ঘাস ছেড়ে সেদিন এক মনে মাটি কোপাচ্ছিল ঘেসেড়া। খেয়াল করেনি পাশেই কেউ দাঁড়িয়ে আছে। খেয়াল হতে তাকালো সেই তরুনের দিকে। ঘেসেড়ার প্রতিবেশী বামুন বাড়ির ছেলে। ‘তুমি কি করছো’ অবাক হয়ে প্রশ্ন করল বামুন বাড়ির ছেলে। জানতে চাইল মাটি কোপানোর কারণ। ঘেসেড়া জানে ওরা শিক্ষিত পরিবার। তরুনটির বাবা যথেষ্ট বিদ্বান। বড় বাড়ির ছেলেকে দেখে সামান্য ঘাস কাটিয়ে তো লজ্জায় জড়োসড়। বিনীত ভাবে জানাল, সে চায় মৃত্যুর পরেও গ্রামের লোক মনে রাখুক তাকে।তাই একটা কুয়ো খুঁড়ছে।
নিরক্ষর ঘাসুড়িয়ার কথায় ব্রাহ্মণ তরুণের মনে উথালপাথাল শুরু হল। একজন অক্ষরজ্ঞানহীন মানুষ চেষ্টা করছে লে এমন কিছু করে যাবে যাতে মৃত্যুর পরও মানুষ তাকে মনে রাখে। আর সে নিজে সম্পন্ন বাড়ির ছেলে হয়ে এ কী করছে!
তরুনের মনে একটা আলোড়ন সৃষ্টি হলো। না তাকেও কিছু করতে হবে। যদি একজন নিরক্ষর দরিদ্র মানুষ সমাজের কল্যাণের জন্য কিছু করতে পেরে সকলের শ্রদ্ধার পাত্র হতে পারে তবে আমি একজন শিক্ষিত ধনী হয়ে সমাজের জন্য কেন কিছু করতে পারব না! এই ঘটনার পরেই প্রথম কবিতা লিখেছিলেন ভানুভক্ত আচার্য। নেপালের আদিকবি। লিখলেন :— “… কুয়া খনাও/ঘাশী দরিদ্র ধরবো,/তর বুদ্ধি কস্তো/ম ভানুভক্ত ধনী ভৈখন/আজ এস্তো …..”।
তাঁর জন্ম ১৩ জুলাই ১৮১৪ সালে তানাহু জেলায়। নেপালি ক্যালেন্ডারে তাঁর জন্মদিন ২৯ আষাঢ়। প্রতি বছর ১৩ জুলাই পালিত হয় ভানুজয়ন্তী। মূলত বাড়িতেই ঠাকুরদার কাছে তাঁর বিদ্যাচর্চা। বাড়ির ধারা মেনেই ধর্ম এবং ধর্মীয় আলোচনায় ছিল গভীর অনুরাগ। ভানুভক্ত নেপালি হলেও তাঁর সাহিত্য সৃষ্টি সংস্কৃতে। কেন? আজকের নেপালি ভাষা যার থেকে উদ্ভূত, সেটি হল খস বা খাস ভাষা। পনেরো শতকে পতন হয় খাস রাজবংশের। ফলে কোণঠাসা হয়ে যায় ভাষাটিও। পরিবর্তে নেপালি সমাজে জাঁকিয়ে বসে সংস্কৃত। বর্ধিষ্ণু ব্রাহ্মণ কুলে জন্মগ্রহণের জন্য রীতি নীতি অনুযায়ি পুজা-অর্চণাদির জন্য সংস্কৃতে বিশুদ্ধ জ্ঞান থাকা দরকার। সেই জন্য নিজের ঘরেই পিতামহের কাছে ভানুভক্ত আচার্য সংস্কৃত ভাষার অধ্যয়ণ করতেন। তাঁর শ্রেষ্ঠ কাজ হল সংস্কৃত থেকে নেপালি ভাষায় রামায়ণ অনুবাদ। জন্ম দিয়েছিলেন নতুন কাব্যিক ছন্দ। নাম, ভানুভক্তীয় ছন্দ। কিন্তু সাধারণ মানুষ এই ভাষার সঙ্গে একাত্ম হতে পারত না। বাধা পড়ছিল শিক্ষা বিস্তারে। ভানুভক্ত জনপ্রিয় করলেন খাস ভাষাকে। দিলেন লিখিত রূপ। ভানুভক্তীয় ছন্দে অনূদিত সংস্কৃত মহাকাব্য রামায়ণ হয়ে উঠল যেন নেপালি সঙ্গীত।
আমৃত্যু বিন্দুমাত্র টের পাননি তিনি নিজের জন্মভূমিতে কোন স্থান পেতে চলেছেন। প্রাপ্য সম্মানের সিকিভাগও জোটেনি তাঁর কপালে। জন্মের দীর্ঘ কয়েক বছর পরে বারাণসীতে তাঁর পাণ্ডুলিপি পাওয়া গিয়েছিল। তারপর তা মুদ্রিত হয়েছিল। জীবনীকার মোতিরাম ভট্ট তাঁকে নেপালের আদিকবি বলে উপাধি দিয়েছিলেন। তিনি ছিলেন এমন এক ব্যক্তিত্ব, পাশ্চাত্য শিক্ষা সংস্কৃতির স্পর্শ ছাড়াই দেশকে এগিয়ে নিয়ে গিয়েছিলেন কয়েক আলোকবর্ষ পথ। আদিকবি ভানুভক্তের আর এক রচনা হল, কান্তিপুরী নগরী। যেখানে স্তুতি করা হয়েছে কাঠমান্ডু উপত্যকা এবং এর অধিবাসীদের। ক্রমাগত চলতে থাকে ওনার সহিত্য এবং কাব্য চর্চা। নেপালী ভাষায় বহু কবিতা লেখেন এবং সংস্কৃত ভাষায় লেখা অনেক কাব্য এবং সাহিত্যেরও উনি নেপালী ভাষায়ায় অনুবাদ করে নেপালী এবং নেপাল দেশবাসীকে সাহিত্য এবং কাব্য রসে অবগাহিত করান। এই মহান কাজের জন্যই ভানুভক্ত আচর্যকে ‘নেপালের আদি কবি’ বলা হয়। এমনকি নেপালি জাতিসত্তাকে একসূত্রে বেঁধে রাখার কাজেও বিশাল দায়িত্বের পরিচয় দিয়েছেন তিনি। পাহাড়কে সংস্কৃতি মনোভাবাপন্ন করে রাখতেও তিনি ছিলেন সদাজাগ্রত।
একবার পাকেচক্রে ভানুভক্তকে যেতে হয়েছিল কারাগারে। বন্দি কবি আবেদন জানিয়েছিলেন দেশের আইন রক্ষকের কাছে। তাঁর মুক্তি প্রার্থনা করে। তাঁর কলমে সেই মুক্তি আবেদনও কাব্যিক মাস্টারপিস বলে পরিগণিত হয়। কবির লেখা পড়ে তাঁকে মুক্তি তো দেওয়া হয়ই। সেইসঙ্গে প্রদান করা হয় ক্ষতিপূরণের অর্থও।
ওনার জন্ম দিনকে উৎসবের দিনরূপে নেপালে শ্রদ্ধার সঙ্গে আজও প্রতিপালন করা হয়। নেপালী ভাষায় রামায়নের অনুবাদ নেপালবাসীর কাছে শ্রদ্ধার এবং সম্মানের পাত্র হয়ে প্রসিদ্ধী লাভ করলেন। ১৮৬৮ খ্রিস্টাব্দে মৃত্যু হয় ভানুভক্তের।
অল্প কথায় নেপালী সাহিত্যের আদি কথা জেনে খুব ভালো লাগলো। অসংখ্য ধন্যবাদ লেখককে।
????????????