অস্ত্রশস্ত্রের কাঁটাবেড়া দিয়ে যাঁরা আপন স্বত্ত্বকে স্থায়ী করার দুরাশা মনে লালন করেন, একদিন কালের আহ্বানে যে মুহূর্তে তাঁরা নেপথ্যে সরে দাঁড়ায়, তখনই ইটকাঠের ভগ্নস্তূপে পুঞ্জীভূত হয় তাঁদের কীর্তির আবর্জনা। আর যাঁরা সত্যের বলে বিজয়ী তাঁদের আধিপত্য তাঁদের আয়ুকে অতিক্রম করে দেহের মর্মস্থানে বিরাজ করে। দেশের সমগ্র চিত্তে যাঁরা এই অধিকার, তাঁকে বারবার স্মরণ করতে হয়। আমরা বলছি আম্বেদকরের চিন্তাভাবনার প্রাসঙ্গিকতার কথা।কোন দুরূহ বাঁধা তিনি দূর করতে চেয়েছিলেন, যার জন্য তাঁর আজীবনের সংগ্রাম — সেটি আজও ভাবায় আমাদের।
পৃথিবীময় মানব ইতিহাসের আরম্ভকাল থেকে দেখা যায় এক দল মানুষ আর এক দলকে নীচে ফেলে, তার ওপর দাঁড়িয়ে নিজের উন্নতি প্রচার করছে। আপন দলের প্রভাবকে প্রতিষ্ঠিত করে অন্য দলের দাসত্বের ওপরে। মানুষ দীর্ঘ কাল ধরে এই অমানুষিক কাজ করে এসেছে। তাই দাসনির্ভরতার ভিত্তির ওপরে মানুষের ঐশ্বর্য সথায়ী হতে পারে না। এতে যে কেবল দাসেদের তথা দুর্বলদের দুর্গতি হয় তাই নয়, প্রভুদেরও বিনাশ ঘটে। এর প্রভাবে মানুষের সভ্যতা রোগে জীর্ণ হয় — এই কথা অনুভব করেছিলেন। ভীমরাও আম্বেদকর। তাঁর চিন্তাভাবনা আজ যে ভাবে প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে, স্বাধীনতার পরে বোধ হয় সেটা ভাবা যায়নি। ভারতের নিম্নবর্গের চোখে আম্বেদকর দ্রুত এক জাতীয়তাবাদী প্রতিকে পরিণত হচ্ছেন। নিম্নবর্গের মানুষ তাঁদের জীবন সংগ্রামে আদর্শগত শক্তি ও প্রেরণার জন্য বাবাসাহেবের শরণ নিচ্ছেন। দলিতদের মুক্তির জন্য, সমাজের মূলস্রোতে তাঁদের সসম্মান ভূমিকা অর্পণের জন্য আম্বেদকরের প্রবল আগ্রহ ও সংগ্রাম স্বভাবতই বিশেষ প্রাসঙ্গিক হয়ে উঠছে।

একটি উদার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থা সচল রাখার তিনটি শর্ত চিহ্নিত করেছিলেন তিনি। সেগুলি হলো — হিংসা বর্জন করা এবং জনসাধারণের ক্ষোভবিক্ষোভের মোকাবিলার জন্য সাংবিধানিক পদ্ধতির আশ্রয় নেওয়া, রাজনৈতিক গণতন্ত্রের সঙ্গে সামাজিক-অর্থনৈতিক গণতন্ত্রের সমন্বয় ঘটানো। তাঁর কাছে গণতন্ত্র কেবল নাগরিক এবং রাষ্ট্রের সম্পর্ক নয়। তিনি মনে করতেন গণতন্ত্র হলো ‘সংশ্লিষ্ট জীবনের একটি রূপ’, ‘সমন্বিত সংযোগের এক অনুশীলন’, এবং ‘সহনাগরিকদের প্রতি শ্রদ্ধা ও সম্মানের এক মানসিকতা’। এগুলিই গণতন্ত্রের স্বভাবধর্ম। যে ধর্ম সামগ্রিক কল্যাণের জন্য বিভিন্ন বর্গের মানুষের পারস্পরিক সম্পর্ককে বিশেষ মূল্য দেয়। যে কোনো সঙ্কটের মুখে দাঁড়িয়ে আম্বেদকরের এই গণতন্ত্র-ভাবনা আমাদের মূল্যবান পাথেয় হতে পারে।
মুক্ত চিন্তা ও নির্ভিক বিচারবুদ্ধির বিকাশই যে শিক্ষার প্রধান লক্ষ্য হওয়া উচিত, সেটা আম্বেদকর জোর দিয়ে বলেছেন। লক্ষণীয়, তিনি চেয়েছিলেন, স্কুল শিক্ষার পরেই ছেলেমেয়েরা আইন পড়ুক। সাংবাদিকতা বিষয়েও তাঁর স্বচ্ছ চিন্তা ছিল। তিনি মনে করতেন সাংবাদিকরা যেন সামাজিক ন্যায়ের মুখপাত্র হয়ে ওঠেন। ‘মূক নায়ক’, ‘বহিষ্কৃত ভারত’, ‘সমতা’ বা ‘জনতা’-র মতো পত্রপত্রিকার সঙ্গে তাঁর সংযোগ ছিল। সৃষ্টিশীল সাংবাদিকতাতে তাঁর অবদান ভোলার নয়। সুযোগ-বঞ্চিত মানুষের হাতে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার প্রতি আম্বেদকরের আগ্রহ তাঁকে মেয়েদের অধিকার ও মুক্তির এক প্রবক্তা হয়ে ওঠার প্রেরণা দিয়েছিলেন। স্ত্রীশিক্ষা প্রসারের পাশাপাশি তিনি চেয়েছিলেন আত্মমর্যাদার দাবিতে মেয়েরা সংগঠিত হোক, সক্রিয় হোক। ১৯২৮ সালের জানুয়ারি মাসে মুম্বইয়ে রমাবাইয়ের তৈরি একটি নারী সংগঠনের প্রেসিডেন্ট হয়েছিলেন আম্বেদকরের স্ত্রী।

১৯৩০ সালে নাশিকে তাঁর আয়োজিত কালারাম মন্দির সত্যাগ্রহে প্রায় ৫০০ মহিলা যোগ দেন। তিনি মনে করতেন, আর্থিক ভাবে স্বাবলম্বী হয়ে তবেই মেয়েদের বিয়ে দেওয়া উচিত। স্বামীর আজ্ঞাবহ এবং বহু সন্তানের জননী হয়ে জীবন কাটানো তাঁদের লক্ষ্য হতে পারে না। বাল্যবিবাহ এবং দেবদাসী প্রথার বিরোধিতায় তিনি ছিলেন মুখর। হিন্দু মেয়েদের সক্ষমতার স্বার্থে হিন্দু কোর্ডবিল প্রণয়নের জন্য জোরদার চেষ্টা চালিয়েছিলেন তিনি। আধুনিক ভারত বলতে তিনি যা বুঝতেন, সেটা কেবল জাতপাতের বৈষম্য দূর করাতেই সীমিত ছিল না, জাতীয় অর্থনীতি সম্পর্কে তাঁর চিন্তাও এ ক্ষেত্রে প্রাসঙ্গিক। ‘জার্নাল অব ইন্ডিয়ান ইকনমিক সোসাইটি’-তে ১৯১৮ সালে লেখা একটি প্রবন্ধে তিনি জানান, ‘কৃষিতে বিনিয়োগের পাশাপাশি সমবায় প্রথার চাষই সীমিত উপকরণে ফলন বাড়ানোর পথ।’ একই সঙ্গে তিনি শিল্প উন্নয়নের উপর জোর দিয়েছিলেন। তাঁর মতে দেশের মানুষের মাথাপিছু আয় বাড়ানোর সঙ্গে সঙ্গে কৃষির সামর্থ্য বৃদ্ধির জন্যও শিল্পের উন্নতি বিশেষ প্রয়োজন। অর্থনৈতিক উন্নয়নের জন্য বিদ্যুৎ, সড়ক, পরিবহণ, যোগাযোগ এবং সেচের উন্নতি আবশ্যক। বহুমুখী নদী পরিকল্পনার উপর বিশেষ জোর দেন তিনি। দেশের সুস্থায়ী উন্নয়নের দিশা খুঁজতে তাঁর এই চিন্তাধারা আজও মূল্যবান। আম্বেদকরের উন্নয়ন-চিন্তায় সামাজিক ন্যায়ের খুব বড় জায়গা ছিল। তিনি চেয়েছিলেন, শিল্পায়ন হোক একটি ‘সামাজিক ভাবে কাম্য’ স্তরে এবং সমস্ত জনগন দেশের শিল্পসম্পদের অংশীদার হোক। শ্রমিক কল্যাণের কথাও তিনি গুরুত্ব দিয়ে ভেবেছিলেন। ভাইসরয়ের কাউন্সিলের সদস্য হিসেবে তিনি শ্রমিক-কর্মীদের সামাজিক নিরাপত্তা, ট্রেড ইউনিয়নের স্বীকৃতি এবং শ্রমবিরোধ নিষ্পত্তির আইনি ব্যবস্থার জন্য সওয়াল করেছিলেন। আজও শ্রমিক ও শিল্পমালিকদের মধ্যে গঠনমূলক কথোপকথনের পরিবেশ তৈরিতে তাঁর এই ধারণাগুলি প্রাসঙ্গিক। আম্বেদকর জানতেন, অর্থনীতিকে খোলা বাজারের হাতে ছেড়ে দিলে উন্নয়নের সমতা আসবে না। তাই তিনি চেয়েছিলেন একটি গণতান্ত্রিক ভাবে নির্বাচিত সরকার অর্থনীতির উপর সামাজিক নিয়ন্ত্রণ প্রতিষ্ঠা করবে।

আম্বেদকর-গবেষকরা বলেন, তাঁর চিন্তা ‘রাষ্ট্রীয় সমাজতন্ত্র’-এর ধারণাটির প্রতি অনুকূল ছিল, তা ‘স্টেটস অ্যান্ড মাইনরিটিজ’ গ্রন্থে স্পষ্ট। তিনি চেয়েছিলেন, জাতীয় উৎপাদন বন্টিত হোক জাতপাত ও মতাদর্শের বিচার না করে। আম্বেদকর বুঝেছিলেন, একটা উদার রাজনৈতিক ব্যবস্থা কায়েম রাখার জন্য সাক্ষরতার প্রসার চাই, এবং সমাজের বৃহত্তর অংশের মানুষকে নিয়ে আসা চাই উচ্চতর শিক্ষার পরিসরে। তিনি তাই স্লোগান তুলেছিলেন, ‘এডুকেট, অ্যাজিটেট অ্যান্ড অর্গানাইজ’ — শিক্ষিত করো, আন্দোলন গড়ে তোলো এবং সংগঠিত করো।তাঁর দাবি ছিল ছাত্রছাত্রীদের এমন ভাবে প্রশিক্ষণ দিতে হবে, যাতে তারা ‘সৃষ্টিশীল মন’-এর অধিকারী হতে হবে। তিনি বলেছিলেন, ‘শিক্ষার্থীকে এমনভাবে শিক্ষা দিতে হবে যাতে সে বিচার করতে শেখে কোনটা তথ্য এবং কোনটা অভিমত। তাকে শিখতে হবে, বিভিন্ন বিষয় কী ভাবে বিশ্লেষণ করতে হয়, প্রত্যেকটি প্রশ্নতে কী ভাবে, কোনো পূর্বনির্ধারিত তত্ত্বের মোহে আবিষ্ট না হয়ে তার নিজস্ব পরিপ্রেক্ষিতে যুক্তি দিয়ে বিচার করতে হয়। যার মত আমি একেবারেই মানি না, তার অবস্থানকেও সুষ্ঠু ভাবে, এমন কী সহানুভূতির সঙ্গে পেশ করতে জানার শিক্ষা অত্যন্ত মূল্যবান। একটি ধারণাকে মেনে নেওয়া বা নাচক করার আগে সেটা যাচাই করে দেখা, তার পরিণাম বিচার করা, এগুলি সুশিক্ষার গুরুত্বপূর্ণ অঙ্গ।’