ভৈরবচন্দ্র সরকারের পুত্র প্যারীচরণ সরকার কলকাতার চোরবাগানে মাতুলালয়ে ১৮২৩ সালের ২৩ জানুয়ারি জন্মগ্রহণ করেন। পনেরো বছরেরই তিনি পিতৃহারা হন। প্রথমে হেয়ার স্কুল ও পরে হিন্দু কলেজে পড়াশুনো করেন। তাঁর মানসিক গঠনে ডেভিড হেয়ারের বিরাট ভূমিকা ছিল। মেধাবী ছাত্র ছিলেন প্যারীচরণ। কৃতিত্বের সঙ্গে তিনি লাইব্রেরি একজামিনেশন পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। হুগলি স্কুলে শুরু করেন শিক্ষকতা, পরে বারাসত সরকারি স্কুলের প্রধান শিক্ষক হন। কলুটোলা ব্রাঞ্চ স্কুলেও প্রধান শিক্ষক ছিলেন। তারপরে সাহিত্যের অধ্যাপক হিসেবে যোগ দেন প্রেসিডেন্সি কলেজে। আমৃত্যু সেখানেই শিক্ষকতা করেছেন।
ছাত্রদরদী প্যারীচরণ ছিলেন এক নির্ভেজাল শিক্ষাব্রতী মানুষ। ডিগ্রি অর্জনের সঙ্গে সঙ্গে ছাত্ররা যাতে সমাজের উপকারে আসে, সমাজমনস্ক হয়ে ওঠে সে দিকে তাঁর বিশেষ নজর ছিল। ছাত্রদের স্বাধীন চিন্তা বিকাশের জন্য তিনি বারাসতের স্কুলে বিতর্ক সভা চালু করেছিলেন। সে সভা ছিল বেথুন সোসাইটির শাখা। পরে প্রেসিডেন্সি কলেজেও তিনি একই উদ্দেশ্যে স্থাপন করেন স্টুডেন্টস অ্যাসোসিয়েশন।
শুধু পুঁথিগত শিক্ষা নয়, ছাত্রদের নৈতিকতার মান উন্নত করার ভাবনাও ছিল তাঁর। তাই তিনি কলকাতায় ১৮৬৫ সালের জুলাই মাসে গঠন করেন জুভেনাইল অ্যাসোসিয়েশন। দূরদর্শী প্যারীচরণ বুঝেছিলেন বৃত্তিশিক্ষার গুরুত্ব। এই শিক্ষা জীবিকার্জনে সাহায্য করবে ছাত্রদের। তাই ১৮৫১ সালে তিনি বারাসত স্কুলে কৃষিবিদ্যা শিক্ষার আয়োজন করেছিলেন। থিয়োরিটিক্যাল ও প্র্যাকটিক্যাল — দু-ধরনের ক্লাশ থাকত ছাত্রদের জন্য। প্রধান শিক্ষক হয়েও প্যারীচাঁদ নিজেও অংশগ্রহণ করতেন বীজ বপন, রোপন ইত্যাদি কাজে। শ্যামল শস্যের হিল্লোলে বারাসতের স্কুলের বাগানটি মনোরম হয়ে উঠেছিল। নারী শিক্ষার ব্যাপারেও তাঁর ব্যাপক উৎসাহ ছিল। নবীনকৃষ্ণ ও কালীকৃষ্ণ মিত্রের সাহায্যে তিনি মেয়েদের স্কুল খোলেন। সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দিয়েছিলেন স্যার জেমস কোলভিন, স্যার এডওয়ার্ড রায়ান, ও বেথুনসাহেব। শ্রমজীবী মেয়েদের শিক্ষার কথাও ভেবেছিলেন তিনি। বারাসত ফিমেল স্কুল কমিটির তত্ত্বাবধানে তিনি শ্রমজীবী মেয়েদের শিক্ষার ব্যবস্থা করেন। মেয়েদের স্বনির্ভর করার জন্য সেখানে তিনি বৃত্তিশিক্ষারও আয়োজন করেছিলেন। ১৮৪৯ সালে বেথুন সাহেব যখন কলকাতায় মেয়েদের স্কুল খোলেন, তখন সংস্কারবদ্ধ মানুষেরা তাঁদের পরিবারের মেয়েদের যাতে সে স্কুলে পাঠান, তার জন্য প্যারীচরণ নানা চেষ্টা করেন। বাঙালির ইংরেজি শিক্ষার প্রাথমিক বই তাঁরই রচনা। রবীন্দ্রনাথও না কি সে বই পড়ে ইংরেজি শিখেছিলেন।
প্যারীচরণ ছিলেন সমাজমনস্ক মানুষ। তিনি লক্ষ্য করেছিলেন শিক্ষিত বাঙালি মদ্যপানে আসক্ত হয়ে নিজের ও সমাজের সর্বনাশ ডেকে আনছে। তাই তিনি বিদ্যাসাগর, শম্ভুনাথ পণ্ডিত, গিরীশচন্দ্র ঘোষ, কেশবচন্দ্র সেন প্রমুখের সহযোগিতায় ১৮৬৩ সালের ১৫ নভেম্বর গঠন করেন ‘বেঙ্গল টেম্পারেন্স সোসাইটি’। দেশের নানা স্থানে তার শাখা স্থাপিত হয়। পত্র-পত্রিকায় মদ্যপানের বিরুদ্ধে নানা রচনা প্রকাশিত হয়। প্যারীচরণ লেখেন; হিতসাধক’। তিনি আপশোশ করে বলেছিলেন, মদ্যপান প্রভৃতি ইউরোপীয় চরিত্রের বদগুণগুলি বাঙালি অনুকরণ করে, কিন্তু তাঁদের সদগুণগুলি আত্মস্থ করে না।
বিধবাদের দুঃখ-দুর্দশা তাঁকে ব্যথিত করত। বিধবা বিবাহের ব্যাপারে তিনি বিদ্যাসাগরের পাশে দাঁড়িয়েছিলেন। বহুবিবাহ ও পণপ্রথার বিরুদ্ধে তিনি নির্ভীকভাবে প্রচার করেন।
১৮৭৫ সালের ৩০ সেপ্টেম্বর আমাদের এই মহান পূর্বসূরী মৃত্যুবরণ করেন।
লেখক সিনিয়র ফেলোশিপপ্রাপ্ত গবেষক