শীতের বিকেলে মধ্য প্রাচ্যের গজনী শহরে সূর্যের আলো খুব তাড়াতাড়ি ক্ষীণ হয়ে যায়। দিনের আলো কমতেই হিন্দুকুশ পর্বতের ওপার থেকে কনকনে ঠান্ডা হাওয়া বইতে থাকে। শরীরের চামড়া আর মাংস ভেদ করে বরফের ছুরির মত সে তীব্র হাওয়া যেন মানুষের হাড়ে গিয়ে বেঁধে। মোটা পশমী আলোয়ানটা ভালো করে গায়ে জড়িয়ে নিলেন এদু এল হাসান এল বিলাজি। তিনি এক বিশেষ কাজে বেরিয়েছেন।
শহরের অভিজাত পল্লীর এক হাভেলীর প্রশস্ত কক্ষে রূপোর বাতিদানে কর্পূরের বাতি জ্বালিয়ে দিল বাঁদী। ধূপদানীতে পুড়ছে ধূপ, ধুনো, গুগগুল, আম্বর আর চন্দনকাঠ। তার সঙ্গে মিলেছে ইউনানী দাওয়াইয়ের গন্ধ। সব মিলিয়ে ঘরের বাতাস ভারী। জানলার রঙিন কাঁচের মধ্যে দিয়ে সূর্যের শেষ আলোটুকু তির্যকভাবে পড়েছে পালঙ্কের ওপর। খুব নিচু স্বরে, প্রায় গুনগুন করে পবিত্র কুরআনের কলমা পাঠ করছেন মৌলভী।
সে ঘরে ঢুকতেই হাসানের মনে হল যেন মৃত্যুর করাল ছায়া ঘিরে আছে এখানে। পালঙ্কের বিছানায় মিশে যাওয়া মানুষটি অতি কষ্টে হাত নেড়ে ডাকলেন এদু হাসানকে।
— আসসালামু আলাইকুম্ জাহ্ বাদ। — ওয়া আলাইকুম আসসালাম্। অস্ফুটস্বরে অভিবাদনের উত্তর দিলেন মরণাপন্ন মানুষটি। আরো কিছু যেন বলতে চাইলেন। আবু তাঁর কানের কাছে মুখ নিয়ে বললেন,
— আপনার কষ্ট হচ্ছে জনাব। আর কথা বলবেন না।
— তুমি আমার প্রশ্নের উত্তর দাও এদু হাসান। আমার এন্তেকাল আগত। কোনো প্রশ্ন, জিজ্ঞাসা মাথায় নিয়ে আমি মরতে চাই না। উত্তরের আনন্দ নিয়েই নাহয় বেহেস্তে যাব।
— গুস্তাকি মাফ করবেন হুজুর। আপনার প্রশ্নের আমি কি উত্তর দেব? গোটা দুনিয়া জানে আপনি আল্ ওস্তাদ আলবিরুণী। একাধারে বহুভাষাবিশারদ। নৃতত্ত্ববিদ। গণিতজ্ঞ। ইতিহাস, ভূগোল, বিজ্ঞান, মহাকাশ বিষয়ে আপনার প্রবল আগ্রহ। সেই কোন শৈশবে আপনি নিজ চেষ্টায় মানচিত্র এঁকেছেন। কত পরিমাপ যন্ত্র নির্মাণ করেছেন। অগণিত আপনার গ্রন্থের সংখ্যা। জ্ঞানই আপনার তপস্যা।
মৃত্যুপথযাত্রী মানুষটির চোখদুটি শেষবারের মত জ্বলজ্বল করে উঠল। তাঁর প্রাণবায়ুটি যেন এইক’টি কথা বলবার জন্যে কোনরকমে তিনি ধরে রেখেছেন। শ্লেষ্মাজড়িত স্বরে অতি কষ্টে বললেন,
— তবুও অনেক জানা বাকি রয়ে গেল যে! কত মণিমানিক্য এখনো অন্ধকারে পড়ে আছে! তোমরা সেসব জ্ঞান আহরণের চেষ্টা কোরো। আমার শেষ অনুরোধ রেখো।
— নিশ্চয়ই রাখব জাহ্ বাদ। আপনি এবার একটু বিশ্রাম করুন। আমি প্রস্থান করি। খোদা হাফেজ্।
মরণাপন্ন জ্ঞানতপস্বী কে বিদায় জানিয়ে এদু হাসান হাভেলী থেকে বেরিয়ে ঘোড়ার গাড়িতে উঠতে যাবেন, তখনই কান্নার রোল উঠল।
তবে কি!! থমকে দাঁড়ালেন তিনি। তারাভরা রাতের আকাশের দিকে একদৃষ্টে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলেন হাসান। একটি নক্ষত্র কি এই মুহূর্তে মহাকাশে স্থান পেল? মহাজ্ঞানী আল বিরুণীর আত্মা কি পৌঁছে গেছে তাঁর প্রিয়তম স্থানটিতে? মহাকাশচর্চা, জ্যোতির্বিজ্ঞান যে বিশেষ প্রিয় ছিল পন্ডিতপ্রবরের। দীর্ঘনিঃশ্বাস পড়ল হাসানের।
আলবিরুণীর ইন্তেকালের খবর ছড়িয়ে গেল গোটা গজনীতে। ইরান ও ভারতের বাণিজ্যপথের মধ্যে পার্বত্য মালভূমির এই অঞ্চলটি জ্ঞান এবং কৃষ্টির পীঠস্থান। সেই আগ্রহে বহু ভারতীয় পন্ডিতদের সেখানে আসাযাওয়া। তাঁরা আলবিরুণীর সংস্পর্শে এসেছেন। একসঙ্গে জ্ঞানচর্চা করেছেন। আলবিরুণীর ঘনিষ্ঠ আদিত্যনাথ তাঁদের মধ্যে অন্যতম। তরুণ আদিত্যনাথের মন আজ তাই বড় ভারাক্রান্ত। কত কথা মনে পড়ছে তাঁর। পন্ডিত মানুষটি নিজের কথা বলতে তেমন ভালোবাসতেন না। জ্ঞানচর্চাতেই ছিল তাঁর অপরিসীম আগ্রহ। তবুও কথায় কথায় বলেছিলেন,
— আল্লাহর অসীম কৃপায় আমি বড় হয়েছি জ্ঞানচর্চার এক পীঠস্থান তুর্কীস্তানের খোয়ারিজমে। পঞ্চাশটি দুর্গ দিয়ে সাজানো, সবুজ-সুন্দর ছিল সে মরুদ্যান। আমু দরিয়া নদীর জলের কি গুণ ছিল জানি না।
যব, ভুট্টা, তরমুজ, খুবানির খেত লকলক করে বেড়ে উঠত। বোধকরি সে নদীর জল পান করে সেখানকার মানুষের মাথাগুলোও ছিল তেমন ঊর্বর।
মেহেন্দিরাঙানো গোঁফদাড়ির ফাঁক দিয়ে মুচকি হাসতেন পন্ডিত মানুষটি।
— জানো আদিত্যনাথ, শিক্ষার বাতাস কোথাও সেখানে বাধা পায় নি। আমি ছোটোবেলায় এক মুক্ত আবহাওয়ায় বড় হয়েছি। ফারসি ছিল আমার মাতৃভাষা। এ ভাষায় বিরুণী শব্দের অর্থ বহিরাগত। আমার আম্মীজান-আব্বা পারস্য থেকে এখানে এসে রয়ে গেলেন। মজাটা দ্যাখো আদিত্যনাথ। আমার পিতৃদত্ত বিশাল নাম, আবু রৈহান মহম্মদ ইরণে আহমেদ কেউ মনে রাখেনি। আমার নামের সঙ্গে জুড়ে গেল বাইরে থেকে আসার গল্প। আমি হয়ে গেলাম আল-বিরুণী!
— নামে কি আসে যায় জনাব! আপনার কীর্তি মানুষ মনে রাখবে যুগ যুগ ধরে। আমাদের দেশকে নিয়ে আপনার আগ্রহ কিভাবে হল?
— সুলতান মেহমুদের দরবারে একজন ওস্তাদ ছিলেন। তিনিই আমাকে তোমাদের ঐ সুন্দর দেশটি সম্পর্কে ওয়াকিবহাল করান। তোমাদের দেশের প্রতি আমার আগ্রহ বাড়ে।
— হিন্দুস্তানে আপনি পৌঁছলেন কিভাবে?
— আমি সুলতান মেহমুদের দলে ভিড়ে যাই। খানিকটা নজরবন্দী হয়ে। রাজনীতির সে লম্বা ইতিহাস পরে কখনো তোমায় শোনাবো। জেনে রেখো আমি সুলতানের খুব পেয়ারের লোক কোনোদিনই ছিলাম না।
হায় আল্লাহ্! কি লুটপাট, কত খুন বয়ে গেল হিন্দুস্তানের এই খুবসুরত জমির ওপর দিয়ে। আমার সেসব বরদাস্ত হত না। আমি হিন্দুস্তানের দিলকে ছুঁতে চাইলাম। বারো বছর ধরে ঘুরে বেড়ালাম তোমাদের মুলুকে। সংস্কৃত শিখলাম। কি অসাধারণ তোমাদের জ্যোতির্বিজ্ঞান, ধর্মশাস্ত্র, মহাকাব্যের ভান্ডার! বৌদ্ধবিহার, হিন্দুবিদ্যাপীঠের শাস্ত্রচর্চায় আমি অত্যন্ত সমৃদ্ধ হয়েছি। তোমাদের খুবসুরত মুলুকের উত্তুঙ্গ হিমালয়ের চূড়া, ফেনিল সমুদ্রের নীলজল দেখে আপ্লুত হয়েছি। পুণ্যতীর্থ দর্শনে ভক্তের আকুলতা আমাকে বার বার সেখানে আকর্ষণ করেছে। দীপাবলির আলোকসজ্জা, হোলির রঙের উৎসবে শামিল হয়েছি। সাধারণ মানুষের সুখদুঃখের সঙ্গী হয়েছি পথে যেতে যেতে। তোমাদের রীতিনীতি, ধর্মাচরণ, সংস্কার অত্যন্ত নিরপেক্ষভাবে লক্ষ্য করেছি। যা গ্রহনীয়, যা বর্জনীয় সবটাই লেখা আছে আমার কিতাবু’ল হিন্দে।
— ভারতকে নিয়ে গ্রন্থ অথচ আপনি সংস্কৃতভাষায় তা কেন লিখলেন না মহোদয়?
— আরবি এ দুনিয়ায় এখন সবথেকে চলতি ভাষা। গোটা দুনিয়া জানুক হিন্দুস্তানের কথা। তোমাদের জ্ঞানবিজ্ঞান, ইতিহাস, ধর্ম, সংস্কৃতির মহত্ত্ব। কথা দাও আদিত্যনাথ আমার এই কাজকে তোমরা এগিয়ে নিয়ে যাবে।
আদিত্যনাথ সেইদিন পা ছুঁয়ে প্রণাম করেছিলেন জ্ঞানপিপাসু, ভারতবিদ মানুষটিকে। তাঁর শোকসভায় শ্রদ্ধাজ্ঞাপন করতে গিয়ে আদিত্যনাথের চোখে জল। কন্ঠে আবেগ। “এই বিদেশী মানুষটি আমার দেশকে বুদ্ধিবৃত্তির আলোয় দেখেছেন। সে আলোকে তিনি উন্মুক্ত করে দিয়েছেন বিশ্বের দরবারে। তাঁর অক্ষয় কীর্তির প্রচার হোক। প্রসার হোক। সমস্ত সংকীর্ণতার ঊর্ধ্বে গিয়ে জ্ঞানমুক্ত হোক পৃথিবীর আকাশে। এই ছিল তাঁর শেষ ইচ্ছা। সে মর্যাদা আমাদের রাখতেই হবে।”
সভাকক্ষ তখন শোকবিহ্বল। নীরব। এদু এল হাসানের চোখেও জল। আলোয়ানের খুঁট দিয়ে চোখ মুছলেন আলা ওস্তাদ আল বিরুণীর দীর্ঘদিনের দোস্ত। বন্ধুর শেষ তামান্নাটি আবার মনে পড়ল তাঁর। আকাশের দিকে দুই হাত তুলে, মুখ উঁচু করে ঈশ্বরের কাছে তিনি দোয়া মাঙলেন। খোদা যেন তাঁর শেষ ইচ্ছে পূর্ণ করে।
তথ্য ঋণ: একটি ইংরিজি তথ্যচিত্র ,A scholar of civilization., প্রভাত মুখোপাধ্যায় অনূদিত অল-বিরুণী রচিত ভারত।
এ লেখা এত অপূর্ব, এত মূল্যবান ও প্রাসঙ্গিক যে কি বললে ভালোলাগার যথার্থ প্রকাশ হবে বুঝতে পারছি না।
অভিভূত….!!!
আমিও অভিভূত তোমার ভালোলাগায়।????????
ঐতিহাসিক পটভূমিতে এত সুন্দর করে তুলে ধরেছো জ্ঞানী আল বেরুনী নামের মানুষটিকে যে ,মনে দাগ কেটে যায়
চেষ্টা করেছি মাত্র গো। এই মানুষটির কথা এত স্বল্প পরিসরে ধরা যায় না।