রাজ্য সরকার বিধানসভায় বিধান পরিষদ নিয়ে প্রস্তাব আনতে চলেছে। প্রসঙ্গত, তৃণমূল এক দশক আগে বাংলায় ক্ষমতায় আসার পরেই বিধান পরিষদ গড়ার লক্ষ্যে বিধানসভায় সরকারি প্রস্তাব এনেছিল। তাতে বিরোধিতা করেছিল বামেরা। সেই প্রস্তাব একটি কমিটির কাছে পাঠিয়ে দেওয়া হলেও বিষয়টি আর এগোয়নি। বাংলা বিধানসভা নির্বাচনের আগেই মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তৃণমূলের প্রতিশ্রুতি পত্রে বিধান পরিষদ ফিরিয়ে আনার ব্যাপারে কথা দিয়েছিলেন। তৃতীয় বার রাজ্যে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় ক্ষমতায় ফেরার পরই ফের তোরজোর শুরু হয়। বিধান পরিষদ গঠনের প্রস্তাব এ বার মন্ত্রিসভায় পাশ হয়েছে।
পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভায় দ্বিকক্ষ আইনসভা চালু ছিল। যুক্তফ্রন্ট সরকারের আমলে এর জন্য রাজ্য সরকারের প্রচুর খরচ হতে থাকায়; এটির কোনও প্রয়োজন নেই, এই যুক্তিতে ১৯৬৯ সালের ১ আগস্ট ভারতীয় সংবিধানে পশ্চিমবঙ্গ বিধান পরিষদ অবলুপ্তি আইনবলে পশ্চিমবঙ্গ থেকে বিধান পরিষদ ও বিলুপ্ত হয়। কেবলমাত্র বাংলায় নয়, দেশের ২৮টি রাজ্যে ১৯৬৯ সাল পর্যন্ত বিধান পরিষদ ছিল। তারপর একে একে ২২টি রাজ্যে বিধান পরিষদের অবলুপ্তি ঘটে। তবে এখনও দেশের উত্তরপ্রদেশ, মহারাষ্ট্র, কর্নাটক, বিহার, অন্ধ্রপ্রদেশ-সহ ছ-টি রাজ্যে বিধান পরিষদ রয়েছে।
রাজ্যে বিধান পরিষদ ফেরানোর বিষয়ে শাসক দলের যুক্তি, জনতার ভোটে সরাসরি নির্বাচিত হয়ে আসার বাইরেও অনেক যোগ্য ব্যক্তি রয়েছেন। সেই সব ব্যক্তিত্বকে আইনসভায় আনা গেলে তা গণতন্ত্রের পক্ষে সুখকর হবে। শাসক দলের নেতৃত্ব এও জানান, সংসদে যেমন লোকসভা ও রাজ্যসভা আছে, রাজ্য স্তরের আইনসভাতেও তেমন দুই কক্ষ থাকলে বিভিন্ন অংশের প্রতিনিধিত্ব আরও নিশ্চিত করা যায়।
অন্যদিকে সিপিএমের রাজ্য সম্পাদক সূর্যকান্ত মিশ্রের বক্তব্য, নরেন্দ্র মোদির পথে হেঁটে অহেতুক ব্যয় না বাড়িয়ে এই করোনা পরিস্থিতিতে রাজ্য সরকারের উচিত মানুষকে চিকিৎসা, খাদ্য ও রোজগারে সাহায্য করা। কিন্তু তা না করলে বুঝতে হবে রাজ্য সরকার শাসক দলের কিছু লোককে পিছনের পুনর্বাসন দিতে বিধান পরিষদ গঠনের নামে খরচের বহর বাড়াতে চাইছেন। যে বিশাল খরচের বোঝা চাপবে জনগণের ঘাড়ে। কংগ্রেসের আব্দুল মান্নান উল্লেখ করেন, সাম্প্রতিক অতীতে তামিলনাড়ু তাদের রাজ্য বিধান পরিষদ গঠনের জন্য প্রস্তাব পাঠিয়েছিল, কিন্তু কেন্দ্রীয় সরকার তাতে অনুমোদন দেয়নি। সংসদেও বিষয়টি নিয়ে যাওয়া হয়নি।
বাম ও কংগ্রেসের এই বক্তব্যকে খণ্ডন করে তৃণমূলের সাংসদ সুখেন্দু শেখর রায়ের বক্তব্য, যারা শুধু খরচ বাড়বে বলেই রাজ্যে বিধান পরিষদ ফেরানোর বিষয়টাকে খারিজ করার চেস্টা করছেন তাদের কথা যুক্তিযুক্ত মনে হচ্ছে না। কারণ; গণতন্ত্রে ভারসাম্য খুব জরুরি। বিধানসভার কাজে কিছু ত্রুটি-বিচ্যুতি থেকে গেলে তার পর্যালোচনা করার সুযোগ বিধান পরিষদের থাকবে। ব্রিটেন বা আমেরিকায় এই কারণেই দ্বি-কক্ষ আইনসভা আছে।
তবে রাজনৈতিক বিশেষঙ্গদের একাংশ অনেক আগে থেকেই বলছেন, রাজ্যে বিধান পরিষদ ফেরানোর তোড়জোড় শুরু হতেই বাম, কংগ্রেস ও বিজেপি দলে ভাঙনের আশঙ্কা করছেন। বিরোধীরা যেমন তেমনি বাম ও কংগ্রেস নেতৃত্বের মধ্যে এই আশঙ্কা ধরে গিয়েছে যে রাজ্যে বিধান পরিষদ ফিরলে নেতা-কর্মীদের তৃণমূলে নাম লেখানোর স্রোত আরও জোরদার বইতে শুরু করবে।
ভাঙন ধরেছে খোদ বিরোধী দলনেতা শুভেন্দু অধিকারীর গড়েও। রবিবার বিজেপি ছেড়ে তৃণমূল কংগ্রেসের পতাকা হাতে তুলে নিয়েছেন নন্দীগ্রামের গেরুয়া শিবিরের কয়েকশো নেতা–কর্মী। এতে শুভেন্দুর গড় আর টিকবে কিনা তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে। রাজ্যে বিরোধী দলনেতা তথা দোর্দণ্ডপ্রতাপ নেতার গড়ে এভাবে ভাঙন ধরায় অস্বস্তিতে পদ্ম–শিবির। রবিবার নন্দীগ্রামের হরিপুর গ্রাম পঞ্চায়েত এলাকা থেকে বিজেপি ও অন্য দল থেকে প্রায় ৩৬০ জন নেতা কর্মী তৃণমূলে যোগ দিয়েছেন। এরপর প্রায় ২ হাজার বিজেপি নেতা-কর্মী তৃণমূলে যোগ দিতে পারেন।
ধাপে ধাপে প্রতিটি পঞ্চায়েত এলাকায় যোগদান পর্ব হবে বলে জানা যাচ্ছে। বিজেপির পাশাপাশি সিপিআইএম এবং কংগ্রেস থেকেও নেতা–কর্মীরা এদিন শাসকদলে যোগ দিয়েছেন। বিজেপি নেতা কর্মীদের দলবদল শুভেন্দুর কাছে বড় সেটব্যাক বলে মনে করছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। কেবল শুভেন্দুর গড় নয়, দুদিন আগে বিজেপি বিধায়কদের শিক্ষণ শিবিরেও অনুপস্থিত ছিলেন কয়েকজন বিধায়ক। এইভাবে প্রায় প্রতিদিন বিজেপির বিধায়করা যেভাবে দলের কার্যক্রমে অনুপস্থিত হয়ে তাদের অনীহা প্রকাশ করছেন এবং তৃণমূলে যোগদানের জন্য মরিয়া হয়ে উঠছেন তাতে শুভেন্দুর পক্ষে বিধানসভার বিরোধী নেতার পদ টিকিয়ে রাখাও এখন প্রশ্নের মুখে।
বিধানসভার ভবনের মধ্যেই বিধান পরিষদের অধিবেশন কক্ষ রয়েছে। নতুন বিধান পরিষদের জন্য আলাদা করে কোনও কক্ষ বা ভবন তৈরি করার দরকার পড়বে না। কিন্তু প্রশ্ন বিধান পরিষদ ফেরানো নিয়ে যে বিতর্ক তা সত্যি সেই আশঙ্কা থেকে? যদি বিধান পরিষদ তৈরি হয়ে যায়, তবে তৃণমূলে ভরা জোয়ার আসবে। বিধান পরিষদের তেমন গুরুত্ব না থাকলেও সদস্যরা মন্ত্রী হতে পারেন। বিধায়কের সমমর্যাদা পেতে পারেন।
নিয়ম অনুযায়ী বিধানসভার সদস্য সংখ্যা এক তৃতীয়াংশ হতে পারে বিধান পরিষদের আসন। সেই নিয়মানুসারে বাংলার বিধান পরিষদের সদস্য হতে পারবেন ৯৮ জন। সেই সদস্যদের এক তৃতীয়াংশ নির্বাচিত হবে পুরসভা, পঞ্চায়েত, পঞ্চায়েত সমিতি এবং জেলা পরিষদ থেকে আর এক তৃতীয়াংশ নির্বাচিত হবে বিধানসভার সদস্যদের ভোটে। এমনটাই নিয়ম বিধান পরিষদ গঠনের নিয়মে। কার্যত এই দুই ক্ষেত্রেই তৃণমূ সংখ্যাগরিষ্ঠ। এছাড়া শিল্প-সংস্কৃতি-বিজ্ঞান প্রভৃতি ক্ষেত্র থেকে কয়েকজনকে নির্বাচিত করতে পারেন। তার মানে বিধান পরিষদেও যে রাজ্য সরকারের দলে ভারী হবে।সেদিক থেকে বিরোধী্রা একেবারেই একেবারেই সুবিধা করতে পারবে না। আর বাম-কংগ্রেসের কথা তো একেবারেই অপ্রাসঙ্গিক। তবে বিরোধি দলে ভাঙ্গনের স্রোত বইবে বলে যে রাজনৈতিক বিশেষঙ্গরা মনে করছেন, তাদের কথাও উড়িয়ে দেওয়া যাচ্ছে না।