বাংলা গদ্য সাহিত্যে যে সময় শরৎচন্দ্রের প্রবল উপস্থিতি সেই সময়ই তিন গদ্যকারের আবির্ভাব বাংলা গল্প উপন্যাসকে বহু যোজন এগিয়ে দিলো। চলতি কথায় এঁদের তিন বন্দ্যোপাধ্যায় বলা হয়-অর্থাৎ, বিভূতিভূষণ, তারাশঙ্কর এবং মাণিক বন্দ্যোপাধ্যায়। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়ের জন্ম ১৮৯৪ সালের ১২/১৬ সেপ্টেম্বর। এই বন্দ্যোপাধ্যায় পরিবার উত্তর ২৪ পরগণার বসিরহাটের কাছে বসবাস করতো। পরে বনগাঁর গোপালনগরে চলে আসেন। বিভূতিভূষণের বাবা মহানন্দ বন্দ্যোপাধ্যায় ছিলেন সংস্কৃত ভাষায় সুপণ্ডিত এবং পেশায় কথক।
বিভূতিভূষণ বনগাঁ হাই স্কুল, সে সময়ের রিপন কলেজ (এখনকার সুরেন্দ্রনাথ কলেজ) এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়য়ে পড়াশোনা করেন। নানা সব আশ্চর্য পেশায় যুক্ত থেকেছেন বিভূতিভূষণ। কখনও গোরক্ষিণী সভায় প্রচারকের কাজ করেছেন। আবার বেলগাছিয়ায় শিক্ষাবিদ খেলাৎচন্দ্র ঘোষের এস্টেটের ম্যানেজারের দায়িত্ব নিয়ে ঘাটশিলা- গালুডিহি-লবটুলিয়ায় কাজ করেছেন। কখনও হুগলিতে, আবার সোনারপুরের হরিনাভি হাই স্কুলে শিক্ষকতাও করেছেন।
১৯২৮ সালে ‘পথের পাঁচালী’ উপন্যাস প্রকাশিত হলে এই সৃষ্টিকাজকে স্বাগত জানিয়ে স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ লেখককে চিঠিতে লেখেন- তোমার এই সৃষ্টি দাঁড়িয়ে আছে সহজ সরল সত্যের ওপর। ক্রমশ তাঁর ‘অপরাজিত’, ‘আরণ্যক’, ‘বিপিনের সংসার’, ‘অথৈ জল’, ‘আদর্শ হিন্দু হোটেল’ প্রভৃতি উপন্যাস প্রকাশিত হয়। সে সময়ে কল্লোল ও কালিকলম গোষ্ঠীর লেখকদের চেয়েও একেবারে আলাদা বিভূতিভূষণের লেখা। তাঁর ‘তালনবমী’, ‘পুঁইমাচা’, ‘কিন্নরদল’, ‘স্বপ্ন-বাসুদেব’, ‘আইনস্টাইন ও ইন্দুবালা’, ‘ক্যানভাসার কৃষ্ণলাল’ প্রভৃতি ছোট গল্পও বাংলার চিরকালীন সম্পদ। তাঁর উপন্যাসে প্লটের ঠাস বুনট নেই। এক অধ্যায়ের সঙ্গে আরেক অধ্যায়ের বিশাল কিছু তফাতও নেই। অতীব অকিঞ্চিৎকর কোনও বস্তুকে তিনি মহার্ঘ বিষয় করে তোলার আশ্চর্য ক্ষমতা দেখিয়েছেন। পথের ধারে ফুটে থাকা ঘেঁটু ফুল কিংবা অরণ্যের গাছে ঝুলে থাকা থোলো থোলো বুনো ফল কিংবা লাল লাল করমচা- এসবই যেন বাংলার জনজীবনের স্মারক হয়ে উঠেছে। দোয়েল-কোয়েল নয়, ঝাঁক ঝাঁক ছাতার পাখির কথা বিভূতিভূষণ যেভাবে পাঠককে শোনান, তা অভূতপূর্ব। আসলে আশ্চর্য গদ্য ভাষা বিভূতিভূষণের বড়ো বৈশিষ্ট। প্রত্যন্ত গ্রাম কিংবা উত্তর কলকাতার পটুয়াটোলা কিংবা বেণিয়াটোলা তাঁর লেখায় অমরাবতীর মর্যাদা পেয়েছে।
সত্যজিৎ রায় একাধিক সাক্ষাৎকারে বলেছেন, ফিল্ম শিক্ষার্থীকে তন্নতন্ন করে বিভূতিভূষণ পড়তে হবে। সকলেই জানেন, সত্যজিৎ রায়ের হাত ধরে ‘পথের পাঁচালী’, ‘অপরাজিত’, ‘অপুর সংসার’, ‘অশনি সংকেত’ প্রভৃতি ছবি বাংলা ছবিকে বিশ্বের সিনেমা-দরবারে প্রথম প্রতিষ্ঠিত করেছে। আরেক কিংবদন্তি চিত্রপরিচালক ঋত্বিক কুমার ঘটক সারা জীবন স্বপ্ন দেখেছেন, বিভূতিভূষণের আরণ্যক নিয়ে ফিল্ম তোলার। রুশ দেশের মহান চিত্রনির্মাতা আন্দ্রেই তারকোভস্কির যেমন হ্যামলেট, ঋত্বিকের তেমন আরণ্যক।
ওদিকে আরব সাগরের তীরে বিভূতিভূষণের ছোট গল্প ‘হিঙের কচুড়ি’ তো ঝড় তুলেছে। রাজেশ খান্না শর্মিলা ঠাকুরের ব্লকবাসটার ‘অমর প্রেম’ আজও মাইলস্টোনের মর্যাদা পায়।
বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায়র শেষ উপন্যাস ‘ইছামতী’। ১৯৫০ সালে এই লেখক অকাল প্রয়াত হন। ইছামতী উপন্যাসের জন্যে তাঁকে মরণোত্তর রবীন্দ্র পুরস্কারে সম্মানিত করা হয়। প্রথম রবীন্দ্র পুরষ্কার প্রাপক সতীনাথ ভাদুড়ী। এর পর ১৯৫১ সালে ‘ইছামতী’র জন্য প্রয়াত বিভূতিভূষণকে পুরষ্কার দেওয়া হয়।
আজও বাঙালির আধুনিকতার অন্যতম প্রধান মুখ শ্রী অপূর্ব কুমার রায়। পথের পাঁচালী, অপরাজিত এবং আরণ্যক-এ গ্রামজীবন, নগরায়ন এবং প্রকৃতি-পরিবেশ নিয়ে আধুনিক সময়ের যে নানাবিধ রূপ-পরিবর্তন তার একজন প্রধান রূপকার অবশ্যই বিভূতিভূষণ।