অমর একুশের শহিদদের নামে আজও দুই বাংলার মানুষ উদ্দীপ্ত হন। অথচ এই ভারতেরই এক ভাষা যোদ্ধা পট্রি শ্রীরামালুর নাম (১৯০১- ১৯৫২) একশো জনে একজন বাঙালিও জানেন কিনা সন্দেহ! মহাত্মা গান্ধীর শিষ্য শ্রীরামালু আন্দোলন না করলে কিন্তু স্বাধীন ভারতে ভাষা ভিত্তিক রাজ্য গঠন সম্ভব হতনা। তিনিই প্রথম মাতৃভাষার ভিত্তিতে রাজ্য গঠনের দাবি তোলেন এবং আমরণ অনশন ও মৃত্যুবরণ করে স্বতন্ত্র অন্ধ্রপ্রদেশ রাজ্য গঠন করতে কেন্দ্রের নেহরু সরকারকে বাধ্য করেন। তাঁর মাতৃভাষা ভারত শ্রেষ্ঠ- এমন দাবি তিনি করেননি। তিনি চেয়েছিলেন, মাতৃভাষার স্বাতন্ত্র্য, নিজ ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে আলাদা এক প্রদেশ। প্রধানমন্ত্রী নেহরু’র সরকার তাঁর দাবি মানতে নারাজ হলে শ্রীরামালু শুরু করেন সেই ঐতিহাসিক অনশন, মৃত্যুতে যার অন্ত হয়। ভারতবাসী পায় ভাষার ভিত্তিতে রাজ্যের অধিকার। আমরি মাতৃভাষার জন্য শ্রীরামালু আত্মহনন ভাষা প্রেমী আমরা কতটা স্বরণে রেখেছি!
সেই ১৯৪৯ সালেই আমাদের জাতীয় নেতারা ‘হিন্দি’ কে সরকারি যোগাযোগ রক্ষাকারী ভাষা হিসেবে আলাদা মর্যাদা দেওয়ার জন্য নানা কৌশল শুরু করেছিলেন। এই সরকারি যোগাযোগ রক্ষাকারী ভাষাটিকেই যে তাবৎ ভারতবাসীর ভাষা করে তুলতে হবে এমন কোন কথা সংবিধানে বলা ছিলনা। মাতৃভাষা তো মানুষের জন্মগত অধিকার, তার ধর্ম, রাজনীতি, শিক্ষা, অর্থনীতি, সমাজনীতি, এমনকি তার ভৌম-রাজনীতির পরিচায়ক এক সম্পদ। আজকের বাংলা ভাষা বলতেই যেমন আমরা বুঝি দুই বাংলার ভূগোলকে। শ্রীরামালু এই দাবিটিই করেছিলেন। তাঁর নিজের ভাষার স্বাতন্ত্র্য, তেলেগু ভাষী মানুষের স্বতন্ত্র এক প্রদেশ।
স্বাধীনতার পর থেকেই ভাষার মর্যাদার প্রশ্নটি সামনে চলে আসে। বাঙালি বুদ্ধিজীবিরা বাংলাকে রাষ্ট্রভাষা করার জন্য সভাসমিতি করতে থাকেন। এমনকি এই মর্মে গণপরিষদের সভাপতি রাজেন্দ্রপ্রসাদ এর কাছে স্মারকলিপি পাঠানো হয়।প্রধানমন্ত্রী নেহরু কলকাতায় এলে তাঁকেও স্মারকলিপি দেয়া হয়। অন্যদিকে হিন্দীভাষীদের দাবিও কিছু কম ছিলনা। আর্যাবর্ত কিংবা উত্তরভারতের এক বৃহৎ অংশের মানুষ হিন্দী ভাষায় কথা বলেন। এক্ষেত্রে সাধারনের কথ্য হিন্দী ও প্রমিত হিন্দীকে এক করে দেখিয়ে হিন্দীর গড়িষ্ঠতা প্রমানের তোড়জোড় চলে। কেন্দ্রের সরকারের নেকনজর কিছু কম ছিলনা! প্রধানমন্ত্রী নেহরু অবশ্য প্রকাশ্যে বলতে থাকেন, মাতৃভাষা নয়, স্বাধীন দেশের কাজের ভাষা কোনটা হবে সেটাই জরুরি কথা। একাধিক ভাষা এই কাজ করতে গেলে অহেতুক ব্যয়বৃদ্ধির কথাও শোনা যায় তাঁর মুখে।
বহুভাষিকতা ভারতের প্রাণস্বরুপ। শ্রীরামালুর দাবি এই অসঙ্গত ব্যবস্থার বিরুদ্ধে ছিল স্বাতন্ত্র্য রক্ষার দাবি। তিনি প্রশ্ন তোলেন, একদা কংগ্রেস দল ও এর নেতৃত্ব উভয়েই ভাষা স্বাতন্ত্র্য কে স্বীকার করতেন। নেহরু তাঁর The question of Language প্রবন্ধে লিখেছিলেন প্রাদেশিক ভাষাগুলি নিছক উপভাষা নয়, এই সুপ্রাচীন ভাষাগুলি ঐতিহ্যবাহী, সাধারণ ও কৃতবিদ্যদের সাংস্কৃতিক জীবন ও ভাবনা এই ভাষাগুলি বহন করছে। তাহলে স্বাধীনতার পর কেন তিনি অন্য কথা বলছেন?
শ্রীরামালুকে অবজ্ঞা করা যেতনা। তিনি ছিলেন দক্ষিন ভারতে গান্ধীজির অন্যতম অনুগামী। স্বাধীনতা সংগ্রামে তাঁর ভূমিকা কিছু কম ছিলনা। ১৯০১ সালের ১৬ মার্চ তাঁর জন্ম হয় নেল্লোর জেলার পদমাতাপল্লীতে। দুর্ভিক্ষের কারণে তাদের পরিবার পরবর্তীকালে চলে আসে মাদ্রাজে। এখানে স্কুল শিক্ষা শেষ করে উচ্চ শিক্ষার জন্য শ্রীরামালু বোম্বে যান। বোম্বেতে স্যানিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং শিক্ষার জন্য ভর্তি হন ভিক্টোরিয়া জুবিলি টেকনিক্যাল ইন্সটিটিউটে। শিক্ষান্তে গ্রেট ইন্ডিয়ান পেনিনসুলার রেলওয়েতে চাকরি নেন। কিন্তু দুবছর মাত্র চাকরি করে তিনি সব ছেড়ে গান্ধীজির ডাকে দেশের কাজে রাস্তায় নামেন। শুরু হয় এক নতুন জীবন। লবন আইন অমান্য করলে তিনি প্রথমবার কারারুদ্ধ হন। এরপর শুরু করেন দলিত মানুষের অধিকার আন্দোলন। নিম্নবর্গের মানুষের অবদমন ও মনুষ্যত্বহীন জীবনের রুপরেখা বদলে দিতে তিনি আন্দোলন শুরু করেন। এক্ষেত্রে তিনি ছিলেন শ্রীনারায়ণগুরুর যোগ্য উত্তরসূরী। লেল্লোরের ভেলু গোপালস্বামী মন্দিরের দরজা দলিতদের জন্য উন্মুক্ত করতে তিনি বারবার আন্দোলন করেন। অনশন করেন টানা বত্রিশ দিন। শ্রীরামালুকে চিনতে ভুল করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নেহরু ও দিল্লির তৎকালীন নেতৃত্ব।
ভাষা ও সংস্কৃতির ভিত্তিতে গড়ে উঠুক পৃথক অন্ধ্রপ্রদেশ— এই দাবীতে অনশনে বসলেন তিনি। সময়কাল ১৯৫২-র অক্টোবর মাস। তাঁর এই ভাষা আন্দোলনের সময় মহাত্মা গান্ধী পরলোকে, নেহরু তাই শ্রীরামালু সম্পর্কে উদাসীন। কারোর আবেদনেই তিনি কান দেবেন না, কারণ ভাষার ভিত্তিতে প্রদেশ হলে দেশের সংহতি নষ্ট হবে, বিচ্ছিন্নতা প্রশ্রয় পাবে! ১৫ ডিসেম্বর ১৯৫২-য় অনশনের ৫৮ দিনের মাথায় অনশনে প্রাণ দিলেন শ্রীরামালু। এদেশে ভাষার জন্য, ভাষার ভিত্তিতে স্বতন্ত্র প্রদেশের দাবিতে প্রথম শহিদ হলেন শ্রীরামালু। তাঁর মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে জনতা উত্তাল হয়ে উঠল, সরকারি দপ্তর আক্রান্ত হল, হরতালে স্তব্ধ হল পথঘাট। শ্রীরামালুর মৃত্যুর দু-দিন পর দিল্লির সরকার ভাষাভিত্তিক স্বতন্ত্র অন্ধ্রপ্রদেশ এর দাবি মেনে নিতে বাধ্য হল। গান্ধিবাদী এই ভাষা শহিদ নিজের প্রাণ দিয়ে অন্যান্য প্রদেশের ভাষিক স্বাতন্ত্র্যকেও মেনে নিতে বাধ্য করেছিলেন প্রধানমন্ত্রী নেহরুকে। তাঁর মৃত্যুর পরপরই ১৯৫৬ সালে ভাষার ভিত্তিতে প্রদেশগুলি বিভক্ত করা হয়েছিল। এক ভাষা এক নেতার দাপটে দিশেহারা আজকের ভারতে শ্রীরামালু হয়ে উঠতে পারেন ভাষা স্বাধীনতার প্রতীক।
It is also correct because It has been exam many times.
This question comes up very often in the final exam.