রবীন্দ্রনাথের জীবনই ভ্রাম্যময়। শুধু তাই নয়, সেখানে প্রচলিত ভ্রমণের ধারণাই তাঁর ভ্রাম্যময় জীবনপ্রকৃতিতে মেলানো দায়। কেননা চলার অস্থিরতায় তাঁর স্থানিক সত্তাই নানাভাবে ভাবিয়ে তোলে। ভ্রমণের ক্ষেত্রে ঘর ছেড়ে বাইরের হাতছানিতে বেরিয়ে দূর দেশের অচেনা-অজানা পরিসরে নিজেকে খুঁজে ফেরার চেতনায় রবীন্দ্রনাথের নির্দিষ্ট ঘরকেই খুঁজে পাওয়া যায় না। জোড়াসাঁকো থেকে বোলপুর-শান্তিনিকেতন, আমেদাবাদ থেকে গাজীপুর, শিলাইদহ-পাতিসর-সাজাদপুর প্রভৃতি স্থানেই তাঁর ঘরের বিস্তার সারা দেশময়। সেক্ষেত্রে এক ঘর থেকে আরেক ঘরে ছুটে বেড়ানোকে তো ভ্রমণ বলা যায় না। আবার যেখানেই গিয়েছেন, সেখানেই নিজের ঘরকে যেমন বিস্মৃত হননি, তেমনই তাঁর ভ্রমণরসিকমানসে বাইরের নিত্যনতুন রূপমাধুরীকে খুঁজে ফিরেছেন। একদিকে ঘরের প্রতি তীব্র অনুরাগ, অন্যদিকে সুদূরের প্রতি তীব্র আকর্ষণ। এই দুই সত্তাতেই ভ্রমণরসিক রবীন্দ্রনাথের পরিচয় নানাভাবে আজীবন সজীব সচল ছিল। সেখানে খাঁচার পাখির আর্তি বনের পাখিতে মুক্তি পায়, আবার পরিশ্রান্ত বনের পাখির নীড়ে ফেরার আকুতিও নানাভাবে প্রকাশমুখর। অন্যদিকে তাঁর সর্বত্রবিহারী মনের কল্পনাভিসারে যেমন তাঁর সহজাত, তেমনই দেশান্তরে গিয়েও নিজের ঘর খুঁজে পাওয়ার স্বপ্নও তাঁর চোখে কাজল হয়ে উঠেছে।
বনেদি ঘরে চাকরবাকর পরিবৃত হয়ে শৈশবযাপনের মধ্যে তাঁর চার দেওয়ালের সীমানা সুদুরের তৃষ্ণায় তাঁকে উন্মনা করে তোলে। সেক্ষেত্রে তাঁর চঞ্চল মনে কল্পনায় আকাশের নীল দিগন্তের সীমানা অতিক্রম করা ছিল সহজাত। সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথের শৈশবের ঘরবন্দি জীবনও তাঁকে স্থানিক ভ্রমণের পাশাপাশি মানসভ্রমণেও সচল রেখেছিল। তাঁর ভ্রমণসাহিত্যের মধ্যেই সেই মানসভ্রমণের পরিচয় নানাভাবে উঠে আসে। ভ্রমণের বহুমাত্রিক চেতনাতেই রবীন্দ্রনাথের স্বচ্ছন্দ বিচরণ তাঁকে আজীবন সক্রিয় রেখেছিল। তাঁর ভ্রমণসাহিত্যের বাইরেও সুবিপুল সাহিত্যসম্ভারের মধ্যেও তার বিস্তার বর্তমান। সেদিক থেকে রবীন্দ্রনাথ তাঁর সৃজনবিশ্বে বিশ্ববিহারী, ভ্রমণবিশ্বে বিশ্বপথিক। তাঁর পথচলাতেই আনন্দ। সেই পথচলায় যখন প্রয়োজনের যোগ নিবিড় হয়ে উঠেছে, তখনও তাঁর স্বচ্ছন্দে চলার গতি রুদ্ধ হয়ে পড়েনি। তীব্র গতিতে দেশ থেকে দেশান্তরে ছুটে চলেছেন। সারা জীবন ধরেই তাঁর গতিশীল জীবনে ভ্রমণের বেগে আবেগ নিঃস্ব হয়ে পড়েনি, বিচিত্র জগতের প্রতি আসেনি অতৃপ্তিবোধ, বরং সীমার মাঝেও অধরা মাধুরীর প্রতি জেগে ছিল তীব্র তৃষ্ণার পরশ আজীবন।

সেখানে রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণরসিক মনটির চলনে কোনো স্থিরতা ছিল না। বলাকার মতো তাঁর চলন, চাতকের মতো তাঁর অতৃপ্তি। এমনকি, তাঁর ঘরের সাধ মেটেনি, বাইরের হাতছানি বিরতি দেয়নি। সেই ভ্রমণরসিক রবীন্দ্রনাথের পরিচয় এখনও অজানা খনির পরশমণি। সৃজনবিশ্ব থেকে মর্তপৃথিবীর সঙ্গে তাঁর নিবিড় যোগ। অথচ যোগসূত্রের অভাবে তাঁর ভ্রমণসাহিত্যের স্বতন্ত্র আভিজাত্য লাভ করেনি, সৃজনবিশ্বেও সেই ভ্রমণের যোগ আন্তরিক হয়ে ওঠেনি। শুধু তাই নয়, রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণরসিক প্রকৃতিও সেখানে আবেদনে সবুজ হয়ে ওঠার অবকাশ লাভ করেনি। অথচ তাঁর প্রকাশই আকাশ হয়ে ওঠে। সে আকাশের দিকে একবার দৃষ্টি ফেরানো প্রয়োজন। সেখানে যে অন্য রবীন্দ্রনাথের পরিচয় বর্তমান।
ভ্রমণরসিক রবীন্দ্রনাথকে শুধু তাঁর ভ্রমণসাহিত্যেই মেলে না, তার বিস্তার তাঁর সাহিত্যের নানা শাখা-প্রশাখায়। অন্যদিকে তাঁর সহজাত প্রকৃতিতে ভ্রমণের হাতছানি তাঁকে সক্রিয় করে রাখত। সেখানে তাঁর বেড়ে ওঠা, গড়ে তোলা জীবনে ঘর ও বাইরের অস্থিরতা আজীবন সচল ছিল। চল মন নিজ নিকেতনের খোঁজে তাঁর ভ্রাম্যমান জীবনই স্বাভাবিক হয়ে আসে। অথচ সেখানেও তাঁর সাধারণে অসাধারণ প্রকৃতি। বর্ণরঙিন পৃথিবীর উন্মুক্ত প্রকৃতির মুক্ত পরিবেশে নিজেকে খুঁজে পাওয়াই শুধু নয়, তার রূপসুধার প্রতি তীব্র অনুরাগে সাধারণ শিশুর মতোই তাঁর প্রকাশ আকাশ হয়ে ওঠে। সেকথা জানাতেও তাঁর শিশুসুলভ মনটির সবুজ মনে হয়। তাঁর ‘জীবনস্মৃতি’ই (১৯১২) তার সাক্ষ্য বহন করে। ছোটবেলা থেকে খাঁচাবন্দি জীবন থেকে মুক্ত আকাশে উড়ার জন্য ডানা ছটপট করত তাঁর। এগারো বছর বয়সে উপনয়নের (২৫ মাঘ, ১২৭৯/১৮৭৩)) পর টাক মাথায় বিব্রত রবিকে দেবেন্দ্রনাথ তাঁর সঙ্গে হিমালয় ভ্রমণের ইচ্ছের কথা জানতে চাইতেই তাঁর উত্তর : ‘চাই এই কথাটি যদি চীৎকার করিয়া আকাশ ফাটাইয়া বলিতে পারিতাম, তবে মনের ভাবের উপযুক্ত উত্তর হইত।’ পিতার সঙ্গে হিমালয় ভ্রমণে বেরিয়ে বালক রবি বোলপুর, অমৃতসর, ডালহাউসি দিয়ে বিচিত্র প্রকৃতির রূপাসুধা পানে অবিরত থাকার মধ্যেও সেই অতৃপ্ত মনের চলন অসাধারণ মনে হয় না। রেলের জানলা দিয়ে ছুটে চলা নিসর্গ-প্রকৃতির প্রতি বালকমনের অপলক ক্ষুধার মধ্যেও সেই স্বাভাবিক প্রকাশ।

আসলে জমিদারির বনেদিয়ানায় রবীন্দ্রনাথের জীবন অভিজাত হলেও তাঁর মননে ছিল বর্ণরঙিন পৃথিবীর মুক্তির হাতছানি যেখানে নিজেকে আপন করে পাওয়ার আয়োজন চলে অবিরত। এজন্য যেখানেই গিয়েছেন, সেখানেই নিজেকে খুঁজে ফিরেছেন। তাঁর এই আপন করে যাপন করার মধ্যেই রয়েছে অসাধারণত্ব। যেখানে অন্যদের মধ্যে ক্ষণিকের অথিতি হয়ে ভ্রমণের মধ্যে নিজেকে ছড়িয়ে দেওয়ার প্রবণতা বর্তমান, সেখানে রবীন্দ্রনাথ ছোটবেলা থেকেই তাঁর রসিক প্রকৃতিতে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার আনন্দ উপভোগে সদা তৎপর। অন্যদের ক্ষেত্রে ভ্রমণ প্রয়োজন, তাঁর কাছে ছিল আয়োজন। প্রয়োজনে আনন্দের যোগ বিলাসী হয়ে ওঠে, আয়োজনে তাই অপরিহার্য মনে হয়। সেখানে রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণে বিলাস ছিল না, ছিল নিজেকে বিকাশের আনন্দ। কতভাবেই না তিনি সেখানে নিজেকে খুঁজে ফিরেছেন, তার ইয়ত্তা নেই। হিমালয় ভ্রমণের পূর্বেও আট-নয় বছর বয়সে কলকাতায় ডেঙ্গুর ভয়ে পানিহাটি বা পেনেটি গিয়েছিলেন রবীন্দ্রনাথ। সেটা ছিল কলকাতা থেকে প্রথম বাইরে যাওয়া। সেখানেও তাঁর নিজেকে খুঁজে পাওয়ার সদিচ্ছা আন্তরিক হয়ে ওঠে। সেই পেনেটির বাগানবাড়িতে নিজেকে আপন করে পাওয়ার কথায় অকপট অভিব্যক্তি তাঁর ভ্রমণপ্রকৃতিকে প্রথমাবধি সবুজ করে তুলেছে। তিনি জানিয়েছেন : ‘এই প্রথম বাহিরে গেলাম। গঙ্গার তীরবর্তী যেন কোন পূর্বজন্মের পরিচয়ে আমাকে কোলে করিয়া লইল।’ প্রতিদিন নতুন করে পাওয়ার সেই বাগানবাড়ির স্মৃতি তিনি আজীবন শুধু স্মরণেই রাখেননি, আবার দেখার জন্য মুখিয়ে থাকতেন। পরিণত বয়সে (১৯১৯-এর মে মাসে) একবার গিয়েছিলেন সেখানে। রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণপ্রকৃতির মধ্যে এইরকম একান্ত আপন খুঁজে পাওয়া তাঁর স্বভাবজ। আর সেখানেই তাঁর সাধারণে অসাধারণ প্রকৃতি আপনাতেই সবুজে সজীবতা লাভ করে। যৌবন গড়িয়ে প্রৌঢ়ের দিকে এগিয়ে চলার পরিসরে লেখা ‘জীবনস্মৃতি’র শুষ্ক পাতাতেও তাঁর সেই ভ্রমণের কথা সবুজ হয়ে উঠেছে।
আসলে রবীন্দ্রনাথের ভ্রমণ ছিল তাঁর মনের সবুজের অভিযান। এজন্য বয়সের ভারে বা দায়িত্বের ধারে সেই অভিযান কখনো বিরত হয়নি। অক্লেশে পাড়ি দিয়েছেন দূর-দূরান্তে, পার হয়েছেন দীর্ঘ পথ। আপন বেগে পাগল পারায় যখন আয়োজন প্রয়োজনে মিলিয়ে গেল, তখনও রবীন্দ্রনাথ ভ্রমণপিপাসু মনে দেশদেশান্তরে ছুটে চলেছেন। ১৯১৩-তে নোবেল পুরস্কার পাওয়ার পরে সেই প্রয়োজনের যোগ ক্রমশ নিবিড় হয় ওঠে। এবার বিদেশ ভ্রমণের গতি স্বাভাবিক ভাবেই শ্রীবৃদ্ধি লাভ করে। সেই ভ্রমণের নেপথ্যে বিশ্বভারতীর জন্য অর্থসংগ্রহের দায় জুড়ে থাকুক না কেন, সেখানেও তাঁর দিগন্তবিস্তারী মনের চলনে কোনো ক্লান্তির ছায়া স্থায়ী হয়নি, অবসাদে বিরতি আনেনি। ১৮৭৮-এ ইংল্যাণ্ড থেকে ১৯৩৪-এ শ্রীলঙ্কা পর্যন্ত ছাপান্ন বছরের মধ্যে পাঁচটি মহাদেশের (অস্ট্রেলিয়া ও আন্টার্টিকা বাদে) তেত্রিশটির বেশি দেশ ঘুরেও তাঁর ভ্রমণ সচল থেকেছে আজীবন। বিদেশ ভ্রমণের বিরতি এলেও স্বদেশে ভ্রমণ ছিল তাঁর অবারিত। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য, দেশের প্রধান সব শহরগুলিতেই তাঁর ছিল অবাধ বিচরণের শ্রীক্ষেত্র। শুধু তাই নয়, সেখানে আত্মমর্যাদায় তাঁর শরীর ভারী হয়ে ওঠেনি, মনে আসেনি আলস্যবিলাস। প্রয়োজনের তাগিদে ভ্রমণের আয়োজনকে তাই তিনি আপন করে নিয়েছেন বারবার।

১৯৪০-এ প্রবৃদ্ধ রবীন্দ্রনাথ গরমের সময় দার্জিলিঙের পাহাড়ের শীতল আশ্রয় মংপু ও কালিম্পংয়ে ছুটে গিয়েছেন। শুধু তাই নয়, সেবছর সেপ্টেম্বরেও অসুস্থ শরীরে ডাক্তারের কথা অমান্য করেই কালিম্পংয়ে আশ্রয় নিয়েছেন কবি। সেখানে তাঁর আনন্দে ভাটা পড়েনি, আসেনি ক্লান্তির অবসাদ। কবি লিখেছেন, ‘আমার আনন্দে আজ একাকার ধ্বনি আর রঙ,/ জানে তা কি এ কালিম্পঙ?’ অসুস্থ শরীর নিয়ে শান্তিনিকেতনে ফিরে আবার কলকাতায় জোড়াসাঁকোয় ঘরে ফেরার জীবনবৃত্তে রবীন্দ্রনাথের আশি বছর মাসতিনেকের আবর্তনের মধ্যে তাঁর চিরসবুজ ভ্রাম্যমান প্রকৃতি নানাভাবেই প্রকাশমুখর। সেদিক থেকে তাঁর ভ্রমণসাহিত্য শুধুমাত্র বিদেশভ্রমণকে কেন্দ্র করেই আবর্তিত হয়েছে। শুধু তাই নয়, সেই ভ্রমণসাহিত্য অপূর্ণ, অবিন্যস্ত এবং বিক্ষিপ্ত-বিচ্ছিন্নভাবে লিখিত। সেখানে ভ্রমণবৃত্তান্ত স্বাভাবিকভাবেই অপ্রত্যাশিত। কেননা তা রবীন্দ্রনাথের স্বভাববিরুদ্ধ। অন্যদিকে যেটুকু ভ্রমণসাহিত্যের পরিচয় উঠে এসেছে, তার মধ্যেও তাঁর ভ্রমণরসিক মনকে চিনে নিতে অসুবিধা হয় না। সেখানেও রবীন্দ্রনাথের ক্রমশ উৎকর্ষমুখর প্রকৃতি লক্ষণীয়। সতেরো বছর বয়সে ১৮৭৮-এর সেপ্টেম্বরে তাঁর প্রথম বিদেশ ভ্রমণ। সেই ভ্রমণের অভিজ্ঞতা প্রকাশের মধ্যেও ছিল তাঁর স্বকীয় আভিজাত্যবোধ। সেখানে তাই তাঁর মনের চলনে আমিত্বের প্রকাশে আন্তরিক হয়ে উঠেছে। চিঠি বা ডায়েরির মাধ্যমে আন্তরিকতার পরশ ছড়িয়ে তার প্রকাশে ভ্রমণের মোড়কটিকে ভ্রমণবৃত্তান্তে আকৃষ্ট করায় সক্রিয় না হয়ে তাঁর অভিজ্ঞতাকেই নিবিড় করে তুলেছে। সেখানেও ভ্রমণের চেয়ে ভ্রমণকারীর অভিজ্ঞতাকেই আলোকিত করার প্রয়াসে স্বাভাবিক ভাবেই ‘জনৈক’র স্থলে ব্যক্তি পরিচয়ের আভিজাত্য ক্রমশ আন্তরিক হয়ে ওঠে।
লেখক : প্রফেসর, বাংলা বিভাগ, সিধো-কানহো-বিরসা বিশ্ববিদ্যালয়, পুরুলিয়া-৭২৩১০৪।