জগন্নাথদেবের এক পরম ভক্ত, সেবিকা ভোরবেলা ঘুম থেকে উঠেই রান্নাঘরে ঢুকতেন। দিনের আলো ফোটার সঙ্গে সঙ্গে তার প্রথম কাজ প্রভুর জন্যে মনপ্রাণ দিয়ে ভোগ তৈরি করা ।
জগন্নাথ একদিন স্বপ্ন দিলেন তাকে, “তুমি কেমন মেয়ে হে? সকালে উঠে বাসী কাপড়টি পর্যন্ত ছাড়ো না, স্নান করো না! আমাকে অশুচি অপবিত্র হয়ে ভোগ নিবেদন করো?”
সে পরম ভক্ত হাতজোড় করে বললে, ‘হে প্রভু আমার বয়স হয়েছে। একা হাতে বাসী ঘরদোর পরিষ্কার করে, স্নান করে তোমার ভোগ তৈরি করতে যে বড় দেরী হয়ে যাবে! তুমি ক্ষিদে সইতে পারবে তো?’
জগন্নাথ বললেন, ”পারব। তুমি বাপু পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন হয়েই রন্ধনশালায় ঢুকো।”

প্রভুর কথা অমান্য করা যায় না। সে বৃদ্ধা সকালে উঠে বাসী কাজ সেরে, স্নান করে, ঘরদোরে গোবরছড়া দিয়ে তারপরে মহাপ্রভুর ভোগের কাজ হাত লাগায়।
এদিকে জগবালিয়া তখন খিদের চোটে অস্থির! আগের ব্যবস্থাই বোধহয় ভালো ছিল। রাতে আবার স্বপ্ন ভক্তকে। “যেমন ছিল, তেমনি থাক। তুমি আগের মতই সকালে উঠে আমার খাওয়াদাওয়ার ব্যবস্থা কোরো।”
এ গল্প আমার ঠাকুমার মুখে শোনা। দেবতাকে তো আমরা বারবার এভাবেই প্রিয় করেছি।
“ত্বমেব মাতা, পিতা ত্বমেব, ত্বমেব বন্ধুশ্চ সখা ত্বমেব।”
গৌড়ীয় বৈষ্ণবেরা দাস্য, সখ্য, বাৎসল্য ও মধুর রসের উপাসক। তাঁরা ভগবানকে প্রভু, সখা, সন্তান ও প্রিয়তম বলে আপন করে নেন।
শবরী সন্তানস্নেহে তাঁকে এঁটো কুল খাওয়ান। মা যশোদা হয়ে শাসন করেন। রামকৃষ্ণ পরমহংসদেবও মাতৃস্বরূপা ভবতারিণীর সঙ্গে কেঁদেছেন, হেসেছেন, লীলা করেছেন।
জগজ্জননীকে ঘরের মেয়ে করে পাঁচদিন ঘরে এনে আমরা গান বেঁধেছি। দীপাবলী তে আলো দিয়ে আমরা ঘর সাজাই। দোলে রঙিন হই।
স্নানযাত্রার পর জগবন্ধুর জ্বর হলে তাঁকে প্রতিবছর পাঁচন খাওয়ানো হয়। গুন্ডিচা বা মাসীর বাড়ি পাঠিয়েও আমাদের শান্তি নেই। রথযাত্রার মাঝে দাঁড় করিয়ে আমরা তাঁকে দাঁড়ে ভোগ বা বলগন্ডি ভোগ দিই।

শ্রীকৃষ্ণদাস কবিরাজের চৈতন্যচরিতামৃতে রথযাত্রার ফাঁকে এই বলগন্ডিভোগের একটি সুন্দর বর্ণনা আছে। মধ্যযুগে শ্রী চৈতন্যকালীন সময়ের ভক্তিমূলক সংস্কৃতি, উৎসব অনুষ্ঠান, ব্যঞ্জন ইত্যাদির অসামান্য বর্ণময় ছবি এই বইটিতে পাওয়া যায়। ভক্তিরসের আধার হয়েও এটি একটি সমাজ চিত্ররূপে প্রতিভাত।
কলিঙ্গ রাজা প্রতাপরুদ্র শ্রীচৈতন্যদেবের পরম ভক্ত। তিনি মহাপ্রভু আর তাঁর শিষ্যদের জন্যে জগন্নাথের বলগন্ডি প্রসাদ পাঠালেন। কি কি ছিল তাতে?
শ্রীকৃষ্ণদাস কবিরাজ লিখছেন,
“বলগন্ডিভোগের প্রসাদ উত্তম অনন্ত।
নিসকড়ি (সকড়ি অর্থাৎ ভাত, নিসকড়ি মানে ভাতের কোনো ব্যাপার নেই) আইল যাহার অন্ত।।
ছেনা পানা (শরবত, যেমন বেলের পানা), পৈড় (ডাব), আম্র নারিকেল, কাঁঠাল।
নানাবিধ কদলক, (কলা) আর বীজতাল (তালশাঁস)।।
নারদছোলঙ্গ টাবা (বাতাবি লেবু), কমলা বীজপুর (ডালিম)।
বাদাম (আমন্ড) ছোহরা (শুকনো খেজুর), দ্রাক্ষা (আঙুর) পিন্ডখর্জ্জুর।।
মনোহর লাড়ু আদি শতেক প্রকার।
অমৃত গুটিকা (অমৃতি) আদি ক্ষীরসা অপার।।
অমৃত মন্ডা, ছানারবড়া আর কর্পূরকুলি।
রসামৃত, সরভাজা আর সরপুলী।।
হরিবল্লভ সেবতী কর্পূরমালতী।
ডালিম মরিচা লাড়ু (মরিচের মিষ্টি জগন্নাথের অন্যতম প্রসাদ) নবাত
অমৃতি।।
পদ্মচিনি চন্দ্রকান্তি খাজা খন্ডসার।
বিয়ড়ি কদমা তিনখাজার প্রকার।।
নারঙ্গ ছোলঙ্গ আম্র বৃক্ষের আকার।
ফল ফুল পত্রযুক্ত খন্ডের বিকার।।
দধি দুগ্ধ দধি তক্র (ঘোল) রসালা শিখরিণী (দই, দারুচিনি, গোলমরিচ, ঘি, মধু, হিমায়িত করে উৎকৃষ্ট পানীয়)।
সলবণ মূদগাঙ্কূর আদা খানি খানি।। (অঙ্কূরিত মুগ, নুন, আদা সহযোগে)
নেবু কলি আদি নানা প্রকার আচার।
লিখিতে না পারি প্রসাদ কতেক প্রকার।।
প্রসাদে পূরিত হইল অর্ধ উপবন।
দেখিয়া সন্তোষ হইল মহাপ্রভুর মন।।
এই মত জগন্নাথ করেন ভোজন।
এই মত মহাপ্রভুর জুড়ায় নয়ন।।
কেয়া পত্রদ্রোণি (কেয়া পাতার দোনা) আইলো বোঝা পাঁচ সাত ।
এক এক জনে দশ দোনা দিল একেক পাত।।”

কীর্তনীয়ারা নেচে গেয়ে পরিশ্রম করেছেন। মহাপ্রভু তাঁদের আগে খাওয়াবেন। তাঁদের পরিবেশন করবেন। স্বরূপ গোঁসাই বললেন, তুমি আগে প্রসাদ নাও প্রভু। তুমি না খেলে কেউ খাবেনা।
ভক্তবৎসল ঠাকুর দীনহীন কাঙাল জনের সঙ্গে বালগন্ডি প্রসাদ গ্রহণ করলেন। হাজার হাজার ভক্ত জয়ধ্বনি দিয়ে উঠল।
মধ্যযুগের ভক্তি আন্দোলনের অন্যতম প্রবক্তা মাধবাচার্যের প্রতিষ্ঠিত কর্ণাটকের উদিপী মন্দির। প্রাচীন সেই মন্দিরে প্রতিষ্ঠিত বালকৃষ্ণস্বামী। সকাল সন্ধ্যে সেই বালগোপাল রথে চড়ে মন্দিরপ্রাঙ্গণ প্রদক্ষিণ করেন। ননীচোরার হাতে ধরা থাকে মাখন। চঞ্চল শিশুর মতই সারাদিন মন্দিরের ভিতরে তাঁর প্রাণ ছটফট করে। তাই দুবেলা তাঁর রথে পরিভ্রমণ। রথের সামনে নারকেল ফাটে। সানাই বাদ্যি বাজে। বালকৃষ্ণস্বামী চতুর্দোলায় মন্দির থেকে বেরিয়ে রথে ওঠেন।
প্রতিদিন সেখানে হাজার হাজার ভক্ত, স্কুলের ছাত্র প্রসাদ গ্রহণ করে। কলাপাতায় পরিবেশিত হয় অন্ন, সাম্ভর, রসম্, সময়ের তরিতরকারি, চাটনি ফলমূল এবং পায়েসম্। জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে নরনারায়ণ একসঙ্গে এই প্রসাদ গ্রহণ করে।
মন্দিরে আছে কনকদাস খিড়কি। নীচ জাতের কুন্ঠিত কনকদাস মন্দিরের মূল দরজা দিয়ে প্রভুকে দর্শন করতে পারতেন না। স্বয়ং কৃষ্ণ মন্দিরের একটি ফাটল দিয়ে তাঁর সামনে প্রকট হতেন।

ভগবান আর ভক্তের এই ভালোবাসার গল্প যুগ যুগ ধরে আমাদের হৃদয়ের মানবিক অনুভূতিগুলিকে উন্মুক্ত করেছে।
সৌভাগ্যক্রমে পুরী এবং উদিপী এই দুটি তীর্থক্ষেত্রেই যাওয়ার সৌভাগ্য আমার হয়েছে। আমি খুব একটা ধার্মিক মানুষ নই। আমার প্রতিদিনের জীবনচর্যায় পূজাপাঠ নেই বললেই চলে। কিন্তু ঈশ্বরকে ঘিরে ভক্তের আকুলতা আমাকে বিস্মিত করে। ধর্মকে আশ্রয় করে আমাদের শিল্প, সাহিত্য, সংস্কৃতির প্রবহমান ধারা আমাকে গভীরভাবে প্রভাবিত করে। সর্বোপরি নন্দনন্দন শ্রীকৃষ্ণের মুরলীতে যে মাধুরীধারা, তা আমার মনকে একান্তভাবে আচ্ছন্ন করে থাকে, “স্ফূরণ-মাধুরী-ধারা কাচন নন্দসূনুমুরলী মচ্চিত্তমাকর্ষতি ”
পরম বৈষ্ণব কবি শ্রীরূপগোস্বামীর হাত ধরে তাই রথারূঢ় জগবন্ধুকে আমার প্রণাম জানাই।
কত যত্ন করে খুজে পেতে এনে সব লিখেছিস রে। দারুন।
এগুলো আমার খুব প্রিয় বিষয়,তাই বারবার পড়তে ভালো লাগে
অপূর্ব বিষয়, অপরূপ লেখনী।
খুব খুব খুব সুন্দর ! এর চেয়ে বেশি কিছু বলার ভাষা নেই আমার!!
পড়ে ভালোলাগা জানালি, খুব খুশি হলাম
বরাবরের মতো মুগ্ধতা রইল এবারেও।বিষয় যাই হোক না কেন প্রতিটি লেখাতেই নিজস্ব স্বকীয়তা, অভিনিবেশ, সাবলীল পাঠযোগ্য ভাষা,তথ্যের চমকপ্রদ ব্যবহার দেখা যায়! এই লেখাটিও তার ব্যতিক্রম নয় ! অনেক শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন!
খুব খুশি হলাম। এত মন দিয়ে পড়ে সুন্দর বিশ্লেষণ করলি
ভারি সুন্দর!
ধন্যবাদ দিদি। ভালো থাকবেন ????