কফি মগ হাতে এককোনায় বসে চিন্তায় মগ্ন ছিল রিমলি। হঠাৎ বাবার ফোনে ওর ধ্যানভঙ্গ হলো।
‘কি রে, কোথায় সে? আর কতক্ষণ লাগবে?’
‘সবে থেরাপি রুমে নিয়ে গেছে। আজ একটু সময় বেশি লাগবে। ধরো দু-আড়াই ঘন্টা, কি সব মেমোরি গেম খেলাবে, তুমি প্লিজ চিন্তা ছাড়ো। একটু বিশ্রাম নাও। আমরা সন্ধ্যার মধ্যে আসবো’ — বাবাকে জানিয়ে ফোনটা রাখে রিমলি।
কিন্তু ও ভালো করেই জানে যে, বাবা একবিন্দুও বিছানাতে গা এলাবে না। ভিতর ভিতরে চাপা দুশ্চিন্তা করবে আর মাঝে মধ্যে জানলা দিয়ে সামনের রাস্তার দিকে তাকাবে। আজ অফিসে ছুটি থাকার কারণে এ কাজ থেকে বাবাকে একটু রেহাই দেওয়ার চেষ্টা করেছে রিমলি। নাহলে প্রতি সপ্তাহে বাবা এই কাজটা করেন অতি যত্নে। এই কাজের জন্য বাবার মুখে কখনো কোন বিরক্তি দেখে নি সে। কিন্তু দুই এক দিন যখনই রিমলি এসেছে, ওর যে কি বিরক্তিকর লেগেছে, সময় যেন আর কাটতেই চায় না। একা একা বাইরে বসে অপেক্ষা করো। কতক্ষণ আর মোবাইলের দিকে তাকানো যায়!! তবু এই নতুন তৈরি হওয়া ক্লিনিকটা বেশ ঝাঁ চকচকে। এদের ক্যাফেটেরিয়াটাও বেশ সাজানো গোছানো। তাই রিমলি একটা কফি নিয়ে এককোণ দখল করে বসে আছে বেশ অনেকসময় ধরে। পাশে কাঁচের দেওয়াল জোড়া জানলা দিয়ে এ শহরের গাড়ির আনাগোনা, মানুষের ব্যস্ততা চোখে পড়ছে। এই করে তবু ঘন্টা খানেক পার করা গেল। এরপর থেরাপি রুমের বাইরে ওয়েটিং চেয়ারে বসে থাকা। এখানে এলে মনে হয়, জীবনে মানুষের কত রকমের সমস্যা। এক জায়গায় থেমে গেছে কত পরিবারের রোজের চলার ছন্দ। কিন্তু ঐ কাঁচের জানলা দিয়ে বাইরে তাকালে বোঝার উপায় নেই…সেখানে শুধুই মানুষের ব্যস্ততা,কেউ যেন থেমে নেই!!
রিমলি ধীরে ধীরে গিয়ে বসলো থেরাপি রুমের সামনে রাখা একটা সারির মাঝের সিটে। এই এক অস্বস্তি… লোকজন দুইপাশের কোণগুলোতে গিয়ে বসবে, মাঝের জায়গাটা ফাঁকা রেখে। তারপর যে মাঝে বসতে আসবে তার ওখানে ঢুকতে বেড়োতে যে কি মুসকিল! কিন্তু আরো প্রায় এক ঘন্টা বাকি, তাই না বসে উপায় নেই। অগত্যা এই মাঝখানে বসে পড়া! একপাশে একজন মাঝবয়সী ভদ্রলোক ঘুমে ঢুলে পড়ছেন। আর আরেক পাশে একটি খুব মিষ্টি দেখতে মেয়ে বসে আছে, হেডফোনে গান শুনতে ব্যস্ত সে। চোখ বুঝে গানে এমন বুঁদ যে মাঝেমধ্যে তার সুরেলা আওয়াজ রিমলিও শুনতে পাচ্ছে। মেয়েটির বেশ সুন্দর গানের গলা আর রীতিমতো রেওয়াজ করা… বোঝা যায়।
হঠাৎ এক ঝটকায় মেয়েটির কোলে রাখা ব্যাগ নীচে পড়ে যায়। চমকে উঠে সে, পলকের মধ্যে সে গানের জগৎ থেকে বাস্তবে চলে আসে। রিমলি ব্যাগটা নীচ থেকে তুলে মেয়েটির হাতে দেয়। ‘থ্যাঙ্ক ইউ’-বলে মেয়েটি। এরপর কান থেকে হেডফোন খুলে থেরাপি রুমের দিকে তাকিয়ে থাকে।
‘গান শুনতে বসলে আমার হুঁশ থাকে না তো!! অম্লান ব্যানার্জীর বাড়ির লোকের নাম ধরে ডাকে নি তো এরা? আপনি কিছু শুনেছেন?’ — মেয়েটি প্রশ্ন করে রিমলিকে।
‘না, আমি যতক্ষণ এসেছি, এরা কারোর বাড়ির লোকেরই খোঁজ করে নি’— উত্তর দেয় রিমলি।
‘যাক, নিশ্চিন্ত হলাম। নাহলে আজ ভরসা করে আমার সঙ্গে ওঁকে পাঠিয়েছে বাড়ির লোকজন। যদি কিছু ঝামেলা হয়, আমার উপরে বিশ্বাস থাকবে না বাড়ির লোকের, বিশেষ করে আমার হাসবেন্ডর’ — বলেই মুচকি হাসলো মেয়েটি।
রিমলি এতক্ষণে সিঁথির এক কোণে হালকা লাল আভা দেখে বুঝলো, মেয়েটি বিবাহিত। নাহলে কিছু বোঝার উপায় নেই।
আবারও মেয়েটি বলে যায় — ‘আমার শ্বশুর মশাইকে নিয়ে এসেছি। আপনার কার হচ্ছে থেরাপি?’
রিমলির এত কথা ভালো লাগছিল না। তবু বলল, ‘আমার মা এর জন্য এসেছি’।
‘ওহ, ওঁনার কত বছর ধরে এমন অবস্থা? আমার শ্বশুর মশাইয়ের আজ প্রায় ৪ বছর হল। এই এক বছর ব্যাপারটা বাড়াবাড়ি হচ্ছে। সারাক্ষণ অস্থিরতা করেন, কিছু তো মনে নেই। কি মানুষ ছিলেন… যাদবপুর থেকে ইঞ্জিনিয়ারিং পড়া, বড় কোম্পানিতে ছিলেন। আর তেমনই নানা বিষয়ে ওঁনার পড়াশোনা ছিল। ‘— মেয়েটি কেমন বিমর্ষ হয়ে বলে চললো।
‘আমার মায়ের এই দুই-বছর মত স্মৃতি হারিয়েছে। এখনো আমাকে বা বাবাকে চিনতে পারে। এখানে তো বেশ আধুনিক থেরাপি চলছে। যতটা স্মৃতিকে সচল রাখা যায়’ — বললো রিমলি।
‘আমার নাম রিক্তা, আমরা এই ক্লিনিকের কাছেই থাকি। আমি একটা স্কুলে পড়াই। এখন ছুটি চলছে বলে বাপি কে নিয়ে এলাম। এমনিতে আমার হাসবেন্ডই নিয়ে আসে’ — আলাপ বাড়ানোর চেষ্টা করে রিক্তা।
রিমলির বড় ক্লান্তি লাগছে এই অপেক্ষা। বাবা যে কি করে মা কে নিয়ে সপ্তাহের ৩ দিন আসে আর বসে থাকে। সত্যি ধৈর্য আছে মানুষটার। এটা যদি উল্টো হত, মা কখনো বাবার জন্য এত সময় বসে থাকতো না। কত যে অভিযোগের ফর্দ ধরিয়ে দিত। সারাজীবন রিমলি দুজনকে দেখেছে বিপরীত দিকে হাঁটতে। তবু মায়ের প্রতি বাবার ভালবাসা, যত্ন এক বিন্দুও কমে নি। মা বরাবর আপন মর্জিতে চলতে ভালবাসতো। কিছু দিন পর পর মনে হত যে, এ ঘর-সংসার জীবন তার জন্য নয়। যখন ইচ্ছে নিজের খেয়ালে ঘুরে ফিরে আবার বাড়িতে এসে কয়দিন বসবাস করবে! এই ছিল মায়ের চিন্তাধারা। বাবা ছিল উল্টো, অফিসের দায়িত্বের কাজ সামলেও বাবার জীবনে এক এবং একমাত্র জায়গা ছিল তাঁর পরিবার। তাই রিমলির জীবনে বাবার ভূমিকাই প্রায় সবটা জুড়ে। আবার মায়ের মধ্যে ছিল এক দুর্নিবার আকর্ষণ শক্তি। তাই মায়ের মন মেজাজ, মায়ের ইচ্ছের কেউ কখনো অবহেলা করতে পারে নি ওরা। হয়ত মা এমন বিচিত্র ছিল বলেই ওদের সংসারটা এমন প্রাণ প্রাচুর্যে ভরা ছিল। এই কয় বছরে হঠাৎ কেমন সব বদলে গেল।
২০ বছর আগের কথা—
অফিসের গাড়িটা মাঝ রাস্তায় খারাপ হয়ে গেল। আজ জরুরি মিটিং আছে বেলা ১২ টায়, সময় মত না পৌঁছালে সবটাই ভেস্তে যাবে। কারণ এই প্রজেক্টের সবটাই অম্লান ব্যানার্জীর তত্ত্বাবধানে। ড্রাইভার বললো সারাতে সময় লাগবে। অগত্যা এই ব্যস্ত রাস্তায় বাসই ভরসা। বহুজাতিক সংস্থার উচ্চপদে আসীন মানুষটি একটু উন্নাসিক প্রকৃতির। তবু আজ কাজের খাতিরে ঐ পাবলিক বাসে উঠতে বাধ্য হলো। সামনে দাঁড়ানো মানুষদের ঠেলা গুঁতো খেয়ে একটু ভিতরে এসে দাঁড়ালেন উনি। ভাগ্যক্রমে হঠাৎ একটা সিট পেয়ে গেলেন, যেখানে দাঁড়িয়ে ছিলেন সেই সামনের সিটের মানুষটি উঠে যেতে। অম্লানবাবু খুব কমই এমন লোকাল বাসে উঠতে অভ্যস্ত। তাই দুজনের সিটের সাইডের সিটে বসতে গিয়ে বুঝলেন যে জায়গা অতি কম। পাশে বসা ভদ্রমহিলার পায়ে পা ঠেকছে। উনি যতবার সরে যাচ্ছেন, ততবার প্রায় সিট থেকে পড়ে যাওয়ার জোগার। প্রায় ৬ ফুট লম্বা ফর্সা সৌম্য দর্শন এই মানুষটার দিকে বাসে থাকা বাকিরা মাঝে মধ্যেই তাকাচ্ছে। কনডাক্টর এসে ভাড়া চাইতেই উনি বলে বসলেন যে, ডালহৌসি যেতে কত টাকা লাগবে? ৫০?
শুনে আসপাশের লোকজন কেমন ব্যঙ্গাত্মক হাসি হাসলো। তখনই হঠাৎ পাশ থেকে মিষ্টি একটা আওয়াজ ভেসে এলো, আপনি ১৫ টাকা দিন ওনাকে।
অম্লান দেখলেন যে, পাশে বসা ভদ্রমহিলা ওঁকে টাকাটা দেওয়ার কথা বলছেন। ভাড়া মিটিয়ে কন্ডাকটর টিকিট ধরিয়ে দিলো হাতে, সরু এক টুকরো কাগজ। সেই কাগজ হাতের মধ্যে পাকিয়ে অম্লান কেমন চিন্তাগ্রস্ত হয়ে পড়ছিলেন অফিসের মিটিং নিয়ে। বাসটার যা গতি, কখন যে গন্তব্যে পৌঁছবেন কে জানে!! আবারও সেই মেয়েলি আওয়াজ কানে এলো…’ ঐ টিকিটটা যত্ন করে রাখুন। নামার সময়ে ফেলে দেবেন। বাসে এই ভুল প্রায় করে। নামার সময়ে হেল্পার অনেক সময় টিকিট দেখতে চায়। ভাড়া মেটালেও বিশ্বাস করে না টিকিট না দেখাতে পারলে। ডাবল ভাড়া দিয়ে নামতে হয়।’
সে কথা শুনেই অম্লান টিকিটটা বুক পকেটে রাখলেন। তারপরই পাশে বসা ভদ্র মহিলার দিকে ফিরে তাকালেন। হালকা নীল রঙের শাড়ি পরা চাপা গায়ের রঙ মহিলার। তবে চেহারায় কোথাও একটা ভদ্র শিক্ষিত ছাপ চোখে পড়লো।
‘ধন্যবাদ আপনাকে। আসলে আমার বাসে চড়ার অভ্যাস নেই। তাই এমন তালগোল পাকাচ্ছে সব। কতসময় আর লাগবে বলতে পারেন ডালহৌসি পৌঁছাতে?’ — জিজ্ঞেস করলো অম্লান।
‘আরো মিনিট ৪৫ লাগবে হয়ত। যদিও আমি এর আগেই নেমে যাবো। তবে আপনাকে দেখে বোঝা যাচ্ছে যে, আপনি বাসে ওঠেন না।’ — বললেন ভদ্র মহিলা।
‘হাঁ, রোজ অফিসের গাড়ি করেই যাতায়াত করি। আজ হঠাৎ মাঝপথে গাড়ি খারাপ হলো। আর আজই অফিসে গুরুত্বপূর্ণ মিটিং। হাতে অবশ্য সময় আছে। আশা করি পৌঁছে যাবো।’ — অম্লান জবাব দিলেন।
‘বুঝেছি, এমন হয় কোন কোন দিন। আর এ রাস্তার কোন ভরসা নেই। হঠাৎ জ্যাম শুরু হলে আর দেখার নেই। আমার তো কতদিন স্কুল কামাই যায় এই বাসের দেরিতে’ — কথা বলে যায় মহিলা।
‘ওহ,আপনি বুঝি স্কুলে আছেন? পড়ান?’— প্রশ্ন করেন অম্লান, বেশ আগ্রহ সহকারে।
‘হা, সামনেই সারদাসুন্দরী বালিকা বিদ্যালয়ে। প্রায় ১০ বছর হতে চললো।’— উত্তর দেন ভদ্র মহিলা।
অম্লান বেশ আগ্রহী হয়ে পড়লেন। সারাদিন অফিসের ব্যস্ততাতে বাইরের অন্য জগত সম্পর্কে ওর জ্ঞান কমে যাচ্ছে, সেটা উপলব্ধি করে ইদানিং। সেই সকালে অফিসে বেড়িয়ে সারাদিন নতুন প্রজেক্ট আস্যাইনমেন্ট নিয়ে ভাবতে ভাবতে রাত হয়ে যায়। বাড়ি ফেরে প্রায় রোজ রাত ৯ টা। তারপর ছেলেটার সাথেও তেমন সময় কাটাতে পারেন না। তবু রোজ রাতে নতুন বই পড়ার অভ্যাসটা ছাড়ে নি এত সবের মাঝেও। এই ভদ্র মহিলার মত বাকি মানুষেরা কেমন করে তাদের দিনযাপন করেন তা জানার হঠাৎ উৎসাহ জন্মালো অম্লানের।
‘আপনি কোন সাবজেক্ট পড়ান?’— অম্লান জিজ্ঞেস করে বসলো।
‘আমি ফিজিক্সের, তবে স্কুল মাধ্যমিক পর্যন্ত… তাই ঐ বিজ্ঞান আর অংক পড়াতে হয়’— উত্তর দিলেন ভদ্র মহিলা।
অম্লান পকেট থেকে মোবাইল বের করে অফিসে কল করার কথা ভাবলো। ওর যে পৌঁছাতে দেরি হবে, সেটা জানানো প্রয়োজন। মোবাইল ফোন ব্যাপারটা বেশ। নতুন প্রযুক্তি, তবে এখন অনেকেই ব্যবহার করছে। কাজের জিনিস, রাস্তাঘাটে যেকোন দরকারে যোগাযোগ করা যায়। কিন্তু ফোন বের করে দেখলো, সুইচ অফ। তখন মনে পড়লো যে, কাল রাতে চার্জে বসানো হয় নি। ভেবেছিলো অফিসে গিয়ে চার্জ দেবে। কিন্তু এমন বিপদ যে পথে হবে তা তো সে বোঝে নি। এবার কি উপায়? অবচেতনেই ওর মুখ থেকে বেড়িয়ে গেল… ‘ইস্, কি হবে? অফ হয়ে গেল যে!!’
‘ফোন করবেন? জরুরি হলে আপনি আমার ফোন ব্যবহার করতে পারেন।’— ভদ্র মহিলা বললেন।
‘তাহলে বড্ড ভালো হয়। অফিসে জানানোটা খুব দরকার। কিন্তু আপনার ফোন নং আমার অফিসে যাবে, কোন সমস্যা নেই তো? অনেকেই ব্যক্তিগত নং দিতে চান না’…অম্লান বলেন।
‘না না,আমার এ সব নিয়ে কোন সমস্যা নেই। আপনি ফোনটা করে নিন। আমি আর ১০ মিনিটের মধ্যে নামবো’— বলে ভদ্র মহিলা তার ফোনটা এগিয়ে দেয় অম্লানকে।
অম্লান অফিসে তার জরুরি কথা সেরেই ফোনটা ফেরত দিয়ে বললো, ‘বড় উপকার করলেন আপনি। আমার নাম অম্লান ব্যানার্জী।’
‘আমি বিতস্তা, বিতস্তা মিত্র’…
এরপর অম্লান নিজের অফিস, তার পেশা আর বাড়ির ঠিকানা জানায় বিতস্তাকে। প্রায় কাছাকাছিই থাকেন… এইটুকু বলেই বিতস্তা সিট থেকে উঠে বাসের দরজার দিকে যেতে থাকে।
‘আলাপ হয়ে ভালো লাগল। আপনার মিটিং সাকসেসফুল হোক, সময় মত পৌঁছে যাবেন’— বলে বিতস্তা হাত নাড়িয়ে চলে যায়। অম্লান বাসের জানলায় বিতস্তার জায়গায় গিয়ে বসে। জানলা থেকে নীল রঙা শাড়িকে পিছন থেকে দেখে বেশ অন্য রকম অনুভূতি হতে লাগল।
অফিসে সময়মত পৌঁছে গেল সেদিন, যদিও ভীষণ গলদঘর্ম অবস্থায়। তবু কোথাও একটা মনটা এই মধ্য তিরিশে এসে ফুরফুরে লাগছিল। সারাদিন মিটিং চললো, এত কাজের চাপ গেল। তারপর হঠাৎ বুকপকেটে হাত দিতেই বাসের টিকিটটা হাতে এলো। ঠিক তখনই নীল শাড়ি বিতস্তা দিদিমণির আওয়াজ কানে ভেসে এলো। মনে হলো যে, ভদ্র মহিলা আজ এত উপকার করলেন। আরেকবার দেখা করে ধন্যবাদ দেওয়াটা জরুরি। কিন্তু কি করে ওনার খোঁজ পাবেন? হঠাৎ অফিসে যাকে ফোন করেছিল, তার কাছ থেকে জোগাড় করলো বিতস্তা মিত্রের ফোন নং।
পরের দিন অফিস যাওয়ার পথে ঐ রাস্তায় যেতে যেতে মনে হলো একবার ফোন করে ধন্যবাদ জানাই ওঁনাকে। কিন্তু অজানা নম্বর দেখে উনি তুলবেন তো? তবু একবার নম্বরটা ডায়াল করে কল করলেন অম্লান। ২-৩ বার রিং হতেই ঐ প্রান্তে সেই আওয়াজ। ‘হ্যালো, আমি অম্লান ব্যানার্জী। কাল বাসে আলাপ হলো। আপনাকে ধন্যবাদ জানাতে কল করলাম’— বললেন অম্লান।
‘ওহ আপনি? আপনার মিটিং তাহলে ঠিকঠাক হয়েছে? কিন্তু কি করে আমার নম্বর পেলেন?’— বিতস্তার গলায় বেশ অবাক হওয়ার অবস্থা।
‘সে জোগাড় করেছি একভাবে। তা আপনি কতদূর? আমি আপনার স্কুল ক্রস করলাম এইমাত্র’— জিজ্ঞেস করে অম্লান।
‘আমার এখনো ১০ মিনিট লাগবে পৌঁছাতে। এটা আপনার নম্বর? তাহলে সেভ করে রাখছি।’
‘হা হা, এটা আমারই নম্বর। ইচ্ছে হলে ফোন করবেন। আপনার সাথে আলাপ হয়ে ভালো লাগল। আর দিদিমনিদের জীবনযাপন সম্পর্কে জানার আগ্রহও রইলো অনেকখানি’— এ কথা বলেই অম্লান কেমন লজ্জিত হলেন। এটা ওর স্বভাব বিরুদ্ধ। কারণ কোন মহিলার সামনে এমন প্রগলভতা দেখানোর অভ্যাস ওর নেই।
অফিস, বাড়ি, বন্ধুমহলে অম্লানকে সবাই প্রবল ব্যক্তিত্বময় হিসেবেই চেনে, যে নিজেকে একটা বর্মের মধ্যে রাখতে ভালবাসে। তাই এমন যেচে কোন মহিলাকে ফোন করতে বলার কথা কল্পনার বাইরে।
কিন্তু কার জন্য কি পথ অপেক্ষা করছে তা তো সময়ই বলতে পারে। দু-দিন পরে পয়লা বৈশাখের শুভেচ্ছা জানাতে বিতস্তা ফোন করে অম্লানকে। কথার পিঠে কথা বাড়ে। এমন করে মোবাইল নামক বস্তুর কল্যাণে দু-জন মধ্য তিরিশের নারী পুরুষের বন্ধুত্ব স্থাপন হয়।
অফিস যাওয়ার পথে বিতস্তাকে ফোন করাটা অভ্যাস হয়ে যায়। বিতস্তাও বিকেলে স্কুল ফেরত বাসে যেতে যেতে কথা বলে। তবে বিতস্তার আত্মসম্মান বোধ প্রবল। তাই কত বার অম্লান অনুরোধ করেছে তাঁর গাড়িতে স্কুলে যেতে, অন্তত সপ্তাহে একটা দিন। কিন্তু প্রতিবারই তাকে সম্মানের সাথে না করেছেন। তাতে নাকি অভ্যাস খারাপ হবে বিতস্তার। ওই রকম রাশভারি ব্যক্তিত্বপূর্ণ অম্লান, এই সাধারণ চেহারার মহিলাটির প্রতি এক তীব্র আকর্ষণ অনুভব করতে থাকে। দু-জনের গল্পের বিষয় নানা রকম। অম্লানের এত কাজের মাঝেও বই পড়ার অভ্যাসকে বিতস্তা ভীষণ শ্রদ্ধা করে, যা সে বারে বারে জানিয়েছে। আর বিতস্তা দারুণ সুন্দর সংসার করে, মেয়েকে সময় দিয়ে, নিজের কাজের জায়গাটাও দারুণ সামলাচ্ছে। সব মিলিয়ে একে অপরের প্রতি মুগ্ধতা ওঁদের বাড়তে থাকে। বিতস্তার মুখেই অম্লান ওর স্বামীর কথা শুনেছে। ভদ্রলোক একটি সরকারি অফিসের আধিকারিক। প্রচন্ড কাজের চাপ, তবু নাকি অসম্ভব সংসারি মানুষ। বিতস্তার মুখে শুনে এইটুকু বুঝেছে যে, বিতস্তা ওর স্বামীকে ভীষণ শ্রদ্ধা মিশ্রিত ভালবাসে। কিন্তু কোথাও একটা কিশোরী মনের বিতস্তাও বসবাস করে আপাত গম্ভীর দিদিমণির মনের মাঝে। তাই কথায় কথায় বিতস্তার ইচ্ছে হয় কোথাও একা চলে যেতে। ওর নাকি এ ঘর সংসার করতে সব সময়ে ভালো লাগে না!
অম্লান এ সব দিক থেকে খুব সংযমী। ও জানে যে, জীবনের এই সময়টা নিজের পেশাগত প্রতিষ্ঠা পাওয়ার যোগ্য সময়। এই সময়ে সাংসারিক বা ব্যক্তিগত শখ পূরণ করতে গেলে সেই সর্বোচ্চ অবস্থানে পৌঁছাতে বাধা আসবে। তাই নিজেকে একটা বাধা ধরা নিয়মের জীবনে বেঁধে রেখেছেন অম্লান। আর বিতস্তা ওঁর বিপরীত। বিতস্তার কাছে ভবিষ্যৎ চিন্তা অতি কম,সে মুহূর্তে থাকতে ভালবাসে। হয়ত এমন বিপরীত স্বভাবের কারণেই অম্লান এত আকর্ষিত হয় ওর প্রতি।
দুজনের বন্ধুত্বটা ফোনের মধ্যে সীমিত থাকলো না কয়েকমাস পরে। প্রায় শনিবারে স্কুল ফেরত বিতস্তা কফি হাউস যেত আর অম্লান অফিসের ফাঁকে দু ঘন্টা সময় বের করে চলে আসত। ফিস ফ্রাই আর কফি সহকারে তাঁদের মুগ্ধতা গাঢ়তর হলো। কথায় কথায় বিতস্তা জানতে পারে অম্লানের মায়ের মনোরোগ বিষয়ে। মায়ের স্মৃতিশক্তি চলে যাওয়াটা অম্লানকে গোপনে কতটা বিমর্ষ করে,তা সে কাউকে বলতে পারে না। কিন্তু বিতস্তা ব্যাপারটা মন থেকে উপলব্ধি করে। কারণ ওঁর জীবনের প্রিয় মানুষ, ওঁর ছোটকাকু যাঁর অনুপ্রেরণায় বিতস্তার পড়াশোনা সব কিছু,তিনিও এই রোগের শিকার। অম্লানকে গল্প করে বিতস্তা, কেমন করে কাকু ছোটবেলা থেকে জীবনের শিক্ষা দিয়েছেন, ওঁকে পড়িয়েছেন। আর আজ সেই কাকু ওঁকে দেখেও চেনে না। অম্লানও তাঁর মনের গহীন থেকে মায়ের এই অসহায়তার কথা বলে যায়। এ কথা অম্লান তাঁর বাড়ির লোক,কাউকে বোঝাতে পারে না। একমাত্র বিতস্তার কাছেই গুরুগম্ভীর অম্লান ব্যানার্জী, তাঁর শিশুসুলভ মনকে খুলে দেয়। মায়ের প্রতি ভালবাসা, তাঁর জন্য কিছু না করতে পারার কষ্ট… সব কথা বলে।
একসময় দুজন নীরবে বসে একে অপরের মনকে অনুভব করে যায়। ওঁরা একদিন আলোচনা করতে করতে জানতে পারে যে, চিকিৎসা শাস্ত্রে এই রোগ বংশগতও হতে পারে। তাই একদিন মজা করতে করতে বিতস্তা বলে যে, ‘ছোট কাকু ভালবেসে আমাকে এই রোগটাও দিয়ে যেতে পারে। তখন অম্লান আমি আপনাকে তো চিনবো না, আপনি হারিয়ে যাবেন আমার জীবন থেকে’।
‘সে তো আমারও হতে পারে বিতস্তা, আমিও মায়ের আদরের ছেলে। আমারও স্মৃতি গেল। বেশ হবে … দুই বুড়ো বুড়ী এই রোগের মাধ্যমে জুড়ে থাকবো চিরকাল’ — অম্লান হাসতে হাসতে বলে।
এমন করেই অম্লান বিতস্তার বন্ধুত্ব চলতে থাকে বছর দুই ধরে।
কিন্তু হঠাৎ বিপত্তি আসে। এক শীতের সন্ধ্যায় দুজন গঙ্গার ধারে বসেছিল। দুর্বল মুহূর্তে অম্লান বিতস্তাকে জানায় যে, সে ওকে ভীষণ ভালবেসে ফেলেছে। আর নির্জন নদীর ধারে বসে বিতস্তাকে কাছে টেনে এনে প্রবল আলিঙ্গন করে। বিতস্তাও তাঁর আগল ভেঙে ভালবাসায় জড়িয়ে থাকে অম্লানকে। নীরবে অম্লানের ঠোঁট এসে বিতস্তার ঠোঁটের গভীরে ঢুকে চরম চুম্বনে লিপ্ত হয়। দুজনের ভালবাসার গভীরতা অঙ্কন হয় ঐ চুম্বনে। কিছু পরেই সম্বিৎ ফিরলে বিতস্তা এক ঝটকায় উঠে পড়ে। তারপর আর পিছন ফিরে না তাকিয়ে মূল রাস্তার দিকে পা বাড়ায়। অম্লান প্রাথমিক শক সামলে উঠে বিতস্তার পিছনে হাঁটতে থাকে। কিন্তু তার আগেই বিতস্তা একটা বাসে উঠে পড়েছে। তারপর থেকে বারে বারে ফোন করতে থাকেন অম্লান। বিতস্তা ফোন ধরে না।
এমন এক সপ্তাহ বিনা যোগাযোগ করে বিতস্তা থাকলো। অম্লানের ফোন বা মেসেজের জবাব দেয় না। মেসেজের মাধ্যমে অম্লান একটাই প্রশ্ন করে গেছে বিতস্তাকে যে, ওঁদের দুজনের অনুভূতি কি এক ছিল না? অম্লান যে তীব্র আবেগ থেকে বিতস্তার প্রতি দুর্বল, তা কি সবটাই মিথ্যে?
বহুদিন পরে একটা ছোট্ট মেসেজ আসে বিতস্তার তরফ থেকে… ‘কিছু প্রশ্নের উত্তর না জানাই ভালো। এরপর থেকে আবারও অম্লান — বিতস্তা অচেনা দুটো মানুষ হলো’।
এই ঘটনার পরে আর কখনো দুজনের মধ্যে যোগাযোগ হয় নি।
বর্তমান সময়ের প্রেক্ষিত (থেরাপি রুমের বাইরে) রিমলির সাথে রিক্তার কথোপকথন অনেকটাই জমে গেছে। একে অপরের ফোন নম্বর নিয়ে ইনস্ট্রাগ্রামে বন্ধুত্বও করে নিলো। একটু পরেই থেরাপি রুমের দরজা খুললো। নার্সদের সাথে পেসেন্টরা বাইরে আসছে। একে একে নাম ধরে ডাকা হলো। ‘অম্লান ব্যানার্জীর বাড়ির লোক’ ডাকতেই রিক্তা দৌড়ে গিয়ে তার শ্বশুর মশাইয়ের হাত ধরলো। রিমলি দেখলো… ফর্সা লম্বা এক বয়স্ক মানুষ আনমনে কি সব বলে যাচ্ছেন। আর রিক্তা তাঁকে খুব যত্ন করে একটা সিটে বসিয়ে মুখ চোখ মুছিয়ে দিচ্ছে। একটু পিছনে মাকে দেখতে পেল রিমলি। মা ওকে দেখেই কেমন কিশোরীর মত ছুটে এলো। আর বকবক করতে লাগলো… ‘এরা বড্ড বাজে, আমাকে আটকে রাখছিলো। আমি বাড়ি যাবো। ‘
‘হাঁ মা, আমরা এখনই যাবো’ — জবাব দেয় রিমলি। তখনই রিক্তা এসে পাশে দাঁড়ায় ওর শ্বশুর মশাইকে নিয়ে। ‘মাসিমা বুঝি?’ বলেই মেয়েটা মাকে নমস্কার করে। মা কেমন বিরক্তি মেশানো মুখ করে বলে ওঠে… ‘আমি এখন কাউকে চিনি না। তুমি কে? আমি বাড়ি যাবো। এরা আমাকে আটকে রেখেছিলো’।
এ কথা বলতে বলতে রিমলির মায়ের নজর হঠাৎ পাশে দাঁড়ানো অম্লান বাবুর দিকে যায়। আর তিনি কেমন অস্থির হয়ে পড়েন। বলতে থাকে, ‘ওঁকে আমি চিনি’।
এ কথা বলেই রিমলির মা চলে যায় অম্লান বাবুর সামনে। আর বলে যায়— ‘এই তোমার বাড়ি কোথায়? তোমাকে আমি এর আগেও দেখেছি। আমি দিদিমণি, জানো তো!’
এই শুনে মা-কে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব সরিয়ে নেওয়ার চেষ্টা করে রিমলি। রিক্তা ইশারায় জানায় যে, ব্যস্ত হওয়ার দরকার নেই। ওরাও অভ্যস্ত এমন মানুষের আচরণে। অম্লানবাবু শুধু নিষ্পলকে চেয়েই থাকে রিমলির মায়ের দিকে। অনেকক্ষণ তাকানোর পরে রিক্তাকে বলে, ‘আমার বাসের টিকিটটা কোথায়?’ রিক্তা হেসে জবাব দেয় যে, বাড়িতে আছে। তারপর ধীরে ধীরে শ্বশুরকে নিয়ে দরজা দিয়ে বেড়োতে থাকে। রিমলিকে পরে ফোন করবে বলে সে ওদের থেকে বিদায় নেয়।
‘বিতস্তা মিত্রের বাড়ির লোক কোথায়? রিসেশন থেকে ওঁনার চার্ট টা নিয়ে নেবেন’ — একজন নার্স সে কথা বলতেই, রিমলি সম্মতি জানিয়ে মা কে নিয়ে লিফটের দিকে যায়।
বিতস্তা নামটা শুনে কিনা কে জানে, অম্লান ব্যানার্জী পিছন ফেরেন, তখন বিতস্তাও হাত বাড়িয়ে দেয় তাঁর দিকে। রিমলি মা-কে টেনে লিফটের মধ্যে নিয়ে যায়।
বাইরে সন্ধ্যা ঘন হয়। রিমলি বাবাকে ফোন করতে করতে মায়ের হাত ধরে বাড়ির পথে পা বাড়ায়।
মন টা ভীষণ ভালো হয়ে গেলো।
আরো লেখা চাই❤️❤️❤️❤️
Thank u bondhu..
Porte eto valo laglo ki r bolbo, Mon die porchilm. Sotti Sokal sokal mon ta valo hoe gelo Bidisha Di……………
Porte eto valo lagchilo ki r bolbo,
Mon die porchilm, sotti sokal sokal mon ta valo hoe gelo amr Bidisha Di……….
Aro lekha pathio tomr
শুনে ভালো লাগলো রে,ভালবাসা অনেক
খুব ভালো লাগলো পড়তে। লিখতে থাকুন, আরো লেখা চাই।
খুব ভালো লাগলো পড়তে।