আমেরিকার মেরিল্যান্ড বিশ্ববিদ্যালয় পরবর্তীতে স্ট্যানফোর্ড বিশ্ববিদ্যালয়ের একটি গবেষণায় দেখা যাচ্ছে; ১৯৬০ সালের পর ১৭টি দেশে ২৩টি সংখ্যালঘু ভাষাগোষ্ঠী সরকারি স্বীকৃতি আদায় করেছে। ১৯৪৫ সাল থেকে দশটি দেশে যেখানে সংখ্যালঘু ভাষাগোষ্ঠীর ভাষাগুলিকে আগে স্বীকার করা হত না তাদের সীমিতভাবে সরকারি ভাষাঢ় স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে। ১৯৪৫ সালের পর থেকে আরও চারটি দেশ সংখ্যাগরিষ্ঠের ভাষাকে একমাত্র সরকারি ভাষা হিসাবে স্বীকৃতি দেয় এবং একই সময় পাঁচটি দেশ প্রধান গোষ্ঠীর ভাষার বাইরেও অন্যান্য ভাষাকে উদার দৃষ্টিভঙ্গীর সঙ্গে স্বীকার করে।
গত ৫০ বছরে বহু দেশে ক্ষুদ্র জনগোষ্ঠীর ভাষার অধিকারকে স্বীকৃতি দেওয়া হয়েছে যেমন অস্ট্রেলিয়া, আলজেরিয়া, বলিভিয়া, ইথিওপিয়া, গুয়াটেমালা, মৌরিটানিয়া, নিউজিল্যান্ড, নিজেইর, পাকিস্তান, পানামা, পেরু, প্যারাগুয়ে, শ্রীলঙ্কা, সুদান ও স্পেন। অন্যদিকে ভাষার অধিকার মেনে নেওয়া হয়নি- বার্মায় কাচিন, কারেন, জোমি, মন, রোহিঙ্গা, শানদের। স্লোভাকিয়া হাঙ্গেরিয়ানদের এবং সুদানে দক্ষিণীদের এবং মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রে স্প্যানিষ ভাষীদের ভাষার অধিকারও অস্বীকার করা হয়েছে। নতুন করে ভাষা সমস্যার সৃষ্টি হয়েছে স্লোভাকিয়া ও সুদানে। পাশাপাশি কিরাগিজস্তান, কানাডা, বলিভিয়া, সোমালিয়া ও সুদানে দেশের প্রধান ভাষা বা একমাত্র সরকারি ভাষা হিসেবে গণ্য হয় না। অন্যদিকে লাওস, সোমালিয়া, সুদান ও শ্রীলঙ্কায় প্রধান ভাষাকেই একমাত্র সরকারি ভাষা হিসাবে স্বীকার করা হয়।
ভাষার জন্য আন্দোলন কিংবা আন্দোলনের অন্যতম লক্ষ ভাষা; পৃথিবীর বহু দেশেই কম বেশি হয়েছে। কোথাও অহিংস আবার আন্দোলনের জেরে সহিংস হতে বাধ্য হয়েছে কোথাও। বাঙালির ওপর পশ্চিম পাকিস্তানি জুলুমের প্রতিবাদ এবং মাতৃভাষার অধিকার প্রতিষ্ঠার জন্য ১৯৫২ সালের ২১ ফেব্রুয়ারি অমর হয়ে আছে। এছাড়া আসামে ভাষার প্রশ্নে আন্দোলন হয়েছিল ১৯৬১ সালে। তৎকালীন প্রাদেশিক সরকার কেবল অহমীয় ভাষাকে আসামের একমাত্র সরকারি ভাষা করার সিদ্ধান্ত নিলে ১৯ মে আসামের কাছাড় জেলার শিলচর শহরে পুলিশের গুলিতে নিহত হন ১১ জন বাংলা ভাষাভাষী মানুষ। পরে অবশ্য বাঙলাকেও স্বীকৃতি দেয় প্রাদেশিক সরকার।
মায়ের ভাষার মান বাঁচাতে মানুষের রক্ত ঝড়েছে দেশ ও বিদেশে। অবিভক্ত পরাধীন ভারতে ১৯৩৭ সালে, কেন্দ্রীয় ‘ইন্ডিয়ান ন্যাশনাল কংগ্রেস’ এর সমর্থণে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির স্থানীয় কংগ্রেস সরকার স্কুলগুলিতে হিন্দি শিক্ষা বাধ্যতামূলক করে। এর বিরুদ্ধে তামিল ভাষা রাখার জন্য প্রথম রাজনৈতিক প্রতিবাদ হয়। সেই আন্দোলনে দু’জন প্রাণ হারায় এবং কয়েক হাজার লোক গ্রেপ্তার হয়। ১৯৪০ সালে মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির ব্রিটিশ গভর্নর বাধ্য হয়ে আইনটি তুলে নেন।
স্বাধীনতার পরে এ দেশে হিন্দিকে একমাত্র সরকারি ভাষা করতে ১৯৫০ সালে আইন গৃহীত হয়। এই প্রস্তাব অবশ্য ১৯৪৬ এর পর বিভিন্ন আলোচনায় ছিল। সেখানে বলা ছিল যে ১৫ বছর পর অর্থাৎ ১৯৬৫ তে হিন্দি সরকারি ভাষা হিসেবে কার্যকর হবে। আইন কার্যকর না হওয়া পর্যন্ত কোনও উচ্চবাচ্য হয়নি। কিন্তু ২৬শে জানুয়ারি, ১৯৬৫ তে আন্দোলন শুরু হলে মানুষ রাস্তায় নেমে আসে। তামিলনাড়ু তথা মাদ্রাজে প্রায় দু’মাস যাবত দাঙ্গা চলে। শেষ পর্যন্ত ১৯৬৭ সালে হিন্দির সঙ্গে ইংরেজিকেও ব্যবহারিক সরকারি ভাষা হিসেবে স্বীকৃতি দেওয়া হয়।
এ দেশের আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ ভাষা আন্দোলন যা তুলনায় খুব কম আলোচিত। যে আন্দোলনের দাবি ছিল, বাংলায় লিখতে চাওয়া, বাংলায় আলাপ করার অধিকার। সেই আন্দোলনেরসঙ্গে জড়িয়ে আছে একটি ঐতিহাসিক টুসু গান। ‘শুন বিহারি ভাই, তরা রাখতে লারবি ডাং দেখাই/এক ভারতের ভাইয়ে ভাইয়ে মাতৃভাষায় রাজ্য চাই।’ মায়ের ভাষার দাবিতেই অবিভক্ত বিহারের মানভূম জেলার পাকবিড়া গ্রামের মাঠ থেকে একটানা ১৬ দিন পথ হেঁটেছিল আন্দোলনকারীরা। ১৯৫৬ সালের ২০ এপ্রিল ওই ঐতিহাসিক মিছিল শুরু হয়েছিল। তারপর বাঁকুড়া, বেলিয়াতোড়, সোনামুখী, পাত্রসায়র, খণ্ডঘোষ, বর্ধমান, পান্ডুয়া, মগরা, চুঁচুড়া, চন্দননগর, হাওড়া হয়ে ৬ মে প্রায় হাজার খানেক মানুষের মিছিল পৌঁছয় কলকাতায়। অবশেষে ওই বছর ১ নভেম্বর মানভূমের কিছু এলাকা পুরুলিয়া জেলা নাম নিয়ে পশ্চিমবঙ্গে অন্তর্ভুক্ত হয়।
প্রেক্ষাপট ভিন্ন হলেও বহু আন্দোলনের অন্যতম কারণ ছিল ভাষা। যেমন দক্ষিণ আফ্রিকায় কর্তৃপক্ষ আফ্রিকানার ভাষা জোর করে চাপিয়ে দিতে চাইলে জোহানসবার্গ শহরের সোয়েটোতে ১৯৭৬ সালের ১৬ জুন স্কুলের ছাত্র-ছাত্রীরা প্রতিবাদ জানাতে রাস্তায় নেমে আসে– কারণ তারা তাদের মাতৃভাষা জুলু এবং ব্যবহারিক লিঙ্গুয়া ফ্রাঙ্কা ইংরেজিতে শিক্ষা নিতে বেশি আগ্রহী ছিল। বর্ণবাদী সরকার প্রতিবাদ সভায় ছাত্রদের মিছিলে গুলি চালায়। প্রায় ২০০ জনেরও বেশী গুলিতে নিহত হয়েছিল, যাদের প্রায় সবাই শিশু-কিশোর! দক্ষিণ আফ্রিকায় দিনটি বিশেষ স্মৃতির মধ্য দিয়ে বর্তমানে এই দিনটি পালন করা হয়।
আমেরিকায় দীর্ঘকাল বিভিন্ন নেটিভ আমেরিকান ভাষা ইউরোপীয় কলোনিয়াল শাসকদের জাঁতাকলে পিষ্ট ছিল। অনেক নেটিভ আমেরিকান ভাষার মৃত্যু হয়। গত শতাব্দীর ষাট-সত্তরের দশকে নাগরিক অধিকার আন্দোলনের সময় নেটিভ আমেরিকান ভাষা রক্ষার প্রসঙ্গ ওঠে। দীর্ঘ ২০ বছর আন্দোলন এবং আলোচনার পর ১৯৯০ সালে আমেরিকার বিভিন্ন নেটিভ, আদি ও স্থানীয় ভাষা রক্ষা এবং সংরক্ষণের জন্য আইন পাশ হয়।
এছাড়া বেলজিয়ামে ফ্রেঞ্চ-জার্মান-ডাচ, ইউরোপের বলকান অঞ্চল, স্পেনের বিভিন্ন অঙ্গরাজ্য, আফ্রিকার গোল্ড কোস্ট অঞ্চলের বিভিন্ন ভাষা নিয়ে আন্দোলন হয়েছে। ঊনবিংশ শতাব্দীতে পুরো মধ্যপ্রাচ্য আরবি-ফারসি-তুর্কি কিংবা তৎকালীন মেক্সিকোর উত্তরাংশে আন্দোলন হয়েছে স্প্যানিশ-ইংরেজি ভাষা নিয়ে। তাছাড়া সপ্তদশ-অষ্টদশ শতাব্দীতে চীনে ম্যান্ডারিন-মাঞ্চুরিয়ান ভাষা নিয়ে বিরোধ ছিল।
একটি ভাল লেখা পড়ার অভিঙ্গতা হল, কিছু জানা কথা ফের জানলাম তবে বেশি জানলাম না জানা। ধন্যবাদ।
ভাষা আন্দোলন নিয়ে বাংলা ভাষায় ২১ ফেব্রুয়ারি অথবা ১৯ মে ছাড়া আর কিছুচোখে পড়ে নি, এই লেখাটি পড়ে তার
বাইরের দুনিয়াটা জানা গেল।
21feb আর 19th may-র কথা অনেক পড়েছি, কিন্তু মাতৃ ভাষার জন্য দেশে বিদেশে আরও অনেক আন্দোলন হয়েছে
সেসব কথা প্রচারের বাইরে। ধন্যবাদ।