মা সারদার মধ্যে কালীকেই দেখেছিলেন ‘ডাকাতবাবা’ ভীম সর্দার। ভীম সর্দারের কালীপুজো প্রতি বছরের ন্যায় এবারেও হচ্ছে যথেষ্ট আচার প্রথা মেনে। বংশপরম্পরায় এই ডাকাতে কালীর কালীপুজো নিয়ে আজও মানুষের মনে উৎসাহ রয়েছে। আরামবাগ থেকে কলকাতার দিকে কিছুটা এগোলেই মুথাভাঙা। চাঁপাডাঙার বিদ্যাসাগর সেতুর আগে। আজ মুখাডাঙা বা আশপাশ এলাকা আধা মফসল শহর। সড়কপথে যোগাযোগের অনেক উন্নতি ঘটেছে। বিদ্যুৎ এসেছে। অ্যান্টেনার যুগ পেরিয়ে কেবল লাইন ঢুকেছে ঘরে। কাঠের জ্বালের পরিবর্তে গ্যাস ওভেনে পা দিয়েছে মুথাডাঙার মানুষ। কিন্তু এই প্রতিবেদনে আমরা পিছিয়ে যাব কয়েক যুগ আগে। তখন ১২৯০ সাল। চারদিকে গহন অরণ্য। সূর্য পাটে গেলেই গাঢ় অন্ধকারে ডুবে যায় চারদিকে। জঙ্গল থেকে ভেসে আসে গর্জন। মানুষ এক স্থান থেকে অন্যত্র যাতায়াত করত পায়ে হেঁটে। এছাড়া কোনও বিকল্প ছিল না। সেই সময় থেকেই তেলোভেলোর মাঠ ইতিহাসের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়েছে নিজেকে।

কালী পুজোর আগে একবার সেই ইতিহাসের পাতায় চোখ বুলিয়ে নেওয়া যাক। মুথাডাঙা থেকে ডান হাতের রাস্তা ধরে সোজা এগোলে পাশাপাশি দুটি গ্রাম তেলিয়া আর ভেলিয়া। বাসিন্দাদের চলতি কথায় তেলোভেলো। এই দুই গ্রামের সীমানা জনবসতিহীন বিস্তীর্ণ জঙ্গলময়। তারই নাম তেলোভেলোর মাঠ। দিনের বেলাতেও এই মাঠ পার হতে বুক কাঁপে। ডাকাতদের রাজ এখানে। শ্রীমা সারদাদেবী কামারপুকুর থেকে হাঁটাপথে কলকাতায় যাচ্ছেন। সূর্য পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়েছে। অথচ তেলোভেলোর মাঠ পার হওয়া বাকি। শ্রীমায়ের সঙ্গিনীরা হাঁটছেন দ্রুত গতিতে। তাঁরা অন্ধকার নামার আগেই বুকে কাঁপন ধরানো আতঙ্কের তেলোভেলোর মাঠ পার হতে চান। কিন্তু, তাঁদের গতির সঙ্গে মেলাতে পারছেন না মা সারদা। তাই বাধ্য হয়েই সঙ্গীদের এগিয়ে যেতে বলে হাঁটতে শুরু করলেন তিনি। ঘন অন্ধকার চারদিকে। ঝিঁ ঝিঁ পোকার ডাকের সঙ্গে জঙ্গল গভীরতর হচ্ছে। সেই জঙ্গলপথে একা হাঁটছেন মা সারদা। হঠাৎই সামনে দেখলেন এক দীর্ঘাবয়ব মানুষ। সে হুঙ্কার দিয়ে বলল, কে গা এ সময়ে এখানে দাঁড়িয়ে? যাবে কোথায়। মা ততক্ষণে তার কাছাকাছি এসে পড়েছেন। সামনে দাঁড়িয়ে এক বলশালী পুরুষ। গায়ের রং ঘোর কালো। হাতে রুপোর বালা, কাঁধে লাঠি। সে ডাকাত। মা বললেন, যাব পুবে। না, ডাকাত মায়ের সঙ্গের সামগ্রী কেড়ে নিল না বা তা দিয়ে দেওয়ার দাবিও জানাল না। বরং আশ্চর্য পরিবর্তন এল তার মধ্যে। নরম গলায় পরম যত্নে মায়ের দিকে তাকিয়ে বললেন, ভয় নেই। শ্রীমা বললেন, বাবা আমার সঙ্গীরা এগিয়ে গিয়েছে। আমি একা হাঁটতে হাঁটতে বোধহয় পথ হারিয়ে ফেলেছি। তুমি আমাকে সঙ্গে করে যদি তাদের কাছে পৌঁছে দাও। তোমার জামাই দক্ষিণেশ্বরে রানী রাসমণির কালীবাড়িতে থাকেন, আমি তাঁর কাছে যাচ্ছি।

শ্রীমায়ের এই ডাকাতের সামনে পড়ার কাহিনী আজও সকলের মুখে মুখে ফেরে। সেই দস্যুর মনে হঠাৎ বড় পরিবর্তন ঘটেছিল। শ্রীমায়ের কাছে বলেছিলেন, তুমি তো সাধারণ নারী নও, আমরা তোমাকে কালীরূপে দেখেছি। তেলোভেলোর মাঠে মা সারদার মধ্যে আরাধ্য দেবী কালীকেই দেখেছিলেন ডাকাতবাবা। সেই মাঠে আজও ডাকাতে কালীর পুজো হয়। সারদার স্মৃতিকে আঁকড়ে ধরে ভীম সর্দারের পুজোতে কোনও খামতি নেই এবারেও।

প্রসঙ্গত, আর ঘন জঙ্গলের মধ্য দিয়ে যেতে হবে না। কাঁটার আচড় গায়ে লাগবে না। কাশফুলের ঘন বনানী মাথা দুলিয়ে বাধাও দেবে না। অন্ধকারের সেই কালো লোকগুলিও আজ সামনে দাঁড়াবে না। ভয় নেই মৃত্যুর, নেই খরস্রোতা সেই নদী। যে আপনাকে চলার পথে মাঝিদের গান শুনিয়ে শ্মশান পার করাবে। এসব কিছুই নেই, সবই আজ ভালিয়ার ইতিহাস। রাতের আজ আছে সাক্ষী হয়ে দাঁড়িয়ে সেই কালী মন্দির, সামনেই হাড়িকাঠ পোঁতা। পাশেই পীরের আস্তানা, পাশ দিয়ে গেছে পিচের রাস্তা। ২৩ বিঘে এলাকায় চারদিকে ছড়ানো কয়েকটি বড় বড় গাছ। নদী মজে জমেছে জল। সামান্য বৃষ্টিতেই মন্দিরে যাওয়া দুরূহ। পুরোহিতরা জল পার হয়ে মাকে খাওয়াতে যান। পাশেই গড়ে উঠেছে সারদা সংঘ। তাও ট্রাস্টি বোর্ডের চেষ্টায়। অনেক দৌড়ঝাঁপ করে মা সারদাদেবীকে স্মরণ করতেই গড়ে তুলেছে সারদা সংঘ মন্দির। মন্দিরে মা সারদার পাথরের মূর্তি বসানো হয়েছে। সেখানেই পুরোহিত আরাধনা করেন। ভগ্ন প্রাচীর ঘিরে রেখেছে। জীর্ণ-শীর্ণ রূপ এখনও কাটিয়ে উঠতে পারেনি। আজও পুজো হয়। আগামী ৬ কার্তিকও পুজো হবে মা কালীর। আড়ম্বর নয়। অতীতে ডাকাত ভীম সর্দার যেভাবে পুজো করতেন, আজকের পুজোর অনেকটাই তফাৎ।

জঙ্গলের মধ্যে এই কালীর সৃষ্টি বা সূচনা করেছিলেন গ্রামেরই সরকার বাড়ির জামাই, একথাই লোকমুখে প্রচলিত, ডাকাত ভীম সর্দার (মাঝি পদবি) ডাকাতি করতে যাবার আগে এখানে পুজো দিতেন। সেই পুজো আজও চলে আসছে। নেই সেই জামাই, নেই ভীম সর্দার (মাঝি)। পুজো টিকিয়ে রাখতে সরকার বাড়ি একটি ট্রাস্টি বোর্ড গঠন করেছে। এরাই সমস্ত পুজোর দেখভাল করেন। ভীম সর্দারের বাড়ির পরবর্তী বংশধর আজও নিজেদের বাড়িতে কালীর পুজো করে। শ্মশানে আর আসে না, মহা ধূমধামের সঙ্গে এবারের বাড়ির কালীপুজো হবে বলে জানিয়েছে, ট্রাস্টি বোর্ডের সম্পাদক অশোক সরকার, মা কালীর মন্দিরে নিয়মরক্ষার পুজো হবে। কোনও আড়ম্বর নয়। আশপাশের গ্রামের বহু দর্শনার্থী এখানে এসে জড়ো হন। মায়ের পুজো দিয়েই রাতে বাড়ি ফেরেন সকলে। জ্বলবে না ইলেকট্রিকের আলো, থাকবে না প্যান্ডেল। সাদামাটা পুজো হবে। মূর্তি বদল হয় কেবল যখন নষ্ট হয়ে যায়। গঙ্গোপাধ্যায় বাড়ির পুরোহিতরা আজও সন্ধ্যায় প্রদীপ জ্বালায়। সনৎ চক্রবর্তী আজও সকাল-সন্ধ্যা মা সারদা মন্দিরে ঘণ্টা বাজান, আরাধনা করেন। কেবল পুজো দু-দিন। এই দু-দিনই পাঁঠা বলি হবে। পণ্ডিতদের (শূদ্র) পাঁঠাই প্রথম বলি হবে। পরের দিন ভোগ বিতরণ।

ট্রাস্টি বোর্ড দু-দিন গ্রামের বারোয়ারিকে দায়িত্ব দেন পুজো করতে। বারোয়ারি কমিটি প্রতি বছর আষাঢ় মাসের প্রথম অমাবস্যায় রাতে মহা ধূমধামের সঙ্গে পুজো করে। তাসা, ঢাক, মাইক জেনারেটর বসিয়ে আলোয় রকমারি দৃশ্য তৈরি করে। এসময় মেলাও বসে, যাত্রাপালা হয়। দূরদূরান্ত গ্রাম থেকে ছুটে আসেন ভিড় জমাতে, শ্যামাপুজোয় যত না আনন্দ এই সময়ই আনন্দে মাতোয়ার হন এলাকার বাসিন্দারা। সর্ব ধর্ম সমন্বয়ের পীঠস্থান। একদিকে মৌলবীর আজান, পীরের আস্তানায় দেওয়া প্রার্থনা, পাশেই পুরোহিতদের মন্ত্রপাঠ। কালী মন্দিরে ভাগবত পাঠ ও দেবীর আরাধনা। ২৩ বিঘে এলাকার মধ্যেই দুইয়ে মিলে একাকার হয়ে যায়। নেই বিভেদ, নেই অস্পৃশ্যতা, মানুষ মানুষই এই পরিচয়ই এখানে প্রকাশ পায়। ভালিয়া মানুষের মনে আজ এক পীঠস্থান। জায়গাটি আজও অবহেলিত। বনসৃজন উদ্যান প্রকল্প নিয়েও সার্থক হতে পারেনি। ৬ হাজার গাছ বসানো হয়েছিল, বেঁচে আছে মাত্র ১ হাজার। প্রাচীরের চিহ্ন নেই। কালী মন্দিরের প্রাচীনদশা আজও চোখে পড়ে। কেবল রঙ করা হয়েছে। চারদিকে এখনও জল থই থই করছে। জল নামায় কোনও বিকল্প খাল বা নালা নেই। বসার চালা নেই। নেই থাকার জায়গা। চুপিসারে অশোক সরকার জানিয়েছেন,খুব শীঘ্রই প্রাচীর এবং একটি অতিথি নিবাস গড়ে তোলা হবে। এজন্য তোড়জোড় শুরু হয়েছে।এত কিছুর মধ্যেও এখানকার মানুষজন কত আপন। ডাকাতি, দস্যু বৃত্তি, চুরি সব কিছু ভুলে গেছে আজ। শুধু বাঁচতে মা সারদাদেবীর আদর্শকে হৃদয়ে স্থান দিয়েছেন। তাই এবারেও পুজো হবে।