রবীন্দ্রনাথের প্রথম বিলেত ভ্রমণের অভিজ্ঞতার (১৮৭৮-এর সেপ্টেম্বর থেকে ১৮৮০-এর ফেব্রুয়ারি) যে তেরোটি চিঠি ‘য়ুরোপ-যাত্রী কোন বঙ্গীয় যুবকের পত্র’ নামে ‘ভারতী’তে (১২৮৬) ধারাবাহিক ভাবে বেরানোর পরে ‘য়ুরোপ-প্রবাসীর পত্র’ নামে সেগুলি গ্রন্থরূপ লাভ করে (১৮৮১)। সেটিই রবীন্দ্রনাথের প্রথম মুদ্রিত গদ্যগ্রন্থ। আত্মপ্রকাশের ক্ষেত্রে ভ্রমণের অভিজ্ঞতাকে এভাবে প্রকাশের মধ্যে তাঁর ভ্রমণপ্রকৃতির সজীবতা আপনাতেই সবুজ হয়ে ওঠে। সেখানে শুধু চলতি ভাষা প্রয়োগের আভিজাত্যেই বাংলা সাহিত্যে তার ভূমিকা নিঃশেষ হয়ে পড়ে না, ভ্রমণের বহুমাত্রিক প্রকাশের আধারে রবীন্দ্রনাথের সৃজনবিশ্বের পরিচয়েও তা মহার্ঘ হয়ে ওঠে। শুধু তাই নয়, বাংলা ভ্রমণসাহিত্যের অভিনব ধারা সৃষ্টিতেও তাঁর অনস্বীকার্য ভূমিকা বর্তমান। অন্যদিকে সেই ‘যাত্রী’ থেকে ‘প্রবাসী’তে স্থির হতে পারেনি।
১৮৯০-এ (১২৯৭-এর ভাদ্র মাসে/২৪ আগস্ট) দ্বিতীয়বারের বিলেত ভ্রমণে ‘প্রবাসী’ আবার ‘যাত্রী’ হয়ে ফিরে এল। তাঁর এবারের ভ্রমণের কথা ডায়েরি আকারে লেখা, ‘সাধনা’য় ‘য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি’ নামে ধারাবাহিক ভাবে প্রকাশিত। মাসদুয়েকের মধ্যেই ভ্রমণ শেষ হয়ে যায়। রবীন্দ্রনাথের সেই ভ্রমণের কথা দুই খণ্ডে ‘য়ুরোপ-যাত্রীর ডায়ারি’ (১২৯৮, ১৩০০)-এ বেরয়। চিঠিপত্র ও ডায়ারির আন্তরিক প্রকাশের মাধ্যমেই রবীন্দ্রনাথের সিংহভাগ ভ্রমণসাহিত্য প্রকাশিত। অবশ্য চিঠি বা ডায়ারির মাধ্যমে ভ্রমণকথা লেখার রেওয়াজ সেকালেও ছিল। শিবনাথ শাস্ত্রীর ‘ইংলণ্ডের ডায়েরী’ বা কেশব সেনের ‘Diary in England’ তাঁর পরিচয়। এছাড়া ‘উদ্বোধন’-এ প্রকাশের প্রথমদিকে স্বামী বিবেকানন্দের ‘পরিব্রাজক’-এর নাম ছিল ‘বিলাত যাত্রীর পত্র’। অন্যদিকে ১৯১২-তে (১৫ মে) তৃতীয়বার বিদেশ ভ্রমণের সময় রবীন্দ্রনাথ নিয়মিত ভ্রমণবৃত্তান্ত লেখার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন। সেবার রবীন্দ্রনাথ য়ুরোপের সঙ্গে আমেরিকাতেও গিয়েছিলেন। ইলিনয়, বস্টন, হার্ভার্ড, শিকাগোও ঘুরে এসেছেন।

শান্তিনিকেতনে আশ্রম বিদ্যালয়ে পাঠিয়ে দেওয়ার প্রতিশ্রুতিতে লেখা সেই ভ্রমণবৃত্তান্তই তাঁর ‘পথের সঞ্চয়’ (১৯১২)। সেখানে প্রচলিত ভ্রমণবৃত্তান্ত নেই, আছে তাঁর চলার আনন্দের কথাই। অন্যদিকে ১৯১৩-এর নভেম্বরে নোবেল পুরস্কার প্রাপ্তিতে স্বাভাবিকভাবেই বিদেশ ভ্রমণের আমন্ত্রণে আয়োজনের চেয়ে প্রয়োজনের যোগ নিবিড় হয়ে আসে। তার ফলশ্রুতিতে যে-সব ভ্রমণসাহিত্যের পরিচয় উঠে আসে, তাতেও চিঠিপত্র ও ডায়ারির ধারা অব্যাহত থাকে। প্রৌঢ় বয়সেও তাঁর বিদেশ ভ্রমণে স্বচ্ছন্দে বেরিয়ে পড়েছেন। শুধু তাই নয়, সুদীর্ঘ পথে একসঙ্গে একাদিক দেশভ্রমণের পাশাপাশি একদেশ অসংখ্যবার ভ্রমণেও ক্রমশ এগিয়ে গিয়েছেন তিনি। আমেরিকার আমন্ত্রণে সাড়া দিয়ে বেরানোর সিদ্ধান্ত নিলেন। কোন্ পথে যাবেন, তা নিয়ে ভাবনা কাটিয়ে অবশেষে জাপান হয়ে (১৯১৬-এর ৩ মে) আমেরিকায় গিয়ে (১৯১৬-১৪ সেপ্টেম্বর) আবার জাপানে ১৯১৭-এর জানুয়ারি) এসে কলকাতায় ফিরে এসেছেন (১৯১৭-এর মার্চ)। তাঁর সেই ভ্রমণের কথা পত্রাকারে লিখিত এবং সংকলিত হয়ে ‘জাপানযাত্রী’তে(১৯১৯) প্রকাশিত হয়। সেদিক থেকে গন্তব্যের চেয়ে পথের পরিচয়ই তাঁর ভ্রমণসাহিত্যে উঠে এসেছে। এজন্য ছোটা নয়, আনন্দে চলাই যে তাঁর ভ্রমণ, সেকথাও রবীন্দ্রনাথ স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন ‘জাপানযাত্রী’র চিঠিতে : ‘ছুটতে ছুটতে তাড়াতাড়ি দেখে দেখে বেড়ানো আমার পক্ষে ক্লান্তিকর এবং নিষ্ফল। অতএব আমার কাছ থেকে বেশ ভদ্ররকম ভ্রমণবৃত্তান্ত তোমরা পাবে না।’ অন্যদিকে এবারে আমেরিকা সফরে গিয়েছেন একজন নোবেলজয়ী কবি হিসাবে। সেখানে চল্লিশটি বক্তৃতা দেওয়ার চুক্তিতে আবদ্ধ হয়েছিলেন কবি। স্বাভাবিক ভাবে সেই ঝটিকা সফরে আমেরিকাকে তাঁর মতো করে পাওয়ার অবকাশ ছিল না।
চতুর্থবার বিলেত ভ্রমণে বেরিয়ে (১৪ মে ১৯২০) য়ুরোপের বিভিন্ন দেশ হয়ে আমেরিকায় থেকে আবার মধ্য য়ুরোপে ফিরে বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা করে চোদ্দ মাস পরে দেশে ফেরেন (১৯২১-এর ১৬ জুলাই)। ১৯২০-এর সেপ্টেম্বরে আমস্টারডামে বক্তৃতার সময় একজন শিল্পী কবিকে জাভা ও বালির ছবি দেখিয়ে সেই স্থানের প্রাচীন আভিজাত্যের প্রতি দৃষ্টি আকর্ষণ করেছিলেন। মূলত প্রাচীন ভারতের ইতিহাস সন্ধানে রবীন্দ্রনাথ তাতে সাড়া দিয়েই বছরছয়েক পরে ১৯২৭-এর ১৪ জুলাই-এ চারমাসব্যাপী দক্ষিণ-পূর্ব এশিয়া ভ্রমণে বেরিয়ে জাভা-বালিতে গিয়েছিলেন। ভ্রমণসঙ্গী হয়েছিলেন সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়, সুরেন্দ্রনাথ কর ও শ্রীধীরেন্দ্রকৃষ্ণ দেববর্মা। তারই ফসল তাঁর ‘প্রবাসী’তে প্রকাশিত ‘জাভা-যাত্রীর পত্র’। অবশ্য তার আগেই চীনের আমন্ত্রণ এসেছিল। কবিও ১৯২৪-এর ২১ মার্চ চিনযাত্রায় বেরিয়ে জাপান হয়ে দেশে ফিরেছেন (১৯২৪-এর ২১ জুলাই )। সেই জাপান থেকেই দক্ষিণ আমেরিকার পেরু যাবার আমন্ত্রণ পেয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। অবশেষে সে-বছরেরই ২৪ সেপ্টেম্বরে রবীন্দ্রনাথ পঞ্চমবার য়ুরোপ যাত্রার মাধ্যমে দক্ষিণ আমেরিকায় আর্জেন্টিনা থেকে ইটালি হয়ে দেশে ফিরে আসেন (১৯২৫-এর ১৭ ফেব্রুয়ারি )। সঙ্গে ছিলেন রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর। এই দক্ষিণ আমেরিকার ভ্রমণই তাঁর ‘প্রবাসী’তে প্রকাশিত ‘পশ্চিমযাত্রীর ডায়ারি’তে ধরা রয়েছে। পেরু ভ্রমণের পথে আর্জেন্টিয়ায় কবির আতিথ্যে এগিয়ে এসেছিলেন ভিক্টোরিয়া ওকাম্পো। তাঁর বাড়ির আশ্রয় আজ রবীন্দ্রস্মৃতিতীর্থ। অন্যদিকে য়ুরোপ থেকেও বক্তৃতার আমন্ত্রণ পেয়েছেন কবি।
১৯২৬-এর ১২ মে ষষ্ঠবার য়ুরোপ-যাত্রায় বক্তৃতা প্রদানের সূত্রে বিভিন্ন দেশে (ইটালি, সুইজারল্যাণ্ড, জার্মানি, নরওয়ে, সুইডেন, অস্ট্রিয়া, হাঙ্গেরি, যুগোশ্লাভিয়া, বুলগেরিয়া, রুমানিয়া, গ্রীস প্রভৃতি) ভ্রমণ করে মিশর হয়ে দেশে ফিরেছেন (১৯২৭-এর ১৮ ডিসেম্বর)। এবারে ভ্রমণে বিশেষ করে ইতালির ফ্যাসিস্ট শাসক মুসোলিনীকে কবির সমর্থন করা নিয়ে বিতর্ক ছড়িয়ে পড়ে। পরের বছরের (১৯২৮) মাঝামাঝি অক্সফোর্ড ইউনিভার্সিটি থেকে হিলবার্ট লেকচারের আমন্ত্রন পেয়েও কবি যেতে পারেননি। ১৯২৯-এ কানাডা থেকে বক্তৃতার আমন্ত্রণ পেয়ে ফেব্রুয়ারিতে কানাডা ভ্রমণে বেরিয়ে জাপান হয়ে জুলাই-এ দেশে ফেরেন। আবার পরের বছর ১৯৩০-এর মার্চে সপ্তমবার য়ুরোপ ভ্রমণে বেরিয়ে পড়লেন। এবারের ভ্রমণে চিত্রপ্রদর্শনীর সঙ্গে চলে বক্তৃতা প্রদান। ২ মে প্যারিসে তাঁর প্রথম চিত্রপ্রদর্শনী ঘুরে দেখলেন। ১৯, ২০ এবং ২৬ মে হিবার্ট বক্তৃতামালা দিলেন অক্সফোর্ডে। বার্মিংহাম, বার্লিন প্রভৃতিতেও চলে তাঁর চিত্রপ্রদর্শনী। বার্লিনে আইনস্টাইনের সঙ্গে সাক্ষাতে সামিল হন কবি। দুইবার ব্যর্থ হওয়ার পর এবার কবি রাশিয়ায় গেলেন। মস্কোতেও তাঁর চিত্রপ্রদর্শনী হয় (১৯৩০-এর ১৭ সেপ্টেম্বর)। অন্যদিকে রাশিয়ার ভ্রমণে মুগ্ধ রবীন্দ্রনাথের লেখনী থেকে বেরিয়ে আসে ‘রাশিয়ার চিঠি’ (১৯৩১)। তাতে তাঁর অকপট স্বীকারোক্তি, ‘না এলে এ জন্মের তীর্থদর্শন অত্যন্ত অসামাপ্ত থাকত।’

অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথ মস্কো থেকে বার্লিন হয়ে আমেরিকায় যাত্রা করেন। সেখানেও তাঁর মাসতিনেক(অক্টোবর-ডিসেম্বর) ধরে চিত্রপ্রদর্শনী চলে। অসুস্থ শরীর নিয়ে আমেরিকা থেকে লণ্ডনে দিন পনেরো থেকে দেশে ফেরেন (১৯৩১-এর ১৭ মাঘ) তিনি। আবার খড়দহের গঙ্গার তীরে বাস করার সময় পারস্য থেকে নিমন্ত্রণ আসে। সেই সত্তরোত্তীর্ণ শরীর নিয়েই বেরিয়ে পড়লেন (১৯৩২-এর ১২ এপ্রিল) কবি। ইরান ও ইরাকে মাসদুয়েক ভ্রমণ করে ১৯৩২-এর জুন-এ ফিরে আসেন দেশে। এবারের ভ্রমণ প্লেনে করে। এর আগে একবারই (১৯২১-এর ১৪ এপ্রিল) প্লেনে ভ্রমণ করেছিলেন কবি। গোলিয়েথ বিমানে বারো জন যাত্রীর সঙ্গে লণ্ডন থেকে প্যারিসে গিয়েছিলেন। সেদিক থেকে পারস্য ভ্রমণ রবীন্দ্রনাথের কাছে নতুন অভিজ্ঞতা বয়ে আনে। অনেক ওপর থেকে দেখা জগতের পরিচয় তাঁর পারস্য ভ্রমণের কথায় উঠে আসে। পারস্য ভ্রমণের কথা জানা যায় তাঁর ‘পথে ও পথের প্রান্তে’ (১৯৩৮) পত্র-সংকলনে। অন্যদিকে রবীন্দ্রনাথের শেষ বিদেশ ভ্রমণ ১৯৩৪-এ শ্রীলঙ্কায়। সেখানে গিয়েছিলেন নাচের দল নিয়ে। শ্রীলঙ্কার প্রাচীন ঐতিহ্য লোকনৃত্য, লোকশিল্প, প্রত্নসম্পদ প্রভৃতি দেখে মাসতিনেক (বৈশাখ থেকে আষাঢ়) কাটিয়ে জাফনা হয়ে মাদ্রাজে ফিরে আসেন তিনি। তার পরেও রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণে ইতি পড়েনি। বিদেশে ভ্রমণ শেষে তাঁর স্বদেশযাত্রা চলেছে বরাবর।
প্রথমাবধি রবীন্দ্রনাথের জীবনযাপনের মধ্যেই রয়েছে ভ্রাম্যমান অস্থিরতা। বিদেশভ্রমণের পাশাপাশি স্বদেশের প্রতি তাঁর আকর্ষণ কম ছিল না। এজন্য সময়-সুযোগে প্রায় সবসময়েই তাঁর ভ্রমণবিপাসু মনের পরিযায়ী প্রকৃতি দেশদেশান্তরে ছড়িয়ে পড়েছে। বিদেশের ভ্রমণের কথা সেখানে যাওবা লেখা হয়ে হয়েছে, স্বদেশের ভ্রমণ অতি সামান্য রচনাদিতেই আশ্রয় পেয়েছে। তাঁর দ্বিতীয় ভ্রমণরচনা ‘সরোজিনী প্রয়াণ’ (‘ভারতী’, শ্রাবণ,ভাদ্র,অগ্রহায়ণ ১২৯১) জ্যোতিরিন্দ্রনাথের স্টীমারে করে বরিশালে ভ্রমণের বিবরণ বর্তমান। শুধু তাই নয়, তার মধ্যে পেনেটির বাগানে ও পিতার সঙ্গে বোটে ভ্রমণে গঙ্গার রূপমাধুরীও যুক্ত হয়েছে। অন্যদিকে পরের বছর রবীন্দ্রনাথের আরও দুটি ভ্রমণবিষয়ক ছোট প্রবন্ধ প্রকাশিত হয়, ‘দশদিনের ছুটি’ ও ‘বরফ পড়া’। সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথের সৃজনবিশ্বে তাঁর ভ্রমণের ভূমিকা ক্রমশ নিবিড়তা লাভ করে। তাঁর প্রথমদিকের ছোটগল্প প্রয়াস ‘ঘাটের কথা’ ও ‘রাজপথের কথা’-এর মধ্যেও সেই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা আন্তরিক হয়ে উঠেছে। পদ্মাতীরে ভ্রমণের ফসল হিসাবে তাঁর ছোটগল্পের সোনালি ফসলের পূর্বেই গঙ্গার তীরের ফসল ফলেছে। সেদিক দেশের ভ্রমণবৃত্তান্ত স্বতন্দ্রভাবে প্রকাশের আভিজাত্য না পেলেও তার অস্তিত্ব রবীন্দ্রনাথের সৃজনবিশ্বে বিস্তার লাভ করে।
অন্যদিকে বিদেশ ভ্রমণের সঙ্গেই চলেছে তাঁর সৃজনের প্রবাহ। সেখানে ছোটগল্প ছাড়া সাহিত্যের প্রায় সব শাখাপ্রশাখা সবুজ হয়ে উঠেছে। ‘পূরবী’কাব্যের অনেকটাই (দক্ষিণ আমেরিকা ভ্রমণকালে), ‘লেখন’-এর অটোগ্রাফের পুরো কপি (হাঙ্গেরির বালাটনে), ‘যোগাযোগ’ উপন্যাসের মাঝের অংশ (দ্বীপময় ভারত ভ্রমণকালে), ‘চার অধ্যায়’ পুরোটাই (সিংহলের ক্যাণ্ডিতে) বিদেশে রচিত। কবিতা-গান-ছবি তো চলেইছে। সেক্ষেত্রে রবীন্দ্রনাথের বিদেশ ভ্রমণও তাঁর সৃজনবিশ্বে একাকার হয়ে গেছে। শুধু তাই নয়, তাঁর ভ্রমণসাহিত্যও তাঁর সৃজন সাহিত্যের অবিচ্ছিন্ন ধারা। সেখানে ভ্রমণের মহিমা ব্যঞ্জিত হয়নি, তাঁর অভিজ্ঞতাই আলোকিত হয়েছে। তরঙ্গবিক্ষুব্ধ সমুদ্র দেখানোর প্রয়াস তাঁর নেই। প্রশান্ত রত্নাকরের অন্তঃস্থলের মণিমুক্তোর হদিশেই তাঁর লক্ষ্য আন্তরিক হয়ে উঠেছে। সেখানে তাঁর ভ্রমণসাহিত্য ভ্রমণবৃত্তান্তে সীমাবদ্ধ থাকেনি, অসীমের ব্যঞ্জনায় সৃজন সাহিত্যে আবেদনক্ষম হয়ে উঠেছে। রবীন্দ্রনাথও সেভাবেই তাঁর ভ্রমণসাহিত্যকে আপনার করে তুলেছেন। ‘পথের সঞ্চয়’ থেকে ‘পথে ও পথের প্রান্তে’ এসে ঠেকেছে। তাঁর নামকরণের মধ্যেই প্রচলিত নামকরণের স্থানমহিমা বিজ্ঞাপিত হয়নি। ‘জাপান-যাত্রী থেকে ‘রাশিয়ার চিঠি’ কোথাও ভ্রমণের আবেদন মুখর হয়ে ওঠেনি। সর্বত্র তাঁর ভ্রমণের যাপনকে আপন করে নেওয়ার প্রয়াস।

আসলে তাঁর ভ্রমণরসিক প্রকৃতির স্বাভাবিকতাই তাঁকে অসাধারণ করে তুলেছে। সেখানে মনের চলনের কোনো স্থির আশ্রয় নেই। শান্তিনিকেতনে চল্লিশ বছরের জীবনেই একাধিক গৃহেই (‘দেহলি’, ‘দ্বারিক’, ‘কোণার্ক’ ‘উত্তরায়ণ’, ‘পুনশ্চ’, ‘শ্যামলী’, ‘উদীচী’ প্রভৃতিতে) বাস করেননি, একঘরেই আসবাবপত্রের স্থান পরিবর্তন করে চলেছেন নিরন্তর। অন্যদিকে দেশের বিভিন্ন স্থানে প্রিয় জায়গায় বারবার ছুটে গিয়েছেন আশ্রয়ের আনন্দে। সেখানে স্থায়ী আবাসনের মায়া তাঁর ছিল না, ছিল না তাঁর মধ্যে নির্জনতাবিলাস। মানুষের টানেই এবং মানুষকে সঙ্গী করেই তাঁর দেশদেশান্তরে বেড়িয়ে পড়া। অন্যদিকে ঘরের টানও তিনি অনুভব করেছেন স্বভাব-সহচরে। সেখানে অবশ্য আপাতভাবে দ্বন্দ্ব মনে হলেও সেই দ্বন্দ্ব তিনি সচেতনভাবেই স্বভাবসঙ্গত করে চলেছেন। এজন্য গৃহকাতরতার কথা বলেছেন অকপটে, পথেও নেমেছেন অবলীলায়। আবার সেই পথেই খুঁজে ফিরেছেন একান্ত আপন। দ্বিতীয়বারে বিলেত ভ্রমণে আরও ভালোভাবে ইউরোপকে আত্মস্থ করতে চেয়েছিলেন। সে স্বাদও স্বল্পকালেই মিটে যায়। আধুনিক সভ্যতাগর্বী মানসিকতায় গৃহবিচ্ছেদ প্রকৃতিতে সবুজ হয়ে ওঠা স্বচক্ষে দেখার অবকাশে রবীন্দ্রনাথ য়ুরোপের ইহলোক বিশ্বাসী জীবনপ্রকৃতির মধ্যে স্বদেশের পরলোকচেতনার কথাও অনুধাবন করেন। এতে য়ুরোপের ভোগের বিস্তারে যেভাবে চারিদিকে বিজ্ঞানের জয়যাত্রায় সেজে উঠেছে, সেখানে স্বদেশে পরলোকে প্রত্যাশী চেতনায় ইহলোকের ভোগীজীবন উদাসীন হয়ে পড়ে। এরূপ ধারণার পরেও রবীন্দ্রনাথের পর্যটক মনে ঘরে ফেরার টান তীব্র হয়ে ওঠে। সেখানে আর প্রবাসী হওয়ার অবকাশ মেলে না, মেলেনি আজীবন। সর্বত্র তাঁর পর্যটক মনের বিস্তার, যাত্রীর সচলতায় দূরগামী। সেখানে তাঁর সমুদ্রগামী নদীর মতো মহামানবসাগরে মিলিত হতে চেয়েছেন বারবার। (চলবে)
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।