতের বিভিন্ন অঞ্চলে ভ্রমণকথাই রমণীয় হয়ে উঠেছে তাঁর ২৪খণ্ডে প্রকাশিত ‘রম্যানি বীক্ষ্য’-এ। আবার যাযাবরে’র (বিনয় মুখোপাধ্যায়) ‘দৃষ্টিপাত’ (১৯৪৬), রঞ্জনে’র (নিরঞ্জন মজুমদার) ‘শীতে উপেক্ষিতা’ (১৯৪৮) ভ্রমণসাহিত্যে অভিনব আস্বাদ বয়ে আনে।
শুধু স্থানিক ভ্রমণেই নয়, মানসভ্রমণেও বাংলা ভ্রমণসাহিত্য ভিন্ন মাত্রা লাভ করেছে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘চাঁদের পাহাড়’ (১৯৩৮) থেকে সমরেশ বসুর ‘কালকূট’ ছদ্মনামে লেখা ‘শাম্ব’ (১৯৭৮) তার স্মরণীয় সংযোজন। সেদিক থেকে বিচিত্র শাখায় পল্লবিত বাংলা ভ্রমণসাহিত্যে রবীন্দ্রনাথের ভূমিকা আপনাতেই প্রাসঙ্গিক হয়ে ওঠে। তাঁর আশি বছর তিন মাসের সুদীর্ঘ জীবনে দেশবিদেশের ভ্রমণ শুধু নিবিড়তা লাভ করেনি, আজীবন সমান সক্রিয় ছিল। রবীন্দ্রনাথের ছোটবেলা থেকেই পায়ে সর্ষে। আজীবন ছুটে চলেছেন। সেখানে তাঁর সহজাত প্রকৃতিতেই ‘আমি চঞ্চল হে, আমি সুদূরের পিয়াসী’ মনের অধিকারী। শুধু তাই নয়, তা তাঁর প্রকাশের তীব্রতায় নানাভাবেই প্রকাশমুখর। সেক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ভ্রাম্যজীবনের পরিচয়ে তাঁর ভ্রমণসাহিত্য তুলনামূলকভাবে অনেক কম। অথচ তার মধ্যেও তাঁর ভ্রমণসাহিত্যিক প্রকৃতি চিরসবুজ, সাধারণে অসাধারণ, প্রাচুর্যে অতুলনীয়, বহুমুখী বিস্তারে আজীবন রূপদক্ষ শিল্পীর পবিত্র অসন্তোষ ও সব পেয়েছি দেশের হাতছানির পরশ আন্তরিক হয়ে ওঠে। অথচ তাঁর সেই ভ্রামণিক পরিচয় আজও মেঘে ঢাকা তারা, অধরা মাধুরী।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।
ভ্রমণসাহিত্য পড়তে গেলে বিষয়গুলো জানা খুবই জরুরি।