বেকন বলেছেন মানুষের মরণভয় যেন শিশুদের অন্ধকার ঘরে যাবার ভয়ের মতো। মৃত্যুর অন্ধকারের মধ্যে কি না কি থাকে — কোন অজানা বিপদ তাই শংকিত মানুষ-শিশু মৃত্যুতমসার চৌকাঠে সিঁটিয়ে থাকে।
মৃত্যু বিষয়ে আমি জানি না কিছুই। কখন মরবো তা জানি না, কেমন করে মরবো তা জানি না। মরতে কেমন লাগে তা কারু পক্ষে আমাকে বলে দেওয়া সম্ভব হয়নি, হবেও না। এই দুর্জ্ঞেয়তার জন্যই মরণ এত ভীষণ এ ব্যাখ্যাও খুব প্রাচীন।
কিন্তু অচেনা যেমন আমাদের ভয়ের কারণ হয় তেমনি অচেনার আনন্দও তো আছে। ওয়ার্ডসওয়ার্থের না-দেখা ইয়ারোর মত মৃত্যু না জানি কতো সুন্দর তা আমরা ভাবি না কেন? অজানা বলেই কি পালাবো তার থেকে? জয় অজানার জয় বলবো না? আসলে অজানা হলে আনন্দ ও দুঃখ দুটিই গাঢ়তর হয়। যদি নিরপেক্ষ কোনো যুক্তিতে মৃত্যুকে দুঃখময় বলে জানি তাহলে তার অজ্ঞাতত্ত্ব দুঃখকে ভীষণতর করবে। জীবনে তেতো হয়ে গিয়ে হ্যামলেট তাই এর পরটাও এমনি দুঃখময় ভেবে নিয়ে সেই দুঃখ অজানা বলে দুঃসহতর এই সিদ্ধান্ত করেছিল। কিন্তু মরণ যে আদৌ দুঃখের হবে তা তো আগে জানতে হবে। রবীন্দ্রনাথ তো কেবলই উলটো কথা বলেছেন। কখনও বলেছেন এই অজানার ভয়টা কোলের বাচ্চার স্তন থেকে স্তনান্তরে যাবার আতঙ্কের মত অযৌক্তিক। বস্তুত অন্ধকারকে শিশুরা ভয় পায় সেটা তো অমূলক ভয়েরই প্রকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। কে বলতে পারে যে নাস্তিত্বের আস্বাদ জীবনের থেকে মধুরতর হবে না। আসল কথা দুঃখ সম্ভাবনাই তো নেই। তাহলে অজানাকেই বা ভয় কেন? কেবল অজানা বলেই তো আর ভয় হয় না!
তাহলে কি মৃত্যুযন্ত্রণাকে নয়, মৃত্যুজনিত আমার বা অন্যের বঞ্চনাকে নয়, মৃত্যুর তমসাবৃত স্বরূপকে নয় — বিশুদ্ধ নাস্তিত্বকেই আমাদের আসল ভয়? ভালো থাকতে, বেঁচে থাকাটা টের পেতে আমরা চাই তো বটেই। কিন্তু সবার ওপর স্রেফ থাকতেই ভালোবাসি আমরা? জীবনের নেশাটা কেবল সুখের নেশা নয়, আরো গভীরভাবে তা হলো অনস্তিত্বেরই নেশা? আর এই থাকা তা যতই দুঃখদগ্ধ হোক না কেন তবু তা-ই আমাদের প্রিয়। এই থাকাতেই বাদ সাধে বলে মৃত্যু এত ত্রাসের কারণ? মৃত্যুতে আমার যে অনন্ত অনস্তিত্ব শুরু হবে কোনো পুনর্জন্মেও আমার সেই অনস্তিত্বের ছেদ পড়বে না। একে তো স্ব-চেতনার সুতো ছিঁড়বেই। না হয় জাতিস্মরতার অব্যর্থ প্রতিশ্রুতিও পাওয়া গেল। তবু এই যে সশীর অনন্য আমি এ তো আর ফিরে আসবে না। এই ‘নেই’ হয়ে যাওয়াটাই আমাদের একান্ত অপছন্দ। এই যুক্তির বিরুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ দুটি দার্শনিক আপত্তি ওঠে।
প্রথমত, নিছক নাস্তিত্বই যদি আমাদের ভয়ের কারণ হয় তাহলে মৃত্যুর পরবর্তী শূন্যতার মত জন্মের পূর্ববর্তী শূন্যতাও আমাদের পক্ষে শোচনীয় হত। কারণ নাস্তিত্ব হিসেবে দুটিই সমান। আমার মৃত্যু হওয়ায় আমার যে অভাব আরম্ভ হবে তার যেমন শেষ নেই বলে তা অনন্ত। তেমনি আমার জন্ম হওয়ামাত্র আমার যে অভাব জগৎ থেকে মুছে গিয়েছে তারও শুরু ছিল না বলে তা অনাদি।
কিন্তু কি জন্ম প্রাগবর্তী নাস্তিত্ব নিয়ে তো কেউ তেমন শোকমগ্ন হয় না। তাহলে মৃত্যুপরবর্তী নাস্তিত্ব নিয়ে হয় কেন? দুটোই তো আমারই না থাকা।
দ্বিতীয়ত, যাকে আমি ভয় পাবো তাকে তো আমার চিন্তার পরিধির মধ্যে থাকতে হবে। ভয়ানুভূতির যে বিশ্লেষণ আমরা আগে করে এসেছি তার থেকেই পাওয়া যাচ্ছে যে ভয়ের গর্ভে থাকে একটি ভবিষ্যৎ বিষয়ক বিশ্বাস। আমার নিজের অনস্তিত্ব কি করে আমার বিশ্বাসের বিষয়বস্তু হতে পারে? ফ্রয়েড বলেছেন যে যখনই আমি আমার মৃত্যু বিষয়ে ভাবি তখনই আমি সেই ঘটনার দ্রষ্টা হিসাবে সেই কল্পিত অবস্থার উপস্থিত থেকে যাই। ফলে আমার নিজের সম্পূর্ণ অনস্তিত্বকে আমি ভাবতেই পারি না। তাহলে আর কি করে অনস্তিত্ব ভেবে ভয় পাবো? নাস্তিত্বকে ভয় করি বলেই মৃত্যুকে ভয় করি এই যুক্তি কিন্তু এতো সহজে খণ্ডিত হবার নয়।
প্রথমত মরণান্তিক না-থাকা আর জন্মপূর্ব না-থাকার তুলনাটা সর্বাংশে গ্রহণীয় নয়। অবশ্য জন্মের আগেকার না-থাকাটা নিয়েও যে আমরা একেবারে দুঃখ করি না তা নয়। হায়! কেন লেনিন বা শ্রীরামকৃষ্ণের সময়ে জন্মালাম না — এই দুঃখ অনেক পরবর্তী ভক্তের হতেই পারে। তবে সেই দুঃখটিকে ভয় বলা যাবে না কারণ ভয় স্বরূপত ভবিষ্যদ্মুখী। তাই জন্মের প্রাগ্বর্তীকালে শোচনীয় হলেও তাকে বয় করার প্রশ্ন ওঠে না। আরো একটি গভীরতর কারণে মৃত্যুর পর আমার না-থাকার, না-থাকা হিসেবেও একটা বৈশিষ্ট্য থেকেই যায় — যেটা জন্মের আগে আমার না-থাকার মধ্যে খুঁজে পাওয়া যায় না। আমার পিতামাতার যে বীজ ও ডিম্বকোষ সংযোগ আমার জন্ম সেগুলি ছাড়া অন্য কোনো পিতামাতার অথবা অন্য কোনো বীজ-ডীম্বকোষ সংযোগে যে অসংখ্য শিশুর জন্ম হয়েছিল বা হতে পারতো তাদের মধ্যে কোনোটিকেই এই আমির সঙ্গে অভিন্ন বলা যেতো না। গর্ভাবাসকালে সামান্য হেরফেরে কয়েকদিন বা কয়েক সপ্তাহ আগে হয়তো আমার এই আমি ব্যক্তিটিরই জন্ম হতে পারতো। কিন্তু তাত্ত্বিক দিক দিয়ে আমিই হুবহু এই ব্যক্তিটিই — যবে বস্তুত জন্মেছি তার দু-দশবছর আগে যে হত সে শিশু আমি হতাম না। কাজেই আমার জন্মের পূর্বে যে নাস্তিকত্বকাল তাতে আমার অস্তিত্বের লজিকাল সম্ভাবনাই যেহেতু অনুপস্থিত সেহেতু কেন তখন আমি থাকলাম না এই শোক করাটা একান্তই অযৌক্তিক হবে। অথচ একবার আমি এসে গেলে আমি বলে একটি ব্যক্তির জীবন শুরু হয়ে গেলে তত্ত্বগতভাবে যেহেতু অনন্ত ভবিষ্যতের কোনো বিন্দুতেই আমি নিজেকে খুঁজে নিতে পারি তাই ভবিষ্যতে আমার ধ্বংস হয়ে যাবার পর চরাচরে আমার যে হাঁ-করা অভাব রাজত্ব করবে সেই অভাবের গায়ে তীক্ষ্ণভাবে বিঁধে থাকবে আমার আত্মপরিচয়।
বস্তুত যে সময়ে আমি মরবো সেই সময়ে আমি না মরলেও আমি আমিই থাকতাম। কিন্তু যে সময়ে আমি বস্তুত জন্মেছি সে সময়ে আমি না জন্মিয়ে, অনেক আগে জন্মালে আমি আমিই থাকতাম না অন্য কেউ হতাম। তাই অতীত আর ভবিষ্যতের দুঃখের প্রতি আমাদের এমনিতেই যুক্তিসঙ্গত মনোভাববৈষম্য আছে বলে আর আমার বাস্তব জন্মক্ষণের খুব বেশী আগে আমি জন্মাতে পারতাম না বলেই মৃত্যু পরবর্তী নাস্তিত্ব নিয়ে আমি যুক্তিসঙ্গতভাবেই শোক করতে পারি জন্মপ্রাগবতী নাস্তিত্ব নিয়ে তা পারি না। আর নিজের অনস্তিত্ব আমার চিন্তার অযোগ্য দেকার্তে-গান্ধি ফ্রয়েডের এই যুক্তি খুবই আপাতমনোগ্রাহী হলেও এতেও একটি বড় রকমের প্রতারণা আছে বলে সন্দেহ হয়। আমি দাঁড়িয়ে আছি একটা গাছের তলায় বন্ধুর সঙ্গে এটা যখন ভাবি আর বন্ধু একা দাঁড়িয়ে আছে ওই গাছেরই তলায় — এটা যখন ভাবি তখন দুটি ভাবনার মধ্যে অবশ্যই তফাৎ থাকে। আর তফাৎটা স্রেফ এইটুকু যে দ্বিতীয় ভাবনাটার ভেতরে আমি নেই। দ্বিতীয় ভাবনাটাও আমারই ভাবনা, কিন্তু আমি-বিষয়ক ভাবনা নয়। কাজেই আমি নেই এমন অবস্থায় জগৎটা বা আমার ঘরটা কেমন দেখাবে তা আমরা অনায়াসেই চিন্তা করতে পারি। সেই অবস্থাটি আমার চিন্তার বিষয় হয় বলেই তার মধ্যে দ্রষ্টা হিসেবে আমিও অন্তর্ভুক্ত হয়ে পড়ি এটা ভাবা ভুল। স্ববিরোধ আচে আমার অভাব আমিই সমকালে দর্শন করছি এই ভবিষ্যৎ ভাবার মধ্যে। কিন্তু আমার অভাব রয়েছে সেটা ভাবতে কোনো স্ববিরোধ নেই। কাজেই নিজের নাস্তিত্ব ভেবে বয় পাওয়া সম্ভব। তবে কি না এই ভয় হবে খুব অদ্ভুত ধরনের। যেহুতু না-থাকা অবস্থায় আমি দুঃখীও হতে পারি না সেহেতু অন্য সব ভয় যেখানে হয় ভবিষ্যতে আমি দুঃখ পাবো এই বিশ্বাসকে ঘিরে — এই ভয় সেখানে হবে ভবিষ্যতে আমি দুঃখ পাব না এই বিশ্বাসকে ঘিরে। এহেন ভয় করা কতটা যুক্তিসহ হবে তা ভাবতে ভাবতে হয়তো আমাদের মৃত্যুভয়ই একটু একটু করে ক্ষয়ে আসবে — কে বলতে পারে!