কার্তিক মাসের অমাবস্যা তিথিতে হয় শ্যামা বা কালী পূজা। এর ঠিক আগের দিন পালন করা হয় ভূত চতুর্দশী। ভারতের নানান প্রান্তে একে বলা হয় নরক চতুর্দশী বা রূপ চতুর্দশী।
প্রচলিত বিশ্বাস অনুযায়ী, ভূত চতুর্দশীর রাতে আমাদের চোদ্দ পুরুষের আত্মা পরলোক থেকে নেমে আসেন মর্ত্যে। পঞ্চ ভূতে লীন হয়ে যাওয়া সেই চোদ্দপুরুষকে উৎসর্গ করে আমরা চোদ্দটি প্রদীপ জ্বালাই এবং চোদ্দ রকমের শাক খাই। হেমন্তের শুরুতে পোকার উপদ্রব দূর করতেও বাড়িতে চোদ্দ প্রদীপ জ্বালানো হয়।
ভূতচতুর্দশীকে কেন্দ্র করে রয়েছে একটি পৌরাণিক কাহিনি। স্বর্গ মর্ত্য ও পাতালের অধীশ্বর দানবরাজ বলির বড়ই অহংকার ছিল দানবীর হিসাবে। এক সময় সব দেবতারা তাঁর কারণে সন্ত্রস্ত হয়ে উঠেছিলেন। এমন সময় দেবগুরু বৃহস্পতি বিষ্ণুকে পরামর্শ দেন, বামন রূপে তাঁর কাছে পা রাখার জন্য মাত্র তিন পা জমি ভিক্ষা চাওয়ার জন্য। বিষ্ণু ঠিক তেমনটাই করেছিলেন। তবে অতিবিচক্ষণ বলি বুঝতে পেরেছিলেন যে, স্বয়ং বিষ্ণুই তাঁর কাছে এসেছেন। তবু বিষয়টা এতটুকুও বিষ্ণুকে বুঝতে দেননি তিনি। বিষ্ণুর কথামতো তিনি রাজি হলেন শুধু মাত্র কথা রাখতে। তখন বামনরূপী বিষ্ণু একটা পা রাখলেন স্বর্গে, আর একটা পা দিলেন মর্তে। তাঁর নাভি থেকে বের হল আরও একটি পা। এই পা তিনি রাখলেন রাজা বলির মাথায়। এর পর বলি ঢুকে গেলেন পাতালে। বলি জেনে বুঝেও জমি দান করেছিলেন বলে বিষ্ণু রাজা বলির নরকাসুর রূপের পুজোর প্রবর্তন করেন মর্ত্যলোকে।
কার্তিক মাসের চতুর্দশীতেই আবার জৈনদের ধর্মগুরু মহাবীর মোক্ষ লাভ করেছিলেন এবং শিখদের ষষ্ঠ গুরু হরগোবিন্দ-সহ বাহান্ন জন রাজা এ দিন মুঘলদের কারাগার থেকে মুক্তি লাভ করেছিলেন বলে সেই দিনটিকে স্মরণে রেখে জৈন ও শিখ এই দুই ধর্মের মানুষেরাও অন্ধকার আর অজ্ঞানতাকে দূরে সরিয়ে রেখে জ্ঞানের, সত্যের পথে জয়ের হেতু তাঁরাও আলোর উৎসবে শামিল হন।
ভূতচতুর্দশীকে ‘যম চতুর্দশী’ও বলা হয়। কারণ এই দিন চোদ্দজন যমের উদ্দেশ্যে তর্পণ করতে হয়। এই ১৪ জন যমরাজ হলেন, ধর্মরাজ, মৃত্যু, অন্তক, বৈবস্বত, কাল, সর্বভূতক্ষয়, যম, উডুম্বর, দধ্ন, নীন, পরমেষ্ঠী, বৃকোদর, চিত্র ও চিত্রগুপ্ত। ‘পদ্মপুরাণ’ অনুসারে এই তিথিতে গঙ্গাস্নান করলে আর নরকদর্শন করতে হয় না।
প্রদীপ জ্বালানো সম্পর্কে অন্য যে সমস্ত মতের প্রচলন আছে তার মধ্যে একটিতে বলা হয়— এই দিনে রামচন্দ্র চোদ্দো বছরের বনবাস কাটিয়ে অযোধ্যায় ফিরে এসেছিলেন। এত বছরের দুঃখের দিনের অবসানের আনন্দে এবং রামচন্দ্রকে স্বাগত জানানোর জন্য সমগ্র অযোধ্যবাসী প্রদীপ জ্বালিয়ে অযোধ্যা নগরীকে আলোকিত করে দিয়েছিল। সেই থেকে এই প্রথা চলে আসছে।
বাঙালির পাতে শাকের গুরুত্ব চিরকালীন। আমাদের দেশে শাককে গ্রহণ করা হয়েছে নিজস্ব খাদ্যসংস্কৃতির অঙ্গ হিসাবে। ধর্মীয় আচরণে শাকপাতাকে পূজোর অঙ্গীভূত করা হয়েছে।সেই জন্যই মা দূর্গার আরেক নাম শাকম্ভরী।
একটি প্রাচীন স্মৃতির গ্রন্থের অভিমত অনুযায়ী…
“ওলং কেমুকবাস্তূকং, সার্ষপং নিম্বং জয়াং।/ শালিঞ্চীং হিলমোচিকাঞ্চ পটুকং শেলুকং গুড়ূচীন্তথা।
ভণ্টাকীং সুনিষন্নকং শিবদিনে খাদন্তি যে মানবাঃ,/ প্রেতত্বং ন চ যান্তি কার্ত্তিকদিনে কৃষ্ণে চ ভূতে তিথৌ।”
এখানে বলা হয়েছে চোদ্দোটি বিশেষ রকমের শাক খাওয়ার কথা। চোদ্দো শাকে থাকে ওল, কেও, বেতো, কালকাসুন্দি, নিম, সরষে, শালিঞ্চা, জয়ন্তি, গুলঞ্চ, ভাঁটপাতা, পলতা, ঘেটু, হিঞ্চে, শুষুনী। অনুমান করা হয়ে থাকে, আগেকার দিনে যখন চিকিৎসা ব্যবস্থা এত উন্নত ছিল না, হেমন্তে ঋতুতে হালকা শীতের আগমনে মানুষের শরীরে রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা যাতে গড়ে ওঠে, তাই এই সময়ে মরসুমি চোদ্দো রকম শাকের রান্না খাওয়া হত। এই চোদ্দটি শাকের প্রত্যেকটির আলাদা আলাদা রোগ নিরাময়ের ক্ষমতা আছে।
চোদ্দ শাকের সঙ্গে ভূতদের কোন সম্পর্ক আছে কিনা তা জানা নেই, তবে অসুখবিসুখ রূপী ভূতকে দূরে সরিয়ে রাখার একটা প্রতীকী ব্যবস্থা হিসেবে এই চোদ্দ শাক খাওয়ার প্রথা চালু আছে। জেনে নেওয়া যাক চোদ্দ শাকের উপকারী দিকগুলো :
১. ওল শাক : চর্মরোগ, রক্ত আমাশা ইত্যাদি রোগের বিরুদ্ধে প্রতিরোধের ক্ষমতা রাখে। এতে আছে ফাইবার এবং অ্যান্টিঅক্সিডেন্ট, যা কোষকে ক্যান্সার প্রতিরোধে সাহায্য করে।
২. কেঁও শাক : কৃমিনাশক এবং হজমকারক। প্রাচীন কাল থেকে কেঁও পাতার নির্যাস জ্বর,হাঁপানী, জন্ডিস, ডায়রিয়া, রক্তাল্পতা ইত্যাদি রোগের চিকিৎসা হিসাবে ব্যবহার করা হচ্ছে।
৩. বেতো শাক : আয়ুর্বেদে এটি বাস্তুক শাক নামে পরিচিত। ইমিউনিটি বর্ধক।কোষ্ঠবদ্ধতা, কিডনি স্টোন, অম্বল ….প্রতিরোধক।
৪. কালকাসুন্দা শাক : অ্যান্টি অ্যালার্জিক, হুপিং কাশি ইত্যাদি চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয়।
৫. নিম : স্বাদে তেতো নিমপাতায় আছে জীবাণুনাশক ক্ষমতা। হম, বসন্ত, কুষ্ঠ সহ যেকোনো চর্মরোগ, জন্ডিস, বহুমূত্র ইত্যাদি রোগের ওষুধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়।
৬. সরিষা শাক : মানবদেহের চামড়া এবং চোখের পক্ষে অত্যন্ত উপকারী।
৭. শাঞ্চে শাক : ক্ষুধাবর্ধক হিসেবে পরিচিত।
৮. জয়ন্তী শাক : উদারাময়, বহুমূত্র,শ্বেতী,জ্বর ইত্যাদির বিরুদ্ধে কার্যকরী।
৯. গুলঞ্চ শাক : বাত,রক্তচাপ নিয়ন্ত্রণে সাহায্য করে।
১০ ভাট : ভাট পাতা ক্যান্সার দমনে সহায়ক এছাড়াও কৃমি, কোলেস্টেরল, ব্লাড সুগার ইত্যাদি রোগ নিরাময়ে সাহায্য করে।
১১. হিঞ্চে শাক : কথামৃতে উল্লেখ আছে, রামকৃষ্ণদেব পিত্ত নাশ করার জন্য হিঞ্চে শাক খাওয়ার কথা বলতেন। ভক্ষণে রক্তে হিমোগ্লোবিনের পরিমাণ বাড়ে এছাড়াও রক্তশোধক হিসেবে এর ব্যবহার অপরিসীম।
১২. শুষনি শাক : স্নায়ুতন্ত্রকে সুস্থ রাখে এটি নিদ্রাকারক, মেধা এবং স্মৃতিবর্ধক হিসেবেও ব্যবহৃত হয়।
১৩. পলতাশাক : এর শাক ও ফল পরিপাকতন্ত্রের যে কোনও রোগের পক্ষে উপকারী। এটি রক্তশোধক, লিভার ও ত্বকের রোগের পক্ষে খুবই ভালো।
১৪. ঘেটু শাক : এর পাতা, ফুল, কলি ইত্যাদি ঔষধ হিসেবে ব্যবহৃত হয়। কাটা স্থানে পাতার রস লাগলে সেরে যায়। চর্মরোগে খুব উপকারী।
কোন একটা অঞ্চলের মানুষের খাদ্যাভ্যাসের ধরন গড়ে ওঠে ওই অঞ্চলের ভূ-প্রকৃতি আবহাওয়া অনুযায়ী। আমাদের দেশে বিশেষ করে বাংলায় দরিদ্রতম মানুষটিও দিনান্তে অন্তত একবার শাকান্ন খেয়ে ক্ষুন্নিবৃত্তি করেন। শরৎকালে পর্যাপ্ত সূর্যালোকে শাক পরিপুষ্ট হয়। ঋতুবদলের সময় যে নানান রোগ ছড়ায়, তার দাওয়াই হচ্ছে এই শাক।
শুধুমাত্র ভূত চতুর্দশী উপলক্ষ্যে নয়, পরিমিত শাক খাওয়ার অভ্যাস গড়ে তুলতে পারেন রোজ ডায়েটের মধ্যে।