আমরা মহালয়ের দিন সকলেই নিজ নিজ বৈষয়িক কার্য্য হইতে অবসর লাভ করিয়া একটী গুরুতর কার্য্যে ব্যাপৃত থাকি। মহালয় শব্দার্থ কি ও অক্ষরার্থই বা কি, এইটী আমাদিগের সর্ব্বাগ্রে বক্তব্য হইয়াছে। মহালয় শব্দের অর্থ সৌরাশ্বিনের অপর পক্ষ। অর্থাৎ কৃষ্ণপক্ষ। লয় শব্দের অর্থ গতি অর্থাৎ সূর্য্যদেবের কন্যারাশিতে গমন। মহৎ শব্দের অর্থ পূজ্য। যেকালে সূর্য্যদেব কন্যারাশিস্থ হইলে বিশেষ গুরুতর কার্য্যের অনুষ্ঠান করিতে হয়, সেই পক্ষ বা কাল মহালয় শব্দে অভিহিত হয়।
আমরা এই মহালয়ে অর্থাৎ অপর পক্ষে আমাদিগের পরলোকগত পিতৃপুরুষদিগের উদ্দেশে তর্পণক্রিয়া করিয়া অমাবস্যার দিন শ্রাদ্ধকার্য্য সম্পাদন করিয়া থাকি। ইহা আমাদিগের একটী গুরুতর কার্য্য। তৃপ্তিসাধন ক্রিয়ার নাম তর্পণ। শ্রদ্ধাসহকারে পিতৃপুরুষদিগকে উদ্দেশ করিয়া তাঁহাদিগের অভীষ্ট দ্রব্য প্রদান করাকে শ্রাদ্ধ বলে। যাহাদিগকে আমরা পরম ভক্তি করি, যাহারা আমাদের পরম স্নেহাস্পদ, যাঁহার প্রণয়পাশে আমরা বদ্ধ, তাদৃশী প্রণয়িনীর অসদ্ভাবে আমাদিগের চিত্ত নিয়তই ব্যাকুলিত থাকে— কোন প্রকারে তাহাদিগের সদ্ভাব প্রতীতি হয়, ইহাই আমাদিগের একান্ত অভিলষণীয়। এই শ্রাদ্ধ তর্পণ কার্য্য কিয়ৎ পরিমাণে সেই সদ্ভাব প্রতীতি সম্পাদনের হেতু।
শ্রাদ্ধ বা তর্পণ কালে আমাদিগের মানসবেদিকায় তদ্রূপ ভক্তির, স্নেহের ও প্রণয়ের পরমাস্পদীভূত পদার্থের সাক্ষাৎকার লাভ করিয়া যে কি পর্য্যন্ত আনন্দানুভূতি হয়, তাহা বলিতে পারা যায় না। যাঁহাদিগের মানসবৃত্তি অতি তেজস্বিনী, তাদৃশ সাধুলোকদিগকে শ্রাদ্ধ তর্পণ কার্য্য সম্পাদনকালে গলদশ্রু দেখিতে পাওয়া যায়। যে জাতির হৃদয়ে এরূপ বিশ্বাস আছে যে, আমরা পরলোক গমন করিলে আমাদিগের ভক্তি, স্নেহ ও প্রণয়ভাজনের সহিত পুনর্ব্বার সাক্ষাৎ হইবে, ও তাহাদিগের সহবাসজনিত সুখ তথায় পুনর্ব্বার ভোগ করিব; শ্রাদ্ধ তর্পণাদি কার্য্য তাঁহাদের হৃদয়ে ঐরূপ বিশ্বাসকে বিলক্ষণরূপে বদ্ধমূল করিতে শিখায়।
আমরা সচরাচর লোকদিগকে পিত্রাদি গুরুজনের ও নিজ প্রণয়িনীর শ্রাদ্ধ তর্পণাদি কার্য্য করিতে দেখিতে পাই, কিন্তু পিতাকে কখনই পুত্রের তাদৃশ কার্য্য করিতে দেখিতে পাই না। পুরাণশাস্ত্রে নিমিরাজ নিজ পুত্রের বিয়োগে কাতর হইয়া তদুদ্দেশে ঐরূপ কার্য্য করিয়াছিলেন, এরূপ দেখা যায়। হৃদয়ে শোকাবেগ অত্যন্ত উচ্ছলিত হয় বলিয়া পুত্র-বিয়োগবিধুর পিতৃগণ এক্ষণে ঐরূপ কার্য্য হইতে বিরত হইয়াছেন, বলিয়া নির্দ্দেশ করা যাইতে পারে। যাহা হউক, এই শোকের সহিত সুখেরও বিশিষ্ট সংস্রব থাকে।
পিতৃপুরুষদিগকে নিত্য স্মরণ করিয়া তাঁহাদিগের তাৎকালিক বিদ্যমানতা উপলব্ধিপূর্ব্বক ভক্তিবৃত্তির প্রখরতা সম্পাদন ও অলৌকিক আনন্দানুভব করিবার নিমিত্ত আমাদিগের মধ্যে নিত্য তর্পণানুষ্ঠানের বিধি দেখিতে পাওয়া যায়। যাহারা নিত্য তর্পণ কার্য্যানুষ্ঠান না করিয়া থাকেন, তাঁহারা এই মহালয়োপলক্ষে তর্পণাদি কার্য্য করিয়া থাকেন। তর্পণ শ্রাদ্ধাদি কার্য্যের অবশ্যকর্ত্তব্যত্ব প্রতিপাদন জন্য সর্ব্বসাধারণের পক্ষে এই মহালয়ে তর্পণ শ্রাদ্ধের বিধিবিধান হইয়াছে। ফলতঃ কোন না কোন সময়ে আমাদিগের পিতৃপুরুষদিগকে স্মরণ করা কর্ত্তব্য, এইটীই শাস্ত্রকারদিগের অভিসন্ধি।
এমন কোন্ সহৃদয় ব্যক্তি পরলোকগত স্নেহময়ী জননী, পরমারাধ্য-ভক্তিভাজন-পুত্রবৎসল-পিতৃদেব, অভিন্নহৃদয়া-পতিপ্রাণা-প্রণয়িনী, নয়ন-রঞ্জন-মনোমোহন পরম স্নেহভাজন-অপত্য ইহাদিগকে একবারও স্মরণ না করিয়া থাকিতে পারে? যাঁহারা প্রচলিত নির্দ্দিষ্ট প্রণালী অনুসারে তর্পণাদি না করেন, তাঁহারাও কোন না কোন সময়ে তাঁহাদিগকে স্মরণ করিয়া ওই কার্য্যের প্রকারান্তরে অনুষ্ঠান করেন, তাহাতে কিছুমাত্র সন্দেহ নাই। যে জাতির চিত্তবৃত্তি অতি সরস ও স্নেহার্দ্র সেই জাতির মধ্যেই এই প্রথা প্রবর্ত্তিত আছে।
এই মহালয়া বা অপর পক্ষের পর দেবীপক্ষ। এই পক্ষে আনন্দময়ী শক্তিরূপা দশভুজা, মুক্তিরূপিণী দেবী ভগবতী মাতৃপিতৃভক্ত ভারত সন্তানদিগকে সন্দর্শন করিয়া থাকেন। তাঁহার সন্দর্শনে ভারত আনন্দময়, পরস্পরের প্রতি বিদ্বেষভাবশূন্য, সুতরাং একতাসম্পন্ন হয়।ভারতবাসী আর্য্যদিগের মধ্যে অপর পক্ষ ও দেবীপক্ষে যে সকল কার্য্যের অনুষ্ঠান দেখা যায়, তাহার একটী গুরুতর উদ্দেশ্য আছে। ভারতবর্ষবাসী আর্য্যদিগের এইরূপ প্রকৃতি যে, তাঁহারা রূপকদ্বারা কি মহত্তর কি সামান্য সকল বিষয়েরই বর্ণনা করিয়া থাকেন। পুরাণাদি শাস্ত্র পাঠ করিলে তাঁহাদিগের ঐরূপ প্রকৃতির বিলক্ষণ পরিচয় পাওয়া যায়। আমাদিগের পূর্ব্বাচার্য্যদিগের মত এই যে, আত্মজ্ঞানই মুক্তির কারণ।
আমরা কে— আমাদিগের পূর্ব্বপুরুষ কাহারা—পূর্ব্বপুরুষেরা কিরূপ জ্ঞান ও বিক্রমসম্পন্ন ও তাঁহারা কিরূপ সুখ সমৃদ্ধির অধিকারী ছিলেন—আমরা সেইরূপ আছি কি না, আমাদিগের অবস্থার কিরূপ পরিবর্তন হইয়াছে, ইত্যাকার আত্মজ্ঞান ঐ শ্রাদ্ধ তর্পণাদি কার্য্যদ্বারা সাধিত হয়। পিতৃপুরুষদিগকে স্মরণ করিতে গেলে সেই সঙ্গে তাঁহাদিগের মহত্তর অবস্থা ও তুলনায় আত্মীয় অবস্থা মানসপটে উদিত হয়। এইরূপ আত্মজ্ঞান হইলেই আনন্দময়ী মুক্তিরূপিণী দেবী ভগবতীর সন্দর্শন মাত্র হয়। তাঁহাকে লাভ করিতে হইলে পরস্পর বিদ্বেষভাব পরিত্যাগ করিতে ও একতাসম্পন্ন হইতে হয়। দেবীর দ্বিবিধা পূজা আছে। বৈদিকী ও তান্ত্রিকী। আমরা তান্ত্রিকদিগের পূজার উদ্দেশ্যই এ স্থলে ব্যক্ত করিলাম। ভারতবাসী আর্য্যেরা যদবধি অধীনতাশৃঙ্খলে বদ্ধ হইয়াছেন, তৎকাল পর্য্যন্ত তান্ত্রিক পূজার সৃষ্টি।
এমনই এক শরতে প্রায় ১৪৬ বছর আগে বর্তমান রচনাটি মুদ্রিত হয়েছিল ভূদেব মুখোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘এডুকেশন গেজেট ও সাপ্তাহিক বার্ত্তাবহ’ (১৬ আশ্বিন ১২৮২/১ অক্টোবর ১৮৭৫, পৃ.৩৮৮-৮৯) পত্রিকায় সম্পাদকীয় নিবন্ধরূপে। বাংলা প্রবন্ধসাহিত্যের বিশিষ্ট রূপকার উনিশ শতকের বাঙালি মনীষী ভূদেবের বহু অগ্রন্থিত রচনার ভেতর এটিও রয়ে গেছে। তাঁর ‘প্রবন্ধ সমগ্র’ (২০১০)-র অন্যতম সম্পাদক, কবি রঞ্জন বন্দ্যোপাধ্যায়ের নিজস্ব সংগ্রহ থেকে এটি প্রাপ্ত। তিনি জানিয়েছেন, ভূদেবের ‘বিবিধ প্রবন্ধ’ তৃতীয় ভাগ কখনো প্রকাশ পেলে হয়তো এটিও তার অন্তর্ভুক্ত হতে পারত। সেকালের বানানরীতি, শব্দসজ্জা সবই অটুট রইল পুনঃপ্রকাশে। সনাতন বিষয়টিও তাই প্রাসঙ্গিক আজকের স্মৃতিতর্পণে।
ভূদেব মুখোপাধ্যায় : ভূদেব মুখোপাধ্যায় (১২ ফেব্রুয়ারি ১৮২৫-১৫ মে ১৮৯৪, চুঁচুড়া) বিশিষ্ট লেখক এবং শিক্ষাবিদ। ভূদেব মুখোপাধ্যায় উত্তর কলকাতার ৩৭, হরীতকী বাগান লেনের বাড়িতে জন্মগ্রহণ করেন৷ হুগলী জেলার খানাকুল থানার অন্তর্গত নতিবপুর গ্রাম তাঁদের আদিনিবাস।