ডন সিনেমার সেই বিখ্যাত গান ‘খাইকে পান বানারসওয়ালা’ মনে পড়ে! গানের রেকর্ডিংয়ের সময় কিশোরকুমার নাকি বেনারসী পান চিবচ্ছিলেন আর পিক ফেলছিলেন। সবাই অবাক। বেনারসের ফিলিংস আনার জন্যই তাঁর এই আয়োজন। অথচ বেনারসের পান আসে মূলত বাংলা, উড়িষ্যা, বিহার থেকে যোগান দেওয়া হয়।
বাঙালির যে কোন পুজোপার্বন বা শান্তিস্বস্ত্যয়ন অথবা চোব্য-চোষ্য-লেহ্য-পেয়-এর পর যাকে ছাড়া অসম্পূর্ণ হয় ভোজন; সে হলো সকলের প্রিয় সবুজ স্বর্ণ ‘পান’। ধারণা করা হয় ‘ব্রহ্মা তুষ্ট সুপারিতে, বিষ্ণু তুষ্ট পানে এবং মহাদেব চুনে’ অর্থ্যৎ পানের খিলিতেই বাস করেন ত্রিদেব।
পান খাওয়ার রেওয়াজ কবে থেকে শুরু হয়েছে সঠিক তথ্য পাওয়া যায় না তবে প্রায় সাড়ে পাঁচ হাজার বছর আগে শ্রীকৃষ্ণ পান খেতেন। দেবতাদের চিকিৎসক ধন্বন্তরীর সহায়তায় আয়ুর্বেদ পন্ডিতরা পান আবিষ্কার করেন। পন্ডিতদের মতে পানের আদি ঠিকানা ফিলিপিন্স, জাভা কিংবা বোর্নি। যদিও ভারতীয়রা পানের মধ্যে স্বদেশিয়ানার স্বাদ পান।

পানবিলাসী ছিলেন সুলতানরাও ইবন বতুতার লেখা থেকে তা জানা যায়। মহম্মদ বিন তুঘলকের দরবারের বাইরে এক মণ্ডপ থাকতো সাধারণের মধ্যে পান-সুপারি শরবত দেওয়ার জন্য।
মোঘল সম্রাট আকবরের আমলে ‘বেগমত-এ-ছালিয়া’ নামে বিশেষ ধরনের পান সাজার রেওয়াজ শুরু হয়। মোঘল অন্তঃপুরের নারীরা দ্রুত পান সাজতে পারতো।
শোনা যায়, বাদশাহ বা তাঁর বেগমেরা সারাদিনে প্রায় পঞ্চাশটি পান খেতেন। জাহাঙ্গীরের প্রিয়তমা স্ত্রী নুরজাহান অন্দরমহলে পানকে খুব জনপ্রিয় করে তোলেন এবং পানের সঙ্গে চিবানোর বেশ কিছু উপাদানও আবিস্কার করেন।
মনসামঙ্গল কাব্য থেকে জানা যায় চাঁদ সওদাগর সপ্তডিঙ্গা নিয়ে বাণিজ্য করতে গিয়ে উপস্থিত হন এক দেশে। কোতোয়াল দেখা করতে আসেন। অতিথিকে আপ্যায়ন করেন সোনার বাটা থেকে পান-সুপারি-চুন দিয়ে। কোতোয়াল চুনকে দই ভেবে চেটে খেলেন, পান পাতা দিলেন ফেলে। সওদাগর বুঝলেন, এ দেশের মানুষদের পানের ব্যবহার অজানা। ব্যবসায়ী বুদ্ধি উস্কে উঠলো। পান পাতার সওদায় পেলেন হিরে-মানিক।

একদা পানের বরজ থেকে এতটাই আয় ছিলো বাংলার সুবাদার আজিম-উস-শান পান চাষকে ‘সাউদিয়া খাস’ নাম দিয়ে একচেটিয়া রাজকীয় ব্যবসায় পরিণত করেন।
তবে, সেই আমলে হিন্দু বিধবাদের পান খাওয়া নিষিদ্ধ ছিলো। শাস্ত্রমতে পান আমিষ ও আনন্দের প্রতীক। সমাজ-অধিপতিদের বানানো এক অদ্ভুত খামখেয়ালি নিয়ম। ‘হিন্দু আচার অনুষ্ঠান’ বইটিতে এমনটার আভাস দিয়েছেন চিন্তাহরণ চক্রবর্তী।
ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগর শিবমোহিনী নামের এক গ্রাম্য অসহায় বালবিধবাকে সস্নেহে শিক্ষা দিয়ে তার জীবনের অমূল পরিবর্তন করেছিলেন। সংসারের নানা খুঁটিনাটি বিষয় শিখিয়েছিলেন নিজের হাতে। বৈঠকখানার সংলগ্ন ঘরে সমাজের কেউ দেখা করতে এলে বিদ্যাসাগর মহাশয় নিজেই বঁটিতে ফল কেটে, নাড়ু, মিষ্টি সাজিয়ে, জাঁতিতে সুপারি কেটে পান সেজে দিতেন। আদরের শিবুকেও পান সাজানো শেখান। বাজার থেকে গোছা ভর্তি পান এনে, ছোট-মাঝারি-বড় ভাগ করে সাজিয়ে রাখানো, কোন পানে খিলি হবে আর কোনটায় চুন লাগানো হবে আয়ত্তে অথবা চুনের ভাঁড়ে সামান্য জলের ছিটে না দিলে খিঁচ ধরে যায়, তা শিখিয়েছিলেন নিজের হাতে বিদ্যাসাগর মহাশয়।
জোড়াসাঁকোর ঠাকুরবাড়ির রান্নার সুনাম ছিলো বিশ্বজোড়া। শিল্প-সাহিত্যে বা রান্নায় সদস্যদের মধ্যে ছিলো জাদুর স্পর্শ। প্রতিদিন একটি করে তরকারি রান্না করা শেখানো হতো এবং শেখানোর শুরু হতো পান সাজা দিয়ে। শোনা যায়, দিনে প্রায় পাঁচশো কড়ুই পান সাজতো মেয়েরা। অতিথি আপ্যায়ন করা হতো পানের খিলি দিয়ে।

এখানকার পানের খিলির বৈশিষ্ট্য ছিলো চৌকো আকারের। খুব ছোটো আকারের পানের খিলির নাম ছিলো বেদানাখিলি।
‘সখা-সমিতি’-র মেলায় এক লাটমেম পানের খিলি পেয়ে তা কেক মনে করে অল্প অল্প করে কামড়ে খেয়েছিলেন।
পান খায়ে সাঁইয়া হমারে/সাঁওলী সুরতিয়া হোঁঠ লাল…
পান চিবিয়ে সাঁইয়ার ঠোঁট শুধু লাল হয়নি, লিপস্টিকবিহীন যুগে পান খেয়ে ঠোঁট লাল করতেন মহিলারা। একসময় সাজের অঙ্গ ছাড়াও প্রেমিক প্রেমিকারা নিঃশ্বাসের নির্মলতা আনতে ব্যবহার করতো পান। বাৎসায়নের ‘কামসূত্র’-এর একটি স্তবকে রয়েছে তাম্বুল বন্দনা। শরীর ও মনের স্ফূর্তির জন্য খাওয়া হতো পান।
পানের গুন বা ধর্মকে তাম্বুল গুন বলা হয়। এর মধ্যে কটূ, তিক্ত, উষ্ণ, মধুর, ক্ষার, কথায়, বাতঘ্ন, কৃমিনাশক, কফহর, দুর্গন্ধীদোষাপহ, বক্তাভরণ, সুগন্ধিকরণ ও কামাগ্নিসন্দীপন এই তেরো প্রকার গুন আছে।
উপকারী হওয়া সত্ত্বেও আন্তর্জাতিক ক্যান্সার গবেষণা এজেন্সির মতে সুপারি-পানের অতিরিক্ত ব্যবহার স্বাস্থ্যের জন্য ক্ষতিকর। পানের সঙ্গে জর্দা মিশিয়ে খেলে পানের গুন নষ্ট হয়ে যায়। পান থেকে চুন খসলে অনেক সময় বিপদ আসে, আবার চুন বেশি দিলে হয় মহাবিপদ। চুনের অতিরিক্ত ব্যবহার ক্ষতি করে দাঁতের এনামেলের। খয়েরের বেশি ব্যবহার ফুসফুসের ক্ষতি করে। পান পাতায় হজম শক্তি বাড়ায় কিন্তু বেশি ব্যবহারে হয় অজীর্ণ।
তাই অতিরিক্ত নয়, পরিমিত ব্যবহার উপকারী। খাওয়ার পর পান খাওয়া উচিত। পানের সুগন্ধি যেন আপনার জীবনের সৌরভ মুছিয়ে দিতে না পারে।
ভালো লিখেছেন। পড়ে আনন্দ পেলাম