‘ভাদু আমার গরবিনী, ওগো আমার ভাদুমনি/ মাথায় দিব সোনার মুকুট, শাড়ি দেবো জামদানি’ —
লোকসংস্কৃতির অপারখনি এই রাঢ়বঙ্গ। ভাদ্রমাস এলেই রাঢ়বঙ্গে পালিত হয় শস্য ও কৃষি সম্পর্কিত টুসু, করম, ছৌ, ঝুমুর, ভাঁজো, ইঁদ, ভাদু(Bhadu Festival) উৎসব।কিন্তু কে এই ভাদু?
ভাদু হলেন মানভূমের পঞ্চকোট রাজপরিবারের এক আদুরে রাজকুমারী, যার নাম ভদ্রাবতী। যিনি সময়ের বহমান ধারায় জনশ্রুতি থেকে লোকপূজ্য দেবী হয়ে ওঠেন। কথিত আছে, ভাদ্র মাসে কাশীপুরের রাজার ঘর আলো করে এক কন্যা সন্তানের জন্য হয়। বিবাহযোগ্য এই কন্যার মৃত্যুও ঘটে ভাদ্র মাসে এবং তার স্মৃতিতেই এই উৎসব পালিত হয়।
ভাদু উৎসব নিয়ে লোকমুখে বেশ কিছু গল্প শোনা যায়। সবচেয়ে প্রচলিত গল্প কাশিপুরের পঞ্চকোট রাজবাড়ির রাজা নীলমণি সিংদেওর তৃতীয় কন্যা ছিলেন ভদ্রাবতী। রাজকন্যা ভদ্রাবতীর সেদিন ছিল বিবাহ অনুষ্ঠান কিন্তু বর বিয়ে করতে আসার পথে ডাকাতের কবলে পড়ে মারা যান। সেই শোক সহ্য করতে পারেননি ভাদু। মর্মাহত রাজকুমারী সহমরনে যান স্বামীর সাথে এবং জনমানসে তিনি সতী লক্ষ্মী কন্যা হিসেবে স্থান লাভ করেন। ১৯৮৫ খ্রিষ্টাব্দে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ওয়েস্ট বেঙ্গল ডিস্ট্রিক্ট গেজেটিয়ার পুরুলিয়া গ্রন্থে এই খবরটি প্রকাশিত হয়।
অন্য একটি কাহিনীতে বলা হয়েছে, ভিন দেশের রাজকুমারের সাথে ভাদুর বিবাহ ঠিক হয়েছিল। বিবাহের রাতে রাজকুমার পথে অসুস্থ হয়ে ভেদবমি হয়ে মারা যান। খবর পেয়ে আত্মঘাতী হন ভাদু।
আবার কেউ বলেন, কাশিপুরের রাজার মেয়ে ছোট বয়স থেকে একটি পুতুল নিয়ে খেলা করত। রাজকন্যা সেই পুতুলের আদর করে নাম দিয়েছিলেন ভাদু। ঘটনা প্রবাহে ওই রাজকন্যা অসুস্থ হয়ে মারা যান। রাজার দ্বিতীয় কোন সন্তান ছিল না। শোকাতুর পিতা মাতাকে একদিন রাজকন্যা স্বপ্নে বলেন, ‘বাবা ভাদু তোমার বাড়িতেই আছে, তাকে লালন পালন করো’। এরপর থেকেই রাজকন্যা ভাদুর স্মৃতিতেই কাশিপুরের রাজার পৃষ্ঠপোষকতায় শুরু হয় ভাদু উৎসব।
যদিও রাজপুরোহিত রাখালচন্দ্র চক্রবর্তী রচিত পঞ্চকোট ইতিহাস নামক গ্রন্থে কাশিপুরের রাজাদের বংশ পঞ্জিকায় ভাদু কিংবা ভদ্রাবতী নামক কন্যা সন্তানের কোন উল্লেখ নেই। রাজা নীলমণি সিংদেওর তিন পত্নী কতৃর্ক দশ পুত্র সন্তানের কথা শোনা যায়।
অথচ এই রাজবাড়ীতেই ভাদ্র মাসে ভাদুগানের সূত্রপাত হয় এবং তার জন্য তার বহু প্রমান রয়েছে প্রচলিত ভাদুগানগুলির মধ্যে।
আবার অনেকের মতে ভাদু অবৈধ সম্পর্কের ফলে নিম্ন সম্প্রদায় ঘরে জাত কন্যা বলেই এই উৎসব রাজপরিবারের আঙিনা টপকে নিম্ন সম্প্রদায়ের মধ্যে উৎসাহের সাথে পালন করা হয়। তবে এই প্রসঙ্গে সেরকম কোনো তথ্যনির্ভর প্রমাণ পাওয়া যায় না।

আবার ঠিক এইরকম গল্পই প্রচলিত হয়েছে বীরভূমে। সেখানে ভদ্রাবতীকে হেতমপুরের রাজার মেয়ে হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে শোনা যায় ভদ্রাবতীর সঙ্গে বিয়ে ঠিক হয়েছিল বর্ধমানের রাজপুত্রের। কিন্তু ইলামবাজারের কাছে চৌপারির শালবনে ডাকাতদের আক্রমণে নিহত হন বর্ধমানের রাজপুত্র। শোকে বিহ্বল ভদ্রাবতী রাজপুত্রের সঙ্গে সহমরনে যান।
বাঁকুড়া জেলার সিমলাপালে ব্রাহ্মণ এবং অন্যান্য সম্প্রদায়ের মেয়েরা একসাথে পালন করেন ভাদু। এই উৎসবে অংশগ্রহণ করেন পুরুষরাও। তবে সময়ের সাথে এই উৎসব মলিন হয়ে আসছে।
ভাদু উৎসব মূলত কৃষি উৎসব। সম্ভবত ভাদ্র মাস থেকেই ভাদু নামটির উৎপত্তি হয়েছে। ভাদ্র মাস কৃষক পরিবারের কাছে অভাবের মাস। উঁচু নিচু ক্ষরা ল্যাটেরাইট প্রকৃতির রাঢ ভূমিতে সেই সময় কোন ফসল হয় না। নিম্ন সম্প্রদায় দিনমজুররা সেই সময় ভাদো (তাল) খেয়ে দিন কাটাতেন। সম্ভবত এই জন্যই ভাদু উৎসবের সূত্রপাত। তারাই তাদের কাঙ্খিত শস্য উর্বরতার মানসকন্যা হিসেবে ভাদুব্রত পালন করে।
ধর্মীয় মতে, ভাদু উৎসব আসলে লক্ষ্মী দেবীর প্রতি উৎসর্গীকৃত। ভাদ্র মাসে লক্ষ্মী-পূজার রীতি অনুসারে, এই উৎসবে শস্যের প্রাচুর্য এবং ঘরে লক্ষ্মীর আগমন কামনা করা হয়।
ভাদু উৎসব নিয়ে অনেক বিতর্ক থাকলেও আগে ভাদুর কোন মূর্তি ছিল না। তবে পরবর্তীকালে মূর্তির প্রচলন হয়। অঞ্চলভেদে মূর্তি নিয়ে বিভিন্ন ধরনের অনুষ্ঠানও পালিত হয়। ভাদু উৎসবে সুনির্দিষ্ট মন্ত্র, পুরোহিত নেই। তবে অঞ্চলভেদে উৎসব পালনের বিভিন্ন প্রথা বা নিয়ম রয়েছে ।
শঙ্খ, উলুধ্বনি, নানা উপাচার, বন্দনা, আরতির মধ্যে ভাদ্র সংক্রান্তির সাত দিন আগে ভাদুমূর্তি পিঁড়িতে স্থাপন করা হয়।সংক্রান্তির আগের দিন চলে জাগরণ৷ এদিন মেয়েরা সারা রাত জেগে থাকেন এবং ভাদু গান করেন। চলে মিষ্টিমুখও৷ এরপর ভাদ্র সংক্রান্তির দিন সকালে মেয়ে, বউ, বয়স্ক মহিলারা ভাদু গান গেয়ে বিসর্জন দেন ভাদুর মূর্তি।
রাঢ় বঙ্গের অর্থাৎ পুরুলিয়া, বাঁকুড়া, বীরভূম, পশ্চিম মেদিনীপুর ও পশ্চিম বর্ধমান জেলার আসানসোল মহকুমা এবং ঝাড়খণ্ড রাজ্যের রাঁচি ও হাজারিবাগ জেলার ভাদু উৎসবের অন্যতম হলো ভাদুগান। সাধারণত গৃহিণীদের জীবন কাহিনী, সুখ-দুঃখ ও বেদনাই এই ভাদুগানগুলির মূল বিষয়। এছাড়াও পৌরাণিক ও সামাজিক ভাদুগান বিভিন্ন পাঁচালীর সুরে গাওয়ার রীতি আছে। চার লাইনের ছড়া বা চুটকিজাতীয় ভাদুগানগুলিতে সমাজ জীবনের বিভিন্ন অসংগতির চিত্র সরস ভঙ্গিতে ফুটিয়ে তোলেন ভাদুশিল্পীরা।
এই ব্রতের গানের মধ্যে দিয়ে কুমারী হৃদয়ের ব্যক্তিগত আশা-আকাঙ্ক্ষা এবং কামনা-বাসনা প্রকাশ পায়। ভাদ্র কুমারীরা একটি মাটির নারীপ্রতিমা তৈরি করে যাকে বলা হয় ভাদুর মূর্তি। সেই মূর্তির সামনে রেখে কুমারী মেয়েরা ভাদুর আগমনী গান গায় —
ভাদুর আগমনে রে —
কি আনন্দ হয় গো–মোদের প্রাণে।
ভাদু আজকে এলো ঘরে গো এলে গো শুভদিনে।
মোরা সাজি ভর্তি ফুল তুলেছি গো যত সব সখিগনে।
সারা ভাদ্র মাস ধরে চলে ভাদুব্রতের অনুষ্ঠান। ভাদুমনির কুমারী মনের সঙ্গে এইসব অঞ্চলের কুমারী মনের একাত্মতা আছে বলেই ভাদুরানীর বিদায় দিনে কুমারী মেয়েরা অশ্রুসজল চোখে গাইতে থাকে —
ভাদু বিধুমুখী।
এসো এসো হৃদয়ে ধরে রাখি।।
বিদায় কথা শুনে — তোমায় গো, অবিরল ঝরে আঁখি।
(তুমি) যেওনা গো, বিনয় করি, আমাদের দিয়ে ফাঁকি।।
এই ভাদুরানীকে উদ্দেশ্য করে এই অঞ্চলের মেয়েদের মনের কামনা বাসনা চমৎকারভাবে প্রকাশ পায় অনুষ্ঠানের মধ্যে দিয়ে।
সময়ের গতিধারায় আধুনিক জাঁকজমক জড়িয়ে ধরেছে এঁদের অকৃত্রিম জীবনযাপনকে। তাদের গানের মধ্যে পাওয়া যায় সাম্প্রতিক বিভিন্ন ঘটনার কথাও। গানের সুরেও লেগেছে আধুনিক গানের ছোঁয়া। তাই ভাদুকে কোন শোক বা স্মৃতি উৎসব বলে মেনে নেওয়ার কোন অবকাশই নেই।