একুশ শতকে প্রায় ২০টা বছর পার হতে চললো। এখনও দেখা যাচ্ছে আমাদের দুশ্চিন্তা, উদ্বেগ, এসবের মধ্যে দিয়ে যে হাতে গোনা কয়েক জনের মুখ বার বার আমাদের চোখের সামনে ভেসে ওঠে, বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁদের মধ্যে অন্যতম প্রধান। দুর্ভাবনা, উদ্বেগ বলতে আধুনিকতার যেসব সমস্যা নিয়ে আমরা জেরবার সেসবের কথা বলছি। ধরুন, প্রকৃতি নিয়ে পৃথিবী জুড়ে উদ্বেগের বাতাবরণ। আধুনিকতা আমাদের শিখিয়েছে নাগরিকতার মূল্য। অথচ নগরায়নের দাপটে কত মানুষ তাঁদের ঘরবাড়ি, কৃষিকাজের জমি হারাচ্ছেন—এই দৃশ্য তো সারা পৃথিবী জুড়ে। ১৯৫৫ সালে সত্যজিৎ রায়ের ‘পথের পাঁচালী’ ফিল্মটি পৃথিবী জুড়ে আলোড়ন ফেলেছে। তারপর ৫০ বছর কেটে গেছে। পথের পাঁচালী ফিল্মের পঞ্চাশ বছর উদ্যাপনের কথা সংগত কারণেই বলা হয়েছে। তবে, বিভূতিভূষণকে নিয়ে সমপরিমাণ আলোচনা হলে আমাদের দুশ্চিন্তার কেন্দ্রগুলো আমরা হয়তো আরেকটু ভালো করে দেখতে পারতাম।
আমাদের মনে পড়বে, ‘অপরাজিত’ উপন্যাসের সেই অংশটি যেখানে শ্রীমান অপূর্বকুমার রায় নিশ্চিন্দিপুরের ঘন সবুজ ছায়া পিছনে ফেলে এই নগরের হ্যারিসন রোড লাগোয়া পুটয়াটোলায় এক মেসে বাসা বেঁধেছে। সারা দিন কলকাতা দেখে বেড়িয়ে সে ভারী ক্লান্ত হয়ে সন্ধ্যায় ছাদে শুয়ে পড়েছে। শুয়ে শুয়ে সে ভাবে এই নগরীতে অপেক্ষা করে রয়েছে সারি সারি বিস্ময়চিহ্ন। সে মিউজিয়াম, গড়ের মাঠ এসব দেখতে পাবে তো। অপু বায়েস্কোপ দেখতে চায়। সে গাঁ থেকে বন্ধুদের মুখে গল্প শুনে এসেছে কলকাতায় ভারী বায়োস্কোপ দেখার চল। তাদের দেওয়ানপুরের স্কুলে একটা ভ্রমণকারী বায়োস্কোপের দল গিয়েছিল। সেইসময় সে জেনেছে বায়োস্কোপ ভারী অদ্ভুত জিনিস। সাদা পর্দায় সে দেখেছে রেলগাড়ি দৌড়োচ্ছে, একটি লোক হাত—পা নেড়ে কতরকম মুখভঙ্গি করে মানুষকে হাসাচ্ছে এইসব। অপু গল্প বলা বায়োস্কোপ দেখতে চায়। মেসের অখিলবাবুকে সে জিজ্ঞেস করে গল্প বলা বায়োস্কোপ কোথায় দেখা যেতে পারে।
গল্প বিষয়টির সাথে আধুনিকতার ভারী নিবিড় যোগাযোগ। এই কালপর্বেই তো নভেল নামক বস্তুর চল হলো। ঘরে ঘরে মেয়েরা লক্ষ্মীর পাঁচালি পড়া শেষ করে কাপড় চাপা দিয়ে নভেল খানা বুকের কাছে টেনে নেয়। বঙ্কিমবাবু, শরৎবাবুর রাজ্যে পাড়ি দিয়ে শিহরিত হচ্ছে আধুনিক মানুষ। অপুও বায়োস্কোপে এই গল্পকথা শুনতে চাইছে। সে তো নিজেই নিজের গল্প লিখে রাখছে হ্যারিসন রোডে, পটুয়াটোলায়, বেনিয়াটোলায়, কলেজ স্ট্রিট চারমাথার মোড়ে, গোলদিঘিতে, সার সার পুরোনো বইয়ের দোকানে। অপুর এই নতুন ছবি তার মা সর্বজয়া অর্ধেক দেখলেন, বাকিটা দেখতে পেলেন না। সর্বজয়া খুশিই হতেন যদি অপু তাঁদের পারিবারিক পেশা পুরুতগিরিতে বহাল থাকতো। কিন্তু অপু ততদিনে গ্লোব দেখা শিখে গেছে, কবিতা আবৃত্তি শিখেছে, ইংরেজি পড়তে শিখেছে, অ্যাটমোস্ফিয়ারে কতরকম গ্যাস এসবও সে জেনে গেছে। এইভাবেই অপুর কথা শুনিয়েছেন বিভূতিভূষণ।
তিনি যদিও গ্রাম প্রকৃতির সফল রূপকার বলেই বার বার চিহ্নিত হন। তবে তাঁর লেখায় অরণ্য—প্রান্তর, গ্রাম—নগর প্রতিটিই যে সমানভাবে উপস্থিত সেটাও যেন আমরা ভুলে না যাই। ‘আরণ্যক’ উপন্যাসের সত্যচরণ সরস্বতী কুণ্ডের জলে পরিদের দেখতে চেয়েছিল। জ্যোৎস্না রাতে ভিন রাজ্যের পরিরা জ্যোৎস্নার পোশাক পরে সরস্বতীর কুণ্ডের চারপাশে ঘুরে বেড়ায় তারপর জলে নাইতে নামে। সত্যচরণ ভাবে এই অপার সৌন্দর্যের দিকে সে কি মুগ্ধ হয়ে চেয়ে থাকতে পারবে? হয়তো কিছুক্ষণ পারবে তারপরই কাছারিবাড়ির কাজে ডাক পড়বে। আধুনিকতার এই ব্যস্ততা বিভূতিভূষণ সঞ্চার করেছিলেন তাঁর চরিত্রের মধ্যে।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৮৯৪ সালে ১২ সেপ্টেম্বর। পথের পাঁচালী, অপরাজিত, আরণ্যক, দৃষ্টিপ্রদীপ, আদর্শ হিন্দু হোটেল, কেদার রাজা, ইছামতী এসব তাঁর বিখ্যাত উপন্যাস। অভিযাত্রিক তাঁর ভ্রমণ বিষয়ক লেখা। এ ছাড়াও অসংখ্যা অসাধারণ ছোটোগল্প লিখেছেন তিনি।
সময়ের সঙ্গে সঙ্গে তাঁর প্রাসঙ্গিকতা এবং সমাদর ক্রমশ যেন বেড়েই চলেছে। তবু তাঁর গ্রাম—নগরের বাসিন্দা, আমরা, আদৌ কি হয়ে উঠতে পারছি!