যে আমি গতকাল ঘুমোতে গিয়েছিলাম সেই আমিই আজ চোখ মেলছি — এই পৌর্বাপর্ব্য অক্ষুণ্ণ থাকে বলেই জাগ্রৎ জীবনকে বাস্তব এবং অসংলগ্ন হয় বলেই স্বপ্ন-জীবনকে কল্পিত অবাস্তব বলি আমরা। আজকে রাত্রির স্বপ্নের পর “ক্রমশ” দিয়ে নিখুঁতভাবে পূর্বানুবৃত্ত স্বপ্ন যদি দেখতাম আর জাগ্রত জীবনটা যদি কোনো কারণে এলোমেলো হয়ে যেতো (ঘুমোতে গেলাম আগ্রার প্রাসাদে, জাগলাম আরবের মরুভূমিতে — এইরকম) তাহলে নিঃসন্দেহে স্বপ্নকেই বাস্তব এবং জাগ্রৎকেই মায়া হিসাবে ধরতাম। এখন স্মৃতি বা অবিচ্ছিন্ন অহংবোধক্ষাকারী উচ্চতর মস্তিষ্কের স্নায়ুকেন্দ্রগুলির মৃত্যু হলে সেই “সেই আমিই এই” এই প্রত্যাভিজ্ঞাই থাকবে না। তখন আমার শরীর থাকলেও আমি থাকব একথা কি করে বলি? হৃদয় বদলানোর মত মস্তিষ্ক বদলানোর অস্ত্রোপচার এখনো সম্ভব হয়ে ওঠেনি। কিন্তু এই অসম্ভাব্যতা কোনো ধ্রুব সত্য নয়, বিজ্ঞানের অগ্রগতির বর্তমান সীমাজনিত একটি সাময়িক সত্য। যে হৃৎপিণ্ডর স্পন্দনের জোরে জীবিত কি মৃত তা আমরা এতকাল ঠিক করে এসেছি সেই অঙ্গুষ্ঠমাত্র প্রাণপুরুষের অধিষ্ঠান হৃদযন্ত্রখানাই আজকাল অন্যের থেকে ধার করে নিয়ে বেঁচে থাকা যায়। তবু বলি আমার নিজেরই আয়ু বাড়ল। তাহলে একদিন ধার করা উচ্চতর মস্তিষ্ক নিয়ে — অতএব ধার করা স্মৃতি এবং অহংবোধ নিয়ে বেঁচেও কি আমি বলবো আমিই বেঁচে আছি। আমাকে থাকতে গেলে আমার নিজের হৃৎপিণ্ডটাও থাকতে হবে এমন নয়, আমার মস্তিষ্ক বাদ দিয়েও আমা থাকতে পারি। আমি একটা মস্তিষ্কবৃন্তও শুধু নই। আমি তাহলে কী? মস্তিষ্কমৃত্যু, হৃদয়মৃত্যু, জীবকোষমৃত্যু, কোন্ মৃত্যুটি আমার মৃত্যু? দর্শন ও শারীরবিজ্ঞানের সীমান্তে এই বিতর্কের কালবৈশাখী আজ চরমে উঠেছে। কাজেই ডাক্তারি ডেফিনিশনি যে আমাদের মৃত্যুজিজ্ঞাসার অন্ত ঘটাবে এমন আসা দুরাশা।
তবু ধরা যাক, শরীরের মৃত্যু কি তা আমরা জানি। আর, ধর্মীয় কুসংস্কার ও প্রেততত্ত্বের বুজরুকিতে আমাদের আস্থা নেই বলে আমরা মৃত্যু বলতে বুঝি একটি ব্যক্তির নিঃশেষ সমাপ্তি। ‘বাসাংসি জীর্ণানী’ অথবা ‘অজো নিত্যঃ’ আমরা যতই পড়ি না কেন — সজীব দেহটাকেই তো ‘আমি’ বলে যত্ন করি বা ‘তুমি’ বলে সোহাগ করি। তুমি রোগা হয়ে যাচ্ছো, সে পিছলে পড়ে গেল, আমি ভালো আছি — এই সব শরীর ঘিরে অনুভবই তো আমাদের হাড়ের মজ্জায় ঢুকে আছে। ধর্মপ্রবক্তারা অনেক সময়েই একটা শস্তা যুক্তি দিয়ে বোঝাতে চান যে দেহটা যেহেতু ‘আমার’ সেহেতু আমি দেহ নই। কিন্তু সবসময়েই এইরকম শব্দভেদ থেকে বস্তুভেদ প্রমাণিত হয় না। ‘পুতুলের শরীর’ বলি বলেই শরীর ছাড়িয়ে একটা পুতুল আছে বলতে পারি না। ‘রাহুর মাথা’ বলা যায় যদিও মাথার বাইরে রাহুর কোনো সত্তাই নেই। এই শাব্দিক যুক্তি যে কতো কাঁচা ‘আমার’ আত্মা’ এই প্রয়োগ লক্ষ করলেই তা বোঝা যায়। যা আমার তা যদি আমি না হই তা হলে তো আত্মাও আমি নই, ‘আমার আত্মা’ বলি যে! অতএব ধরা যাক মৃত্যু মানে যে-আমিকে আমি বলে চিনি সেই শরীরী আমির চির অবসান। মৃত্যুর পরেও আমার অশরীরী আত্মা বলে কোনো অংশ থেকে যায় কিনা তা নিয়ে তর্ক চলতে পারে। কিন্তু আমি — পুরো আমিটা অন্তত থাকে না। একটা শাড়ীর অংশকে তো ‘শাড়ী’ বলে না। গাড়ির অংশকেও বলে না “গাড়ি”।
মজার কথা হল যে (যেটা অনেক ভাবুকেরই দৃষ্টি এড়িয়ে যায়) মৃত্যুর অব্যবহিত পরে বরং দেহ নামে অংশটাই থেকে যায়। অস্বাভাবিক বিপর্যয়ে দেহবিকৃতি বা অঙ্গ বিশ্লেষ না হলে প্রায় হুবহু শরীরটা মৃত্যুর পরে অনেকক্ষণ পড়ে থাকে। অসতর্ক প্রয়োগে মৃত ব্যক্তির নাম বা তদ্বাচক সর্বনাম ধরে ওই মৃত শরীরটিকেও ডাকা হয়। “এই সমাধিবেদীর নিচে মাইকেল মধুসূদন শুয়ে আছেন।” “শোনা গেল লাশকাটা গরে নিয়ে গেছে তারে”। এখানে “মাইকেল মধুসূদন” বা “তারে” বলতে স্পষ্টতই শরীরটিকেই বোঝানো হয়েছে। খানিকক্ষণ পরে কৃত্রিম বা প্রাকৃতিক উপায়েই দেহটিও অবশ্য বিনষ্ট হয়ে যায় — যদি না মিশরীয় পদ্ধতিতে তাকে সুরক্ষিত রাখা হয়। তবু লোকটির থেকে দেহটি সব সময়েই সামান্য বেশী দীর্ঘজীবী।
তবে কিনা প্রাণহীন দেহ বা কায়াহীন আত্মা কোনোটিকেই আমরা ব্যক্তিনামের যথার্থ বাহক বা বাচ্য বলতে পারি না। সচেতন অথচ রক্ত-মাংসের এই দ্রব্যটকেই ‘শ্রীযুক্ত অমুক’, ‘শ্রীমতী তমুক’, ‘লোকটি’, ‘মহিলাটি’, ‘ইনি’, ‘সে’ বা ‘তুমি’ কিংবা ‘আমি’ বলি। এ এক অদ্ভুত পদার্থ যার বিষয়ে ‘লম্বা’, ‘বেঁটে’, ‘চলছে’, ‘বসে আছে’ — এসবও বলা যায়। আবার তাঁরই বিষয়ে রেগেগেছে, ভাবছে, ফূর্তিতে আছে, কষ্ট পাচ্ছে এসবও বলা যায়। আধুনিক যুগে অনেক দার্শনিকই এই পার্সন বা ব্যক্তিকে যুগপৎ দৈর্ঘ্য ওজন রং ইত্যাদি জড়ধর্ম এবং জ্ঞান ইচ্ছা আবেগ ইত্যাদি চেতনধর্মবিশিষ্ট একটিই অবিভাজ্য পদার্থ হিসেবে ভাববার চেষ্টা করছেন। জড়ধর্মের আশ্রয় একটি দেহ এবং চেতনধর্মের আশ্রয় একটি আত্মা — এই দুটি আলো অন্ধকারের মতো একান্ত বিরুদ্ধ-স্বভাব জিনিস, কোনো মতে পরস্পরের মধ্যে ঢুকে পড়েছে, এদের সমষ্টি অথবা এদের যে-কোনো একটা হিসাবে খোলের ভেতর অনু পরিমাণ কেশাগ্রের শত ভাগের শত ভাগ আত্মা পোরা আছে অথবা অখণ্ড চিদাত্মার আকাশকে এক-একটি দেহের অলীক রেখা দিয়ে কেটে কেটে দেখা হচ্ছে — দু রকম ছবিই ভারতবর্ষে ভাবা হয়েছে। কিন্তু মানুষকে এভাবে দু-ভাগে বিভক্ত করার বিপক্ষ যুক্তি প্রচুর। মানুষের তথাকথিত অশরীরী আত্মাও নাকি “হাঁটে”, আবার মানুষের জড় শরীরটিকেও জড় জিনিসের মত “সরু” বলি না, বলি “রোগা”। মানব শরীর তাই যে-কোনো জড় পদার্থের মতন নয়। সমস্ত দিক ভেবে মানুষ একটি অবিভাজ্য ব্যক্তি যার নানান বিচিত্র ধর্ম আছে — যার কিছু কিছু জড় পদার্থেও দেখা যায় আবার কিছু কিছু কেবল মানুষেরই আছে। মৃত্যুতে এই অবিভাজ্য পার্সনের সম্পূর্ণ বিলুপ্তি হয় এমন ভাবাটাই যুগের হাওয়া। এই সম্পূর্ণ বিলুপ্তির ধারণাটি কিন্তু লজিক দিয়ে বোঝা খুবই শক্ত।
প্রচলিত লজিকে ধরেই নেওয়া হয় যে, যদি একটি নাম সার্থক হয় তাহলে সেই নামের দ্বারা বাচ্য কোনো না কোনো জিনিস থাকবে। অর্থাৎ যখনই “শ্রীযুক্ত অমুক বুদ্ধিমান” বলা যাবে তখনই তার থেকে অনুমান করা সমীচীন হবে যে “এমজন এমন আছেন যিনি বুদ্ধিমান।” একে আধুনিক লজিকে অস্তিত্বঘটিত সামান্যীকরণের নিয়ম বলা হয়েছে। এই তাত্ত্বিক সমস্যার সমাধানকল্পে অনেক রকম পারিভাষিক কসরত করা যেতে পারে। প্রথমত কেউ বলতে পারেন যে, ‘মারা গেছেন’ এই বিধেয়টি ম্রিয়মান ব্যক্তির কোনো যথার্থ ক্রিয়া বা ধর্মবাচক নয়। “আছে” — এটা বিধেয় নয় — এই শ্লোগান কান্টের সময় থেকে চালু হয়েছে। এখন তাহলে “নেই” বা “মৃত” এটাও বিধেও নয় বলে ঘোষণা করা হোক। বিংশ শতাব্দীর সর্বাধিক আলোচিত পাশ্চাত্য দার্শনিক ভিট্গেনস্টাইন তো ট্র্যাক্টাটাস গ্রন্থে বলেছেন যে, মৃত্যু জীবনের কোনো ঘটনা নয়। মৃত্যুর ঠিক আগের ক্ষণটি পর্যন্ত ব্যক্তিটির জীবন বা আয়ুর বিস্তার। অবশ্য বিলুপ্তি, শেষ হয়ে যাওয়া বা অস্তিত্বনাশের ধারণাটি গাণিতিক সীমা এর ধারণার মতই দুরবগাহ। তবু “সক্রেটিস্ মারা গেলেন” এটা সক্রেটিস বিধয়ে কোনো সংবাদ নয়; সক্রেটিসের জীবনের কোনো ঘটনা নয় তাঁর বীরের মতো মরণ — এটা মেনে নিতে কষ্ট হয়। দ্বিতীয়ত, কেউ বলতে পারেন যে, অস্তিত্বঘটিত যে মানক ব্যবহার করে “এমন কেউ একজন আছেন, যিনি মৃত” — বলা হচ্ছে, সেই মানকের অন্তর্গত “আছেন” শব্দের মানে বেঁচে থাকা নয়। কাজেই পরবর্তী “নেই” শব্দের সঙ্গে তার বিরোধ হবে না। লজিকের জগতে থাকা মানে কোনো না কোনো নামের বাচ্য হয়ে থাকা। মৃত ব্যক্তি সত্তা হারালেও স্বনামের বাচ্যই থেকে যান। তার নামটি তো আর মৃত্যুক্ষণ থেকে রূপকথার নামগুলির মত হয়ে যায় না। আজ “অতুল্য ঘোষ” নামটি “বন্ধ্যাপুত্র” বা “খরগোশের শিং” শব্দের মত নিরর্থক হয়ে যায় নি। লজিকের জগতে থাকা মানে কোনো না কোনো কালে অথবা কালাতীতভাবে থাকা, আর বাঁচা অর্থে থাকা মানে বর্তমানে থাকা। কাজের লজিকে এমন অনেক কিছুই আছে যা বর্তমানে নেই।
এই সমাধান শুনতে যতই ছিমছাম হোক এতে সত্তার বিভিন্ন স্তর কল্পনার একটি উস্কানি থেকে যায়। আর এই স্তর কল্পনা একবার শুরে হলে কল্পিত সত্তা, কালাতীত সত্তা, বিমূর্ত সত্তা ইত্যাদি বাস্তবাতিরিক্ত বহু সত্তার রাজ্য তৈরি হতে থাকবে। এবং রাসেল যে আমাদের শিখিয়েছিলেন যে এক শিংওয়ালা ঘোড়া যদি প্রাণিবিদ্যায় না থাকে তাহলে লজিকেও নেই — সেই দার্শনিক সত্তার সংখ্যা সংযমের শিক্ষা আমরা বুলতে বসবো।
তৃতীয়ত, কেউ বলতে পারেন যে, কালিক যুক্তিবিজ্ঞান দিয়ে মৃত্যু সংবাদকে বিশ্লেষণ করতে হবে। এটা অতীতে সত্য ছিল যে, এমন একজন আছেন যিনি আর ইন্দিরা গান্ধী অভিন্ন, এবং এটা বর্তমানে মিথ্যা যে এমন একজন আছেন যিনি আর ইন্দিরা গান্ধি অভিন্ন — এইভাবে ইন্দিরা গান্ধি মারা গেছেন” এই বাক্যের বিশ্লেষণ করতে হবে। নামের ব্যবহার থেকে অস্তিত্ব-অবধারণ নিষ্কাশন করে ‘মারা গেছেন’ এই অস্তিত্বনিষেধের সঙ্গে তার ঝগড়া বাঁধিয়ে দেবার যে সম্ভাবনা ছিল তা আপাতত নিবারিত হল। বর্তমান কাল বিষয়ে যা বলা হল সেই দ্বীতিয়াংশে “ইন্দিরা গান্ধি” নামটি “এটা মিথ্যা যে” — এই নিষেধ প্রকরণের অধীনস্থ হওয়ার নামটি তেকে অস্তিত্ব নিঃসরণের বিপদ ঘটবে না।