ভাবছেন এ কি! এটা তো একটা পুরোনো বেসিনের ছবি। এর আবার গল্প কি? ঠিক। এটাই মনে হওয়ার কথা। কিন্তু এতো গল্প নয়, মনে করিয়ে দেওয়া। নিরীহ দেখতে এই বেসিনের পরতে পরতে জড়িয়ে রয়েছে আত্মত্যাগের কাহিনী। এর প্রতিটি অণু পরমাণুতে মিশে আছে শহিদের রক্ত। এই বেসিনটি আছে আধুনা প্রাক্তন আলিপুর জেলখানাতে। ফাঁসির মঞ্চের ঠিক পাশের ছোট ঘরটিতে। কোন এক অদ্ভুত যোগাযোগে এটি বেঁচে গিয়েছে। কাচের জিনিস ভেঙে যেতেই পারতো। না তা যায় নি। হয়তো আমাদের মনে করিয়ে দেওয়ার জন্যই রয়ে গিয়েছে। এটাই সত্যি। আলিপুর জেল তার সার সার কুঠুরী আর ফাঁসির মঞ্চ নিয়ে মিউজিয়ামে পরিবর্তিত হয়েছে। কি নির্মম ছিল সেই ব্যবস্থা। ফাঁসির মুক্তমঞ্চ আর তার থেকে ঢিল ছোড়া দুরত্বে তিনতলা জেলখানা যার সবকটি জানলাই ঐদিকে মুখ করা। পুরো ব্যবস্থাটা এমনভাবে বানানো হয়েছে যাতে বন্দীরা সবটাই নিজের চোখে দেখতে পারে। কি নির্মম মানসিক নির্যাতন।

আবার ফিরে আসি সেই বেসিনটির কথায়। আলিপুরে যারাই শহিদের রক্তে রাঙানো আত্মদান বেদী দেখতে গিয়েছেন তারা মঞ্চের পাশের এই ছোট ঘরটি নিশ্চয় দেখেছেন। ঘরের আসবাব পত্র বলতে টিনে মোড়া সবুজ রঙের দুটি উঁচু টেবিল আর একটি বেসিন যা নিয়েই ছিল সেই লাশ কাটা ঘর যেখানে সদ্যমৃত বিপ্লবীর ‘নিশ্চিত মৃত্যু’র সীলমোহর দেওয়া হত। আর তার পর হাত ধুয়ে ফেলার জন্য ছিল এই বেসিন। ভাবুন তো! সদ্য প্রয়াত রাইর্টাসের অলিন্দ কাঁপানো বিপ্লবী দীনেশ গুপ্তের নিথর দেহ এনে রাখা হয়েছে এই টেবিলে। অ্যাপ্রন আর গ্লাভস পরা জেলের ডাক্তার পরীক্ষা শেষে বেসিনে হাত ধুয়ে মাথা নিচু করে বেড়িয়ে যাচ্ছেন। ভাবা যায়! কে নেই এই মৃত্যু মিছিলে?

১৯০৮ এর নভেম্বরে বিশ্বাসঘাতক নরেন গোঁসাই কে হত্যা করে কানাইলাল দত্তের ফাঁসি দিয়ে, যে আপনি মরে মরার দেশে আনবো বরাভয়ের যাত্রা শুরু হয়েছিল, ১৯৩৪ এর জুন মাসে দীনেশ মজুমদারের আত্মদানের মধ্যে দিয়ে এই জেলে সেই যাত্রা শেষ হয়। এছাড়াও অন্যান্য মৃত্যু দন্ড প্রাপ্ত আসামীরও ছিলেন। সেই অর্থে ২০০৪-এর ১৫ই আগস্ট ধনঞ্জয় চ্যাটার্জির ফাঁসির মধ্যে দিয়ে এর পুর্ণছেদ ঘটে। আর বাকিটা মৌন ইতিহাস। প্রসঙ্গত: ১৯৩১ সালের আজকের দিনে শহীদ দীনেশচন্দ্র গুপ্ত, অত্যাচারী ইন্সপেক্টর জেনারেল সিম্পসনের হত্যাকারী এবং অলিন্দ যুদ্ধের নায়ক আলিপুর জেলে ফাঁসির মঞ্চে শহীদ হয়েছিলেন। তিনি ছিলেন মেদিনীপুর কলেজের প্রাক্তন ছাত্র ও মেদিনীপুর বেঙ্গল ভলান্টিয়ার্সের ক্যাপ্টেন।

এই বেসিন তৈরীর কোম্পানীর ইতিহাসও কিন্তু কম আকর্ষনীয় নয়। এক সাথে জড়িয়ে রয়েছেন এক উদ্দ্যোগী পুরুষ। সে যুগে শ্যাঙ্কস ছিল স্যানিটারির জগতে এক কিংবদন্তির মতন। ইংলান্ডের এই কোম্পানিটি একশ বছরেরও বেশি সময় ধরে দেশে বিদেশে দাপটের সঙ্গে ব্যাবসা করে গিয়েছে। এদের তৈরী বেসিন আর ট্যাপগুলি এতটাই সেরা মানের ছিল যে একশো বছর পরে অনেক যায়গাতে এখনও তা ব্যবহার হচ্ছে।তার মধ্যে আমাদের শহরও আছে। শ্যাঙ্কস অ্যান্ড কোম্পানি লিমিটেডের প্রতিষ্ঠাতা জন শ্যাঙ্কস ১৮২৬ সালে পেসলিতে জন্মগ্রহণ করেন। ব্যবসা ছিল তার রক্তে। ১৮৫১ সালে, পঁচিশ বছর বয়সে তিনি নিজে ব্যবসা করার সিদ্ধান্ত নেন। শুরুতে তিনি নদীর গভীরতা মাপার যন্ত্রপাতির ব্যবসায় পুজি লাগিয়েছিলেন। সেই সময়ের সুপরিচিত প্লাম্বিং ঠিকাদার ওয়ালেস এবং কনেলের ফার্মেই তার হাতেখড়ি। প্রথমে পেসলিতে ও তার দু-বছর পরে ১৮৫৩ সালে তিনি ব্যারহেডের লোনডেস স্ট্রিটে একটি প্লাম্বিং এর দোকান খোলেন। তিনি যখন স্যানিটারি ইঞ্জিনিয়ারিং ব্যবসা শুরু করেন তখন সদ্য সদ্য জলবাহিত রোগ হিসাবে কলেরা এবং টাইফাসের মধ্যে যোগসূত্র আবিষ্কৃত হয়েছে আর বিশুদ্ধ জল সরবরাহের প্রয়োজনীয়তা সমাজে অগ্রাধিকার পেতে শুরু করেছে। আর একটা নুতন উদ্দ্যোগও তখন সবে সবে শুরু হয়েছিল তা হলো সাহেবদের ফ্লাট কালচার।

সেখানেও এই ধরনের স্যানিটারির জিনিসপত্র প্রচুর দরকার পরছিল। এই বিপুল চাহিদা মেটাতে ১৮৬৬ সালে তিনি নিজেই একটি ফাউন্ড্রি খুলে ফেলেন। তার নতুন কারখানাতে মূলত টয়লেট, স্নান এবং অন্যান্য স্যানিটারি সামগ্রী আর তার জন্য দরকারী পিতলের ফিটিং ও ট্যাপ তৈরি হতো। খুব তাড়াতাড়ি তার কোম্পানীর তৈরী এসব পণ্য বিশ্বের বাজার ধরে নেয়। ভারতবর্ষ ছিল তার মধ্যে অন্যতম। ব্যবসার এই উন্নতি দেখে ১৯০৪ সালে সংস্থাটি শহরের কেন্দ্রে অনেকটা বড় জায়গা নিয়ে আরও বড় যাকে বলে রিটেইল আউটলেট শুরু করে। বিশ্বজোড়া তখন শ্যাঙ্কস ব্রানডের খ্যাতি। এরপর কেটে যায় প্রায় একশো বছরের বেশী সময়। ৬০-এর দশকের থেকেই ব্যবসায় মন্দা দেখা দিচ্ছিল অবশেষে প্রতিযোগিতার আর বাজার দখলের লড়াইয়ে পিছিয়ে পড়ার কারনে ১৯৯২ সালে শ্যাঙ্কসের দরজা চিরকালের জন্য বন্ধ হয়ে যায়। আজও হাসপাতালের পুরোনো ওয়ার্ডে এর দেখা পাওয়া যায়।
অনেক অজানা তথ্য পেলাম। ঋদ্ধ হলাম। ধন্যবাদ
এরকম অনেক ঘটনা আছে
অসাধারণ লেখা!
ধন্যবাদ
খুব সুন্দর লাগল লেখাটি।
Thanks
তথ্যগুলি খুবই আগ্রহউদ্দীপক। এই পর্যায়ে অতীত-বীক্ষণ সম্ভব হলে ইতিহাসের বহু ফাঁক পূরণ হবে। শুভেচ্ছা।
এরকম অনেক ছোটখাটো কিন্তু ইতিহাসে ভরা যায়গা/জিনিস আছে।
Thanks
Khub bhalo laglo lekha ti. Informative and creates interest to see the basin.
Thanks.
Liked reading such a well researched article, & that too by someone known.
Thanks
খুবই গুরুত্বপূর্ণ একটি বিষয়। ভালো লাগলো।
Thanks for your comments
এ তথ্য জানা ছিল না। অসংখ্য ধন্যবাদ
ধন্যবাদ
খুব ভালো লেখা।
ধন্যবাদ
Great article, Kamal????????
Enjoyed reading this.