‘গঞ্জ’ একটি দেশি শব্দ, এই শব্দের অর্থ হাট বা বড় বাজার বা শস্য কেনাবেচার স্থান। সুতরাং এখানে নিশ্চয়ই সেই সময় বড় হাট বা বাজার ছিল সন্দেহ নেই। কিন্তু এখনকার প্রথাগত হাটের মত ছিল না নিশ্চয়ই বা কেমন ছিল জানা যায় না। এই হাট নদীয়া জেলার একটি গুরুত্বপূর্ণ হাট। এখানকার হাট সপ্তাহে দুদিন বসে — সোমবার আর শুক্রবার। এখানে হাটের জন্য নির্দিষ্ট কোন ফাঁকা জায়গা নেই। প্রত্যহ যেখানে সবজি বাজার বসে, হাটবারে সেই দোকানগুলির পাশাপাশিই কিছু অস্থায়ী হাটুরে ব’সে জিনিসপত্র কেনাবেচা করে।
বেতাই এর সবজি-সহ অন্যান্য জিনিসপত্রের হাটটি বসে বেতাই বাস স্টপেজের সন্নিহিত স্থানে রাস্তার উভয়পাশে। প্রচুর লোকসমাগম হয়। অন্তত ২০০ থেকে ২৫০ হাটুরে আসে জিনিসপত্রের বেসাতি নিয়ে। হাট শুরু হয় বিকেল তিনটা থেকে চারটের মধ্যে, চলে রাত আটটা থেকে নটা পর্যন্ত। রাস্তার দুপাশে হাট বসে বলে প্রচুর যানজট হয় বিকেলের দিকে। মোটামুটি ছটা থেকে সাতটার মধ্যে সবথেকে বেশি জনসমাগম হয়। ঠেলাঠেলি, কথাবার্তার ভিড়ে গমগম করে চারিদিক। আলাদা একটা অনুভূতি আসে। সবাই যেন নিজের ফুর্তিতে চলে। রকমারি জিনিসপত্র পাওয়া যায় বেতাই-এর হাটে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর ‘সহজ পাঠ’ দ্বিতীয় ভাগের ‘হাট’ কবিতায় তুলে ধরেছিলেন বক্সীগঞ্জের পদ্মা পারের হাটে বিক্রি হওয়া জিনিসপত্রের তালিকা —
“জিনিসপত্র জুটিয়ে এনে
গ্রামের মানুষ বেচে কেনে,
উচ্ছে বেগুন পটল মুলো,
বেতের বোনা ধামা কুলো,
সর্ষে ছোলা ময়দা আটা,
শীতের র্যাপার নক্সা কাটা,
ঝাঁঝরি ছাতা বেড়ি হাতা,
শহর থেকে সস্তা ছাতা,
কলসি ভরা এখো গুড়ে,
মাছি যত বেড়াই উড়ে,”

তেমনি প্রত্যেকটা হাটে বিক্রি হওয়া জিনিসপত্রের তালিকায় কিছু কিছু অভিনবত্ব আছে। যেমন-বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের ‘পাহাড়ের নিচে হাট’ রচনায় সিংভূমের হাটে বিক্রি হওয়া জিনিসের তালিকায় নবতম সংযোজন — জোঁদা অর্থাৎ নালসে পিঁপড়ের ডিম ও শুটকি মাছ। আবার কবিকঙ্কণ মুকুন্দ চক্রবর্তীর ‘কবিকঙ্কন-চন্ডী’র আখেটিক খণ্ডের ‘হাটে কালকেতুর দ্রব্য ক্রয়’ অংশে কবি কালকেতুর হাটে ক্রয় করা দ্রব্য সামগ্রী উল্লেখ দেখে আমাদের চক্ষু চড়কগাছ হয়।এমন সব দ্রব্যও তখনকার হাটে বিক্রি হত!
“লইয়া টাকার পাট চলে বীর গোলা হাট
পাছু ধায় শতেক কিঙ্কর।
সেবক যোগায় পান বিউনী বিজয়ে আন
বৈসে বীর দুলিচা উপর।।
কানে কলম হাতে দুঅত আইলো কায়স্থ- সুত
মহাবীরে নম্র কৈল মাথা।
রাহুত মাহুত মাল যে বা ধরে অসি ঢাল বীরের শুনিয়া আল্য কথা।।
আনন্দে পূর্ণিত মন ভাঙ্গায়্যা চন্ডীর ধন কিনে বস্তু শতে শতে লেখা।
বিচারিয়া কেহ দেখে কায়স্থ কাগজে লিখে
সায় কর্যা বান্যা দেই টাকা।।
কনকের সাজাকুড়া বিচিত্র পাটের গড়া সাজাকুড়া হীরায় জড়িত।
চন্দন তরুর কুড়া লম্বিত মুকুতা ছড়া কিনে দোলা রত্ন বিভূষিত।।
পর্বত্যা টাঙ্গন তাজি বাছিয়া কিনিল বাজী
গজ কিনে পর্বতের চূড়া।
লম্বমান মোতি যার অঙ্গদ কঙ্কণ হার
কিনে বীর কনক সাপুড়া।।
যুদ্ধের জানিয়া মর্ম অভেদ্য কিনিল বর্ম নানারত্ন-বিচিত্র মুকুটে।
কিনিল মহিষা ঢাল তালীপত্র করবাল মুঠ যার রচিত পুরটে।।
তবক বেলক টাঙ্গি ভিন্দিপাল শেল সাঙ্গি
ভূষণ্ডী ডাবুশ খরশাণ।
হীরামুঠি জমধর খেটক পট্টিশ শর কিনে বীর কামান কৃপাণ।।
পূরিতে জায়ার সাধ কিনিল পাটের জাদ
মণিময় সূত্র তাহে বেড়ি।
হীরা নীলা মোতি পলা কলধৌত- কণ্ঠ মালা
কুণ্ডল কিনিল স্বর্ণচুড়ি।।
নিয়োজিয়া জনে জনে গো ধেনু মহিষ কিনে
বলদ গড্ডর কিনে খাসী।
নেত- তূলী খাট পাটী পালঙ্ক মশারি শাটী
চন্দ্রাতপ পূর্ণিমার শশী।।
সরিষা মসুরি মাষ ধান্য নাহি দিশপাশ
গুড় তিল মুগ বরবটী।
তণ্ডুল কিনিল ছোলা মূলাইয়া লবণ গোলা
তৈল কিনে উমানিয়া ঘটী।।”

১. কিঙ্কর-চাকর, ভৃত্য, অনুচর,
২. বিউনী-হাতপাখা, বেণীবন্ধন, নারীদের কেশের পারিপাট্য সাধন,
৩. বিউনী বীজয়ে আন-চামর ঢুলায়ে আন,
৪. দুলিচা-ছোটো গালিচা বা আসন বিশেষ,
৫. রাহুত-রাজপুত্র ঘোড়সওয়ার, মিলিটারি পুলিশের উচ্চপদস্থ কর্মচারী, ৬.মাহুত-<মহামাত্র (হস্তিচালক)
৭. অসি-তরবারি,
৮. সায়-শেষ,
৯. সাজাকুড়া-সাজের আসন,
১০. টাঙ্গন-অশ্ব,
১১. তাজি- আরবীয় অশ্ব বা আরবী ঘোড়া (বানান ভেদে তাজী),
১২. বাজী-অশ্ব, ঘোড়া,
১৩. সাপুড়া- সর্বপুট, অলংকার বিশেষ,
১৪. গড়া -থান বস্ত্র,
১৫. তবক-বন্দুক,
১৬. বেলক-কুঠার,
১৭. ভিন্দিপাল-দন্তসমন্বিত অস্ত্র,
১৮. টাঙ্গি-পরশু, কুঠার জাতীয় অস্ত্র,
১৯. সাঙ্গি- নিক্ষেপণযোগ্য প্রস্তরাস্ত্র,
২০. ভূষণ্ডী-লৌহপ্রস্তরাদি ক্ষেপণক চর্মরজ্জু,
২১. ডাবুশ- অঙ্কুশ সদৃশ তীক্ষ্ণাস্ত্র,
২২. হীরামুঠি- মুষ্টিতে পরিধেয় অস্ত্র,
২৩. জমধর-জামদার, পার্শ্বে ধারণযোগ্য বক্র তীক্ষ্ণাস্ত্র,
২৪. খেটক-গদা,
২৫. পট্টিশ- দুদিকে ধার এমন খড়গ
২৬. জাদ-ফিতা

বেতাই-এর হাটেরও নিজস্ব একটা সংস্কৃতি রয়েছে। এখানেও নানান ধরনের জিনিস বেচাকেনা হয়। এখানকার হাটুরেরা বেশিরভাগই স্থানীয়। তবে আশেপাশের জায়গা থেকে যেমন শ্যামনগর, পলাশীপাড়া, দেবনাথপুর, মহিষবাথান, সাধুবাজার, করিমপুর ইত্যাদি জায়গা থেকেও হাটুরেরা আসে। আগে গরুর গাড়ি, ঘোড়ার গাড়ি করে হাটুরেরা জিনিসপত্র বয়ে নিয়ে আসত হাটে। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সর্বজনবিদিত ‘সহজপাঠ’ দ্বিতীয় ভাগের ‘হাট’ কবিতাতেও আমরা দেখি গরুর গাড়িতে করে হাটে জিনিসপত্র নিয়ে আসার দৃশ্য।
“কুমোর পাড়ার গরুর গাড়ি
বোঝাই করা কলসি হাড়ি
গাড়ি চালায় বংশীবদন
সঙ্গে যে যায় ভাগ্নে মদন।”
এখন সময় বদলেছে। এখন গরুর গাড়ির জায়গাটা দখল করে নিয়েছে টুকটুকি, অটো, টোটো, লসিমন ইত্যাদি। প্রাচীনকালে অনেক হাটই নদীর ধারে বসত। কারণ নদীর ধারে নৌকা নিয়ে যাতায়াতের সুবিধা হত। পরিবহনের খরচও অনেক কম হত। যেমন-তেহট্ট হাট।
“জলঙ্গী নদীর পূর্বপাড়ে কৃষ্ণনগর করিমপুর রাজ্য সড়কের উপর অবস্থিত তেহট্ট গ্রাম। বর্তমানে এটি মহকুমা সদর গ্রাম পঞ্চায়েতের অধীন গঞ্জে পরিণত হয়েছে।তেহট্টের পূর্ব নাম ছিল ‘ত্রিহট্ট’। একসময় সপ্তাহে এই গ্রামের তিন জায়গায় তিনটি হাট বসতো। সেই থেকে নাম হয় ‘ত্রিহট্ট’। ইংরেজ আমলে সরকারি নাম ছিল ‘তেহাটা’। লোক মুখে অপভ্রংশ হয়ে নাম হয় ‘তেহট্ট’। নদীর ধারে হাট এখনো বসে, রবি ও বৃহস্পতিবারে, তবে তিন জায়গায় নয়, এক জায়গায়।”
(‘তেহট্ট মহকুমার পুরাসম্পদ’ লোকেশ চন্দ্র বিশ্বাস, ‘রামধনু পত্রিকা’- ২০১৬, ‘নদিয়ার সংস্কৃতি-চর্চা’, সম্পাদনা-মৃত্যুঞ্জয় মন্ডল।) (চলবে)
লেখক : প্রসেনজিৎ দাস, বেতাই অখড়াপাড়া, বেতাই, নদিয়া।
সকলে পড়তে পারেন।