প্রবাসী বিভূতিভূষণ চিরটাকাল প্রবাসে কাটালেও বাঙালী পাঠক সমাজে তিনি আজও অপ্রবাসী বিভূতিভূষণ। কতদিন তিনি অপ্রবাসী থাকবেন তাঁর বিচার কালের হাতেই সঁপে দেওয়া উচিত। বর্তমানে বিভূতিভূষণ আছেন, থাকবেনও।
বাংলা সাহিত্যে অনেক ব্যাক্তিত্বকে আমরা পাই যাঁদের শেকড় প্রবাসে। কিন্তু যেহেতু বাঙালী তাই বাংলার প্রতি একটা টান তাঁদের থেকেই গেছে। বিশেষতঃ বিহারের ভাগলপুর, পূর্ণিয়া, দ্বারভাঙ্গা অনেক সাহিত্যিকের অনুপ্রবেশ ঘটিয়ে, আমাদের বাংলা সাহিত্যকে পরিপূর্ণতা দিয়েছে। বাংলা সাহিত্যের সঙ্গে এই ভূখণ্ডের এক নিবিড় যোগ। বিভূতিভূষণ মুখোপাধ্যয় এর ব্যাতিক্রম নয়।
একসময় মধ্যবিত্ত বাঙালীর জয়-জয়কার ছিল সওদাগরী অফিসের কনিষ্ঠ কেরাণী হিসাবে। তৎকালীন সওদাগরী অফিস শতকরা একশো ভাগই ছিল ইংরেজ পরিচালিত। এই অফিসে করণীক মানেই সে ইংরাজী ভাষায় শিক্ষিত। মধ্যবিত্ত সেই সব বাঙালীদের প্রায়শই বাঙলার বাইরে তাই প্রতিষ্ঠিত হতে দেখি। পূর্বপুরুষ সূত্রে বিভূতিভূষণের নেড়া বাঁধা ছিল হুগলী জেলার চাতরা শ্রীরামপুরে। চাতরায় মুখোপাধ্যায় পরিবারের ইতিহাস স্বম্বন্ধে তিনি বলেছেন—‘সেখানে পৌরহিত্য পূজার্চণাই ছিল পারিবারিক পেশা। আর্থিক অবস্থা তেমন সচ্ছল ছিল না। তবে নিষ্ঠাবান ব্রাহ্মণ হিসাবে তাঁদের খ্যাতি ও প্রতিপত্তি দুই’ই ছিল। পিতামহ’র জ্যেষ্ঠ ভ্রাতার (ভগবতীচরণ) যে ছবি আমি এঁকেছি ‘স্বর্গাদপি গরিয়সী’তে তা প্রায় আক্ষরিক ভাবে সত্য। অমনই নিষ্ঠা এবং প্রভাব ছিল তাঁর। পারিপার্শ্বকেও ছিল একটা শুচিতার আদর্শ’।—আবার ‘স্বর্গাদপি গরিয়সী’তে দেখি,—‘জায়গাটা মিথিলার একেবারে মাঝখানটিতে, তায় বিশেষ করিয়া ব্রাহ্মণ প্রধান হওয়ায় স্বভাবতঃই একটু পুরাতন ঘেঁষা। এরই মাঝে অতি-আধুনিক যন্ত্র যুগের প্রতীক এই নীলকুঠি হঠাৎ কোনো সময়ে ঠাঁই করিয়া লইয়া একটা মিশ্র সুরের অবতারণা করিয়াছে।….কুঠির সর্ব্বোচ্চ আমলা হিসাবে মধুসূদনের দেওয়াল কাঁচা ইঁটের’।
মধুসূদন বিভূতিভূষণের পিতামহ। যৌবনের প্রারম্ভে তিনি কিছু ইংরাজী শিখেছিলেন। ফল হাতে-নাতে পেলেন একেবারে নীলকুঠির আমলা। বাংলার চাতরা থেকে সোজা বিহারের পাণ্ডুল। অবশ্যই জীবিকার তাগিদে। মধুসূদনের পুত্রের নাম বিপিনবিহারী। বিপিনবিহারীর জন্ম এই পাণ্ডুলেই। তাঁর বিবাহ হয় হাওড়া আমতা থানার অধীন বেলে-প্রতাপপুর গ্রামের রসিকলাল বন্দ্যোপাধ্যায়ের কন্যা গিরিবালা দেবীর সঙ্গে। বিপিনবিহারী এবং গিরিবালার এগারটি সন্তানের মেজ বিভূতিভূষণ।
১৮৯৮ সালের ২৮শে অক্টোবর বিহারের অন্তর্গত দ্বারভাঙ্গা শহর থেকে বারো মাইল উত্তর-পূর্বে পাণ্ডুলে তাঁর জন্ম। বিপিনবিহারী ছেলেমেয়েদের শিক্ষার ব্যাপারে ষোলো আনা বাঙালী মানসিকতার দ্বারা প্রভাবিত ছিলেন। তাই শৈশবে খুব একটা বেশি দিন তাঁর পাণ্ডুলে কাটল না। বড়ভাই শশিভূষণ পিতামহী নিস্তারিণী দেবীর হাত ধরে চলে এলেন চাতরায়। তাঁকে ভর্তি করা হল মহাদেব মাষ্টারের পাঠশালায়। পাঠশালার শাসন একটু কঠিন ছিল। সেইটি পুষিয়ে দিতেন পিতামহী নিস্তারিণী দেবী। সঙ্গে ছোট পিসীমা অভয়া দেবী। তাঁর নিজের কথায়,—‘মহাদেব মাস্টারের পাঠশালা। গঙ্গায় যেতে যে রাস্তা পশ্চিমে এসে গঙ্গার রাস্তার সঙ্গে মিশেছে তার কোনটাতে একটা ঘর, বোধহয় গোলপাতার ছাউনী, ঠিক মনে পড়ছে না। সামনে এক চিলতে রক, তারপরই একটা শুকনো নালা, তারপরই একটা সদর রাস্তা প্রায় এক সমতলে, নালাটা প্রভেদ রচনা করেছে। সমস্ত জায়াগাটুকু ছেয়ে একটা বাদামের গাছ; চওড়া চওড়া সবুজ আর রাঙা রাঙা পাতা। যেতেই একটা সুমিষ্ট গন্ধ আমায় অভ্যর্থনা করে নেয়’। আর এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন,—‘সেখানে আর ছিলেন আমার ছোট পিসীমা অভয়া দেবী। এই দুই স্নেহশীলা ব্যাতীত আমার এই সময়কার আর এক সঙ্গী আমার অগ্রজ শশিভূষণ মুখোপাধ্যায়। এই চারজনের মিলিত জীবনের স্মৃতি আমার কাছে খুবই মূল্যবান। কোন শাসন ছিল না আমার সেই সময়কার জীবনে। তখন পাঠশালার সঙ্গে মোটামুটি একটা সুস্থ সম্বন্ধ বজায় রেখে অবাধে ঘুরে বেড়িয়েছি বনে-জঙ্গলে, মাঠে ঘাটে। সে যে কী মুক্তির স্বাদ….প্রায়,—‘বাপে তাড়ানো মায়ে খেদানো’ ছেলের মত অবাধ জীবন’।
জীবন তীর্থের ২৬ পৃষ্ঠায় চাতরার বাউণ্ডুলেপনা সম্বন্ধে লিখেছেন—‘তাঁকে ভূত বলব না পরী বলব, না আমার গার্জেন—এঞ্জেল বলব তা তো এখনও ঠিক করে উঠতে পারি নি, একটা পাঠশালা পালানো ছেলের যা প্রাপ্য—সাজা, ধিক্কার, উপদেশ হলেও তিক্ত উপদেশ—সব পেয়েছি, তবু উত্তর-জীবনে সামান্য যা কিছু পেয়েছি সে তো ঐ ভূত বা এঞ্জেলের কৃপাতেই’।
চাতরায় এই অবাধ জীবনের স্বাদ তিনি বেশীদিন উপভোগ করতে পারেন নি। তার আগেই তাঁকে পাণ্ডুলে ফিরে আসতে হল। ১৯০২ কিংবা ১৯০৩ সাল পিতার কর্মস্থলে তখন ভীষন গলযোগ। নীলচাষের স্বর্ণযুগ তখন অস্তমিত। ফলে নীলকুঠিতে ভাটার টান। পিতা বিপিনবিহারী সপরিবারে পাণ্ডুল ছেড়ে চলে এলেন দ্বারভাঙ্গায়। দ্বারভাঙ্গায় তখন রাজস্কুলের শাখা বাংলা স্কুলে অষ্টম শ্রেনীতে বিভূতিভূষণ ভর্তি হলেন ফের পড়াশুনা শুরু করার জন্য। বর্তমানে স্কুলটির নাম ‘দি পিতাম্বরী মিডিল বেঙ্গলী স্কুল’। স্কুলের খাতায় ভর্তির তারিখ ১৯০৩ সালের ৩রা জুলাই। স্কুলের হেডমাষ্টার মহাশয়ের এক চিঠি থেকে জানা যায়,—“As recorded in Ad. Register, Shree Bibhuti Bhushan Mukerjee, Son of Late Bipin Behari Mukerjee, guardian Chandi Charan Mukerjee of Chhattra (Hoogly) was admited in ৮th class Sec A, He was admitted on ০৩-০৭-১৯০৩ at the age of ৮ yrs ৬ months.” শুরু হল তাঁর শিক্ষা জীবনের দ্বিতীয় পর্ব। বছর পাঁচেক এই স্কুলে থাকার পর সরাসরি দ্বারভাঙ্গার রাজ স্কুলে ভর্তি হন। ২৯-০৭-৭৩ সালে সরোজ দত্তকে লেখা এক পত্রে তিনি জানান,—‘পীতাম্বরী বেঙ্গলী মিডল স্কুলের গোড়ার নাম ছিল মাত্র বাংলা স্কুল। ওটা রাজ স্কুলের একটা শাখা হিসাবে ছিল। মহারাজের বাঙ্গালী কর্মচারীদের ছেলেদের পড়াবার সুবিধার জন্য। বাড়িটাও মাহারাজেরই দেওয়াছিল ওই উদ্দেশ্যে। ভূমিক পর্যন্ত (১৯৩৮) ওই নামই ছিল। তারপর সে বাড়ীও ভেঙ্গে যায়, নূতন বাড়িও পাওয়া যায় না রাজার থেকে।—এখানকার সমবেত চেষ্টায় স্বাধীনভাবে স্কুলটি আবার পত্তন করা হয়। চাঁদায় এখানকার এক বাঙ্গালী ব্যবসাযীর অঙ্কটা বেশী থাকায়, তার মার নামে স্কুলটি প্রতিষ্ঠিত হয়’। ১৯১২ সাল, আঠার বছর বয়সে তিনি প্রবেশিকা পরীক্ষায় প্রথম বিভাগে উত্তীর্ণ হন।
স্কুল জীবনে যে দুজনের প্রভাব তাঁর উপর সবচেয়ে বেশী পড়েছিল তাঁরা হলেন হেডমাষ্টার সুধীরবাবু এবং গোষ্ঠবিহারী বন্দ্যোপাধ্যায় (জ্ঞতি, মেজদা)। সুধীরবাবুর কাছ থেকে শিখেছিলেন প্রকৃত মানুষ কি ভাবে হতে হবে, আর মেজদার কাছ থেকে আংশিক প্রেরণা পেয়েছেন Wit ও humour-এর এছাড়া এই স্কুল জীবনেই তাঁদের পরিবারের ওপর দারুন বিপর্যয় ঘনিয়ে এসেছিল। প্রথমতঃ বাবা ও জ্যাঠার চাকরি যায়। দ্বিতীয়তঃ দ্বারভাঙ্গায় কয়লার ব্যবসায় প্রথম দিকে ভাল হলেও পরে বিপর্যয় প্লেগের মহামারীতে। শেষ পর্যন্ত বাড়ি ছেড়ে দ্বারভাঙ্গারই সবচেয়ে বড় পুকুর ‘হড়হির’ পাশে একটি বাড়িতে উঠে আসা। সেই সঙ্গে মায়ের চরম অসুস্থতা। সব মিলিয়ে এক নিদারুন পরিস্থিতি।
এরি মধ্যে দ্বিতীয় বারের জন্য বাংলায় এলেন। তিনি বলেছেন,—‘আমি বাংলাকে প্রথম পরিচয়ের ফ্রেশনেশ আর মুগ্ধ বিষ্ময়ের আলোয় পেয়েছি দুবার, চাতারায় আমি বাংলাকে দেখি, শিবপুরে আমি বাংলাকে প্রকৃতই পেলাম’। হাওড়া শিবপুরের মাতুলালয়ে এসে উঠলেন কলকাতার কলেজে লেখাপড়া করার উদ্দেশ্যে। রিপন কলেজে (বর্তমানে সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) আই-এ-ক্লাশে ভর্তি হন। প্রথম বার্ষিক শ্রেনীতে পঠনীয় বিষয় ছিল সংস্কৃত, ইতিহাস ও তর্কশাত্র। তিনি বলেছেন,—‘রিপন কলেজে যাঁদের কাছে পড়েছি, তাঁদের মধ্যে মনে পড়ে অধ্যাপক রবি ঘোষে’র কথা। তিনি ছিলেন ‘ডন’ সোসাইটির সদস্য। পড়ানোর ধারাটি আমার কাছে কেমন Paraphrasing মনে হত। আর ছিলেন দেশ বিখ্যাত বাগ্মী নেতা সুরেন্দ্রনাথ বন্দ্যোপাধ্যায়। পড়িয়ে ছিলেন Froude-এর Seamen of the 16th Century. সবচেয়ে ভালো লাগত অধ্যাপক শ্রীকুমার বন্দ্যোপাধ্যায়কে—চমৎকার পড়াতেন। বেশীর ভাগদিনই হাঁটা পথে কলেজে যাতায়াত করতেন। আসার সময় চলে আসতেন ‘ইডেন গার্ডেন’। ঘণ্টার পর ঘণ্টা ইডেন গার্ডেনে বসে প্রকৃতির সৌন্দর্য সুধা পান করতেন।
১৯১৮ সালে আই-এ পরীক্ষা দেবার পর তিনি কিছুদিনের জন্য উধাও হয়ে যান। চলে যান হাজারীবাগ। কারন স্বরূপ তিনি জানান পরীক্ষা ভাল দিতে না পারার জন্যই তাঁর আত্মগোপন। তবে আই-এ পরীক্ষায় তিনি সফলতার সঙ্গেই উত্তীর্ণ হন। কিন্তু স্বাস্থ্যের কারণে চলে আসেন পিতার কর্মস্থল উত্তর বিহারের মহম্মদপুরে। ১৯১৬ সালে তিনি আবার ফিরে এলেন বিহারে। পাটনায় তৃতীয় বার্ষক শ্রেনীতে ভর্তি হন বি-এন কলেজে। অনার্স নিয়ে পড়ার সুযোগ হয় নি কারণ সেই সময় বি-এন কলেজে অনার্স ছিল না। তাই সংস্কৃত এবং দর্শনশাত্র নিয়ে বি-এ ক্লাসে ভর্তি হলেন। এই সময় পাটনার বিখ্যাত উকিল শরদিন্দু গুপ্তের বাড়িতে তিনি গৃহশিক্ষকতা করতেন এবং ওই বাড়িতে থেকেই কলেজে যাতায়াত করতেন। তিনি বলেছেন,—‘পাটনা বি-এন কলেজের দু’জনের কথা মনে পড়ে—একজন প্রিন্সিপ্যাল দেবেন্দ্রনাথ সেন। ইনি ছিলেন ব্রাহ্ম ধর্মাবলম্বী, পড়াতেন দর্শনশাত্র। দ্বিতীয় জন কামাক্ষ্যাবাবু, পদবীটা মনে নেই। এর মধ্যে প্রিন্সিপ্যাল সেনের আমার উপর যথেষ্ট স্নেহদৃষ্টি ছিল এবং তাঁর প্রভাবও আমার জীবনে প্রচুর’।
সাহিত্যাঙ্গনে তাঁর প্রথম প্রয়াস ছোটগল্প। অষ্টম/নবম শ্রেণীতে পড়বার সময় ‘কুন্তলীন’ গল্প প্রতিযোগিতায় তিনি প্রথম গল্প পাঠান। এ প্রসঙ্গে কৌতুক ভরে তিনি স্মৃতিচারণ করেছেন,—‘আপনারা কি দুঃখিত হলেন যে আমার প্রথম গল্পটির কোন নিশানাই রইল না পৃথিবীতে? কিন্তু গল্পটি প্রকাশিত হলে আমারই কোন নিশানা রাখতেন না বাবা আর কাকা মিলে,—সেইটি কি সুখের কথা হোত ? তাঁর প্রথম ও পুরস্কৃত গল্প ‘অবিচার’ আষাঢ় ১৩২২ প্রবাসীতে প্রকাশিত হয়। তৃতীয় স্থান অধিকারী এই গল্পটি স্বন্ধে জ্যৈষ্ঠ ১৩৬৩-র ‘কথাসাহিত্য’ প্রত্রিকায় গৌরীশঙ্কর ভট্টাচার্য লিখেছেন,—‘থার্ড ইয়ারের ছাত্র বিভূতিভূষণ, সেই সময় প্রবাসী গল্প প্রতিযোগিতায় লেখা পাঠান এবং তৃতীয় স্থান অধিকার করেন।—এর কিছুদিন পরে ‘দাদা’ গল্পটি ‘মানসী ও মর্মবাণী’তে গৃহীত ও প্রকাশিত হয়।—পুনরায় ‘মানসী ও মর্মবাণী’তে লেখা পাঠালেন! এবার কিন্তু গল্প অমননীত হয়ে ফেরত এল।—‘মানসী ও মর্মবাণী’র বাতিল গল্পটি’ই প্রবাসী প্রত্রিকার প্রতিযোগিতায় দ্বিতীয় পুরস্কার পেয়ে প্রকাশিত হয়েছিল’।
১৯১৬ সালে তিনি বি-এ পাশ করেন। শুরু হয় তাঁর কর্ম জীবন। কর্মজীবনের পঁচিশটা বছর তাঁর জীবনে নানা রকম উত্থান পতন হয়েছে—তাঁর নিজের কথায়,— ‘আমি পাশ করার কয়েক মাসের মধ্যেই স্থানীয় (দ্বারভাঙ্গা) মাড়োয়ারী স্কুলে শিক্ষকরূপে প্রবেশ করি। এবং এক বছর পূর্ণ হবার আগেই সে কাজ ছেড়ে মজঃফরপুরে গিয়ে ওখানকার মুখার্জীস সেমিনারীতে কাজ নিই। সেখান থেকেও আট নয় মাস পরে আবার দ্বারভাঙ্গায় ফিরে এসে আমি রাজ স্কুলে শিক্ষকতার কাজ পাই। এখানে সহাকারী শিক্ষকরূপে কিছুদিন কাটাবার পর আমি হেডমাস্টারের পদে উন্নীত হই। দুইটি মিলিয়ে অনুমান বছর তিনেক কাজ করার পর, তৎকালীন সেক্রেটারীর সঙ্গে মনোমালিন্যের ফলে স্কুলের সঙ্গে আমার যোগাযোগ ছিন্ন হয়। কিছুদিন পর কিন্তু আমি আবার মহারাজ কুমার কামেশ্বর সিং-এর চেষ্টায় (পরে মহারাজাধিরাজ) তৎকালীন মহারাজাধিরাজ স্যর রামেশ্বর সিং এর একান্ত সচিব এর কাজ পাই। এই কাজ আমি প্রায় বৎসরাবধি করে নিজেই ছেড়ে দিই। এরপর প্রায় আট বৎসর আমি একে একে একটি জমিদারের গৃহশিক্ষকতা, পরে মজঃফরপুরে বি-বি কলিজিয়েট স্কুলে শিক্ষকতা, এবং পাণ্ডুল (আমার জন্মভূমি) নন্-এফিলিয়েটেড হাইস্কুলের হেডমাষ্টার রূপে কাটাই। আমারই সময়ে স্কুলটি এফিলিয়েশনও লাভ করে। এটি ১৯৩৮ সাল—যে বৎসর বিহারে ভূমিকম্প হয়। এরপর আমি অপ্রত্যশিতভাবেই আবার পাণ্ডুল থেকে দ্বারভাঙ্গা রাজ-এ ফিরে আসি। ইতিমধ্যে রাজ-এ একটা বড় পরিবর্তন হয়েছে, রামেশ্বর সিং স্বর্গতঃ হয়েছেন এবং কামেশ্বর সিং গদীতে আরোহণ করেছেন। ইনি আমায় তাঁর ভাগিনেয়’র আবাসিক গৃহশিক্ষকতার জন্য ডেকে নেন। এরপর থেকেই ১৯৮২ সাল অর্থাৎ আমার চাকরি জীবনের অবসান পর্যন্ত আমার দ্বারভাঙ্গা রাজ সরকারেই কাটে। তবে বিভিন্ন বিভাগে, যথা, গৃশিক্ষকতা, রাজপ্রেসের ম্যানেজার পুনরায় রাজস্কুলের স্থায়ী হেডমাষ্টার, এবং সর্বশেষে পাটনা থেকে প্রকাশিত মহারাজের দৈনিক ইংরাজী সংবাদপত্রের ম্যানেজারের দায়িত্ব গ্রহণ। এর প্রত্যেকটি কম-বেশী দুই-আড়াই বৎসরের কার্যকাল। এরপর আমি আর চাকরি করি নি, মোটামুটি লেখা নিয়ে আছি’ (সাক্ষাৎকার গ্রহণ সরোজ দত্ত, দ্বারভাঙ্গা, ১৬–১১–৬৯)।
দীর্ঘ পঁচিশ বছরের চাকরি জীবনে তিনি কোন জায়গাতেই স্থির থাকতে পারেন নি। এই পঁচিশটা বছরের জীবনে তিনি ১১ বার চাকরি পরিবর্তন করেছেন। ১৯১৭ সালে দ্বারভাঙ্গায় মাড়োয়ারী স্কুলে সহকারী শিক্ষকরূপে জীবনের প্রথম চাকরি পান। একবছর কোন প্রকারে চাকরি করার পর হঠাৎ চাকরিতে ইস্তফা দিয়ে একবছরের জন্য অন্তর্ধান হন। তারপর ১৯২০ সালে অস্থায়ী শিক্ষকরূপে মজঃফরপুরে ‘মুখার্জীস সেমিনারী’তে শিক্ষকতা করেন প্রায় আট-নয় মাস। অন্তর্ধান প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে (২৬-০৩-৭৮, হাওড়া, সরোজ দত্ত) তিনি বলেন,—‘আমার গৃহত্যাগ বলতে বাড়ি থেকে পালানোর ব্যপার নয়। আই-এ পরীক্ষা দেবার পর কলিকাতা থেকে দ্বারভাঙ্গা না গিয়ে, সোজা হাজারীবাগ চলে যাই, কাউকে কিছু না জানিয়ে। আর একটা ঘটনা মাড়োয়ারী স্কুলে কাজ করতে করতে হঠাৎ কাউকে না জানিয়ে ‘মুখার্জীস সেমিনারী’তে যোগ দিই, মজঃফরপুরে গিয়ে। একে যদি পালানো বল তোমরা বলতে পার। এই ঘটনাই একটু কমিয়ে বাড়িয়ে ‘স্বর্গাদপি গরিয়সী’তে দিয়েছি’। ১৯২১ থেকে ১৯২৪ সালের প্রারম্ভ পর্যন্ত প্রায় বছর তিনেক দ্বারভাঙ্গার রাজস্কুলে শিক্ষকতা করেন। ১৯২৪-২৫ দ্বারভাঙ্গা মহারাজের প্রাইভেটট সেক্রেটারী হিসাবে নিযুক্ত হয়েছিলেন। এরপর ১৯২৭ থেকে ২৯ সাল পর্যন্ত রঘুনন্দন সিংয়ের পুত্রের গৃহশিক্ষক হয়ে চলে যান। আবার ফিরে আসেন মজঃফরপুরে বি-বি-কলিজিয়েট স্কুলে শিক্ষক হয়ে। ১৯২৯ থেকে ১৯৩২ সাল পর্যন্ত তিনি মজঃফরপুরেই ছিলেন, এরপর ১৯৩৩ থেকে ১৯৩৪ সাল পর্যন্ত পাণ্ডুল স্কুলে শিক্ষকতা করেন। আবার ফিরে আসেন দ্বারভাঙ্গায়। দ্বারভাঙ্গা রাজের গৃহশিক্ষকতা করতে। এখানে তিনি রাজার ভাগ্নে কনৈহাজীর গৃহশিক্ষক হয়ে আড়াই বছর থেকে তিন বছর অতিবাহিত করেন অর্থাৎ ১৯৩৪ থেকে ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত। ১৯২৫ থেকে ১৯৩৪ এই দীর্ঘ নয় বছর দ্বারভাঙ্গার রাজার সঙ্গে তাঁর সম্পর্ক ভাল ছিল না। কিন্তু চাকরি জীবনের ২৫ বছরের অর্ধেকের বেশী কেটেছে দ্বারভাঙ্গা রাজপরিবারের কোথাও না কোথাও চাকরি করে।
এ প্রসঙ্গে ২৩-০৯-৭৬ সালে সরোজ দত্তকে দেওয়া এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন,—‘কথাটা ঠিকই। আমি দ্বারভাঙ্গা রাজস্কুলে শিক্ষকতা করেছি বিভিন্ন সময়ে। তৎকালীন সম্পাদকের হস্তক্ষেপের ফলে আমার প্রথম বারের চাকরির অবসান ঘটে। ‘রাজ’ পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ দীর্ঘদিনের। চাকরিচ্ছেদের ব্যাপারটা আমি তৎকালীন মহারাজা রামেশ্বর সিং এর গোচরে আনি এবং তাঁকে বলি, বিনা দোষে আমার সেই কর্মহীন জীবনের কথা একটু বিবেচনা করে দেখতে। এর পরই মহারাজা আকস্মিকভাবে আমায় তাঁর একান্ত সচিব নিয়োগ করেন। আমার এই নিয়োগে স্থানীয় অনেকে (বাঙ্গালী অবাঙ্গালী উভয় সম্প্রদায়ের লোকই) মনে হয় খুশি হতে পারেন নি। ফলে, মহারাজের কাছে বারবার আমার অকর্মন্যতার ঈর্ষাসুলভ মিথ্যা অভিযোগ পৌঁছতে থাকে। পরিণতি হিসাবে মহারাজা একবার আমার উপস্থিতিতেই আমার অযোগ্যতার ইঙ্গিত করেন। অথচ তিনিই ইতিপূর্বে আমার কাজ দেখে মন্তব্য করেছিলেন যে, এমনভাবে গুছিয়ে কাজ ইতিপূর্বে কেউ করেন নি।
যাই হোক। মহারাজ-এর ঐ ইঙ্গিতের পরে আমি আত্মস্মান বজায় রাখতেই পদত্যাগ করতে বাধ্য হই। শুনেছি মহারাজা তাঁর পরিষদ বর্গের কাছে আমার পদত্যাগের কথা উল্লেখ করে বলেন,—‘নিজের ছেলেই যদি আমাকে ত্যাগ করে যায়, তা হলে কি করতে পারি’ পরে অবশ্য এসব মিটে যায়, এবং আমি আবার দ্বারভাঙ্গা-রাজ-এ নিযুক্ত হই’।
১৯৩৭ সালের মাঝা মাঝি সময় থেকে ১৯৩৯ সালের শেষ দিক পর্যন্ত তিনি ছিলেন দ্বারভাঙ্গায় রাজপ্রেসের ম্যানেজার। ১৯৩৯ এর মাঝপর্বে তিনি দ্বারভাঙ্গা রাজ স্কুলের প্রধান শিক্ষক হিসেবে কাজে যোগদেন। ১৯৪১ এর মঝামাঝি পর্যন্ত প্রধান শিক্ষক হিসাবেই কাজ করে যান। এরপর তিনি মহারাজের ‘ইণ্ডিয়ান নেশান’ পত্রিকার ম্যানেজারীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ১৯৪২ সালে গান্ধীজীর ‘কুইট ইণ্ডিয়া’ আন্দোলনের সময় এই পত্রিকা বন্ধ হয়ে যায়। বিভূতিভূষণের চকরি জীবনের ইতি এখানেই।
‘ইণ্ডিয়ান নেশান’ পত্রিকা বন্ধ হওয়ার কথা প্রসঙ্গে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন,—‘সেই গান্ধীজীকেই দেখা গেল’ ৪২-এ একেবারে নূতন ভূমিকায়, ‘ভারত ছাড়’ আন্দোলনের পুরধা রূপে। দেশবাসীর দীর্ঘদিনের অবরুদ্ধ আবেগ প্রকাশের পথ পেল। সেই ঢেউ পৌঁছেছিল পাটনাতেও। স্পষ্ট মনে পড়ে একদিনের কথা। প্রেসের সামনে বড় রাস্তার উপর আন্দোলন কারীরা সমবেত হয়েছে, আর তাদের থামিয়ে দিতে প্রস্তুত রয়েছে বন্দুক হাতে গুর্খা সেপাই।….সেপাইরা লক্ষ্য রাখছে আমাদের অফিসের দিকে। এমন সময় পত্রিকার সম্পাদক সি. ভি. রাও এবং আমি সেপাইদের দিকে এগিয়ে যেতে থাকি প্রকৃত অবস্থা তাদের বুঝিয়ে বলার জন্যে। আমাদের আশঙ্কা ছিল, সন্দেহ বশে তারা আমাদের কার্যালয়ে প্রবেশ করে গোলযোগ ঘটাতে পারে এবং নিরীহ কর্মীদের নির্যাতিত করতে পারে। তেমন কিছু শেষ অবধি ঘটে নি। এরপর সম্পাদক ও আমি মহারাজকে কাগজ বন্ধ করে দিতে পরামর্শ দিই দ্বারভাঙ্গা গিয়ে। কননা, কাগজের জন্য কোনো নীতি নির্ধারণ করা শক্ত ছিল সেদিন। পুরোপুরি ইংরেজের বিপক্ষতা করা মহারাজের পক্ষে সম্ভব ছিল না, আবার দেশের এই জাগরণকে অস্বীকার করাও সুবুদ্ধির কাজ বলে মনে করি নি; অথচ ইংরেজের বিপক্ষতা না করে কাগজ চালাতে গেলে তা-ই করতে হ’ত। সুতরাং আমরা মহারাজকে ঐ পরামর্শই দিয়েছিলাম। মহারাজও পরামর্শের যৌক্তিকতা স্বীকার করে কাগজ সাময়িক ভাবে বন্ধ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছিলেন’।
১৯১৬ থেকে ১৯৪২ সুদীর্ঘ পঁচিশ বছরের চাকরী জীবনে তাঁর বেশির ভাগ সময়টা কেটেছে শিক্ষকতা করে। কখনো স্কুলের শিক্ষকতা কখনও বা গৃহশিক্ষকতা। সাহিত্যের জগতে তাঁর নাম ডাক হলেও খুব একটা নয়। এই সময় পর্যন্ত যা লিখেছেন সব ছোটগল্প। ‘রাণুর প্রথম ভাগ’ (১৩৪৪, ৭টি গল্প), ‘রাণুর দ্বিতীয় ভাগ’ (১৩৪৫, ১০টি গল্প), ‘রাণুর তৃতীয় ভাগ’ (১৩৪৭, ১৩টি গল্প), ‘বর্ষায়’ (১৩৪৮, ১০টি গল্প), ‘বসন্তে’ (১৩৪৮, ১৪টি গল্প), ‘শারদীয়া’ (১৩৪৮, ১১টি গল্প), ‘রাণুর কথামালা’ (১৩৪৮, ১৬টি গল্প)। প্রবাসীতে গল্প প্রকাশ এবং পুরস্কার পাবার পর থেকই প্রায় প্রতি বছর তাঁর দু’চারটি গল্প প্রকাশ পেতে থাকে বিভিন্ন পত্র পত্রিকায়। গল্প গুলি প্রকাশের প্রধান মাধ্যম অবশ্যই ‘প্রবাসী’ তবে ‘কল্লোল’, ‘বিচিত্রা’, ‘বঙ্গশ্রী’, ‘অমৃত’, ‘প্রভাতী’, ‘বিশ্বভারতী’, ‘শনিবারের চিঠি’, ‘উপাসনা’, ‘দেশ’, ‘কথাসাহিত্য’, ‘হিমাদ্রী’, ‘পত্রিকা’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘পরিচয়’ প্রভৃতি পত্র পত্রিকায়। তিনি শুধু গল্প লেখেন নি পাশাপাশি উপন্যাসও লিখেগেছেন।
১৩৪৪ এর বৈশাখ মাসে তাঁর প্রথম গল্প গ্রন্থ প্রকাশিত হয়। প্রকাশক ‘রঞ্জন পাবলিশিং হাউস’। ১৩৪৮ পর্যন্ত যে সাতটি গল্প গ্রন্থ প্রকাশিত হয়েছিল, তাঁর প্রথম চারটি গল্প গ্রন্থের প্রকাশক রঞ্জন পাবলিশিং। বাকি তিনটি গল্প গ্রন্থের প্রকাশক ‘জেনারেল প্রিন্টার্স এন্ড পাবলিশার্স’। তবে গ্রন্থ প্রকাশনার ক্ষেত্রে প্রথম দিকে তাঁর জীবনে বেশ বড় একটা দুর্ঘটনা ঘটে। ‘রাণু’ সিরিজের গ্রন্থস্বত্ব তিনি সজনী কান্ত দাসকে বিক্রি করে দেন দু’ইশত টাকার বিনিময়ে। পঞ্চাশটি গল্প নিয়ে তৈরী রাণু সিরিজ। রাণুর গ্রন্থস্বত্ব বিক্রি ১৯৩৬-৩৭ এর কিছু আগের ঘটনা। আর্থিক উপার্জনের অনিশ্চিয়তা এবং অসচ্ছলতাই তাঁকে এই কাজ করতে বাধ্য করে। তবে ভুলেও কোনদিন সজনীবাবু সম্বন্ধে কোনরকম কটূক্তি তিনি করেন নি।
চল্লিশের দশক বিভূতিভূষণের জীবনে সবচেয়ে দুর্বিষহ। তাঁর জীবনের অনেক অঘটনই এই দশকে ঘটে। চাকরী ছেড়েছেন ১৯৪২ সালে। এরপর একে একে তাঁকে ছেড়ে চলে গেছেন তাঁর মা, বাবা এবং প্রিয় দাদা শশীভূষণ। ১৯৪২ সালের ২১শে অক্টোবর তাঁর মাতৃবিয়োগ। পিতা মারা যান ১৯৪৪ সালের ১৫ই জুলাই। দাদা শশিভূষণ মারা গেলেন ১৯৪৭ সালের ১৮ই জানুয়ারী। এর পরেই তিনি বাইরের কর্মজীবন থেকে অবসর গ্রহণ করলেন। সর্বৈব ভাবে আত্মনিয়োগ করলেন সাহিত্যক্ষেত্রে।
সাহিত্যের হাটে তাঁর প্রথম আগমন ছোট গল্পের হাত ধরে। প্রতিষ্ঠা পেলেন। সাহিত্য পিপাসু পাঠকের কাছে তিনি পরিচিত হলেন রাণুর মেজকা হিসাবে। রাণুর প্রথম ভাগ প্রকাশ পায় প্রবাসী (শ্রাবন ১৩৩৬)-তে। বয়সে ছোট হলেও বাড়ির বড় রাণু কম বয়সেই কইয়ে বলিয়ে হিসাবে দারুন পাকা। তার বাবা তাকে গৌরীদান করে পুণ্য অর্জন করলেন। শ্বশুর বাড়ি যাবার সময় রাণু তার মেজকাকে কথা দিল চিঠি দেবে আর বর্ণ পরিচয় প্রথম ভাগ শেষ করবে। শিশুর আচরণ নিয়ে এত সহৃদয় লেখা বাংলা সাহিত্যে বিরল। এই ধরনের আরো অসংখ্য গল্প তিনি লিখেছেন। এদের মধ্যে ‘দাঁতের আলো’, ‘ননীচোরা’, ‘মাসী’, ‘পীতু’, ‘বাদল’ এই পর্যায়ের বিখ্যাত গল্প। তাঁর সৃষ্ট শিশুরা রহস্যে আবৃত,—‘নানান সামাজিক সমস্যা, যেমন মনে হয়েছে, তেমন ভাবেই সেগুলো তুলে ধরার চেষ্টা’ করছেন। তাই তিনি বলতে বাধ্য হয়েছেন,—‘এত বেদনা চারপাশে ছড়িয়ে আছে যে, তার ভেতর থেকে হাসি আর আসে না’। তবে বিভূতিভূষণের বেদনা রস-সিক্ত সাহিত্যের মূল্যায়ণ কতটা হয়েছে তা ভাববার বিষয়। তবে হাস্যরসিক হিসাবে অনেকেই তার মূল্যায়ণ করেছেন।
এক সাক্ষাৎকারে তিনি সোমনাথ মুখোপাধ্যায়কে বলেছেন,—‘বিয়ে আমি করিনি বটে তবে দিয়েছি প্রচুর। বিয়ে করিনি বলে তার প্রত্যক্ষ ভালমন্দের দিকটা হয়ত বর্ণনা করতে পারব না কিন্তু বিবাহ অনুষ্ঠানের যত অভিজ্ঞতা আমি সঞ্চয় করেছি তা বোধকরি নিজে বিবাহিত হলে সম্ভব হত না’। ‘বরয়াত্রী’ (প্রবাসী, অগ্রহায়ণ ১৩৪০) এধরনের একটি গল্প। ত্রিলোচনের বিয়ের রাতে অন্য পাঁচ বন্ধু গনশা, ঘোঁৎনা, রাজেন, গোরাচাঁদ এবং কে. গুপ্তর রোমহর্ষক অভিজ্ঞতার গল্প নির্মল হাসির উদ্রেক করে। এই পর্যায়ের গল্পগুলি হল ‘বর ও নফর’ (১৩৪৩), ‘স্বয়ংবর’ (১৩৪৫), ‘পাকাদেখা’ (১৩৪৬), ‘ঘর জামাই’ প্রভৃতি। এছাড়া ‘বিয়ের ফুল’, ‘মোটর দুর্ঘটনা’ তো আছেই। ‘একটিতে দীর্ঘপোষিত আশাভঙ্গ, অপরটিতে কৌমার্য পালনের প্রতিজ্ঞাচ্যুতি—হাসির প্রবাহ ছুটাইয়াছে’। তাই বিভূতিভূষণ স্বগতোক্তির সুরে বলেন,—‘আমার লেখায় হাস্য কৌতুকরস বেশ খানিকটা স্থান পেয়েছে, বাটখারা দিয়ে ওজন করলে বোধহয় এটাই বেশি হবে। তাই থেকে ধারণা হওয়ার কথা, তবে বোধহয় হাসিই আমার সাহিত্যসত্তার অন্তরতম জিনিস। কিন্তু বিচার করে দেখলে তাই বা দাঁড়ায় কোথায় ?—নিজেকে যতটা জানি, বিষন্নতাই আমার মনের গঠনে যেন মূল উপাদন’।
ছোট গল্পের থেকেও বিভূতিভূষণ পাঠককে বেশি মজিয়েছেন তাঁর উপন্যাসে। প্রথম উপন্যাস ‘নীলাঙ্গুরীয়’। আশ্বিন ১৩৪৭ থেকে আষঢ় ১৩৪৯ এর মধ্যে প্রবাসীর ২২টি সংখ্যায় প্রকাশিত হয়। উপন্যাস রচনা সম্বন্ধে বিভূতিভূষণের মত,—‘সাতটা গল্প সংগ্রহের পর হঠাৎ নভেল ধরা সত্যই নিতান্ত খনিকটা আকস্মিকই।….একটা উপন্যাস ধরার হালকা রকমের একটা তাগিদ কিছুদিন থেকে মনের ভেতর অনুভব করছিলাম। তবে, অবসরহীন আসক্তি, সম্ভাবনার বাইরেই মনে হোত। তারপর একদিন আমার সমবয়সী এক আত্মীয় পাঠক, আমার একটা গল্প পড়ে, অভিমত জানতে চাওয়ায়, বলেন—লাগল তো ভালো, তবে এতে আশ মেটে না; একটা বড়ো ধরো, যাতে গা-ঘামে। গা-ঘামা অর্থাৎ যাতে বেশ দিনকতক লেগে থাকতে হয়। নীলাঙ্গুরীয়-র এই হোল সংক্ষিপ্ত ইতিহাস’। উপনন্যাসটি স্বন্ধে সরোজ বন্দ্যোপাধ্যায় বলেছেন,— ‘আমার বিবেচনায় নীলাঙ্গুরীয় মুখোপাধ্যায়ের সব চেয়ে সুপরিকল্পিত, সব চেয়ে বেদনাঘন রোমান্টিক এবং সে কারনে সবচেয়ে জনপ্রিয় উপন্যাস। পাত্রপাত্রীরা প্রত্যেকে তাদের নিজ নিজ নিয়তির দ্বারা অধিকৃত হয়েছে। সেই নীল নিয়তির দান নীল অঙ্গুরীয়। কিন্তু নিয়তির প্রতিস্পর্ধী তারা কেউ হতে চায়নি। এজন্য এ উপন্যাসের ট্র্যাজিক রস বড় ফিকে। সেখানেও শেষ পর্যন্ত আমাদের বিষন্ন করে ব্যাকুলা জননী চরিত্রটি’। তবে ‘স্বর্গাদপি গরিয়সী’ উপন্যাসটি লেখক বিভূতিভূষণকে আমাদের কাছে স্বমহিমায় প্রতিষ্ঠা করে। আর নব সন্ন্যাস ? তাঁর উপন্যাসমালার বাইরে এক স্বতন্ত্র উপন্যাস। ‘স্বর্গাদপি গরিয়সী’ সম্বন্ধে তাঁর অভিমত,—‘আমার নিজের শক্তিটুকুকে যতটুকু খাটাতে পেরেছি, তাতে ‘স্বর্গাদপি গরিয়সী’ তেই সেটা সবচেয়ে (আমার নিজের শক্তি অনুযায়ী) বেশি সার্থক হয়েছে। সাধারণ পাঠকের মধ্যে নীলাঙ্গুরীয়’ই বেশি জনপ্রিয়। কিন্তু, দেখেছি, যাঁরা একটু বেশি—Discriminating বা অন্তদৃষ্টি সম্পন্ন তাঁদের মতটা আমারই মতো। কারন ইচ্ছে (অর্থাৎ আমার এবং তাঁদের অভিমতের কারন) স্বর্গাদপি গরিয়সী একটা পূর্ণতর বৈচিত্র্য-সমৃদ্ধ জীবনের পূর্ণরূপ। বইটি জীবনীমূলক। আমার নিজের মায়ের জীবন নিয়ে আমি একটি বিশেষ (Individual) কন্যা-বধূ-জননী-গৃহিনীর জীবন থেকে নারীর মাতৃত্বের আকৃতিকে ফোটাবার চেষ্টা করেছি। অর্থাৎ মা থেকে মাতৃত্বে (Mother থেকে Motherhood)। যে মাতৃত্বের স্বপ্ন শৈশব থেকেই, প্রকৃতির কোন বিধানে জানি না, নারীর মনে সঞ্চিত হতে থাকে। কথাটা এইজন্যে বললাম যে, ঠিক এইভাবে পুরুষের মনে পিতৃত্বের স্বপ্নটা জাগে না। বইখানিতে আমার খানিকটা সুবিধা হয়েছে, আমি স্বভাবতঃই মূল চরিত্রের জীবন এবং পরিবেশ সম্বন্ধে পূর্ণভাবে অভিজ্ঞ। বলা বাহুল্য, এই মূল চরিত্রটিকে ফোটাতে আমি প্রয়োজন মত কল্পনার সাহায্য নিয়েছি’। আর নব সন্ন্যাস গ্রন্থ সম্বন্ধে তার অভিমত,—‘একজন সাহিত্যিক রাজনীতিতে প্রত্যক্ষভাবে লিপ্ত না হয়েও দেশের কথা ভাবতে পারেন। নব সন্ন্যাস গ্রন্থে আমার তেমন ভাবনার প্রতিফলন আছে। এ কথাও ঠিক স্বদেশী বিপ্লবী আন্দোলন সম্পর্কে আমার শ্রদ্ধা গভীর। সেই শ্রদ্ধা নিয়েই নব সন্ন্যাস লিখি।….কাত্রাস গড় কয়লাখনি বেশ ভাল ভাবেই দেখার সুযোগ ঘটে। সেই খনির পরিবেশ, সেখানকার শ্রমিক জীবন ভীষন ভাবে প্রভাবিত করে। নব সন্ন্যাস উপন্যাসে আমি তাদের জীবন কথাই লিখেছি। অবশ্য পরিণতিতে গান্ধীজির আদর্শে একটা আশ্রমের কথা আছে। ব্যক্তিগতভাবে গান্ধীজির মতাদর্শ সম্পর্কে আমার ধারনা যা-ই হোক না কেন, সেদিন দেশের বুকে গান্ধীজির অমোঘ প্রভাব ছিল জলন্ত সত্য। তাই মনে হয় আমি সত্যভ্রষ্ট হই নি’।
বিভূতিভূষণকে ‘অকৃতদার’ বলা যাবে কিনা সে বিষয়ে সামান্য মতভেদ আছে। তবে তিনি স্বীকার করেছেন,—‘আমি তা মনে করি না। একমাত্র দাম্পত্য জীবনের ঘনিষ্ঠতা ব্যতীত বাকি সবই তো আমার অভিজ্ঞতায় আছে’। অনেকের মতে আবার তাঁর সৃষ্ট নারী চরিত্রগুলি স্নেহময়ী করুনার আধার, এই ছায়াই তাঁর রচনায় প্রতিফলিত হয়েছে। নারীকে তিনি মাতৃরূপেই দেখেছেন। যেমন কয়েকটি বিশেষ চরিত্র—‘সৌদামিনী’ (নীলাঙ্গুরীয়), ‘চম্পা’ (নব-সন্ন্যাস), ‘হেনা’ (দুইকন্যা), ‘ডোরা’ (তোমারই ভরসা) ইত্যাদি। তবে তিনি বলেছেন,—‘আমার সাহিত্য সাধনার মূল প্রেরণা নারী সৌন্দর্য, নারী মাধুর্য, নারী বিষ্ময় (জীবন তীর্থ ৮৫ পৃষ্ঠা)’। আর এক জায়গায়,—‘অসম পর্যায়ের নায়ক-নায়িকা—এটা বেশ কৌতুকজনকই বোধ হোল আমার। অবশ্যই সবক্ষেত্রেই নয়, তবে কয়েকটি Prominent নিশ্চয়ই। অবচেতন মনেরই কাজ, যদিও একটা হেতু আছেই ওর মধ্যে, Contrast-এ সম্বন্ধটা জোরাল করা….’। তবে তাঁর অকপট স্বীকারোক্তি,—‘আমি নিজে জীবনে অনেকবার ভালবেসেছি, এক এক করে গুনে দেওয়া শক্ত হবে, চিঠিও যাবে অনর্থক বেড়ে;….নিজে কৈশোর থেকে নিয়ে যৌবন পর্যন্ত এত ভালবাসিয়াছি, ভালোবাসার পরিভাষায় এত জনকে ‘মনেপ্রানে’ চেয়েছি যে যদি ক্ষমতা থাকত তো মোগল হারেমের মতো অত না হোক, অন্তত জন কুড়ি পঁচিশ ভালোবাসার পাত্রীর জীবন দুঃসহ করে তুলতাম। কথাটা অপ্রিয় হলেও সত্য, জানি না অপরের ক্ষেত্রেও কিনা। আর, আশ্চর্য, যখনই যাকে ভালোবেসেছি, তার জীবনের কথা খতিয়ে দেখিনি বড় একটা, শুধু মনে হয়েছ, না পেলে আমার জীবনটা ‘মরুভূমি হয়ে য়াবে’— ….শুধু এইটুকু রক্ষা যে, একসঙ্গে নয়। একজনকে না পাওয়ার পর আর একজনকে ঘিরে। সময়ের অন্তরালে কোথাও হ্রস্ব, কোথাও দীর্ঘ (আমার সাহিত্য জীবন, রচ—১ম খণ্ড)।
১৩২২ (১৯১৫) সালে ‘অবিচার’ গল্পটির জন্য ‘প্রবাসী’ পত্রিকার তরফ থেকে তাঁকে পুরস্কৃত করা হয়েছিল। সাহিত্য জগতে তাঁর এই স্বীকৃতি জীবনের শেষ দিন পর্যন্ত বহুবার পেয়েছেন। পুরস্কার তাঁকে কখনই সেই ভাবে বিচলিত করে নি। আত্মতৃপ্তি তারমধ্যে কখনও সেভাবে ধরা পড়ে নি। সাহিত্য সৃষ্টিতে তা বাধা হয়ে দাঁড়ায় নি। ১৩৬৪ (১৯৫৭) সালে আনন্দ বাজার পত্রিকা গোষ্ঠী তাঁকে আজীবন সাহিত্য সাধনার স্বীকৃতি হিসাবে সুরেশচন্দ্র স্মৃতি পুরস্কার (আনন্দ) প্রদান করেন। ওই বছরই কলকাতা বিশ্ব বিদ্যালয়ের পক্ষ থেকে তাঁকে শরৎ স্মৃতি পুরস্কার স্বরূপ স্বর্ণপদক প্রদান ক়রা হয় কাঞ্চনমূল্য (অনুমান) গ্রন্থের জন্য। ১৩৬৫ সালের ৪ঠা আশ্বিন হাওড়ার সাহিত্যসংস্কৃতি পরিষদ তাঁকে সম্বর্ধনা জানান। ১৯৬৫ সালের আগষ্ট মাসে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের গুনীজন সম্বর্ধনা সভায় বিভূতিভূষণ সম্বর্ধিত হন। ঐ বছরই তিনি কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের আমন্ত্রনে শরৎ স্মৃতি বত্তৃত্বা দিয়েছিলেন, পরবর্তী কালে এই স্মৃতি বক্তৃত্বা মালার বিষয় ‘সামগ্রিক দৃষ্টিতে প্রভাত কুমার’ নামে গ্রন্থাকারে প্রকাশ পায়। ১৯৬৯ সালে বিহার-বাংলা সমিতির ভাগলপুর অধিবেশনে তাঁকে সম্বর্ধনা জানান হয় সাহিত্য সেবার জন্য। ১৯৭২ সালে ‘এবার প্রিয়ংবদা’ উপন্যাসের জন্য তিনি রবীন্দ্র পুরস্কার পান। এই উপলক্ষে ঐ বছর ২৭ আগষ্ট বিহারের কয়েকটি সাংস্কৃতিক সংস্থা তাঁকে মিলিতভাবে সম্বর্ধনা জানায়। এ ধরনের আরে দুটি সম্বর্ধনা তিনি লাভ করেছেন দ্বারভাঙ্গা-লাহেরিয়াসরাই (মিলিতভাবে) ও সমস্তিপুর থেকে। ১৯৭৩ সালে কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ‘সামগ্রিক সাহিত্যকৃতির জন্য’ তাঁকে জগত্তারিণী পদক দিয়ে তাঁকে পুনরায় সম্মানিত করেন। ১৯৭৪ সালে বিহার-বাঙ্গালী সমিতির মজঃফরপুর বার্ষিক অধিবেশনে তাঁর আশি বছর পূর্তি উপলক্ষে সম্বর্ধনা জানান হয়। ১৯৭৫-এর আগষ্ট মাসে, কলকাতা বিশ্বাবিদ্যালয়ের আমন্ত্রনে ‘ডি-এল-রায়. রীডারশিপ বক্তৃত্বা’ দিয়েছেন। বিষয় ‘বঙ্গ সংস্কৃতির ত্রিধারা’। ১৯৭৮ সালে শরৎসমিতি তাঁকে শরৎ পুরস্কারে ভূষিত করেন। এই বছরেতেই বারাণসীতে অনুষ্ঠিত ‘নিখিল ভারত বঙ্গ সাহিত্য সম্মেলনের’ সুবর্ণজয়ন্তী পদক পান। ১৯৮২-তে হাওড়া বিবেকানন্দ আশ্রম তাঁকে তারাচরণ বসু স্মৃতি পুরস্কার প্রদান করে। ১৯৮৪ সালে পাটনায় বেঙ্গলী একাডেমী ৯০ বছর পূর্তি উপলক্ষে তাঁকে সম্বর্ধনা জানায়। ১৯৮৬ সালের ২৩ শে ডিসেম্বর বর্ধমান বিশ্ববিদ্যালয় সাম্মানিক ডি-লিট. ডিগ্রী প্রদান করেন। ১০ই জানুয়ারী ১৯৮৭ সালে বিশ্বভারতী দেশিকোত্তম উপাধিতে ভূষিত করেন। এছাড়া বিহারের সাহিত্যিক বিভূতিভূষণকে বিহার সরকার তাঁর সাহিত্য সাধনার জন্য ১৯৭৩ সাল থেকে মাসিক তিনশো টাকা সম্মান দক্ষিনা দিয়ে এসেছেন আমৃত্যু। এছাড়া বিহার-বাংলা একাডেমী প্রতিষ্ঠা হবার পর থেকে আমৃত্যু তিনি ছিলেন একাডেমীর অবৈতনিক চেয়ারম্যান।
প্রবাসী বিভূতিভূষণ সত্যই অপ্রবাসী হয়ে বাংলা সাহিত্যের জন্য নিরলস ভাবে কাজ করে গেছেন। পাশাপাশি সাধ্যমত সামাজিক ও সাংস্কৃতিক ক্ষেত্রে। প্রথম দিকে বিহার-বেঙ্গলী এ্যাসোসিয়েশনের মাধ্যমে তাঁর প্রচেষ্টা তিনি শুরু করেছিলেন। এ্যাসোসিয়েশনের প্রতীক চিহ্নটি তাঁরই নির্ধারিত—মৈত্রীতে নিবদ্ধ দুটি হাত করমর্দনের ভঙ্গিতে। তাঁর মতে এর তাৎপর্য ‘সংহতি ও সমন্বয়’। দ্বারভাঙ্গায় বাঙালী সমিতির প্রতিষ্ঠা বার্ষিক অনুষ্ঠানে ‘অপ্রবাসী’ নামে একটি পত্রিকাও প্রকাশ করেছিলেন যাতে ভারতবর্ষের যে কোন রাজ্যের বাঙালীরা ভাবতে পারেন তারা প্রবাসী নয়। তাঁর শুধু ভারতে নয় বাংলা সাহিত্য চর্চার প্রাণ কেন্দ্রেই আছেন। এ্যাসোসিয়েশনের সম্বন্ধে এক সাক্ষাৎকারে তিনি বলেছেন,—‘যতদূর মনে পড়ে মিঃ পি. আর. দাশ (পাটনার বিখ্যাত ব্যারিষ্টার ও দেশবন্ধুর ভাই) প্রমুখের চেষ্টায় বিহার-বাঙ্গালী এ্যাসোসিয়েশনের প্রতিষ্ঠা। বছর দুই সভাপতি হিসাবে থাকবার পর আমি সভাপতির পদ ত্যাগ করি। কেন না, দ্বারভাঙ্গা থেকে পাটনায় নিয়মিত যোগাযোগ রাখা শক্ত, আবার না রাখলেও কাজকর্ম ব্যাহত হয়। তবে, বিহারের প্রত্যেকটি বড় শহরে এর শাখা আছে, দ্বারভাঙ্গা শাখার আমি প্রায় স্থায়ী সভাপতি হিসাবে রয়ে গিয়েছি’।
সাহিত্যিকদের মধ্যে মজলিস আড্ডা তৎকালীন যুগে এক বিশেষ তাৎপর্যমণ্ডিত ছিল। আজ এ ব্যাপার ভাবাই যায় না। এই মজলিস আড্ডায় তিনি প্রায়ই যোগ দিতেন সময় সুযোগ মতো। তবে মজলিসি হিসেবে নন। র্নিবকার শ্রোতা হিসাবে। এই মজলিসি আড্ডার মধ্যে বিখ্যাত ছিল কালু ঘোষ লেনের ‘বারবেলা ক্লাব’, ধর্মতলা স্ট্রীরে ‘বুধমণ্ডলী’ পরবর্তী কালে মিত্র ও ঘোষের সাহিত্য বাসর। হাওড়ার সাহিত্য সংস্কৃতি পরিষদের সঙ্গেও তাঁর যোগাযোগ ছিল অত্যন্ত নিবিড়। এই মজলিস সম্বন্ধে তাঁর অভিমত,—‘আমরা নিজেদের রচনা এখানে পড়তাম, পরে একে অন্যের রচনা বিষয়ে আলোচনা করেছি। আমাদের উদ্দেশ্য ছিল একটা সুস্থ সাহিত্যিক পরিবেশ গড়ে তোলা। আমাদের কোন মুখপত্র ছিল না। আলাপ আলোচনাতেই সীমাবদ্ধ ছিল আমাদের প্রয়াস।
এখানে আসতেন রমাপদ মুখোপাধ্যায়, কবি গোবিন্দ মুখোপাধ্যায়, হাওড়ার প্রসিদ্ধ ব্যবসাযী অনুকূল চন্দ্র চট্টোপাধ্যায়, ডঃ নিমাই সাধন বসু, হরিশঙ্কর বন্দ্যোপাধ্যায়, আর আসতেন এখনকার দিনের প্রখ্যাত লেখক শংকর’।
আর বারবেলা ক্লাব সম্বন্ধে তিনি বলেন,—‘আমার সাহিত্যিক জীবনে যার প্রভাব খুবই বেশি। বৈঠকটি বসত বঙ্গবাসী কলেজের বোটানীর অধ্যাপক বুদ্ধদেব ভট্টাচার্যের বাড়িতে। সুকিয়া স্ট্রীটের কাছে, বোধহয় গিরিশ ন্যায়রত্ন লেন-এ। এখানে আর আসতেন নলিনীকান্ত সরকার (বর্তমান পণ্ডিচেরী বাসী), বিনয় বসু এবং জেনারেল প্রিন্টার্স-এর সুরেশ দাশ। আমি দ্বারভাঙ্গা থেকে এসে এখানে থেকেছি অনেকবার। আমার রচনা সম্পর্কে এঁদের সকলের আগ্রহ ছিল অপরিসীম। নলিনীকান্ত সরকার এবং সাহিত্য-রসজ্ঞ বুদ্ধদেববাবু আমার লেখার আলোচনা করতেন সহৃদয়ভাবে, বিনয় বসু (যিনি ছিলেন একজন Finished Artist) রচনার মর্ম অনুসরণ করে গ্রন্থগুলিকে চিত্রিত করতেন আর সুরেশ দাশ মশাইয়ের যত্ন ছিল বইগুলি যাতে সৌষ্ঠবমণ্ডিত হয়ে প্রকাশিত হয়। এর আগে ‘রাণু’ পর্যায়ের গল্পগুলি অবশ্য ‘শনিরঞ্জন’ থেকে প্রকাশিত হয়েছে। কিন্তু ছোট সাহিত্য বৈঠকটি সাহিত্যিক হিসাবে আমার আত্মবিশ্বাস নিশ্চিত করে। এছাড়াও আর একটা কথা—বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ও মাঝে মাঝে এসেছেন এখানে; কলকাতা থেকে বাস তুলে দেবার পর কখনও কখনও থেকেছেনও। বুদ্ধদেববাবুর সঙ্গে তাঁর খুবই যোগাযোগ ছিল। তবে এই আসরে তাঁর সঙ্গে আমার কখনও সাক্ষাৎ হয় নি। দেখা হয়েছে অন্যত্র। হয়তো ‘শনিবারের চিঠি’ দলের সঙ্গে কোথাও একসঙ্গে নিমন্ত্রনে গিয়েছি। একটু জোর দিয়ে কথা বলার অভ্যাস ছিল বিভূতিবাবুর। সাহিত্যে তাঁর আবির্ভাবটাই তো একরকমের জোর চমক লাগিয়ে। কথাটা আমি বলেছিলাম তাঁর স্মৃতি সভায়-পুরনো সিনে হলে। সেদিন খুব Inspired হয়ে বক্তৃত্বা করি’।
দৈনন্দিন জীবন যাত্রায় মাঝে মাঝেই তিনি হয়ে পড়তেন শ্রান্ত ক্লান্ত। এই সব বিষন্ন মুহুর্তগুলি তিনি কাটাতেন শিশুদের মধ্যে। ওরা ছিল তাঁর অক্সিজেন। নিজেকে নির্মল করে আবার ফিরে আসতেন কর্মের জগতে। বহেমিয়ান জীবনে তিনি বিশ্বাসী ছিলেন না। তবে ভ্রমনের নেশা ছিল আশৈশব থেকেই।—‘পাঠশালার সঙ্গে মোটামুটি একটা সুস্থ সম্বন্ধ রেখে অবাধে ঘুরে বেড়িয়েছি বনে-জঙ্গলে, মাঠে-ঘাটে। সে যে কি মুক্তির স্বাদ….বাপে তাড়ান মায়ে খেদানো ছেলের মত অবাধ জীবন। সেই সুযোগে আমি জেনেছি বাংলার প্রকৃতিকে। আমার উত্তর জীবনে ইতস্ততঃ ভ্রমণের নেশা আমার শৈশবের এই অবাধ স্বাধীনতার ফল। আমার অনেক ছোট গল্পে এবং কোনো কোনো উপন্যাসে যে পাড়াগাঁয়ের ছবি দেখতে পাও তার মূলে আমার এই শৈশবে পাওয়া অভিজ্ঞতার মূল্যকম নয়। পল্লী বাংলাকে এরকমভাবে দেখার সুযোগ পরবর্তীকালে আর একবারই মাত্র পেয়েছি আমার যৌবনে’।
‘জায়গাটা খুবই ভালো লাগল; দূরে কাছে পাহাড় জঙ্গল দিয়ে ঘেরা ছোটনাগপুরের একটা অঞ্চল; রাঁচী থেকে ৬০ মাইল দূরে সাবডিভিসন সহর। ছোট-খাটো, ছিমছাম। রাজনীতির উত্তাপ অনেকটা শান্ত। ঠিক ঘুমন্ত না হলেও তন্দ্রাত্মক তো বটেই।
বেশ কিছুদিন থেকেই এইরকম একটা পরিবেশ মনটা চাইছিল। তিন পাহাড়-নদী-অরণ্য অঞ্চল ঘুরে এলাম মোটরে—১৬, ১০ আর ৬০ মাইল দূরত্বের। সে অপরূপ শান্তি অল্পকথায় বোঝান যায় না। ষাট মাইলেরই। নেতার হাট বিহারের এক মনোরম শৈলপুরী—সেখানে একটি রাত্রিও কাটল। সে রাত্রির রূপ আরও অবর্ণনীয়। এখানে রেডিও-লাউডস্পীকারের তাণ্ডব নেই, সুদূরোগত একটু রেতো মাদলের ধ্বনি, অরণ্যগন্ধমাখা। এখানেও গরম পড়ে এসেছে। বসন্তের পাখীগুলো রয়েছে, তবে কণ্ঠস্বর একটু শ্রান্ত, তন্দ্রাজড়িত’।….
এই মানুষটি তিরানব্বই বছর বয়সে যে রকম স্বভাবিক ভাবে চলাফেরা করতেন তা সত্যি আশ্চর্যের বিষয়। মৃত্যুর দশদিন আগে তিনি পাটনা যাত্রা করেন এবং সেখান থেকে ২৩ শে জুলাই কলকাতায় পৌঁছে ২৪ শে জুলাই রামকৃষ্ণ মিশন সেবা প্রতিষ্ঠানের এক অনুষ্ঠানে যোগ দেওয়ার কথা ছিল কিন্তু শেষ পর্যন্ত শারীরিক অসুস্থতার জন্য আর সম্ভব হয়ে উঠল না। ২৩ শে জুলাই কলকাতা যাওয়া স্থগিত রেখে ২৮ শে জুলাই পাটনা থেকে স্বেচ্ছায়, একরকম জোর করে দ্বারভাঙ্গা ফিরে আসেন মোটরে। ৩০ শে জুলাই ১৯৮৭ বেলা ১ টা ১০ মিনিট সজ্ঞানে তাঁর জীবনাবসান হয়।
সাহায্য কারী গ্রন্থ:-
১) অপ্রবাসী বিভূতিভূষন মুখোপাধ্যায়—মঞ্জুলী ঘোষ সম্পাদিত।
২) বিভূতিভূষন মুখেপাধ্যায় জীবন ও সাহিত্য সাধনা—সরোজ দত্ত।
৩) দেশ—৬২ বর্ষ ১১ সংখ্যা, ১০ই চৈত্র ১৪০১, ২৫ শে মার্চ ১৯৯৫। টাবর ১৯৫৯ সাল। প্রকাশকঃ ইণ্ডিয়ান এ্যাসোসিয়েড পাবলিশার্স। ১৯৯ পৃষ্ঠা। মূল্যঃ ৫.০০ টাকা।