চল্লিশটির বেশি সংগঠন নিয়ে সংযুক্ত কিষান মোর্চার নেতৃত্বে সোমবার গোটা দেশে সকাল ৬ টা থেকে বিকেল ৪ টে পর্যন্ত পালিত হল ভারত বনধ। তিনটি কৃষি আইন প্রত্যাহারের দাবিতে সারা ভারত জুড়ে এই সাধারণ ধর্মঘটের ডাক দিয়েছিল কৃষক সংগঠনগুলি। এদিন সকাল থেকেই দেশের বিভিন্ন প্রান্তে এই বনধের প্রভাব পড়ে। খবর অনুযায়ী, সকাল থেকেই দিল্লি-মিরাট এক্সপ্রেসওয়েতে যান চলাচল বন্ধ করে দেয় সংযুক্ত কিষান মোর্চা। এরফলে উত্তরপ্রদেশ থেকে দিল্লি কোনও যান চলাচল করতে পারেনি বলেই খবর। আগেই বলা হয়েছে, সংযুক্ত কিষান মোর্চার এই বনধ দেশজুড়ে শান্তিপূর্ণ ভাবে পালিত হবে। বন্ধ থাকবে সরকারি, বেসরকারি অফিস, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, কারখানা, দোকান, বাজার। তবে জরুরি পরিষেবার সঙ্গে যুক্ত সমস্ত কার্যকলাপ সচল থাকবে বলে আগেই জানিয়েছিল সংযুক্ত কিষান মোর্চা।
বনধের দিন এমএসপি নিয়ে চাই নতুন আইন, কেন আলোচনায় বসছে না সরকার? ফের প্রশ্ন তুললেন কৃষক নেতা রাকেশ টিকাইত। জানালেন, কৃষি আইন প্রত্যাহার না করলে আগেই বড় আন্দোলনে নামার হুঁশিয়ারি দিয়ে রেখেছিলেন ভারত বনধের দিন তাঁর হুঁশিয়ারির ঝাঁঝ বাড়ালেন। তীব্র সমালোচনা করলেন বিজেপি সরকারের। যা নিয়ে জোর চর্চা শুরু হয়েছে রাজনৈতিক মহলে। তবে এদিন তিনি সরকারের সঙ্গে ফের আলোচনার বার্তাও দিয়ে বলেন, কৃষকরা সরকারের সঙ্গে আলোচনার জন্য বরাবরই রাজি। তবে আগের মতো কোনও শর্তাধীন আলোচনা হবে না। আইন প্রত্যাহার না করা পর্যন্ত যে তাঁরা বিক্ষোভের রাস্তা থেকে পিছু হটবেন না- এই হুঁশিয়ারিও দেন। কৃষক নেতা এও বলেন, এমএসপি-এর গ্যারান্টির জন্য সরকারকে অবশ্যই একটি নতুন আইন নিয়ে আসতে হবে। একজন কৃষক তাঁর পঞ্চাশ কুইন্টাল পণ্যও বিক্রি করতে পারে না কিন্তু একজন ব্যবসায়ী যত খুশি বিক্রি করতে পারে। সরকার এই সহজ কথা ভাবছে না। সরকার আসলে দেশের ফসল নিজেদের দখলে রাখতে চাইছে।
উল্লেখ্য, এদিন ৪০টি কৃষক সংগঠনের ডাকে এই বনধ চলে সকাল ৬টা থেকে বিকেল ৪টে পর্যন্ত। বনধের ভালো প্রভাব পড়ে তামিলনাড়ু, অন্ধ্রপ্রদেশ, ওড়িশা, মধ্যপ্রদেশ, তেলেঙ্গানা সহ অন্যান্য রাজ্যেও। দক্ষিণে শাসক সিপিএম বনধে পূর্ণ সমর্থন জানানোয় ভালো প্রভাব পড়েছে কেরলে। পুরো দস্তুর বনধ হয়েছে রাজস্থান, ছত্তিশগড়ের মতো রাজ্যেগুলিতেও। বনধের প্রভাব পড়েছে দেশের পরিবহন ব্যবস্থার উপরেও। ফলে চরমে ওঠে যাত্রী দুর্ভোগ এদিন হরিয়ানা সীমান্তে অবরোধ করেন বনধ সমর্থকরা। পাঞ্জাব প্রদেশ কংগ্রেসের সভাপতি নভোজিৎ সিং সিধু এই বনধ সমর্থন করে টুইট করেছেন। নিজের কর্মী সমর্থকদের এই বনধ সমর্থনের আহ্বান জানান। উত্তরপ্রদেশের বহুজন সমাজবাদী পার্টির নেত্রী মায়াবতী এই বনধ সমর্থন করেন। তিনি জানান, এই তিনটি কালা আইন মানেন না। গত দশ মাস ধরে চলা কৃষক আন্দোলন তিনি সমর্থন করেন। দিল্লিতে পরিস্থিতি সামাল দিতে নিরাপত্তা বাড়ানো হয়। চলে পুলিশি টহলদারি। দিল্লির তিনটি সীমান্ত থেকে বিক্ষোভকারীরা যাতে ঢুকতে না পারেন, সেদিকে বাড়তি নজরদারি ছিল।

এদিকে খবর, সংযুক্ত কিষান মোর্চার ডাকা ভারত বনধের দিনেই মৃত্যু হয় আন্দোলনকারী এক কৃষকের। হরিয়ানার সিঙ্ঘু সীমান্তের কাছে কৃষক সংগঠনের একটি বড় দল যখন বিক্ষোভ প্রদর্শন করছিলেন তখনই হঠাৎ অচৈতন্য হয়ে পড়েন বছর ৫৪-এর এক কৃষক। তাঁকে নিকটবর্তী হাসাপাতালে নিয়ে যাওয়া হলে তাঁকে চিকিৎসকরা মৃত বলে ঘোষণা করেন। প্রাথমিকভাবে অনুমান করা হচ্ছে, হৃদরোগে আক্রান্ত হয়ে মৃত্যু হয়েছে ওই কৃষকের। ইতিমধ্যেই মৃত ওই কৃষকের দেহ ময়না তদন্তের জন্য পাঠানো হয়েছে।
অন্যদিকে এই ভারত বনধের জেরে প্রায় ২৫টি ট্রেন চলাচল ব্যাহত হয়েছে বলে জানিয়েছে ভারতীয় রেল। জানা গিয়েছে সোমবার সকাল ৬টায় বনধ শুরু হওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই দিল্লি, পঞ্জাব, হরিয়ানার একাধিক রেল লাইনে বসে বিক্ষোভ দেখাতে শুরু করেন কৃষকরা। ফলে একাধিক লাইনে ট্রেন চলাচল বন্ধ হয়ে যায়। রেল মন্ত্রকের পক্ষ থেকে জানানো হয়েছে, সোমবার সকালে দিল্লি থেকে অমৃতসর, মোগা, কাটরা যাওয়ার একাধিক ট্রেনের যাত্রাপথ এই বনধের কারণে বিঘ্নিত হয়েছে। শুধুমাত্র দিল্লিতেই প্রায় ২০টি জায়গায় রেলপথ অবরোধ চলছে। বাতিল করা হয়েছে দিল্লি-পঞ্চকোট, কালকা-শতাব্দীর মতো একাধিক ট্রেন।
ভারত বনধে রাজধানীর পাশাপাশি এ রাজ্যেও সাড়া পড়ে। সকাল থেকেই জেলায় জেলায় চলে প্রতিবাদ কর্মসূচি। বনধের সমর্থনে সকাল থেকেই রাস্তায় বাম এবং এসিউসিআই কর্মীরা। যাদবপুর স্টেশনে রেল অবরোধ করে বামপন্থীরা। চলে স্লোগানিং। পাশাপাশি, বিনপুর দু’নম্বর ব্লকের শিলদা বাজারে মিছিল করে এসিউসিআই এবং তাদের কৃষক সংগঠন। এদিন বনধ সমর্থকরা শিলদা বাজারে মিছিল করে। সাতসকালে মেদিনীপুর শহরে বিক্ষোভ মিছিল করে এসিউসিআই। মেদিনীপুর সেন্ট্রাল বাসস্ট্যান্ডের সামনেই বাস আটকায় ধর্মঘটিরা। মেদিনীপুর শহরের হেড পোস্ট অফিসের গেটে তালা দিয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে বাম কর্মীরা। জেলার অন্য প্রান্তেও রাস্তায় নামে ধর্মঘটিরা। ঘাটাল চন্দ্রকোনা রাজ্য সড়কের একাধিক প্রান্তে আটকানো হয় বেসরকারি বাস। পাঁশকুড়া বাসস্ট্যান্ডের সামনে পথ অবরোধ করে বাম সমর্থকেরা।