ওঁ ত্র্যম্বকম যজামহে সুগন্ধিমপুষ্টিবর্ধনম।
উর্ভারুকবিভ বন্ধনান্মৃত্যৌমুশীয়মামৃতাত।।
মহারাষ্ট্রের পুনে থেকে প্রায় ১২৫ কিলোমিটার দূরে সহ্যাদ্রি পর্বতমালার ঘাট অঞ্চলে ভোরগিরি গ্রামে অবস্থিত ভীমাশঙ্কর জ্যোতির্লিঙ্গ। এই অঞ্চল থেকে ভীমা নদী উৎপত্তি হয়ে কৃষ্ণা নদীর সাথে মিলিত হয়েছে। কোন এক সময় এই স্থান ছিল মানুষের অগম্য। এটি ছিল মহারণ্য ও ডাকিনি-শাকিনীর বাস। ডাকিনীদের আবাসভূমি বলেই এই স্থান ডাকিনী ক্ষেত্র নামে পরিচিত। তাই এখানকার শিবের নাম “ডাকিন্যাং ভীমাশঙ্করম”।
ছত্রপতি শিবাজি, পেশোয়া বালাজি বিশ্বনাথ, রঘুনাথ এবং রাজারাম মহারাজের মতো ঐতিহাসিক ব্যক্তিবর্গ এই মন্দিরে যেতেন বলে জানা যায়। রঘুনাথ পেশওয়া এখানে একটি কূপ খনন করেছিলেন। পেশওয়ারের দেওয়ান, নানা ফড়নবীস (বালাজি জনার্দন ভানু) এই মন্দিরের সংস্কার করেন। ১৪৩৭ খ্রিস্টাব্দে চিমানজি আন্তাজি নায়েক ভিন্ডে নামে একজন পুনের ব্যবসায়ী বা সাহুকার মন্দিরের একটি দরবার হল তৈরি করেছিলেন।

ভীম শঙ্করের মন্দিরটি হেমাদপন্থী রীতিতে নির্মিত। এটি দশাবতার মূর্তি দিয়ে সজ্জিত। এগুলো দেখতে খুবই সুন্দর। মূল মন্দিরের কাছেই নন্দী মন্দির। ৫ মণ ওজনের একটি বিশাল ঘণ্টা মন্দিরের কাছে অবস্থিত। এটিতে ১৭২১ খ্রিস্টাব্দ লেখা আছে। যখন এই ঘণ্টা বাজানো হয়, তখন এর শব্দ সমগ্র স্থান জুড়ে প্রতিধ্বনিত হয়।
প্রতিদিন রুদ্রাভিষেক, পঞ্চামৃত স্নানের মাধ্যমে ভীমশঙ্করের পূজা করা হয়। সোমবারের পাশাপাশি অন্যান্য দিনেও এখানে প্রচুর ভক্তের সমাগম হয় দর্শনের জন্য। মহা শিবরাত্রি উৎসবে একটি বড় উৎসব (মেলা) হয়। এখানকার প্রাকৃতিক নৈসর্গিক সৌন্দর্য দৃষ্টি আকর্ষণীয়।
ভীমাশঙ্কর জ্যোতির্লিঙ্গের সাথে বিভিন্ন কিংবদন্তি জড়িত। একটি কিংবদন্তি অনুসারে, ত্রিপুরাসুর নামক এক রাক্ষস ভগবান শিবকে খুশি করার জন্য ভীমাশঙ্কর জঙ্গলে তপস্যা করেছিলেন এবং তাঁর কাছে অমরত্বের উপহার চেয়েছিলেন। ভগবান শিব তাঁর ভক্তিতে খুশি হয়েছিলেন এবং এই শর্তে তাঁকে অমরত্ব দিয়েছিলেন যে তিনি স্থানীয় লোকদের সাহায্য করার জন্য তাঁর শক্তি ব্যবহার করবেন। ত্রিপুরাসুর তার সাথে একমত হলেন। অমরত্ব পাওয়ার পর, সময়ের সাথে সাথে তিনি তার প্রতিশ্রুতি ভুলে যান এবং মানুষ এবং দেবতার উপর অকথ্য অত্যাচার শুরু করেন।

অসহায় দেবতারা ভগবান শিবের কাছে ছুটে যান এই অন্যায়, বিশৃঙ্খলা বন্ধ করার জন্য। তখন ভগবান শিব তাঁর সহধর্মিণী দেবী পার্বতীর সঙ্গে অর্ধনারীশ্বর রূপে আবির্ভূত হন এবং কার্তিক পূর্ণিমার দিন ত্রিপুরাসুরকে হত্যা করে এখানে শান্তি স্থাপন করেন। কার্তিক পূর্ণিমাকে তাই ত্রিপুরারি পূর্ণিমাও বলা হয়।
ত্রিপুরাসুরের মৃত্যুর পর তাঁর দুই স্ত্রী ডাকিনি-শাকিনী ছুটে আসেন মহাদেবের কাছে তাদের অস্তিত্বের জন্য। ভগবান শিব তখন অভয় দেন তাদের রক্ষা করার এবং সেখানে জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে বিরাজমান হন। তাই এই লিঙ্গের নাম ‘ডাকিন্যাং ভীমাশঙ্করম।’

অন্য একটি কিংবদন্তি অনুসারে, ডাকিনী বন ছিলো দানবদের রাজ্য। এখানকার রাজা ছিলেন কুম্ভকর্ণ, তবে ইনি রামায়ণের নন। সেই অঞ্চলে কুম্ভকর্ণ রাজত্ব করে বনাঞ্চল কাঁপিয়ে বেড়াতো এবং প্রবল অত্যাচার করত আশেপাশে গ্রামগুলোতে। ওই প্রদেশেই প্রিয়ধর্ম নামে এক ধার্মিক রাজা ছিল, সে অনেক চেষ্টা করে কুম্ভকর্ণকে বধ করেন। কুম্ভকর্ণ-এর মৃত্যু সংবাদ পাওয়া মাত্রই তার পুত্র ভীম প্রতিশোধ স্পৃহা নিয়ে নানাস্থানে ঘুরতে ঘুরতে সহ্যাদ্রি পর্বতমালার এক মনোরম পরিবেশে উপস্থিত হন যেখানে রাজা প্রিয়ধর্ম শিবের ধ্যানে মগ্ন ছিলেন। এদিকে ভীম তার পিতার হত্যাকারীকে সামনে পেয়ে তরবারি দিয়ে রাজাকে দ্বিখন্ডিত করতে গেলে, হঠাৎই সেই শিবলিঙ্গ থেকে জ্বালাময় অগ্নিশিখা বেরিয়ে এসে জ্বালিয়ে দিল ভীমকে। অগ্নিতে দগ্ধ হতে হতে ভীম চিত্কার করলে ধ্যানভঙ্গ হয় প্রিয়ধর্মের।
ধ্যানভঙ্গ হওয়ার পর তিনি দেখলেন তার সামনে দাঁড়িয়ে স্বয়ং দেবাদিদেব এবং পাশেই পড়ে রয়েছে ভীম দৈত্যের ভস্ম। প্রিয়ধর্ম তখন দেবাদিদেবের চরণে লুটিয়ে পরে বললেন, ‘হে প্রভু, তোমার দর্শন পেয়ে আমি ধন্য। তবে যেভাবে তুমি আমাকে এই মহাশত্রুর হাত থেকে রক্ষা করলে, ঠিক সেই ভাবেই তুমি এই অঞ্চলকে রক্ষা করো। এখানে তোমার অগ্নিজ্যোতির প্রকাশ হোক।’

তথাস্তু বলে মহাদেব সেখানেই জ্যোতির্লিঙ্গ রূপে চিরকালের জন্য অবস্থান করলেন। ভীম দৈত্যের সংহারকারী বলে সেই থেকেই জ্যোতির্লিঙ্গের নাম হলো ভীমাশঙ্কর।
মন্দিরের শুরুতেই একটি বিশাল নন্দীর মূর্তি রয়েছে। মন্দিরের সিঁড়ি বেয়ে কয়েক ধাপ নামলেই মন্দিরের সুরম্য চূড়া নজরে পড়বে। মন্দির প্রাঙ্গণ থেকে ফুল, বেলপাতা, এলাচদানা কিনে ভক্তরা ভীমাশঙ্করকে পুজা দেন।
মোক্ষ কুন্ড — ভীমাশঙ্কর জ্যোতির্লিঙ্গ এবং আশেপাশের মন্দিরগুলিতে দর্শন করার পরে এটি দেখার জন্য প্রথম স্থান। স্থানটি মূল ভীমাশঙ্কর মন্দির থেকে ৫০০ মিটার দূরে। এখানে ঋষি কৌশিক দীর্ঘ তপস্যা করেছিলেন।

কমলাজাদেবী মন্দির — কমলাজাদেবী মন্দিরে দেবী কমলাজা রয়েছেন যিনি ভগবান শিব এবং ত্রিপুরাসুরের মধ্যে যুদ্ধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন। কথিত আছে যে ভগবান ব্রহ্মাও কমলাজাদেবীকে পদ্মফুল দিয়ে পূজা করতেন।
এছাড়াও এখানে একটি শনি মন্দির, সাক্ষী বিনায়ক মন্দির আছে। আছে আরেকটি কুণ্ড ও হনুমান ঝিল। আর এখানকার ‘নাগফণী পয়েন্ট’ থেকে প্রকৃতির অপূর্ব দৃশ্য দেখলে মন মোহিত হয়ে যায়।
পুনে থেকে এই মন্দির দিনে ভালোভাবে দর্শন করে ফিরে আসা যায়। সমুদ্রপৃষ্ঠ থেকে ৩৫০০ হাজার ফুট উপরে ভীমাশঙ্কর সারা বছরই অ্যাক্সেসযোগ্য, বর্ষাকালের পরে আগস্ট থেকে ফেব্রুয়ারীতে এটি পরিদর্শন করার উপযুক্ত সময়। শীতের মাসগুলিও এখানে ভ্রমণের জন্য উপযুক্ত সময়।

গুপ্ত ভীমাশঙ্কর জ্যোতির্লিঙ্গ
ভীমাশঙ্করকে বন্যপ্রাণী অভয়ারণ্য হিসেবে ঘোষণা করা হয়েছে; এটি একটি সংরক্ষিত বনাঞ্চল, এবং এটি পশ্চিমঘাটের অংশ হওয়ায়, এটি উদ্ভিদ ও প্রাণীজগতে সমৃদ্ধ।মহারাষ্ট্রের মালাবার জায়ান্ট স্কুইরেল এখানে পাওয়া। এটি একটি বিরল প্রাণী।
এছাড়াও ঘন বনে প্যান্থার, সাম্বার, ইঁদুর, হরিণ, হায়না এবং বন্য শূকর দেখা যায়।
জানলাম শিখলাম আলোকিত হলাম শিবালোকে*
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে।
পড়ে খুব ভালো লাগলো????????????
থ্যাঙ্ক ইউ।