| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

কথা খুঁজে পাই : বিদিশা বসু

Reporter
বিদিশা বসু / ৭৩৯ জন পড়েছেন
আপডেট বুধবার, ২৭ জুলাই, ২০২২

ছোট্ট পুকুরপাড়… তাকে ঘিরে আম, কাঁঠাল, নারকেল গাছের সারি। রাস্তার ধারেই বাড়ি, কিন্তু বড় বড় গাছের আড়ালে অনেকটা গোপন থাকে এ বাড়ির সজীব সৌন্দর্য। রাস্তার পাশে ছোট খালের উপরে সাঁকো করা… বাড়ির ফটক দরজা পর্যন্ত। তারপর গেট থেকে সিমেন্ট বাঁধানো রাস্তা ধরে খোলামেলা ছোট দোতলা বাড়িটি। বাড়ির মধ্যে কোন প্রাচুর্যের ছোঁয়া নেই, অতি সাধারণ ছিমছাম। রোজের জীবন কাটানোর জন্য যতটুকু সরঞ্জাম প্রয়োজন ততটুকুই রয়েছে এখানে। কিন্তু বিঘা খানেক জায়গা জুড়ে কতরকম বড় বড় গাছের সমারোহ। সারাদিন পাখিদের কিচিরমিচির, সেই সাথে উঠান জুড়ে রঙবেরঙের ফুলগাছ। তবে নারকেলগাছের সারির ফাঁকে ঐ পুকুর পাড়ের বাঁধানো জায়গাটা সবচেয়ে মনোরম। কেমন যেন প্রশান্তিতে ভরে যায় মন।

গত এক সপ্তাহ ধরে হিয়া ঐ পুকুর পাড়ে অনেক সময় কাটায়। কত কথার মেলা মনের কোণে উঁকি দেয়। কখনো একা মনে বকবক করে যায়, কখনো বা অপলকে জলের দিকে তাকিয়ে থাকে। আবার সন্ধ্যা নামার আগে অঝোরে চোখের জল ফেলে নিজেকে শান্ত করছে হিয়া। এ জায়গা এত নিশ্চুপ নীরব… ওকে বিরক্ত করার মত কেউ নেই এখানে। তাই ২-১ দিন স্বজন হারানোর বেদনার মত হাহাকার করে চিৎকার করেছে সে। যদি মন হালকা হয় তাতে! কিন্তু দিনের শেষে সেই এক দৃশ্য, একটা দমবন্ধ করা যন্ত্রণা বুকের ভেতর আপনমনে ঘোরাফেরা করে বাড়ায়।

এ বাড়িতে থাকে দুটো মানুষ… হিয়ার দিদুন আর তার সর্বক্ষণের সাথী পদ্মমাসি। দিদুনের বয়স প্রায় ৮০-র দোরগোড়ায়। তবু দিদুন এ ভিটেমাটি ছেড়ে যেতে চায় না। বাংলাদেশ থেকে আসার পরে এই পাথরপুর গ্রামে দাদু-দিদুন নিজ হাতে এই বাড়ি গাছ পালা সব সাজিয়েছে। দেশভাগের সময়ের স্মৃতি আজও উজ্জ্বল দিদুনের মনে। গ্রামের বাড়ির আদলে তাই পুকুর, বড় গাছ, খোলা বাড়ি… সব তৈরি করা। তবু কি সে আসল ভিটের স্বাদ মেটানো যায়! এখানে বসবাস শুরুর প্রথমে এ বাড়ি কাঁচা ছিল। দাদু স্থানীয় স্কুলে শিক্ষকতা করে আর দিদুনের বুদ্ধিমত্তা দিয়ে তিল তিল করে গড়ে তোলা এ বাড়ি আজ এত স্বচ্ছল। হিয়ার মা একমাত্র মেয়ে দাদু-দিদুনের। তখনকার যুগে এক সন্তান, তাও আবার কন্যাসন্তান… এমন হলে দ্বিতীয় সন্তানের আসার সম্ভাবনা থাকত। কিন্তু দাদু-দিদুন কখনও তাদের মেয়েকে শুধু কন্যা হিসেবে দেখে নি। তারা হিয়ার মা-কে পড়াশোনার সব রকম সুযোগ করে যোগ্য সঙ্গ দিয়েছিলো। সেই কারণে আজ হিয়ার মা শহরের এক নামকরা কলেজের ভূগোলের প্রফেসর। ঐ গ্রামে হিয়া-র মা ছিল গর্ব করার মত। কালের ধর্ম মেনে একদিন মেয়ের বিয়ে হয় তার উপযুক্ত পাত্রের সাথে। হিয়ার বাবা ও মা এক কলেজে পড়তো। সেই সূত্রে আলাপ। তার বাবাও সরকারি বড় পদে আসীন। কিন্তু ব্রাহ্মণ পরিবারের মেয়েকে তথাকথিত নিম্ন জাতের পরিবারে বিয়ে দিতে কিন্তু হিয়ার দাদুর প্রথমে আপত্তি ছিল। কিন্তু হিয়ার দিদুন, সেই সময়ে মেয়ের পাশে থেকে ভালবাসার স্বীকৃতি দিতে প্রস্তুত ছিল। আর তাঁর জেদের কাছে মাথা নত করতে বাধ্য হয় হিয়ার দাদু। হিয়া বাবা-মায়ের এ বিয়ের গল্প অনেকবার শুনেছে। পাথরপুর গ্রামে তখন লোকের মুখে মুখে ছিল সে কথা। তখনকার সমাজে ভিন্ন জাতে বিয়েও বেশ কঠিন সিদ্ধান্ত ছিল। কিন্তু দিদুনের কাছে ভালবাসা আর মনই গুরুত্বপূর্ণ ছিল। এ কথা মায়ের মুখে অনেকবার শুনেছে হিয়া। যদিও গ্রাম্য বয়স্ক দিদুনকে দেখলে বোঝা যায় না যে, তার মধ্যে এত জেদ লুকিয়ে আছে।

এ হেন হিয়া গত ১৫ দিন ধরে বিষাদের ছোঁয়া. আক্রন্ত। কিছুতেই তা থেকে বেরিয়ে আসতে পারছে না। বাবা মা কাজে ব্যস্ত। তবু মায়ের চোখে আড়াল হয় নি কিছু। কলেজের পাট চুকিয়ে হিয়া এখন উচ্চতর ডিগ্রি লাভের জন্য ইউনিভার্সিটিতে ভর্তির অপেক্ষা করছে। সারাদিন মেয়েকে কেমন মন মরা হয়ে বসে থাকতে দেখে একদিন হিয়ার মা বেশ চিন্তায় পড়েন। প্রথমে ভাবলেন যে কলেজ শেষ হওয়ায় বাড়ি বসে থাকতে থাকতে মন খারাপ হচ্ছে হয়ত। তাই একদিন মেয়েকে জিজ্ঞেস করলেন… ‘কিরে, সারাদিন কি করে কাটাস। কিছু একটা কোর্সে ৩/৪ মাসের জন্য ভর্তি হয়ে যা। আমি খোঁজ নেবো?’

হিয়া মাথা নাড়িয়ে অসম্মতি জানায়। তখন ওর মা আরও কাছ ঘেসে এসে মেয়ের পাশে শুয়ে এমনি গল্প করতে থাকে। কলেজে কি হলো, কোন কলিগ কি বললো, ওর বাবা এ বছর পুজোতে কোথায় যাওয়ার প্ল্যান করছে… এ সব বলতে বলতে মেয়ের চুলে বিলি কেটে দিতে থাকে। হিয়াও মাকে জড়িয়ে ধরে শক্ত করে। হঠাৎ হিয়ার মা অনুভব করেন তাঁর নাইটি ভিজে যাচ্ছে মেয়ের চোখের জলে। সে কি আকুল কান্না মেয়ের… উনি একটা কথা না বলে শুধু জড়িয়ে থেকে মেয়ের কষ্টকে বুকের মধ্যে অনুভব করতে থাকেন। হৃদয়ে হৃদয়ে মিশে থাকা… হিয়ার জমে থাকা দুঃখ ওর মায়ের মনকে আরো বেশি নোনা জলে ডুবিয়ে দিতে থাকলো। তিনি ভাবতে থাকলেন, কোথায় ওনার খামতি রয়ে গেল। অনেক ভেবে দেখলেন… নিজের কাজ, সংসার, বাইরের জগতে ব্যস্ততার ফাঁকে মেয়ের সাথে তার আত্মিক গল্প করার সময়টাই ছিল না। সেই ছোটবেলার পরে আর হিয়ার বন্ধু বান্ধব, কলেজের গল্প কিছুই শোনা হয় নি তাঁর। মেয়ের যখন যা লেগেছে, উনি শুনেছেন, সেটা পূরণ করার চেষ্টা করেছেন। কিন্তু হিয়াকে দেখেও কখনও অসংলগ্ন বা কোন অস্বাভাবিক কিছু চোখে পড়ে নি। বরাবরই খুব শৃঙ্খলাপরায়ণ এবং বাধ্য মেয়ে। তাই কখনও আলাদাভাবে মেয়ের মনের জগতে কি ঘটছে সেটা ভাবার অবকাশ আসে নি। হিয়ার ভবিষ্যৎ পড়াশোনা, ওর ক্যারিয়ার এসব নিয়েই আলোচনা ভাবনা চলত। কিন্তু মেয়েও যে বড় হয়েছে, তারও মনের মধ্যে একটা জগৎ তৈরি হচ্ছে, সেটা ভুলে গেছিলেন।

সেই মুহূর্তে হিয়ার মায়ের নিজের ওই বয়সের কথা মনে পড়লো। কলেজ হস্টেল থেকে সপ্তাহ শেষে বাড়ি ফিরলে তাঁর মা কত প্রশ্ন, কত গল্প শুনতে চাইতো। সে সব কথায় কখনও শাসন থাকত না। মা যে কখন বন্ধু হয়ে গেছিলো তা বুঝতেই পারে নি। খুব অকপটে তাই হিয়ার বাবার সম্পর্কে জানিয়েছিল সে। মাও উৎসাহ সহকারে শুনতে চাইতো তাদের কথা। এমনও দিন গেছে যে, তাদের মধ্যে ভুল বোঝাবুঝি হয়েছে, মা ঠিক তা ধরতে পারতো। বন্ধুর মত পাশে থেকে সেই মুহূর্তে কি সমাধান তা নিয়ে উপদেশ দিত। এমন ছিল আজ থেকে ৩০ বছর আগের সময়। আর এই এত আধুনিকতার আঁচ এসেও হিয়ার মা তাঁর মেয়ের মনের কাছে পৌঁছাতে পারলেন না, সেই দুঃখ তাঁকে বিদারিত করতে লাগলো। তবে বুঝলেন যে, আজ মেয়েকে কিছু জিজ্ঞেস করবেন না। ওকে সময় দিতে হবে, ওর মনের কাছে যেতে গেলে ধৈর্য ধরে পাশে থাকতে হবে। সে রাতে তাড়াতাড়ি খেয়ে মেয়ের পাশে ঘুমাতে এলেন। মেয়ে প্রথমে বারণ করেছিল। তারপর দু-জন দু-জনকে জড়িয়ে কখন ঘুমিয়ে পরলেন। হঠাৎ মাঝরাতে অন্য পাশে ফিরে শোয়া মেয়ের ফুঁপিয়ে কেঁপে ওঠা চাক্ষুষ করলেন। বুঝলেন… আঘাত গভীরে পৌঁছেছে।

এমন করে প্রায় এক সপ্তাহ হিয়াকে নজরে রেখেও ওর মা কিছুতেই ঘটনার প্রকৃত কারণ বের করতে পারলেন না। বারে বারে মেয়েকে জিজ্ঞেস করলে একটাই উত্তর… ‘আমাকে একটু সময় দাও মা! আমি যথেষ্ট ম্যাচুওর। নিজেকে সামলে উঠতে পারবো। তুমি চিন্তা করো না। আমি কোনও ভুল পদক্ষেপ নেবো না। শুধু একটু নিজের সাথে বোঝাপড়া করার সময় দাও।’

তারপরই একদিন হঠাৎ পাথরপুর থেকে হিয়ার দিদুনের ফোন আসে।

‘কি গো হিয়ারানি, তুমি বুঝি দিদুনরে ভুইল্যা গ্যালা? অহোন আর ফোন করো না, কথা কও না। আমি আর কয়দিন বাঁচুম, বলো।’

‘দিদুন, আমাকে কয়েকটা দিন তোমার কাছে থাকতে দেবে?’— হিয়া অজান্তেই এ কথা বলে ফেললো।

‘এ তো ম্যাঘ না চাইতেই পানি… চইল্যা আসো। দিদুন নাতনি মিইল্যা খুব মজা করুম। হয়ত আমার জীবনের শেষ আনন্দের সময় হইবো এইড্যা’— দিদুনের আওয়াজে এত মায়া জড়ানো ছিল, হিয়ার চোখের কোণ ভিজে গেল।

‘আমি কালই দুপুরে পৌঁছে যাবো দিদুন’— হিয়া জানায় তাঁকে।

হিয়ার মা দরজার ঐপ্রান্তে দাঁড়িয়ে কেমন যেন স্বস্তির নিশ্বাস ফেলে। অবচেতনে হলেও সে বিশ্বাস করে যে তাঁর মা পারবে তাঁর মেয়ের এই মৃয়মান দশা থেকে মুক্ত করতে।

পরের দিন থেকেই হিয়ার বসবাস শুরু এই পাথরপুর গ্রামে। পুকুর ধারে বসে অভ্যাস বশতই সে কেশবের ফোন নং টা চেক করতে থাকে। অনলাইন শো করছে কিনা। মনের মধ্যে কেমন যেন হাহুতাশ কাজ করে ওর নম্বরটা অনলাইন দেখলেই। একটা সময় ছিল, তাদের দুজনের নম্বর একসাথে অনলাইন হতো। কথার বন্যা ছুটতো। তারপর তো ফোনে কথাও যেন ফুরাতো না।

কেশব আর হিয়া একসাথে এক স্কুলে পড়তো। বন্ধুত্ব ছিল বেশ ভালো। কেশব অবাঙালি পরিবারের, কিন্তু কি অবলীলায় দুর্দান্ত বাংলা লিখতে ও পড়তে পারত সে। কবিতা বলা, গিটার বাজানো, ডিবেট… সবেতে স্কুলে সে খুব নামকরা। মেয়ে মহলে তাকে নিয়ে চর্চা চলতো। কেশবের পড়াশোনা বা অন্য গুণাবলি থাকলেও মেয়েবাজ হিসেবে বেশ বদনাম ছিল। স্কুল জীবনেই সে নিজের ক্লাস কিংবা জুনিয়র অনেক মেয়ের সাথে রিলেশনে জড়িয়েছিল। হিয়া তাই একটু এড়িয়ে চলতো। কেশব স্কুল শেষে আই. আই. টি কানপুরে চলে যায়। কিন্তু সোস্যাল মিডিয়ার জমানায় কেউ কারোর থেকে আলাদা হয় না। তাই হিয়ার বন্ধু তালিকায় কেশব ছিল। এমনই একদিন কলেজ চলাকালীন হিয়া দেখে কেশবের মেসেজ… কেমন আছিস? কোথায় এখন। আমি কলকাতায় এসেছি। কয়েকজন পুরনো বন্ধুর সঙ্গে দেখা করবো, তুই আসবি?

হিয়া দেখলো যে, মিটিং প্লেসটা ওর কলেজের কাছেই। আর দুপুরের পর ক্লাস নেই, তাই ও যেতে সম্মতি জানায়।

৪-৫ জন বন্ধুর মাঝে কেশব মধ্যমনি হয়ে বসে। তাদের মধ্যে দুপাশে ওদের ব্যাচের দুই সুন্দরী।

‘কি রে হিয়া, তুই এলি? আমাদের মধ্যে তুই হলি একজন সিরিয়াস মেয়ে। সে যে আড্ডায় যোগ দেবে তা ভাবাই যায় না। তাই আজ বড় ট্রিট হবে’ — কেশব খুব উত্তেজিত হয়ে বললো।

আড্ডা খাওয়া দাওয়া গান কবিতায় জমজমাট হলো ওদের রি-ইউনিয়ন। ফেরার পথে কেশবের গাড়িতেই ওরা ৩ জন ফিরলো। শেষে হিয়াকে নামানোর সময়ে কেশব বললো যে, তোকে ফোন করতে পারি আমি?

চোখ নাড়িয়ে হাঁ জানিয়ে বিদায় নিল হিয়া। সেই বন্ধুত্বের শুরু। স্কুল জীবনে যে কেশবকে এড়িয়ে যেত হিয়া, তার মধ্যে যে এত শিশুমন লুকিয়ে আছে, সাথে শিল্পী সত্তা… তা সময় যেতে যেতে আবিষ্কার করলো হিয়া।

কেশবের কানপুরে ফিরে যাওয়ার আগে একবার আলাদাভাবে দুজন দেখা করলো একটা পার্কে। সেখানে কেশব জানায় যে, ওর হিয়ার প্রতি একটা আলাদা আবেগ কাজ করছে। তখন হিয়া জানায় যে, ও কেশবের মেয়ে ঘটিত ব্যাপার নিয়ে বেশ চিন্তিত। তাই ওর এই আবেগটা সাময়িক, দু-দিন পরে কেশব অন্য কোথাও আবারও জড়াবে।

তখন কেশব ওকে জানায় তার সদ্য ব্রেক আপ হয়েছে একটি মেয়ের সাথে এবং এই দশদিন মত ও হিয়ার সাথে কথা বলে এত ভালো বোধ করছে… হিয়া বাকিদের মত নয়। সেই শুনে খিলখিলিয়ে তখন হিয়া হেসে উঠেছিল, বলেছিল… ‘দেখলি তো, তোর প্রেমের ফিরিস্তি কত? এই মেয়েটা কত নম্বর তোর জীবনে? প্লিজ, আমাকে তোর এই নম্বর তালিকায় জায়গা দিস না। আমরা বন্ধু হিসেবেই ভালো থাকি’…

‘তুই আমাকে ভুল বুঝলি, হিয়া। দেখ্, একটিবার সুযোগ দিয়ে। আমি সেই কেশব থাকবো না। আমি হিয়ার কেশব হয়েই চিরকাল থাকবো’— আবেগঘন হয়ে কেশব হিয়ার হাত ধরে এ কথা জানিয়েছিল।

আজ থেকে প্রায় ২.৫ বছর আগের ঘটনা৷ হিয়া তবু সময় চেয়েছিলো৷ যোগাযোগ রাখবে রোজ… কিন্তু প্রেম হবে কিনা সেটা সময় বলবে, এমন কথাই সেদিন হিয়া জানিয়েছিল।

কিন্তু সময়ের পরিহাস এমন, সেই হিয়ার জীবনে কেশব কখন নেশার মত চেপে বসেছে ও বুঝতেও পারে নি। দূরত্ব কোন ব্যাপার হয় নি ওদের মাঝে। সকালে ঘুম ভাঙা থেকে মাঝরাতে পড়ার ফাঁকে কথা বলা… ওরা একে অপরের সাথে আষ্টেপৃষ্টে জুড়ে গেল। তাতে কিন্তু কারোর পড়ার ক্ষতি হয় নি। সবকটা সেমিস্টারে হিয়া কলেজ টপার। ওদিকে কেশবও উচ্চ ডিগ্রি লাভের পথে। কেশব বরাবরই একটু উদাসীন। সে যে সময় দেয় না তা নয়। যখনই হিয়া ফোন বা মেসেজ করেছে… উত্তর এসেছে। কিন্তু নিজে থেকে হিয়ার খোঁজ কখনও নেয় নি সে। হিয়া এই উদাসীনতাকে ওর স্বভাবের অংশ হিসেবে মেনে নিয়ে আরও বেশি ভালবেসেছে কেশবকে। কেশবের একটু শরীর খারাপে এত অস্থির হয়েছে… নিজে ঘরে বসে নাওয়া খাওয়া বন্ধ রেখেছে। সম্পর্কের প্রথম এক বছর দুজনের দারুণ সুন্দর কাটলো। একে অপরের সাথে জুড়ে থাকত। এর মাঝে ৪-৫ বার সুযোগ পেলেই কেশব কলকাতায় এসে দেখা করে গেছে হিয়ার সাথে। শুধুমাত্র হিয়ার সাথে দেখা করবে বলে সে ২-৩ দিন পরপর ছুটি পেলেই ফ্লাইটের টিকিট কেটে চলে এসেছে। সারাটাদিন দুজন একসাথে কাটিয়েছে। মাঝে একবার তাদের মধ্যে শরীরিক সম্পর্কও হয়েগেছে। কেশব সেদিন ওকে জানায় যে, হিয়াকে মন থেকে তার বৌ হিসেবেই ভাবে। দুজন জীবনে প্রতিষ্ঠিত হলেই বাড়িতে জানিয়ে বিয়ে করবে।

হিয়ার আবেগ হৃদয়ের গভীরে ঢুকে পড়লো আরও। ও নিজেকে শুধুই কেশবের জন্য তৈরি… এ কথা ভাবতো। মন শরীর সব জুড়ে সে কেশবের। পড়াশোনা বাদে সে সারাদিন কেশবের চিন্তায় মগ্ন হয়ে থাকতো। কি খেলো, কখন হস্টেলে ফিরলো, কোন সাবজেক্ট পড়তে কঠিন লাগছে কেশবের… সব সব খেয়াল হিয়ার থাকতো।

সম্পর্কটা এক বছরের পরে কেমন ধারাগতের হয়ে উঠলো। হিয়া নিজের আগ্রহে একরকমই খেয়াল রাখতো। কিন্তু কেশবের মধ্যে কেমন পরিবর্তন আসতে লাগলো। হিয়া প্রথম দিকে বোঝেনি, পরে একদিন কেশবকে ফোনে না পেয়ে পাগলের মত ওর বন্ধুদের সাথে যোগাযোগ করে। ওকে নিয়ে এত উদ্বিগ্ন হয়ে পড়ে হিয়া যে হিতাহিত জ্ঞান শূন্য হয়ে পড়েছিলো।

‘আমাকে নিয়ে এত চিন্তা করিস কেন? আমি কি বাচ্চা ছেলে যে হারিয়ে যাবো? আমার উপরে সবসময়ে এই নজরদারি বন্ধ কর্ হিয়া। আমারও নিজের স্পেস দরকার, তোকে সবসময়ে বলতে পারবো না যে, কি খাচ্ছি, কোথায় যাচ্ছি, কি পরছি। এটা আমাদের দুজনের পক্ষেই ভালো, বুঝলি’ — কেশব হিয়াকে ফোন করে একনাগাড়ে বলতে থাকে।

‘ঠিক আছে, ভবিষ্যতে মাথায় রাখবো। এই নতুন সেট আপ টায় আমার এডজাস্ট করতে একটু সময় লাগবে। নিজেকে বুঝিয়ে নেবো’— হিয়া জানায়। কিন্তু এই আঘাত মনে এত ব্যথা তৈরি করে তা কাউকে বোঝাতে পারে না। কেশব তো এমন করে কখনো কথা বলে নি আগে ওর সাথে। কেশব উদাসীন হতে পারে, কিন্তু ওকে খুব সম্মান দিয়ে শান্ত ভাবে কথা বলার মানুষ।

‘সামনের কয়েক মাসের মধ্যে আমি হয়ত বিদেশে যাবো। তখন আমাদের সময় মিলবে না। তোর জীবনে আমি অভ্যাস হয়ে যাচ্ছি, হিয়া!! এটা থেকে নিজেকে বের কর্।’ — আবারও একদিন কেশব ওকে জানায়।

এমন করে চলতে চলতে গত ছয়মাসে ওদের মধ্যে এক অলীক দূরত্ব তৈরি হলো। কথা হয় নিয়মিত, কিন্তু কোথায় যেন সুর তাল কেটে গেছে। রাতে কথা বলার অভ্যাস দুজনের। হঠাৎ হিয়া আবিষ্কার করে যে, কেশব ওর মেসেজের রিপ্লাই দেয় না। দিলেও দেরি করে। কিন্তু ওকে প্রায় সারারাত অনলাইন দেখা যায়। ভদ্রতার খাতিরে প্রথমে কেশবকে জিজ্ঞেস করে নি। পরে একদিন যখন জানতে চায় যে, তুই কার সাথে এত ব্যস্ত থাকিস রে, আমার মেসেজের জবাব দিস না।

‘তোর সাথেও কথা বলি। তবে অন্য বন্ধুরাও আছে এখন। আমার সেটাও ভালো লাগার জায়গা। কিন্তু তোর জায়গাটা একই আছে হিয়া। এত সন্দেহ করিস না’ — ওকে আশ্বস্ত করেছিল কেশব। ওর কেশব, ওরই আছে… হিয়া নিজেকে সবসময়ে বোঝাতে থাকে।

তারপরও হিয়া দেখতে থাকে কেশব রাত ২/৩টে পর্যন্ত অনলাইন, এদিকে হিয়াকে কোনও মেসেজ নেই। সারারাত হিয়া কেশবের পাশে জ্বলে থাকা সবুজ অনলাইন বটম টায় তাকিয়ে থাকে। কিন্তু কোন কথা ওর জন্য আসে না। শেষে না থাকতে পেরে কেশবকে কান্না ভেঁজা কণ্ঠে জিজ্ঞেস করে যে, তুই এমন করে আমাকে অপমান করিস না। যে সময়টা শুধু আমার জন্য রেখেছিলি, আজ সে জায়গা তো অন্য কেউ নিয়েছে। তুই সেটা আমাকে স্পষ্ট করে জানা, প্লিজ।

‘তুই যেটা ভাবছিস সেটা নয়। আমার কলেজের একটি মেয়ে সুইসাইড করতে যাচ্ছিলো। ওর সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পরে চরম ডিপ্রেশনে আছে। আমি ওকে সেই স্টেজ থেকে বের করতে চাইছি। মেয়েটা কথা বলে শান্তি পায়’— এতদিন পরে কেশব এক নতুন মেয়ের কথা জানায় হিয়াকে।

‘কিন্তু কেশব, রাতের বেলা কি কথা বলে বোঝানোর সময়? যে মেয়ে সম্পর্ক ভাঙার কষ্ট ভোগ করছে, সে তো তোর কথাতে তোর উপরে আরও নির্ভরশীল হয়ে পড়বে। পারবি তো সামলাতে? রাতের বেলা আবেগ বাড়ে কেশব’ — সাবধান করে হিয়া।

কিন্তু বিধির বিধান ভাঙবে কে? কেশবের রাতের কথপোকথন বাড়ে। হিয়ার অনিদ্রায় চোখের তলায় কালি পড়তে থাকে। শেষে হিয়ার প্রিয় বান্ধবী স্নিগ্ধা সব জানতে পেরে ওকে মনোবিদের কাছে নিয়ে যায়। হিয়াকে এ সম্পর্ক থেকে বেড়োতে উপদেশ দেন তিনি। কিন্তু দিনের শেষে সেই হিয়া না থাকতে পেরে একবার হলেও কেশবকে ফোন করে। কেশব কিন্তু স্বাভাবিক সুরেই বলে যায় কথা। হিয়া বারে বারে ওকে বলে যে, তুই নতুন সম্পর্ক শুরু করতে চাইলে কর। কিন্তু আমাকে মুক্তি দে। আমাকে সত্যিটা জানা কেশব। কিন্তু কেশব বারে বারে ওর চিন্তা ভাবনাকে ভুল প্রমাণ করতে চায়। ওকে বোঝায় যে, রাতে কথা বলি মানে যে, সেটা প্রেমের গল্প বা সেক্স চ্যাট তা কিন্তু নয়।

এমনভাবেই চলতে চলতে আজ থেকে প্রায় একমাস আগে কেশব কলকাতায় আসে। হিয়াকে দেখা করতে বলে। সামনাসামনি বসে হিয়ার হাত জড়িয়ে ধরে কেশব, হিয়ার শুধু মনে হয় যে ওর কেশব ওরই আছে। কত ভুল ভেবেছে কেশবকে। একই রকম ভালবাসা ওদের। কেশব এবার এক সপ্তাহ থাকবে বললো। কেশবদের বাড়িতে হিয়া আগেও গেছে। তাই একদিন ভাবলো যে, কেশবের প্রিয় পারফিউম আর নিজের হাতে বানানো চিকেনের একটা ডিস নিয়ে ওদের বাড়ি গিয়ে সারপ্রাইজ দেবে।

সেদিন দুপুরে, আজও মনে আছে… শনিবার, মায়ের একটা নীল সিল্কের শাড়ি পরে কেশবদের বাড়িতে যায়। কেশবের মা খুব খুশি হন ওকে দেখে। বলেন যে কেশব ঘরে আছে, ওর এক বন্ধুও এসেছে… তার সাথে গল্প করছে। হিয়াকে ওর ঘরে যেতে বলেন উনি। হিয়া খুব আবেগ নিয়ে কেশবের ঘরের দরজা খুলতেই আঁতকে ওঠে। কেশবের বাহুলগ্না হয়ে এক পরম সুন্দরী মেয়ে। ওরা তখন চরম মুহূর্তে ছিল মনে হয়। কেশব হকচকিয়ে গেল। হিয়া হাতে রাখা সব উপহার এক জায়গায় রেখে বলে যে, ‘সরি, দরজা নক করা উচিত ছিল’… এটা বলেই ও হনহনিয়ে বাড়ির বাইরে চলে আসে।

তারপর থেকেই হিয়া এই ঘোরের মধ্যে আছে। বিশ্বাস — অবিশ্বাস, প্রতারণা, মন ভাঙা… সব কষ্ট নিয়ে হিয়া এক মৃতপ্রায় মেয়ে। কেশব তারপর থেকে ফোন মেসেজ করে যাচ্ছে। ওর বক্তব্য… ওর সাথে এই মেয়েটির সম্পর্ক তৈরি হয়েছে এই কয়েক মাস। কিন্তু ওরা কেউ ভবিষ্যৎ নিয়ে ভাবে না। মুহূর্তে থাকতে বিশ্বাসী। কেশবের জীবনে হিয়ার উপরে কেউ নেই। যে যত্ন ভালবাসা কেশব হিয়ার থেকে পায়, তা অন্য কেউ দেবে না। তাই ও হিয়াকে হারানোর ভয়ে এ সম্পর্কটা লুকিয়েছিলো। কিন্তু এই মেয়েটির সাথে ওর ঔটুকুই সম্পর্ক, খুব ক্যাসুয়ালি ওরা নিজেদের সাময়িক আনন্দ খুঁজেছে। এর বেশি নয়। সেই সাথে হিয়াকে বারে বারে বলতে চাইছে যে, আর ও যোগাযোগ রাখবে না। ওকে যেন সুযোগ দেওয়া হয়। ও হিয়ার হয়েই থাকবে। কিন্তু হিয়া চোখ বুজলেই ঔ মুহূর্তটা দেখে রোজ। আর ওই শোক দুঃখ ওকে আঁকড়ে জড়িয়ে ধরছে। সে এক যন্ত্রণাময় অসীম সময়, হিয়া জীবনে এই ধাক্কা সামলে কবে উঠবে কে জানে? ওই দৃশ্য কি করে ভুলবে? সময় নাকি সব জখম কমিয়ে দেয়, হিয়ার ক্ষেত্রে উল্টো।

দিদুনের এখানে এসে তবু মনটা প্রশান্ত হয় প্রকৃতির মাঝে। কেশবকে মাঝেমধ্যে বিশ্বাস করতেও মন চায়। আবার মনে হয় যে, একবার যে ঠকায়, সে বারে বারে ঠকাবে। এটাই জীবনের ধর্ম। কিন্তু কোথায় যেন কেশবের আওয়াজ ওকে মনে মনে দুর্বল করে। হিয়া চাইলে যোগাযোগ বন্ধ করতে পারতো, কিন্তু ও কি করে কেশবের থেকে নিজেকে আলাদা করবে?

পূর্ণিমার রাত ছিল এক শনিবার… দিদুন আর হিয়া ছাদে পাশাপাশি বসে আছে। দিদুন কত গল্প করতে লাগলো। শেষে বললো…’তুমি আমারে কইতে পারো, তোমার মনের মধ্যে অনেক দুঃখ লুকায়ে রাখছো। কোথাও বলার দরকার তোমার, কথা শোনার লোক নাই তোমার জীবনে’।

এ কথা শুনে হাউ হাউ করে কেঁদে ফেলে হিয়া। তারপর একে একে সে সব কথা জানাতে থাকে দিদুনকে। দিদুন নীরবে শুনতে থাকে। তারপর ওকে কাছে ডেকে মাথায় হাত বোলাতে থাকে। বলেন যে, ‘দিদিভাই, তোমাকে বলবো না যে ওই ছেলেটারে ভুইল্যা যাও। তোমার সামনে দুইটা পথ… হয় সব ভুলে নতুন করে নিজেকে একজন শক্ত মানুষ তৈরি করো। ভালোবাসা ছাড়াও এ জগতে আরো কিছু কাজ আছে। তোমার বয়স অল্প, তোমারে যত্নে রাখার মানুষ ঠিক পেয়ে যাবা। তখন এ সময়কে অতীত স্মৃতিই লাগবো।’

‘পারবো আমি দিদুন? আমার মনের গভীরে যে কেশব। এত বড় প্রতারণার পরেও আমি কেন ওকে নিয়ে ভাবি দিদুন?’— হিয়া আকুলভাবে বলতে থাকে।

‘ওইটাই তো, তোমার কাছে আরেকটা পথ… সব ভুইল্যা ঐ ছেলেটার উপরে বিশ্বাস রাখা। এইড্যা কিন্তু খুব ঝুঁকির কাজ। মন আবারও তোমার ভাঙতে পারে। তবু ভালোবাসার মানুষরে আরেকটা সুযোগ তো দিতে হয়, বলো?’— দিদুন ওকে বলে।

হিয়া চুপ করে ভাবতে থাকে, চাঁদের দিকে তাকিয়ে। হাতে মোবাইলে তখনও কেশবের নম্বরটার দিকে চেয়ে আছে সে।

দিদুন স্বগতোক্তির মত বলতে থাকে… ‘তোমার দাদুর জীবনে প্রথম প্রেম ছিল এক মুসলমান মেয়ে। কিন্তু দেশ ভাগের পর পর আমার সাথে তাঁর বিয়া হয়। প্রথম প্রথম ভাবতাম আমার বর বুঝি নিরাসক্ত এমনই। পরে বুঝলাম যে তার মন জুড়ে তো রাবেয়া। এ দেশে আসার পরে আমরা দুজন এত সমস্যার মুখে পড়লাম, সংসার গুছাইতে গুছাইতে দু-জন কাছাকাছি আইলাম। জীবন যুদ্ধ আমাদের ঘনিষ্ঠ করলো।’

‘বাহ। তাহলে তো ভালো দিদুন’— হিয়া বলে।

‘কেমন ভালো শুনবা? তোমার মায়ের তখন পাঁচবছর বয়স। একজনের মুখে শুনলাম তোমার দাদু নাকি সপ্তাহে একবার পাশের গাঁয়ে যায়। খোঁজ নিয়ে জানলাম যে, রাবেয়া সেই গ্রামের এক প্রাথমিক স্কুলে পড়ায়। সে নাকি বিয়াও করে নাই। এদেশে চইল্যা আইসে। বলো দেখি, আমি তখন কেমন থাকি। তোমার দাদুরে একদিন জিগাইলাম যে, রাবেয়ারে তুমি ভালোবাসো? উনি মাথা নীচু করেছিলেন। বললাম যে, তুমি চাইলে আমি মেয়ে নিয়ে আলাদা হইতে পারি। ভালোবাসার মানুষের সাথে ঘর করাটা স্বপ্ন, সেটা তোমার পূরণ হোক। শুইনা মানুষটার কি কান্না। আমার পা জড়াতে আসে। বলে যে, একবার সুযোগ দাও আমাকে ভালো মানুষ হতে। আমার মেয়েটার যোগ্য বাবা হয়ে উঠি। এ অধিকার থেকে বঞ্চিত করো না। আমারও মানুষটার প্রতি এত মায়া ছিল। একভাবেই সংসার চলতো৷ কিন্তু জানো তো দিদিভাই, কাঁচের আয়নায় একটা সরু ফাটল পড়ে গেছিলো। উনি তারপর থেকে আমারে এত যত্ন আত্তি করছেন, আমার কথাই শেষ কথা হইছে। কিন্তু আমি এটাও জানতাম ওনার গোপনে যোগাযোগ ছিল রাবেয়ার সাথে। আমি ঐ সত্যিটা মেনে নিয়ে, ভালোবাসারে ভাগ করে দিছিলাম। ওনার জীবন শূন্য আমাকে আর তোমার মাকে ছাড়া। রাবেয়া হয়ত ওনার হৃদয়ে বাস করে, কিন্তু আমি মানুষটার অস্তিত্ব জুড়ে’ — দিদুন একটানে এত কথা বলে যায়।

‘দিদুন, তুমি সব জেনেও পারলে এতকাল এ কষ্ট বইতে?’— অবাক হয়ে যায় হিয়া।

‘হা, আমি পারছি বলে যে তোমাকে পারতে হবে এমন নয়। তোমার সামনে দারুণ সময়, দিদিভাই। নিজের মনকে গুরুত্ব দিও, কিন্তু আত্মসম্মান বলি দিও না। ভালবাসার মানুষকে সুযোগ দেওয়া যায়, যদি সে তার যোগ্য সম্মান রাখে। তুমি খুব বুদ্ধিমতি… ভাবনার জন্য সময় নাও। তোমার মন চাইলে এই দিদুনকে মনের কথা খুইলা বলো।’ — দিদুনের কথায় কি যে ছিল, হিয়া একবারে হালকা বোধ করছে।

আকাশ জুড়ে তারাদের মেলা বসেছে।

ওদিকে কেশবের মেসেজ… হিয়া, আরেকটা সুযোগ দে আমাকে। আমি তোর হয়েই থাকবো। কোথাও যাবো না।

হিয়া আকাশের দিকে চেয়ে ভাবতে থাকে, দিদুন ঠিকই বলেছে… জীবন অনেক বড়। কাল কি হয় জানি না। নিজের ভালোবাসা ভুলতে বসেছিলাম, সেটা এবার নতুন করে শুরু করি। তারপর না হয় নতুন পথের সন্ধানে বেড়োবো।

লেখিকা : অঙ্কের শিক্ষিকা, উত্তর চব্বিশ পরগনার পৃথিবা রাধারাণী গার্লস হাই স্কুল, হাবড়া।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev