সিপিআইএম একসময় আম্বেদকরের নাম সহ্য করতে পারতো না। ২০০৫ সালের এপ্রিল মাসে দিল্লিতে সিপিআইএমের পার্টি কংগ্রেস হয়েছিল। সেই প্রথম সিপিআইএম আম্বেদকরের ছবি টাঙায়। তার ২-৪ বছর আগে বিমান বসু ও প্রয়াত কান্তি বিশ্বাস আম্বেদকরের জন্মদিন পালন করতেন। পার্টি থেকে কিছু করা হতো না। সিপিআই ও সিপিআইএমের বক্তব্য ছিল, আম্বেদকর দলিতদের নিয়ে যে রাজনীতি করতেন তা আসলে জাতপাতের রাজনীতি। শ্রেণি রাজনীতি নষ্ট করা হতো। আবার জনসঙ্ঘ এবং পরবর্তীকালে রূপান্তরিত বিজেপি বর্ণহিন্দুদের স্বার্থেই রাজনীতি করতো। এঁরা কখনও দেশের গরিব দলিতদের নেতাদের স্মরণ করতে চাইতো না। আজ চাপে পড়ে করছে। তবে যারা গরিব কৃষকের জমি বন্দুকের ডগায় কেড়ে নিয়ে টাটাকে দেয় এবং যারা ঋণখেলাপি আদানিকে স্টেট ব্যাঙ্ক থেকে ১০ হাজার কোটি টাকা ঋণ পাইয়ে দেয়, তারাও আজ চাপে পড়ে আম্বেদকরের গলায় মালা দিচ্ছে। মালা দেওয়ার অধিকার সকলের আছে। কিন্তু ভণ্ডামি হলে সেটাও জানতে হবে।
শুক্রবার ১৪ এপ্রিল ২০১৭ ড. ভীমরাও রামজি আম্বেদকরের ১২৬তম জন্মদিন। সরকারি ছুটি বলে অনেকে জানতে চাইবেন, সেদিন কেন ছুটি? জানবেন, আম্বেদকরের জন্মদিন বলে ছুটি। ভারতে দলিতদের হয়ে কথা বলার জন্য বিভিন্ন অঞ্চলে কিছু নেতা কাজ করেছেন। স্বাধীনতার আগেই পশ্চিম ভারতে ছিলেন মহাত্মা জ্যোতিবা ফুলে, দক্ষিণ ভারতে ছিলেন রামস্বামী পেরিয়ার এবং নারায়ণ গুরু, পূর্ব ভারতে ছিলেন হরিচাঁদ-গুরুচাঁদ ঠাকুর, উত্তরবঙ্গে ছিলেন ঠাকুর পঞ্চানন বর্মা। সমাজ সংস্কারক হিসেবে দলিতদের নেতা হিসেবে এঁদের একসময় খুব নাম ডাক ছিল। কিন্তু সারা ভারতে এমন নেতাই ছিলেন আম্বেদকর।
ভীমরাও রামজি আম্বেদকর ১৮৯১ সালের ১৪ এপ্রিল মধ্যপ্রদেশের মউ শহরে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর বাবা নাম ছিল রামজি সৎপাল, মা-র নাম ভীমাবাঈ। আম্বেদকর জন্মেছিলেন মাহার পরিবারে। উচ্চবর্ণ এবং জমিদাররা এই মাহার সম্প্রদায়কে অস্পৃশ্য ভাবতেন। ছোটোবেলা থেকেই আম্বেদকর এটা দেখেছিলেন। একবার গরুর গাড়িতে যাওয়ার সময় আম্বেদকর অস্পৃশ্য পরিবারের ছেলে জেনে গাড়োয়ান নামিয়ে দিয়েছিল। স্কুলেও এমন অভিজ্ঞতা তাঁর হয়েছিল। ১৭ বছর বয়সে ভীমরাওকে জোর করে বিয়ে দিয়ে দেওয়া হয়। পাত্রী ৯ বছরের রামী। আম্বেদকর যখন কলেজে বিএ পড়তেন, তখন কলেজের ক্যান্টিনে তাঁকে খেতে দেওয়া হতো না। অস্পৃশ্য পরিবারের ছেলে বলে। মনে দুঃখ থাকলেও ১৯১২ সালে তিনি কৃতিত্বের সঙ্গে বিএ পাশ করেন। বরোদার মহারাজা তাঁকে আমেরিকায় পড়তে যাওয়ার খরচ দিয়েছিলেন। এই শর্তে যে, ওখান থেকে ফিরে ১০ বছর তাঁকে তাঁর এস্টেটে চাকরি করতে হবে। এরপর উচ্চশিক্ষা লাভের জন্য ১৯১৩ সালের জুলাই মাসে আম্বেদকর আমেরিকায় পৌছোন। আম্বেদকর বিএ পাশ করেছিলেন ইংরেজি এবং পারসি ভাষা নিয়ে পড়াশুনো করে। কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয়ে তিনি পড়েন রাষ্ট্রবিজ্ঞান, দর্শন, নৃতত্ত্ব, সমাজতত্ত্ব ও অর্থনীতি। বৃত্তির টাকা থেকেই তাঁকে পড়তে হতো। বৃত্তির টাকা থেকে কিছু বাঁচিয়ে আবার বাড়িতেও পাঠাতে হতো।

১৯১৫ সালে কলম্বিয়া বিশ্ববিদ্যালয় থেকে তিনি এম.এ ডিগ্রি পান। প্রাচীন ভারতের ব্যবসাবাণিজ্য নিয়ে তিনি একটি থিসিস জমা দেন। ১৯১৬ সালের মে মাসে একটি সেমিনারে তিনি ‘ভারতের জাত ব্যবস্থা—তার ক্রিয়াকৌশল, সৃষ্টি ও বিকাশ’ শিরোনামে একটি থিসিস পাঠ করেন। এই থিসিসেই তাঁর পাণ্ডিত্যের পরিচয় পাওয়া যায়।
আমেরিকায় থাকতেই আম্বেদকর শোনেন লন্ডন মিউজিয়াম হলো জ্ঞানপিপাসুদের সোনার খনি। কার্ল মার্কস, লেনিন সবাই লন্ডন মিউজিয়ামে বসে পড়াশুনো করেছেন। ১৯১৬ সালের জুন মাসে আম্বেদকরও আমেরিকা ছেড়ে লন্ডনের উদ্দেশ্যে যান। কিন্তু তাঁর বৃত্তির মেয়াদ শেষ হয়ে যাওয়ায় ১৯১৭ সালের আগস্টে তাঁকে দেশে ফিরে আসতে হয়
শুক্রবার ১৪ এপ্রিল ২০২০ ভীমরাও রামজী আম্বেদকরের ১২৯তম জন্মদিন। গত সংখ্যাতেই আমরা আম্বেদকরের কৈশোর থেকে কলেজজীবনের কথা আলোচনা করেছি। তাঁর জন্ম ১৮৯১ সালের ১৪ এপ্রিল মধ্যপ্রদেশের মৌ শহরে। মধ্যপ্রদেশে জন্ম হলেও তাঁরা মূলত মহারাষ্ট্রের কঙ্কন এলাকার রত্নাগিরির জেলার আম্বাবাদের বাসিন্দা। আম্বেদকর মাহার সম্প্রদায়ের। মহারাষ্ট্রের উচ্চবর্ণের হিন্দুরা মাহারদের অস্পৃশ্য করে রাখতেন। গত সংখ্যায় আমরা বলেছিলাম, তিনি আমেরিকা ও লন্ডনে পড়াশোনা করতে যান। ১৯১৭ সালে বিদেশে পড়াশোনা শেষ করে তিনি দেশে ফিরে আসেন।

তারপর বরোদার মহারাজার এস্টেটে কাজ করতে থাকেন। এভাবে কেটে যাচ্ছিল দিনগুলি। কিন্তু এর মধ্যে হঠাৎ একদিন একদল পারসি যুবক লাঠিসোটা নিয়ে হোটেলে ভীমরাও-এর ওপর চড়াও হয়। তারা ভীমরাওকে বলে তুমি অস্পৃশ্য। এক্ষুনি হোটেল ছেড়ে চলে যাও। ভীমরাও বরোদার মহারাজাকে সব কিছু জানান। মহারাজা ভীমরাওয়ের একটা বিকল্প ব্যবস্থা করতে দেওয়ানকে নির্দেশ দেন। কিন্তু এ ব্যাপারে দেওয়ানও তাঁর অক্ষমতার কথা মহারাজাকে জানিয়ে দেন। অগত্যা ভীমরাও একটা গাছের নীচে বসে অঝোরে কাঁদতে থাকেন। ভীমরাও বোঝেন, ব্যক্তিগতভাবে কেউ যতবড়ো হোক না কেন, একজন অস্পৃশ্যের প্রতি বর্ণহিন্দুদের হীন মনোবৃত্তি তাতে কোনও হেরফের হবে না। দু-মাস চাকরি করার পর হতাশ, অসহায় ও অপমানিত হয়ে ১৯১৭ সালের নভেম্বর মাসের মাঝামাঝি ভীমরাও বম্বে ফিরে যান। ১৯১৮ সালে তিনি কলেজের অধ্যাপক হিসেবে কাজে যোগদান করেন। লন্ডনে আইন ও অর্থনীতি বিষয়ে অসমাপ্ত শিক্ষা শেষ করার জন্য এবার টাকার জোগাড় হয়ে যাবে ভেবে আম্বেদকরের মন খুশিতে ভরে ওঠে।
অধ্যাপক হিসেবে ভীমরাও ভালো মাইনে পেতেন। তিনি খুব মিতব্যয়ী ছিলেন। প্যারেলে শ্রমিক বস্তির দুই কামরার ঘরে স্বামী-স্ত্রী বাস করতেন। মাইনের একটা অংশ স্ত্রী রমাবাঈয়ের হাতে তুলে দিয়ে তিনি নিশ্চিন্ত থাকতেন। এর আগে ভীমরাও যখন আমেরিকার উদ্দেশ্যে রওনা হন, তখন তাঁর স্ত্রী ছিলেন সন্তানসম্ভবা। তিনি একজন পুত্রসন্তানের জন্ম দেন। তার নাম ছিল রমেশ। ওই সময়ে ভীমরাওয়ের পরিবারের আর্থিক দুরাবস্থা ছিল চরম। অপুষ্টি আর চিকিৎসার অভাবে রমেশ মারা যায়। কিন্তু ভীমরাওয়ের স্ত্রী তাতে যত দুঃখই পান, তা নিয়ে অন্যের কাছে দু-কথা বলে আত্মশান্তি লাভের চেষ্টা করেন। স্বামী ও পরিবারের অক্ষমতার কথা কারুর কাছে প্রকাশ করতে চাননি। দুরবস্থার মধ্যেও স্বামীর মৃত দাদার পরিবারের প্রতি এতটুকু অবহেলা করেননি। তা নিয়ে কোনও অশান্তি হয়নি সংসারে। ভীমরাও আমেরিকা থেকে ফিরে আসার পর তাঁদের দ্বিতীয় পুত্র সন্তান গঙ্গাধরের জন্ম হয়। সে-ও শৈশব অবস্থায় মারা যায়। শেষ সন্তান যশোবন্তের শরীরও ভালো থাকতো না।
পৌনে দু-বছর অধ্যাপনা করে তিনি সামান্য সঞ্চয় করেছিলেন। সেটার ওপর ভরসা করেই ১৯২০ সালের জুলাই মাসে পুনরায় তিনি লন্ডন যান। ইতিমধ্যে বরোদা এস্টেটের অতি উৎসাহী কর্মকর্তারা মহারাজার স্বার্থসন্ধানের অজুহাতে ভীমরাওয়ের কাছে বৃত্তির টাকা ফেরত দেওয়ার জন্য তাগাদা দিতে থাকেন। আসলে একজন অস্পৃশ্য মাহারের উত্থানকে উচ্চবর্ণের হিন্দু কর্মচারীরা একেবারেই বরদাস্ত করতে পারছিলেন না। উচ্চশিক্ষার জন্য দেওয়া বৃত্তির টাকাকে তাঁরা লোন বলে চালাতে চেষ্টা করেন। লন্ডনে পৌঁছে ১৯২০ সালের সেপ্টেম্বর মাস থেকে ভীমরাও পুনরায় লন্ডন স্কুল অব ইকনমিক্স অ্যান্ড পলিটিক্যাল সায়েন্সে অর্থশাস্ত্র বিষয়ে পড়াশোনা শুরু করেন এবং একই সাথে গ্রেস ইন-এ ব্যরিস্টারি পড়া চালিয়ে যান। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ভীমরাও আম্বেদকর বৃটিশ মিউজিয়ামে পড়ে থাকতেন। থিয়েটার, সিনেমা দেখতে যেতেন না। পোশাক-পরিচ্ছদের বিলাসিতাও ছিল না। বাসভাড়া বাঁচানোর জন্য বহুক্ষেত্রে হেঁটেই মেরে দিতেন।

‘বৃটিশ ভারতে বিভিন্ন প্রদেশের মধ্যে অর্থ বণ্টন’ শীর্ষক থিসিসটি তিনি শেষ করেন। লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয় এই থিসিসের জন্য তাঁকে ১৯২১ সালের জুন মাসে এমএসসি ডিগ্রি দেয়। ১৯২২ সালের অক্টোবর মাসে তিনি তাঁর বিখ্যাত থিসিস ‘টাকার সমস্যা’ শীর্ষক প্রবন্ধটি লিখে শেষ করেন।
১৯২৩ সালের এপ্রিল মাসে তিনি দেশে ফিরে আসেন। দেশে ফিরে কিছুদিনের মধ্যে তিনি ওই থিসিস সামান্য অদলবদল করে আবার লন্ডন বিশ্ববিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দেন। পরীক্ষকরা এজন্য তাঁকে ডিএসসি ডিগ্রি দেন। এর ফলে ভীমরাও আম্বেদকরের পরিচয় দাঁড়ালো ডক্টর ইন সায়েন্স (লন্ডন) ও ব্যারিস্টার। ডক্টর ইন ফিলোজফি (আমেরিকা)।
সামাজিক ও রাজনৈতিক আন্দোলন
১৯২৪ সালের মার্চে ভীমরাও আম্বেদকর অস্পৃশ্যদের উন্নয়নের জন্য সামাজিক আন্দোলন করবেন বলে স্থির করেন। ১৯২৪ সালের ২০ জুলাই বহিষ্কৃত ‘হিতকারিণী সভা’ নাম দিয়ে একটি সংগঠন তৈরি করেন। তিনি এর চেয়ারম্যান ছিলেন।
আমেরিকা ও লন্ডনের প্রথাগত পড়াশোনা শেষ করে ১৯১৭ সালের ২১ আগস্ট বম্বে ফেরেন ড.আম্বেদকর। ওই সময় ভারত বিষয়ক ব্রিটিশ মন্ত্রালয়ের সচিব মন্টেগু চেমসফোর্ড ব্রিটিশ পার্লামেন্টে এক বিখ্যাত ঘোষণা করেন। এই ঘোষণায় বলা হয়, ব্রিটিশ সরকারের অধীনেই ভারতে দায়িত্বশীল সরকার গঠনের লক্ষ্যে একটি স্বশাসিত সংস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে। মন্টেগু ভারত সফরে আসেন ওই বছর অর্থাৎ ১৯১৭ সালে। বিভিন্ন ধর্ম, বর্ণ, নানা সামাজিক সংগঠনের প্রতিনিধিদের সঙ্গে তিনি বৈঠক করেন। ভারতের রাজনৈতিক ইতিহাসে প্রথম অস্পৃশ্যরা তাঁদের প্রতিনিধি দল পাঠিয়ে নিজেদের সামাজিক অধিকার সুনিশ্চিত করতে মন্টেগুর কাছে দাবিসনদ পেশ করেন। তৎকালীন মাদ্রাজ প্রেসিডেন্সির অস্পৃশ্যদের সংগঠন এবং ওই প্রেসিডেন্সিরই আদিবাসীদের সংগঠনও দাবিসনদ পেশ করে। অনুমান করা হয়, বাংলার অস্পৃশ্যদের সংগঠন দাবিসনদ পেশ করেছিল, তবে এ বিষয়ে নির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবুও বিশেষজ্ঞরা বলেন, এই দাবিসনদ পেশে নেতৃত্ব দিয়েছিলেন গুরুচাঁদ ঠাকুর। দাবিপত্রে স্বাক্ষর করেছিলেন তাঁর শিষ্য ভীষ্মদেব দাস।
মাদ্রাজের অস্পৃশ্যদের সংগঠন পুঞ্চমা কলভি অভিভারতী-অভিমনা সংঘ তীব্র ভাষায় ব্রাহ্মণ্যবাদী হিন্দু সমাজের সমালোচনা করেন। তাঁদের আবেদনপত্রে লেখা হয়, প্রশাসনিক ক্ষমতা হস্তান্তরিত হয়ে যদি বর্ণহিন্দুদের হাতেই থেকে যায়, সেক্ষেত্রে ব্যাপারটা দাঁড়াবে ‘বিষধর কেউটে সাপের অভিভাবকত্বে তাজা ব্যাঙ লালনপালন করা’। আদিবাসী সংগঠনটি বলে, বর্ণহিন্দুরা আমাদের ছোঁয়াচে রোগীর মতো ঘৃণা করে। এবং উন্নয়নের পথে হাঁটতে সবরকম বাধা সৃষ্টি করে। ডিপ্রেসড ক্লাসেস মিশনের পক্ষে মন্টেগুর সঙ্গে কথা বলেন স্যার এম জি চন্দভারকর। ড.আম্বেদকর তখনও রাজনৈতিক তথা সামাজিক আন্দোলনে প্রত্যক্ষভাবে যুক্ত হননি। সে সময় গদর পার্টির বিপ্লবী কার্যকলাপে ইংরেজ সরকার যথেষ্ট বিচলিত। একইসঙ্গে ভারতের জাতীয় কংগ্রেসও অস্বস্তিবোধ করতে শুরু করেন। কারণ, কংগ্রেসের নেতারা বুঝতে পারছিলেন, দেশের সমগ্র জনসংখ্যার চার ভাগের এক ভাগ মানুষ ক্ষমতা হস্তান্তরের বিরোধিতা করছেন। তার কারণ, বর্ণহিন্দু বা ব্রাহ্মণ্যবাদীদের বিরোধিতা করছেন বিভিন্ন ডিপ্রেসড ক্লাস বা পিছিয়ে পড়া অংশের জনগোষ্ঠীগুলোও। এই পরিস্থিতিতে ১৯১৭ সালের শেষের দিকে বম্বেতেই দুটো সম্মেলন হয়। প্রথমটির উদ্যোক্তা ছিলেন স্যার এম ডি চন্দভারকর। এই সম্মেলনে আইনসভায় সংখ্যানুপাতে প্রতিনিধি নির্বাচনে অধিকার রক্ষার দাবি জানানো হয়। কংগ্রেস পরিচালিত ডিপ্রেসড ক্লাস মিশনকে বলা হয়, যথাযথ প্রতিনিধিত্ব যাতে রক্ষা করা হয়। দ্বিতীয়টিতে ক্ষমতা হস্তান্তরের কংগ্রেসের দাবিকে সমর্থন জানানো হয়। এর পাশাপাশি কংগ্রেসকে বলা হয়, অস্পৃশ্যদের প্রতি যে সামাজিক বৈষম্য এবং চরম দুর্ব্যবহার হয়ে থাকে তার প্রতিকারের জন্য কংগ্রেস যেন উদ্যোগী হয়। এই সংগঠন যেন উচ্চবর্গীয়দের কাছে নিম্নবর্গের মানুষের দাবিকে সঠিকভাবে তুলে ধরে। এবং সামাজিক বৈষম্যের সরাসরি বিরোধিতা করে। এছাড়া আরেকটি সম্মেলন হয়। এই সম্মেলনে বর্ণহিন্দুদের হাতে ক্ষমতা ছাড়ার বিরোধিতা করা হয়।

ড.আম্বেদকর এই সম্পর্কে কংগ্রেস পরিচালিত ডিপ্রেসড ক্লাসেস মিশন যদি অস্পৃশ্যদের প্রতিনিধি নির্বাচন করে তাহলে গোটা ব্যাপারটাই অর্থহীন হয়ে যায়। ড. আম্বেদকরের মনে হয়েছিল কংগ্রেস প্রধানত বর্ণহিন্দুদের প্রতি ঘেঁষা একটি সংস্থা। এরাই যদি ডিপ্রেসড ক্লাসেস মিশনের নেতৃত্ব দেয় সেক্ষেত্রে আইন পরিষদের সদস্য যাঁরা নির্বাচিত হবেন তাঁরা কংগ্রেসের মূল নীতি ও প্রবণতার দ্বারাই পরিচালিত হবেন। ১৯১৮ সালের ২৩ ও ২৪ মার্চ বম্বেতে ডিপ্রেসড ক্লাসেস মিশনের প্রথম সর্বভারতীয় সম্মেলন বসে। এর আগে কলকাতাতেও সম্মেলন অনুষ্ঠিত হয়। বম্বে অধিবেশনে বালগঙ্গাধর তিলক বলেন, যদি ভগবান অস্পৃশ্যতাকে বরদাস্ত করেন তাহলে তিনি মোটেও ভগবান নন। আমি মনে করি, ভগবান নয়, আসলে ব্রাহ্মণরা এই অস্পৃশ্যতার প্রথা সৃষ্টি করেছে। এটা এক জঘন্য সামাজিক ব্যাধি।
মন্টেগু চেমসফোর্ড মিশনের পরে শাসন সংস্কারের লক্ষ্যে আরও একটি কমিটি দেশে আসে। অতঃপর ১৯১৯ সালে ভারত শাসন আইন ঘোষণা হয়। এই আইনে সর্বপ্রথম সরকারিভাবে অস্পৃশ্যতার দৃঢ় অস্তিত্বের কথা স্বীকার করা হয়।
১৯২০ সালের ৩১ জানুয়ারি ‘মূকনায়ক’ নামের পাক্ষিক পত্রিকা প্রকাশিত হয়। আম্বেদকর ঘোষিতভাবে পত্রিকার সম্পাদক না হলেও, এই পত্রিকার বিভিন্ন প্রতিবেদন সম্পর্কে তাঁর গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা ছিল। এই পত্রিকার প্রথম সংখ্যায় ড. আম্বেদকর লেখেন, এটা মানতেই হবে যে ভারত একটি অসাম্যের দেশ। হিন্দু সমাজ সিঁড়ি ছাড়া একটা বড়ো বাড়ির মতো। যে তলায় যে জন্মাবেন তাকে সেই তলায় বসে থাকতে হবে। হিন্দু সমাজকে স্পষ্ট তিন ভাগে ভাগ করেন ড. আম্বেদকর। প্রথম বিভাগ ব্রাহ্মণ এবং দ্বিতীয় অব্রাহ্মণ। আরেক বিভাগ অস্পৃশ্য।
ড. আম্বেদকর এই প্রবন্ধে আরও বলেন, উচ্চবর্ণের হিন্দুরা এক ভয়াবহ ভণ্ডামি করে থাকেন। তাঁরা বলেন, পৃথিবীতে যত জীবজন্তু এমনকী যেখানে জীবন রয়েছে সেখানে ভগবানের বাস। অথচ নিজের ধর্মেরই এক বিরাট অংশের মানুষকে এঁরা অস্পৃশ্য করে রেখেছেন।

১৯২৪ সালের ৯ মার্চ বম্বের দামোদর হলে এক সভা ডাকেন ড. আম্বেদকর। এই সভায় তিনি সরাসরি অস্পৃশ্যতাবিরোধী আন্দোলনে সামিল হবেন বলে জানিয়ে দেন। ওই বছরই ২০ জুলাই বহিষ্কৃত হিতকারিণী সভা নামের এক সংগঠন প্রতিষ্ঠা করেন। তিনি ছিলেন এই সংগঠনের চেয়ারপার্সন। এই সম্মেলনে আম্বেদকর কড়া ভাষায় হিন্দু সমাজের বর্ণব্যবস্থাকে আক্রমণ করেন। আম্বেদকর বলেন, হিন্দু সমাজের গভীরেই রয়েছে ব্রাহ্মণ্যবাদ। এর ফলে সামাজিক বিভাজন বার বার স্পষ্ট হয়েছে। সমাজকল্যাণে অসংখ্য লাইব্রেরি, স্টাডি সেন্টার এবং রিডিং সার্কেল গড়ে তুলতে হবে। কম দামে বই তুলে দিতে হবে গরিব মানুষের হাতে। সাংস্কৃতিক আন্দোলনকে জোরদার করতে হবে। একদিকে কৃষি ও শিল্প বিদ্যালয় গড়তে হবে। অস্পৃশ্যদের মধ্যে এখনও যাঁরা নিরক্ষর, তাঁদের জন্য দ্রুত কাজ করতে হবে।
এখানে উল্লেখ করা দরকার, গান্ধীজি বর্ণব্যবস্থা হুবহু বজায় রেখে অস্পৃশ্যদের যুগ যুগের কলঙ্ক ঘোচানোর চেষ্টা করছিলেন। বর্ণব্যবস্থা বজায় রেখেই অস্পৃশ্যতা দূর করতে কাজ করছিলেন গান্ধীজি। অন্যদিকে সাভারকার মহারাষ্ট্রের রত্নগিরি জেলার মধ্যে হিন্দু সমাজের বর্ণব্যবস্থা ভেঙে দেওয়ার লক্ষ্যে আন্দোলন গড়ার কাজ করছিলেন। ড.আম্বেদকরের দৃষ্টিভঙ্গি গান্ধীজি এবং বিনায়ক দামোদর সাভারকার এই দু-জনের থেকে আলাদা ছিল। তাঁর স্পষ্ট বক্তব্য ছিল, বর্ণ ব্যবস্থা বজায় থাকলে অস্পৃশ্যতা দূরীকরণ বা সামাজিক ন্যায়ের ধারণা প্রতিষ্ঠা হওয়া সম্ভব নয়। দলিতরা তাঁদের অধিকার পাবেন কি না, এ নিয়েও গভীর সন্দেহ প্রকাশ করেছিলেন ড. আম্বেদকর। তিনি চেয়েছিলেন, জাতি এবং বর্ণব্যবস্থার সম্পূর্ণ বিলোপ সাধন। আধুনিক সাম্য, মৈত্রী, স্বাধীনতার ভিত্তিতে হিন্দু সমাজের পুনর্গঠনের পক্ষে জোরদার সওয়াল করেন ড. আম্বেদকর। তিনি বলেন, বর্ণ ব্যবস্থার মধ্যে বর্ণহিন্দুদের কায়েমি স্বার্থ লুকিয়ে আছে। বর্ণব্যবস্থাকে হাতিয়ার করে নিজেদের তথাকথিত শ্রেষ্ঠত্বের গ্যারান্টি এঁরা আদায় করেন। এর ফলে হাজার হাজার বছর ধরে সামাজিক বৈষম্য চলে এসেছে। আম্বেদকরের স্পষ্ট বক্তব্য, ক্রীতদাসকে ক্রীতদাসই বলো। হিন্দু সমাজে ব্রাহ্মণ ছাড়া অন্যান্যরা যে ব্রাহ্মণের তুলনায় নিচুজাত এটা স্পষ্ট স্বীকার করতে হবে। সোজা কথা যাঁদের উপবীতের অধিকার আছে আর যাঁদের নেই— তফাতটা এখানে। অস্পৃশ্যতা তো আরও ভয়ংকর। তারা তো হিন্দু সমাজে পশুর মতো বেঁচে আছে।
বম্বেতে ড. আম্বেদকরের প্রথম মিটিংয়ে অল্প কয়েক জন দলিত এসেছিলেন। খুব উল্লেখযোগ্য সাফল্য কিন্তু আসেনি। কিন্তু ক্রমাগত এই লড়াই তিনি এগিয়ে নিয়ে গেছেন। ১৯২৪ সালে শোলাপুরের বার্সিতে অস্পৃশ্যদের প্রথম সম্মেলনে বক্তৃতা দিয়ে ড. আম্বেদকর বলেন, সকলেই ভগবানের জীব। এই সব ব্রাহ্মণ্যবাদী ধান্দাবাজির কথা এবার বন্ধ করতে হবে। অস্পৃশ্য এবং নিম্নবর্গের মানুষকে এটা প্রকাশ্যেই দাবি জানাতে হবে যে, আমরা আমাদের অধিকার চাই।
ড. আম্বেদকর দীর্ঘদিন একের পর এক গুরুত্বপূর্ণ কর্মসূচি রূপায়ণ করে ভারতে দলিত রাজনীতির মাত্রা সম্পূর্ণ বদলে দেন। এর আগে অস্পৃশ্যতা এবং দলিত রাজনীতি নিয়ে ভারতে সচেতনতার বিপুল ঘাটতি ছিল। সকলেই শ্রীহরির জীব এই জাতীয় আপ্তবাক্য সামনে রেখে ব্রাহ্মণ্যবাদীরা শোষণ করতেন। এর বিরুদ্ধে তাত্ত্বিক একটা অবস্থান নিয়ে একের পর এক আন্দোলন কর্মসূচিতে নেতৃত্ব দেন ড.আম্বেদকর। আমরা তার কয়েকটি তুলে ধরছি।
মন্দির প্রবেশ আন্দোলন
সংবাদপত্রে ঘোষণা করা হয়, তৎকালীন বম্বের কাছে ঠাকুর দুয়ারের মন্দির সকলের জন্য খুলে দেওয়া হবে। এটা ১৯২৭ সালের জুন মাসের ঘটনা। আম্বেদকর মন্দির কমিটির সম্পাদককে ফোন করে মন্দিরে চলে আসেন। বর্ণহিন্দুদের সংগঠন তাঁকে ধাক্কা মেরে বার করে দিতে চেষ্টা করলে ড.আম্বেদকর রুখে দাঁড়ান। কিন্তু মন্দির কমিটির সম্পাদক হঠাৎই মত বদলে জানিয়ে দেন, উচ্চজাতির হিন্দুদের কথা শুনেই মন্দির চালাতে হবে। আম্বেদকরের পায়ের ছোঁয়ায় মন্দির অপবিত্র হয়েছে, অতএব শুদ্ধীকরণের যজ্ঞ হয়। এই সময় আম্বেদকর মন্দির প্রবেশের অধিকার বিষয়ে বিস্তর লেখালিখি করেন। ১৯২৭ সালের ২১ আগস্ট মহারাষ্ট্রের অমরাবতীর অম্বাদেবী মন্দিরে প্রবেশের দাবিতে সত্যাগ্রহ শুরু হলে আম্বেদকর অংশগ্রহণ করেন। ১৯২৯ সালের অক্টোবর মাসে পুণার পার্বতী মন্দিরে সত্যাগ্রহ শুরু হয়। তবে বড়ো আন্দোলন গড়ে ওঠে নাসিকে। ১৯৩০ সাল থেকে ১৯৩৫ সাল পর্যন্ত নাসিকের বিখ্যাত কালেরাম মন্দিরে জোরালো আন্দোলন চলে। পাঁচ বছর মেয়াদি এই আন্দোলনে আম্বেদকর যোগ দেন। তবে একইসঙ্গে তিনি এ-ও বলেছিলেন, বিশ্বাসী মানুষ মন্দিরে প্রবেশের অধিকার পাবে এটা নিঃসন্দেহে আমরা চাই। কিন্তু শিক্ষা, সংস্কৃতি, অর্থনৈতিক অধিকার, রাজনৈতিক অধিকার এগুলির দাবিতে আরও বড়ো আন্দোলন সংগঠিত করতে হবে।
এই সময় লোকমান্য বাল গঙ্গাধর তিলকের ছেলে শ্রীধরপন্থ তিলক আম্বেদকরের আন্দোলনে যোগ দেন। শ্রীধরপন্থ ছিলেন অত্যন্ত সুদর্শন এবং খুবই প্রতিভাবান এক যুবক। তিনি গায়কোয়াড় ওয়াড়াতে দলিত এবং অস্পৃশ্য গায়কদের মহাসম্মেলনের ডাক দেন। ট্রাস্টি সদস্যরা রুখে দাঁড়ালেও শ্রীধরপন্থ তাঁদের বক্তব্যে কান দেননি। বরং ওই বিখ্যাত হলে চা-চক্রে ড.আম্বেদকরের সঙ্গে চা-জলখাবার খান। গোটা মহারাষ্ট্র জুড়ে আলোড়ন সৃষ্টি হয়। দুর্ভাগ্যের বিষয়, খুবই কম বয়সে প্রায় বিনা রোগে শ্রীধরপন্থ হঠাৎই মারা যান। বর্ণহিন্দুদের একাংশ প্রচার শুরু করে ব্রাহ্মণ হয়ে নিচু জাতকে মাথায় তোলার চেষ্টা করার পাপে শ্রীধরপন্থের প্রাণ গেল!
মাহার জাতির আবেগ জড়িয়ে ছিল চৌদার জলাশয়কে ঘিরে। এই জলাশয়ের চারপাশে সশস্ত্র প্রহরী নিয়োগ করে বর্ণহিন্দুরা। বিপুল পুলিশবাহিনী নিয়োগ করা হয়। ১৯২৭ সালের ২৮ ডিসেম্বর দাশগাঁও পৌঁছোন ড.আম্বেদকর। তাঁর সঙ্গে ছিলেন ২০০ জন প্রতিনিধি। দশাগাঁওতে ৩ হাজার সত্যাগ্রহীদের সমাবেশে বক্তব্য রাখেন তিনি। এর পর ১০ কিলোমিটার পথ পেরিয়ে জলাশয়ের কাছে পৌঁছোন। পরিস্থিতির দ্রুত অবনতি হয়। হিংসা এড়াতে জলস্পর্শ করার কর্মসূচি থেকে বিরত থাকেন ড. আম্বেদকর। তবে রাত্রি ১০টায় অস্পৃশ্যদের এক বিরাট সম্মেলনে বক্তব্য রাখেন তিনি। এই সম্মেলনে প্রথম ৩ হাজারেরও বেশি অস্পৃশ্য পরিবারের মহিলা যোগ দেন। বক্তব্য রেখে ড. আম্বেদকর বলেন, বাড়ির ছেলে-মেয়েদের স্কুলে পাঠান। তাদের বই কিনে দিন। আপনাদের স্বামীরা মদ খেলে তাঁদের বলুন ওই পয়সা বইয়ের পেছনে খরচ করতে হবে। বই কেনার দাবিতে ঘরের মধ্যেই আনেআদালন শুরু করুন। নিজেরাও লেখাপড়া করুন।

মহাত্মা গান্ধীর দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠকে যোগ দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেন। প্রথম গোল টেবিল বৈঠকের সময় ফেডারেল স্ট্রাকচার কমিটি থেকে তাঁকে বাদ দেওয়া হয়। কিন্তু পরে তাঁকে ফের মনোনীত করা হয়। ১৯৩১ সালের ৬ আগস্ট গান্ধী তাঁকে হাতচিঠি লিখে জানান, আম্বেদকরের আপত্তি না থাকলে গান্ধীজি তাঁর বাড়িতে যাবেন। অসুবিধা না থাকলে আম্বেদকরও গান্ধীজি যেখানে রয়েছেন, সেখানে দেখা করতে পারেন। ড.আম্বেদকর তখন সাংলি জেলা থেকে ফিরেছেন। গায়ে প্রচণ্ড জ্বর। এর পর ১৪ আগস্ট গান্ধী এবং আম্বেদকরের বৈঠক হয়। গান্ধীজি বলেন, কংগ্রেস সম্পর্কে আপনার অভিযোগ শুনতে চাই। কংগ্রেস অন্তত ২০ লক্ষ টাকা খরচ করেছে অস্পৃশ্যদের কল্যাণে। কিন্তু আপনার মতো মানুষ কংগ্রেসের বিরোধিতা করছেন। ড.আম্বেদকর বলেন, কংগ্রেস সমস্যার স্বীকৃতি দিয়েছে মাত্র, আপনাদের ওই অর্থব্যয়ও জলে গেছে। কংগ্রেসের সদস্য পদ পেতে খদ্দর পরা যেমন বাধ্যতামূলক, তেমন অস্পৃশ্যতার বিরোধিতা করা বাধ্যতামূলক হবে না কেন? কংগ্রেসের জেলা সভাপতি, রাজ্য সভাপতি এঁদের কি আপনি বলতে পারেন নীচু জাতের সদস্যদের বাড়ি গিয়ে সামান্য জল, মিষ্টি খেতে? আলগা-আলগা বিরোধিতা করবো, আর যখন পরিস্থিতি ভয়াবহ হবে তখন কংগ্রেস চিৎকার করবে, এটা হয় না। আম্বেদকর গান্ধীজিকে সরাসরি বলেন, অস্পৃশ্য এবং দলিতরা বর্ণহিন্দু এবং কংগ্রেসকে বিশ্বাস করে না। আর শুনুন, এদেশে মহাত্মারা দ্রুতগামী অশ্বে এসেছেন, ধুলো উড়েছে, আবার মিলিয়েও গেছে। অস্পৃশ্যরা যে তিমিরে পড়েছিলেন সেখানেই আছেন। আপনাদের দলের ছোটো-বড়ো বিভিন্ন নেতারা সুযোগ পেলেই বিভিন্ন মন্দির ট্রাস্টের মাথায় বসেন। এবং বর্ণহিন্দুদের সংগঠনে নেতৃত্ব দেন। এভাবে অস্পৃশ্যতা বিরোধিতা করা যায় না। মহাত্মাজি আপনি শুনুন, আমার কোনও স্বদেশ নেই। আমি সে অর্থে জাতীয়তাবাদীও নই। কারণ, জাতীয়তাবাদ পিছিয়ে পড়া মানুষের কতটা উপকার করেছে, এই নিয়ে আমার সন্দেহ আছে।
১৯৩১ সালে লন্ডনে দ্বিতীয় গোলটেবিল বৈঠক শুরু হয়। আম্বেদকর পৌঁছোন ২৯ আগস্ট। ফেডারেল স্ট্রাকচার কমিটিতে বক্তব্য রেখে ড. আম্বেদকর বলেন, ফেডারেশনে যোগদান করার আগে অঙ্গরাজ্যগুলোকে প্রমাণ করতে হবে যে, নাগরিকদের ন্যূনতম নাগরিক অধিকার ও সুযোগসুবিধা তাঁরা সুনিশ্চিত করবেন। আর ফেডারেল অ্যাসেম্বলিতে যাঁরা আসবেন তাঁরা অবশ্যই ভোটে লড়ে নির্বাচিত হবে। মনোনীত হলে চলবে না। ১৯৩২ সালের ২৮ ফেব্রুয়ারি মাদ্রাজে এক ঐতিহাসিক সমাবেশে বক্তব্য রাখেন ড.আম্বেদকর। অস্পৃশ্যদের এই সমাবেশে আদিবাসী মুসলিম, খ্রিস্টানরা তো এসে ছিলেনই, সেইসঙ্গে বর্ণহিন্দু সমাজের অপেক্ষাকৃত নিচু জাতের বড়ো সংখ্যক মানুষও যোগ দেন। আম্বেদকর ক্রমশ বৃহত্তর পরিসরে নেতৃত্বদান শুরু করেন।