বেতাই-এর নানা গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই হাটবারে বাজার করতেই ভালোবাসেন। এর কয়েকটি কারণ ক্ষেত্র সমীক্ষায় খুঁজে পাওয়া গেছে। বেতাই এর হাটে শতকরা ৪০ ভাগ মেয়েরা হাট করতে আসে। কারণ এখানে অনেক পুরুষেরা বিদেশে ও অন্য কোনো রাজ্যে কাজের জন্য যান। তাই বাধ্য হয়েই মেয়েদেরই হাট বাজার করতে হয়। প্রতিদিনকার টাটকা শাকসবজি কিনে এনে রান্না করা মহিলাদের পক্ষে কষ্টকর হয়ে দাঁড়ায়। তাই এরা হাটবারে বাজার করে। আবারও তারা অপেক্ষা করে পরের হাটবারের জন্য। তবে বর্তমানে কিছু মানুষ পাড়ায় পাড়ায় সবজি ফেরি করে বেড়ায়। তার ফলে মেয়েদের সুবিধা হয়েছে, সেখান থেকেই প্রাপ্ত সামগ্রী কিনে নিন। ফলে দিন দিন হাটে লোকের সংখ্যা অনেকটাই কমছে। আবার অনেকে হাটে বাজার করতে ভালোবাসেন কারণ রকমারি শাকসবজি ও অন্যান্য প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র পাওয়া যায়, যেটা অন্য দিন পাওয়া যায় না। এই সুবিধার জন্যই তাই অনেকে হাটে আসেন। উল্লেখ্য তারা হাটবার ছাড়াও কিন্তু অনহাটেও বাজার করেন। তাই হাটে আসা একটা প্যাশান বলতে পারেন।তাছাড়া অনেকের মতে হাটবারে জিনিসপত্র বিশেষ করে শাক সবজি অন্যদিনের তুলনায় কিছুটা সস্তায় পাওয়া যায়। তাই অনেকেই সেই সুযোগে ভাঙা হাটে বাজার করতে আসেন।কারণ সেই সময় হাটুরেরা বাড়ি যাওয়ার অপেক্ষায় থাকে। কিছুটা সস্তায় জিনিসপত্র বিক্রি করে দিয়ে তারা বাড়ি মুখো হয়। এবার আসা যাক বেতাই হাটে কী কী ধরনের দোকানপাট থাকে তার একটা তুল্যমূল্য আলোচনায়। এখানকার হাটের মূল বৈশিষ্ট্য হচ্ছে, জিনিসপত্রের বৈচিত্র্য।

সবজি হাটঃ
সব হাটের মত বেতাই এর হাটে আলু, পটল, ঝিঙে, উচ্ছে, বেগুন, বাঁধাকপি, ফুলকপি, লঙ্কা, পেঁয়াজ, বীনস্, গাজর, লাউ, কুমড়ো, চিচিঙ্গা, পেঁপে, শসা, মোচা, থোড়, বকফুল, কুমড়ো ফুল, কচু, মান, ওল, শাপলা, কচুর লতি, থেকে শুরু করে সমস্ত সবজিই কমবেশি পাওয়া যায়। এখানকার হাটে শাকসবজি তুলনামূলকভাবে বেশিই ওঠে কিন্তু দাম তুলনামূলকভাবে বেশি। অথচ নাজিরপুর বা তেহট্ট হাটে জিনিসপত্রের দাম অনেকটাই বেতাই অপেক্ষা সস্তা। সকালে পাইকারি সবজি হাটটি বসে বেতাই-পলাশী মোড় সংলগ্ন অঞ্চলে। প্রচুর ক্রেতা ও বিক্রেতার সমাগম হয়। পেঁপে, পটল, বেগুন, কুমড়ো, ইত্যাদি পাইকারি দরে কিনে অনেকেই গাড়ি বোঝাই করে কলকাতা, রাণাঘাট, খড়গপুর ইত্যাদি স্থানে চালান করে।

পুরোনো জামা কাপড়ের হাটঃ
বেতাই এর হাটের আরেকটি বিষয় আমাদের নজর কাড়ে। সেটি হচ্ছে পুরোনো জামা কাপড়ের হাট। আমাদের ছেলেবেলা থেকে দেখে আসছি এই পুরোনো জামা কাপড়ের দোকানগুলি। তবে বদলেছে হাটুরের সংখ্যা। আগে সাত থেকে আটটা দোকান বসত, এখন বসে মাত্র তিন থেকে চারটি। বেতাই এর অনেক মানুষ যারা বিশেষ করে কৃষি কাজ করেন বা রং এর কাজ করেন বা রাজমিস্ত্রীর কাজ করেন বা ইটভাঁটায় কাজ করেন তারা এই পুরোনো জামা-প্যান্ট কেনেন এই সব দোকানিদের কাছ থেকে। যেগুলি দামেও মোটামুটি ভাবে সস্তা। তাই চাহিদা থাকাই এই পুরোনো জামা কাপড়ের হাটটি এখনও টিকে আছে। অনেকে এখান থেকে কাপড়ও কিনে নিয়ে যান লেপ বা কাঁথার ওয়াড় করার জন্য। আবার অনেকের মনে সংস্কার আছে যে পুরনো জামা কাপড়গুলি শ্মশানে মৃতদের সঙ্গে ফেলে দেওয়া হয়, সেগুলি এরা সুন্দর করে কেচে ইস্ত্রি করে বিক্রি করে। তাই অনেকে এর ত্রিসীমানায় ভেড়ে না। তবে মোদ্দা কথা হচ্ছে গ্রাম বা শহরের কিছু ফেরিওয়ালা কাপড় বা প্যান্টের বিনিময়ে প্লাস্টিকের ঘটি, গামলা, কৌটো, ইত্যাদি বিনিময় করে বিক্রি করেন। এক কাপড়, দুই, তিন বা চার কাপড় বা প্যান্টের বিনিময়ে তারা আলাদা আলাদা জিনিস নির্দিষ্ট করেন। এই কাপড়গুলি বিক্রির বড় হাট হয় নদীয়ার বীরনগর, বাদকুল্লা, চাকদহ ও পালপাড়ায়। এখানে ভালো জামা প্যান্ট কাপড় গুলি বেছে নেওয়া হয় ও কেচে ইস্ত্রি করে নতুন চকচকে করে ফেলা হয়। সেগুলি হোলসেল রেটে কিনে আনেন হাটুরেরা এবং হাটে বিক্রি করেন। বর্তমানে আধুনিক যুগে এসে এইসব পুরোনো বস্ত্রের চাহিদা ধীরে ধীরে কমছে। মানুষ এখন আর ওই পুরনো জামা কাপড়ে অভ্যস্ত নয়। তাই এই সমস্ত ব্যবসায়ীরা নিতান্ত অর্থকষ্টে ক্লিষ্ট। গ্রামের দিকগুলিতে যদিও এর চাহিদা কিছুটা আছে, শহরের দিকে এর চাহিদা নেই বললেই চলে।

মাটির জিনিসের হাটঃ
কুমোরদের তৈরি মাটির জিনিস, হাড়ি, সরা, ঝাঁঝরি, প্রদীপ, ধূপদানি, কলসি ঘট থেকে শুরু করে সুন্দর করে পুড়িয়ে রং করা মাটির ভান্ডার সবই পাবেন বেতাই এর হাটে। তাছাড়া শীতকালে পিঠে সরা, গাছ লাগানোর ছোটো-বড়ো টবও বিক্রি হয় এখানে। এখানকার হাটুরেরা সকলেই আসেন বেতাই এর সাধুবাজার থেকে। তারা জাতিতে সকলেই কুম্ভকার অর্থাৎ কুমোর। সকলেরই পদবি পাল। মদন পাল, সঞ্জিত পাল, নৃত্য পাল, বিজয় পালেদের দেখা যাবে বেতাই এর হাটে মাটির জিনিস সামনে করে বসে থাকতে। সবই তাদের নিজেদের হাতে তৈরি। চার থেকে পাঁচটা হাটুরে এসে দোকান পাতে অস্থায়ীভাবে ও মাটির জিনিসপত্র বিক্রি করে। তবে যেকোনো পূজা পার্বনের আগের দিনে বেচাকেনা একটু বেশিই হয়।

বাঁশের বোনা ধামা, কুলোঃ
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ‘হাট’ কবিতায় বেতের বোনা ধামা কুলোর কথা পাই। কিন্তু বেতের বোনা ধামা কুলো আর এখন কোথায় পাবেন? অগত্যা মানুষ এখন বেতের বিকল্প হিসেবে বাঁশের বোনা ধামা, কুলো, চালনে অভ্যস্ত হয়ে গেছে। বেতাই এর হাটেও এগুলো পাওয়া যায়। হাটবারে হাটবারে এদের দেখা পাওয়া যায়। সাধুবাজারের সমীর দাস, উত্তর জিৎপুরের মরণ দাস কিম্বা বেতাই দাস পাড়ার রঞ্জিৎ বেদ, গণেশ দাস কিম্বা সঞ্জয় দাসকে দেখা যাবে ছোটো-বড়ো ঝুড়ি, চালন, কুলো, ডালা, ঝুড়ি, হাঁস-মুরগির খাঁচার পশার সাজিয়ে বসে থাকতে দেখা যাবে। দামও মোটামুটি সস্তা। আবার দাম নিয়েও ক্রেতা বিক্রেতার মধ্যে তর্কাতর্কিও চলতে থাকে। সেটাও চোখে পড়ার মতো। এই মুখগুলিকে বহুদিন থেকে দেখে আসছি। স্থান হয়তো বদলেছে, বদলাইনি শুধু মানুষগুলো। দর কষাকষি করেই ক্রেতা জিনিস কিনবে এদের কাছ থেকে। মাঝে মাঝে অসহ্য লাগে এই ভীষণ দর কষাকষি।

পাখির হাটঃ
অনেকদিন আগে বেতাই এর হাটে একটি জিনিস ছিল লক্ষ্য করার মতো। সেটা হল পাখি, বক, হাঁস-মুরগির বিক্রি। অনেক অসাধু লোক বেতাই এর চাঁদবিল থেকে অনেক পরিযায়ী পাখি, বক, চ্যাগা, ডাহুক ইত্যাদি পাখি ধরে বাজারে বিক্রির জন্য নিয়ে আসত। উৎসাহী ক্রেতা পাখির লোভ সম্বরন করতে না পেরে অতি উৎসাহে সেগুলো ক্রয় করে নিয়ে যেত। বাড়িতে গিয়ে মহানন্দে ভোজন সারত। তাছাড়া আসত হাঁস, মুরগি বিক্রিরও চল ছিল। কিন্তু বর্তমানে পাখি হত্যা নিষিদ্ধ। বিশেষত যেগুলো প্রায় লুপ্তপ্রায়। তাই প্রশাসনের নজরদারিতে এই ঘৃণ্য ব্যবসা বন্ধ হয়েছে কিন্তু পাখি ধরার কু প্রথা এখনও বন্ধ হয়নি। হাঁস-মুরগিও আর বেতাই এর হাটে খোলা বাজারে বিক্রি হয় না। এগুলো বিক্রির জন্য নির্দিষ্ট মাংসের দোকান আছে। সেখান থেকে ক্রেতারা এগুলো সংগ্রহ করে গোটা অথবা মাংস হিসেবে। (চলবে)
লেখক : প্রসেনজিৎ দাস, বেতাই অখড়াপাড়া, বেতাই, নদিয়া।