পয়লা বৈশাখ আজ শুধু একটা দিন হয়ে রয়ে গেছে। বাঙালি বোধহয় একমাত্র এই দিনটাই বাংলায় মনে রাখে। বাকি সবটাই তো ইংরাজি তারিখের রমরমা। এমনকি ক্যালেন্ডারেও আগে বাংলা তারিখ বড়ো থাকতো। ইংরাজি ছোটো। এখন তার উল্টোটাই চল। ফলে বাংলা বছরের প্রথম দিনটি ছাড়া বাংলার সাল তারিখ মূল্যহীন হয়ে গেছে।
ছোটবেলায় পয়লা বৈশাখ বলতে জানতাম হালখাতা। বর্ধমানের গ্রামের বাড়িতে বছরের প্রথম দিন মা সকাল সকাল স্নান সেরে সদর দরজায়, তুলসীতলায় আল্পনা এঁকে নতুন ঘটে আমশাখা দিয়ে পুজো করতো। আর “আজ হালখাতা, ওঠ ওঠ…” বলে ঘুম থেকে ডেকে তুলে দিতো।
‘আজ হালখাতা’… মায়ের মুখে এটা শুনেই মনে কেমন জানি একটা আনন্দ থাকতো সারাদিন। সেদিনটা ছোটো বয়সের আবেগে বাৎসরিক উৎসবের দিন ছিলো আমাদের গ্রাম্য জীবনে। মাকে দেখতাম সেদিন তুলে রাখা একটা মোটামুটি ভালো শাড়ি পরেছে। সীমিত সামর্থে সেদিন বেশ কয়েক পদ রান্না হতো। আশেপাশের সকলের বাড়িতেও সেই একই গল্প। আসলে তখন বাংলা বছর শুরু হবার প্রথম দিনটা খুব নিষ্ঠার সঙ্গে সবাই পালন করতো। তাতে আড়ম্বর না থাকলেও আনন্দের ঘাটতি ছিল না।
এখন তো বাংলা নববর্ষ বলতে এই প্রজন্ম বোঝে ফ্যাশনেবল নতুন ড্রেস আর রেস্টুরেন্টে খাওয়া। এরা জানেই না বাংলা নববর্ষ হুজুগ নয়। এটাও একটা ট্র্যাডিশন। যাইহোক নতুন বছরে নতুন জামা কোনোদিন পরেছি তা মনে পরে না কিন্তু অপেক্ষাকৃত ভালো জামা পরে বিকেলে বাবার হাত ধরে দোকানে দোকানে যেতাম নতুন খাতা করতে। ফিরে আসতাম মিষ্টির প্যাকেট আর রাবার ব্যান্ড দিয়ে আটকানো ক্যালেন্ডার হাতে।
মা মিষ্টির প্যাকেট খুলে গুছিয়ে রাখতো আর আমি ঘ্যানঘ্যান করে মাকে বিরক্ত করতাম ক্যালেন্ডারগুলো খুলে দেখানোর জন্য। তখন কিন্তু ক্যালেন্ডারে শুধু শিব, কালী, দুর্গা কিংবা রাধাকৃষ্ণের ছবি থাকতো। প্রতিবার মা সবথেকে সুন্দর ছবির ক্যালেন্ডারটা ঘরের দেয়ালে পেরেক পুঁতে টাঙাতো।
মাঝের সময়গুলো বীরভূম আর হাওড়ায় পয়লা বৈশাখের তেমন কোনো স্মৃতি মনে আসেনা। কলকাতায় আসার পরে তো পয়লা বৈশাখ অন্যান্য আরেকটা ছুটির দিনের মত ছিলো। তখন ছুটির দিন মানেই মদ, দেদার আড্ডা আর মাংস খাওয়া। আমি জীবনে কাক আর বেড়ালের মাংস ছাড়া বোধহয় সবকিছুই খেয়েছি। সে এক বোহেমিহান জীবন। সেখানে দিনক্ষণ তিথি তারিখের কোনো স্থান নেই। শুধু ভেসে বেড়ানো সময়ের তালে তালে।
পয়লা বৈশাখ আবার জীবনে ফিরলো যখন ক্যামেরা হাতে কাগজের অফিসে কাজ শুরু করলাম। তখন প্রতি বছর নববর্ষের দিন ভালো মুহূর্ত খোঁজার তাগিদ থাকতো। ব্যবসায়ীরা নতুন পাটভাঙা ধুতি পাঞ্জাবি পরে ঝুড়িতে পুজোর ফুল মিষ্টির মধ্যে টুকটুকে লাল রঙের নতুন খাতাটিকে বছরের প্রথম দিন পুজো করানোর জন্য মন্দিরে মন্দিরে লাইন দিতো। কালীঘাট, দক্ষিণেশ্বর মন্দির চত্বরে আমরা ফটোগ্রাফাররা সেইদিন সবাই জড়ো হতাম।
কাগজের অফিসগুলোয় সেদিন কাউকে কোনো অ্যাসাইনমেন্ট দেওয়া হতো না। যার যেমন ইচ্ছে ছবি তুলতো। যার ছবি ভালো হতো সেটাই ছাপা হতো। ফলে সবারই একটা তাগিদ থাকতো ভালো ছবি তোলার। আমিও সবসময় চেষ্টা করতাম অন্য ফ্রেমের ছবি তুলতে। তাই গোটা কলকাতা ঘুরে ঘুরে দেখতাম সারাবছরের নিত্য নৈমিত্তিক জীবনযাপনের একঘেয়েমী উৎসবের দিনগুলোয় কিভাবে যেন উবে যেত। বছরের প্রথম দিনটা বাঙালী উদযাপন করতো ভারি বাঙালিত্বের সঙ্গে।
আমি তখন আনন্দবাজারে, নিয়মিত ছবি তুলি কলকাতার পাতার জন্য। শহর কলকাতার অফিসে অফিসে ভালোই কম্পিউটার এসে গেছে। তো একবার পয়লা বৈশাখে মনে হলো, আচ্ছা এখন তো আর খাতায় লিখে কাজ হয়না। সবটাই কম্পিউটারে। কম্পিউটারে লাল সিঁদুর দিয়ে স্বস্তিক চিহ্নও আঁকা দেখেছি। তাহলে নতুন খাতার জায়গায় কম্পিউটারের পুজো করা উচিত।

কি করি? কি করি? ভাবতে ভাবতে মনে এলো আমার ভাতৃপ্রতিম বন্ধু পার্থ সান্যালের দাদার কথা!! পার্থ নিজেও ভালো ফটোগ্রাফার। পার্থের দাদা ব্যবসা করে। প্রতিবার পয়লা বৈশাখের দিন দক্ষিণেশ্বর মন্দির যায় পুজো দিতে। ওর দাদার অফিসেও তখন বেশ কয়েকটি কম্পিউটার বসেছে।
আমি সেই অফিসে গিয়ে পার্থের দাদাকে বললাম, এখন তো সব কাজই কম্পিউটারে হয় ?
দাদা বললেন, হ্যাঁ।
আমি বললাম, তাহলে পয়লা বৈশাখে খাতার পুজো কেন করবে? কম্পিউটারের পুজো করা উচিত।
দাদা হেসে উড়িয়ে দিলেও আমি নাছোড়বান্দা যে এবারের নতুন বছরের পুজো কম্পিউটারকেই করতে হবে। শেষমেশ পার্থের দাদাকে রাজি করি।
পয়লা বৈশাখের দিন সকালে এক বিশাল বড়ো ঝুড়ির মধ্যে ফুলটুল দিয়ে সাজিয়ে তারমধ্যে একটা কম্পিউটার রেখে দক্ষিণেশ্বর মন্দিরে পুজো দেবার লাইনে দাদা দাঁড়িয়ে আছেন। এদিকে আমি ভিতরে ভিতরে টেনশন করছি অন্য কোনো ফটোগ্রাফার যেন এটা দেখে না ফেলে। পার্থও উপস্থিত ছিলো নজর রাখার জন্য যাতে এটা কারো চোখে না পরে। কারণ এটা আমার তৈরি করা স্টোরি।
শেষপর্যন্ত পার্থের দাদার কম্পিউটার পুজোর ছবি আমি ভালোভাবেই তুলতে পেরেছিলাম সেদিন। কলকাতার পাতায় পয়লা বৈশাখে ছাপার পর বেশ আলোচ্য বিষয় হয়েছিলো ছবিটি। কেউ কেউ ভীষন প্রশংসা করেছিলেন। কেউ অবাক হয়েছিলেন। বহু চিঠি এই ছবির জন্য আনন্দবাজার দফতরে এসেছিলো। বেশ কয়েকটি চিঠি সিরিজ করে ছাপাও হয়েছিলো।
আনন্দবাজারও ছেড়েছি বেশ কয়েক বছর হয়ে গেল। এখন মুখ্যমন্ত্রীর দফতরে কাজের সুত্রে পয়লা বৈশাখের দিনটা ছুটির দিন। এখনও প্রতিবার এদিনের জন্য বহু নিমন্ত্রণ আসে। কোথাও যাই না। মা যতদিন ছিলো সকালে মায়ের কাছে যেতাম বছরের প্রথম দিন মায়ের আশীর্বাদ নিতে। মাও অপেক্ষা করে থাকতো। এবছর মা নেই। কোথাও যাবারও নেই। অনেকেই বাড়িতে মিষ্টি পাঠিয়ে দেয়। আমি পারতপক্ষে সেসব খাই না। শরীরের কথা ভেবেই খাই না। না সুগার নেই। ফলে ডাক্তারেরও বারণ নেই। আসলে আমি খাদ্যলোভী মানুষ। মিষ্টিও ভীষন প্রিয়। একবার খেয়ে ফেললে আর লোভ সামলাতে পারি না। তাই এড়িয়েই চলি।
এভাবেই সময়ের পরিবর্তনে বাঙালীর ঘর সংসারে পয়লা বৈশাখ নিয়ে আলাদা কোনো আবেগ অনুভূতি তেমন আর অবশিষ্ট নেই। কলকাতায় তো বটেই জেলা থেকেও বাঙালী জীবনের অন্যতম একটা দিনের গুরুত্ব ধীরে ধীরে বিলুপ্ত হয়ে যাচ্ছে। মোবাইল নির্ভর রোজনামচায় জানিনা আগামী প্রজন্ম এর কাছে এই দিনটি একেবারেই হারিয়ে যাবে।