পোড়া গাছের গুঁড়িময় পাহাড়সারি। রেললাইন ধরে উপরের দিকে উঠে রেলগাড়িটা দৃশ্যের বাইরে চলে গেল আর একগোছা ক্যানভাসের উপর বসে রইলো নিক এডামস। রেলগাড়ির দরজা থেকে ব্যাগপত্র নামিয়ে দিয়ে গেছে গাড়ির লোক। যতদূর চোখ যায় শহরের অস্তিত্ব বলতে কিছু নেই, শুধু রেললাইন আর পুড়ে যাওয়া ধ্বংসযজ্ঞ। তেরো নম্বর মালবাহী রেলগাড়িটি সিনেইয়ের পথ ধরে চলে যাবার চিহ্নটুকুও মুছে গেল ধীরে ধীরে। টিলার উপর ম্যানসন হাউজ হোটেলটির ফাউন্ডেশন টিকে আছে কেবল। পুড়ে খসে খসে পড়ছে তার পাথুরে দেয়াল। সিনেই শহর বলতে এটুকুই যা অবশিষ্ট এখন। মাটি পুড়ে কালচে হয়ে গেছে।
পোড়া বাড়িঘরগুলোর শেষচিহ্নটুকু দেখতে পাবে এই আশায় পাহাড়ের চারদিকে তাকালো নিক। তারপর উঠে দাঁড়ালো। রেললাইন ধরে হেঁটে হেঁটে নদীর উপর ব্রিজটিতে পৌঁছল। ব্রিজের কাঠের সাথে ধাক্কা খাচ্ছে স্বচ্ছ জল। নিচের বাদামী মাটির কারণে জলের রঙও বাদামী দেখাচ্ছে। স্রোতের বিপরীতে পাখনা নাড়িয়ে স্থির থাকার চেষ্টা করছে কতগুলো ট্রাউট। সে তাকাতেই দ্রুত সরে পড়লো মাছগুলো। বদলে নিল নিজেদের অবস্থান। স্রোতের সাথে তাল মিলিয়ে নিজেদের জায়গায় স্থির দাঁড়ালো ওরা। দৃশ্যটির দিকে অনেকক্ষণ চেয়ে রইলো নিক।
ট্রাউটের কমতি নেই জলের গভীরে। নিচেই বড়সড় একটাকে দেখা যাচ্ছে। প্রথমে চোখে পড়েনি, একদম তলায়, বালির সাথে স্রোতের বিপরীতে পাখনা দুলিয়ে চলেছে ওটা। নিক ব্রিজ থেকে জলের গভীরে ভালো করে তাকালো। দিনটা উষ্ণ। একটা মাছরাঙা পাখি লাফিয়ে উঠলো স্রোতের উপর। মাছগুলোকে প্রাণভরে দেখে নিল নিক। মাছরাঙাটা লাফিয়ে ওঠার সময় বড় ট্রাউটটা সরে গেল দ্রুত, পেছনে তৈরি হওয়া ঘোলাটে জলের রেখাটিও মিলিয়ে গেল ধীরে ধীরে।
মাছটা সরে যাবার সাথে সাথে নিকের মন কেমন করে উঠলো। পুরনো দিনের সেই অনুভূতি যেন পেয়ে বসছে আবার তাকে।
ঘুরে স্রোতের দিকে তাকালো সে, নুড়িপাথর জমে আছে নদীর তলায়। তারপর রেললাইনের পাশে যেখানে জিনিসপত্রগুলো রাখা, সেখানে ফিরে এলো। আনন্দ লাগছিল তার। ব্যাগটাকে কাঁধে তুলে নিল কসরত করে। প্রচণ্ড ভারী। হাতে রডের লাঠিতে ভর দিয়ে ওজন ব্যালেন্স করে রেললাইনের পাশ ধরে এগোতে থাকলো নিক। পেছনে পড়ে রইলো উষ্ণ পোড়া শহর।
আগুনে পোড়া পাহাড়, তার উপর দিয়ে চলে গেছে পোড়া একটা পথ। ধীরে ধীরে সেই রাস্তা ধরে এগিয়ে চললো সে। পিঠের ভারি ব্যাগগুলোর জন্য কাঁধ টনটন করছে। এভাবে পাহাড়ে ওঠাটা খুব কষ্টকর। কিন্তু ভেতরে ভেতরে কেমন এক আনন্দও খেলে যাচ্ছে। মনে হচ্ছে সবকিছু পেছনে ফেলে আসতে পেরেছে সে। সব চিন্তা, লেখালেখি, আর যা যা আছে। সমস্ত কিছুই ওর অতীত এখন।
রেলগাড়ি থেকে নামার পর সবকিছু অন্যরকম লাগছে। সিনেই পুড়ে গেছে, পুরো অঞ্চল এখন পোড়া ছাই। কিন্তু এসব আর কোনো ব্যাপার না। সবকিছু তো আর পোড়েনা। ও জানে। রাস্তা ধরে উঠতে থাকলো নিক। ঘেমে যাচ্ছে সূর্যের তাপে। পাহাড়টি পেরিয়ে যাবার সময় রেললাইনটির দিকে তাকালো সে, পাইনবনের ওপাশে—দূরে সরে যাচ্ছে ক্রমশ।
রাস্তা কখনো নিচু হয়ে এলো, তারপর আবার উপরের দিকে উঠে গেলো পুরোটাই। এক সময় পোড়া পাহাড়চূড়ার সমান্তরালে চলা শেষ হলে সে দেখলো, সামনে যতদূর চোখ যায়, শুধু পাইনবন। দূরের ওই নদীটাই শুধু পেছনে পড়েনি তার। জলের উপর সূর্যের আলোর ঝকমক করছে। একটা থামের সাথে হেলান দিয়ে বসলো নিক। সিগারেট ধরালো। মানচিত্রের দরকার পড়লোনা, নদীর অবস্থান থেকেই পুরোটা চিনে নিতে পারলো সে।
সিগারেট খাবার সময় মাটির উপর কালো একটা ঘাসফড়িং চোখে পড়ল। নড়েচড়ে ওর পশমি মোজার কাছে ঘেঁষতে চেষ্টা করছে। রাস্তা ধরে হেঁটে আসার সময় আরো অনেকগুলো দেখেছে সে। হলুদ কিংবা লাল রঙের ছিলনা একটাও। এটা নিয়ে ভাবেনি তখন নিক। এখন দেখছে, আর ভাবছে। ঘাসফড়িংগুলো কালো হয়ে গেছে এই পোড়া অঞ্চলের ছাইয়ের মাঝে থাকতে থাকতে। আগুন লাগানো হয়েছিল সেও প্রায় বছরখানেক আগে। কতদিন ওদেরকে এই রঙ বয়ে নিয়ে চলতে হবে? ভেবে আশ্চর্য লাগলো তার।
‘যা ফড়িং,’ প্রথমবারের মতো উচ্চস্বরে বলে উঠলো সে, ‘কোথাও উড়ে যা!’
পতঙ্গটাকে শূন্যে তুলে হাওয়ায় উড়িয়ে দিল সে। সামনের পথ চোখে পড়লো ওর। চারকোলের কালো দাগ লেগে আছে রাস্তাজুড়ে। উঠে দাঁড়িয়ে পিঠের ব্যাগটাকে কসরত করে আবার ব্যালেন্স করে নিল। দূরে—নদীর দিকে যাবার জন্য পাহাড়ের পাশ ঘেঁষে নামতে হবে। পায়ের তলার এই রাস্তা ধরে হাঁটতে ওর ভালো লাগছে। দু’শ গজ নিচে গিয়ে থেমেছে আগুনের পোড়া দাগ। এরপর সুন্দর সবুজ, লতানো ঝোপঝাড়। আরেকটু হেঁটে গেলে জ্যাক পাইনের সারি। পায়ের তলায় পোড়া মাটি নেই। যেন এখানে এসে আবার জ্যান্ত হয়ে উঠেছে অঞ্চলটি।
সূর্যের অবস্থান দেখে এগোতে থাকলো নিক। পাইনের সারি ধরে হাঁটতে হাঁটতে কয়েকটা লতার ডগা ছিঁড়ে শুঁকে দেখলো। ক্লান্ত লাগছে খুব। ঘামে ভিজে গেছে শরীর। পাইন সারির ভেতরে মনমতো ছায়া নেই। যে কোনো সময় বাঁ’দিকে হেঁটে গেলে নদীটিকে পাওয়া যাবে, জানা আছে তার। বড়জোর মাইলখানেক তফাতে বয়ে গেছে ওটা। কিন্তু সে সোজা হাঁটছে উত্তরদিক বরাবর। যতটা সম্ভব একদিনের পথ হেঁটে তারপর নদীর কিনারে গিয়ে তাবু ফেলতে চায় ও। পাইনগাছের শাখাগুলো ছড়ানো না; তবে বেশ উঁচু। মাঝে মাঝে কয়েকটা পাইনগাছের ঘন ডালপালা বাদামি মাটির উপর নিরেট ছায়া ফেলে আছে। লম্বা গাছগুলো ডালপালা ছড়িয়ে নিজেদের মতো উঠে গেছে সূর্যের আলো প্রবেশের জন্য যথেষ্ট যায়গা রেখে।
পিঠের ব্যাগ ফেলে একটা ছায়ায় বসে পড়লো ও। শিথিল করার চেষ্টা নিল শরীরের পেশিগুলোকে। ডালপালার ভেতর দিয়ে আকাশের দিকে তাকিয়ে চোখ বন্ধ করলো, তারপর আবার চোখ খুলে তাকালো, ডালপালার উপর দিয়ে বাতাস বয়ে যাচ্ছে। ঘুমে বুঁজে এলো দু’চোখ।
যখন ঘুম ভাঙল—সূর্য প্রায় ডুবতে বসেছে। হাত-পায়ে দারুণ ব্যাথা। ব্যাগপত্র তুলতে কষ্ট হলো ওর, সেসব কোনরকমে পিঠে তুলে রডে ভর করে আবার এগিয়ে চললো সামনের দিকে। পাইনবনের শেষে—নদীটির দিকে—সবুজ ঘাস, লতাপাতায় ছেয়ে যাওয়া ভূমি। পাহাড়ের ধার ঘেঁষে নেমে আসতে আসতে সামনের তৃণভূমি চোখে পড়লো। তৃণভূমির শেষপ্রান্তে বয়ে যাচ্ছে সেই জলধারা। নদীটির দেখা পেয়ে আনন্দে ভরে উঠলো নিকের হৃদয়। এগিয়ে গেল সে। মোজা ও প্যান্ট শিশিরভেজা হয়ে যাচ্ছে। সারাদিনের উষ্ণতা শেষে, সূর্যটা ডুবে যাবার আগেই, শিশির ঝরতে শুরু করেছে। ভারী শিশির। নদীটিও নিশ্চুপ। নীরবে বয়ে চলেছে তার প্রচণ্ড স্রোত। তৃণভূমির শেষে নদীর ধারে একটু উঁচু জায়গা বেছে নিল সে ক্যাম্প করার জন্য। ট্রাউটগুলো ছোটাছুটি করছে জলের ভেতর। জলপোকা খেতেই বারবার উঠে আসছে ওরা। তাতে ঝিরিঝিরি আলোড়ন উঠছে জলে। যেন বৃষ্টি নামছে ওখানে।
বালিময় উঁচু একটা জায়গা দেখে ব্যাকপ্যাক নামালো সে। জায়গাটা তৃণভূমি থেকে উঁচু হলেও পাইনবনের প্রায় সমতল। খিদে পেয়েছে ওর। তবে রান্নার আগে তাবুটা টাঙিয়ে ফেলা দরকার। ব্যাগ থেকে কুঠার বের করে দুটো জ্যাক পাইন গোড়া থেকে কেটে আনলো নিক। শোয়ার জন্য এদুটো যথেষ্ট চওড়া। ঘাসগুলোর সাথে হাত লেগে, সুন্দর একটা ঘ্রাণ তৈরি হয়েছে হাতে। তাবুর জায়গাটা সমান করে সেখানে তিনটি কম্বল বিছিয়ে নিল ও। জ্যাক পাইনের বাকি অংশ কেটে তাবুর খুঁটি হিসেবে ব্যবহার করল। জ্যাক পাইনের তুলনায় খুব ছোট একটা তাবু। রশি দিয়ে খুঁটির সাথে শক্ত করে তাবুর প্রান্তগুলো বাঁধা হলো।
তাবুর খোলা দিকটাতে মশারির মতো কাপড় টাঙিয়ে দিল নিক, যাতে মশা না ঢুকতে পারে। তারপর হামাগুড়ি দিয়ে ভেতরে ঢুকলো। ব্যাগ থেকে প্রয়োজনীয় জিনিসপত্র বের করে ক্যানভাসের একপাশে উঁচু জায়গায় গুছিয়ে রাখলো। বাইরের ম্রিয়মান আলো ক্যানভাসের বাদামী কাপড়ের উপর পড়ে ভেতরটাকে সামান্য আলোকিত করছে। ক্যানভাসের ঘ্রাণ ভালো লাগছে ওর। সারাদিনে এতটুকুও মন খারাপ হয়নি আজ। এখন যদিও সব অন্যরকম। ঝামেলা চুকে গেছে সব। থেমে গেছে যুদ্ধ। বহু দীর্ঘ যাত্রা শেষে এখানে পৌঁছেছে সে। ক্লান্ত লাগছে খুব। যাক, ক্যাম্প তৈরি হয়ে গেল। থিতু হওয়া গেল সাময়িকভাবে। কিছুই আর ওকে স্পর্শ করতে পারবে না এখন। ক্যাম্প করার যথার্থ জায়গা এটা, আর সেই যথার্থ জায়গাতেই আছে সে।
মশারির কাপড় সরিয়ে তাবু থেকে বাইরে বেরিয়ে এলো নিক। চারপাশে আঁধার নেমেছে। ব্যাগ হাঁতড়ে অনেকগুলো পেরেক থেকে বড় একটা পেরেক বের করে কুঠারের হাতল দিয়ে একটা পাইন গাছে ঠুকে দিল ও। ব্যাগটা ঝুলিয়ে রাখল তাতে। খাবার এবং সমস্তকিছুই ওই ব্যাগের ভেতর। ভীষণ খিদে পেয়েছে তার। এতই যে মনে হচ্ছে এর চেয়ে বেশি খিদে মানুষের লাগেনা কখনও। একটা কৌটা থেকে শুকরের মাংস, একটা কৌটা থেকে মটরশুটি এবং আরেকটি থেকে কিছু ময়দা বের করে সে কড়াইয়ের উপর ঢাললো। ‘এগুলো এতদূর বয়ে যদি আনতে পারি তো খাওয়ার অধিকারও শুধু আমারই,’ বিড়বিড় করলো সে। অন্ধকার নেমে আসা বনভূমির ভেতর ওর কন্ঠস্বর শোনালো অদ্ভুত।
কুঠার দিয়ে পাইনের কিছু ডালপালা কেটে সে আগুন জ্বালালো। তারের সাহায্যে গ্রিলের মতো বানিয়ে কড়াই বসিয়ে দিলো গণগণে আগুনের উপর। খিদে আরো বেড়ে গেছে যেন। ক্যানের ভিজে মাংস, মটরশুটি আর ময়দা গরম হতে থাকলো, ফুটে বুদ্বুদ উঠতে শুরু করলো কিছুক্ষণের মাঝে। সুন্দর ঘ্রাণ ছেড়েছে। রুটি কেটে নিল নিক, টমেটো কেচাপ বের করল কৌটা থেকে। বুদ্বুদ বাড়ছে। কড়াইটা নামিয়ে নিল তারপর। টিনের থালায় খাবার ঢাললো। গরম থালা থেকে উড়ছে ধোঁয়া। একবার আগুনের দিকে তাকালো সে, এরপর তাবুর দিকে। এই সুন্দর অভিজ্ঞতা সে জিহ্বাটা পুড়িয়ে নষ্ট করতে নারাজ। কোনদিনই সে ভাজাপোড়া গরম গরম উপভোগ করতে পারেনি। ওর জিহ্বা খুব স্পর্শকাতর। যদিও খিদেয় চোঁচোঁ করছে পেট। নদীর ওপাশে জলাজঙ্গল, সেখানে জমে আছে অন্ধকার, কুয়াশা নেমে আসছে ধীরে ধীরে। আরেকবার তাবুর দিকে তাকালো নিক, অতঃপর শুরু করলো খাওয়া।
‘ক্রাইস্ট’, উল্লাসে চিৎকার করে উঠলো সে, ‘জিসাস ক্রাইস।’ রুটির কথা ভুলেই সাবাড় করে দিল মাখামাখা মাংস আর মটরশুটির ঝোল। এরপর আবার থালা ভর্তি করে খেল রুটি দিয়ে। সেইন্ট ইগনেস স্টেশনের এক রেস্টুরেন্টে খেয়েছিল শেষবার। তারপর আর একমগ কফি কিংবা একটা হ্যাম স্যান্ডউইচও খাওয়া হয়নি। এত ভাল লাগছে। আগেও এমন খিদে লাগতো ওর, কিন্তু এমন করে, এত তৃপ্তি নিয়ে খিদে মেটাবার সৌভাগ্য হতো না। চাইলে কয়েকঘণ্টা আগেই ক্যাম্প ফেলতে পারত ও। ক্যাম্প ফেলার মতো এমন আরো অনেক সুন্দর জায়গা ছিল পেছনে। তবে এ জায়গাটি অন্যরকম।
পাইনের দুটো বড় ডাল ঠেলে দিল সে গ্রিলের নিচে। ফুঁসে উঠলো আগুন। কফি বানাবার জন্য পানির কথা ভুলেই গিয়েছিল। ব্যাগ থেকে ভাঁজ করা ক্যানভাসের বালতি খুলে পাহাড়ের কিনার ঘেঁষে, তৃণভূমির শেষপ্রান্তে, নিচে, জলস্রোতের কাছে নেমে এলো। নদীর ওধারটা সফেদ কুয়াশায় ঢেকে আছে। স্রোতে বালতি ডুবিয়ে দেবার সময় নিক টের পেল ঘাসগুলো—শিশিরে ভিজে আছে, শীতল। বরফের মতো ঠাণ্ডা জল। বালতিটা ধুয়ে পানিভর্তি করে উঠে এলো। কফির পটে অর্ধেক পানি ঢেলে আগুনের উপর বসিয়ে দিল। ওর মনে পড়লোনা কীভাবে কফি বানাতো আগে। শুধু খেয়াল হল, এ নিয়ে হপকিন্সের সঙ্গে তর্ক হয়েছিল কয়েকবার। ভাবলো, পানিটা ফুটে উঠুক আগে। এখন মনে পড়ছে হপকিন্স কীভাবে কফি বানাতো। একটা সময় ছিল, হপকিন্সের সঙ্গে ও পৃথিবীর তাবৎ বিষয়াদি নিয়ে তর্ক করতো। কফি ফুটবার সময় এপ্রিকোটের ছোট কৌটাটি খুলে নিল সে। কৌটা খুলতে ওর মজা লাগে। একটা টিনের কাপে পুরো কৌটা খালি করে এপ্রিকোট ঢেলে নিল। আগুনের উপর কফি যখন গরম হচ্ছিল সেই ফাঁকে ধীরে ধীরে গিলতে লাগলো এপ্রিকোটের জুস।
কফি সেদ্ধ হলো। সামান্য উছলেও পড়লো পট থেকে। হপকিন্সের সঙ্গে তর্কে জেতার প্রমাণ এটি—নিজের পদ্ধতিতে কফি বানানো। এপ্রিকোটের খালি কাপের মধ্যে খানিকটা চিনি ঢাললো ও। কফিপট প্রচণ্ড গরম। মাথার টুপিটা খুলে হাতে নিয়ে তারপর ধরলো সে পটটা। বাইরে ছলকে পড়তে দেবে না একফোঁটাও। হপকিন্সের কথা মনে পড়ছে খুব। সাঙ্ঘাতিক কফিখোর ছিল হপকিন্সটা। নিকের দেখা সব চাইতে সিরিয়াস মানুষও ছিল সে। অনেক আগের কথা এসব। হপকিন্স নিজের ঠোঁট না নাড়িয়েই কথা বলতে পারতো। আর পারতো পোলো খেলতে। টেক্সাসে লাখ লাখ টাকা কামিয়েছিল সে। হপকিন্সদের বড় কুয়োতে তেলের সন্ধান পাওয়া গেছে—এই মর্মে টেলিগ্রাম এলো একবার। শুনে হপকিন্স গাড়ি ভাড়া করলো শিকাগোতে যাবার জন্য। টাকা চেয়ে টেলিগ্রাম করতে পারতো সে। তবে সেটা আরো ধীর প্রক্রিয়া হতো। নিক ও অন্যান্য বন্ধুরা হপকিন্সের প্রেমিকাকে বলতো ‘ব্লন্ড ভেনাস’। হপকিন্স এতে কিছু মনে করতো না। কারণ মেয়েটি ওর আসল প্রেমিকা ছিলনা। ওর আসল প্রেমিকা যে ছিল—তাকে নিয়ে যেন মন্তব্য না করে কেউ—এমনটা বলে সে সতর্ক করে দিয়েছিল সবাইকে। সেই ঠিক ছিল; টেলিগ্রাম আসতেই চলে গেল। কুয়োটা ছিল ব্ল্যাক রিভারের পাশে। আটদিন লেগেছিল টেলিগ্রামটা ওর কাছে পৌঁছুতে। যাবার আগে নিজের পয়েন্ট টু টু ক্যালিবারের কোল্ট অটোমেটিকটা নিককে দিয়ে গিয়েছিল হপকিন্স। আর ক্যামেরাটা বিলকে। এগুলোই সবসময় মনে করিয়ে দিতো হপকিন্সের কথা। পরের গ্রীষ্মে ওরা সবাই মিলে আবার মাছ ধরতে গিয়েছিল। হপকিন্স তখন বিশাল বড়লোক। চাইলেই পরবর্তীতে একটা ইয়ট কিনে সবাইকে নিয়ে সুপেরিয়র লেকের উত্তর উপকূলে ঘুরতে যেতে পারত। হপকিন্স এসব ব্যাপারে উত্তেজিত ছিল, ছিল যথেষ্ট সিরিয়াসও।
টেলিগ্রামের ফলে চলে যাবার দিন বন্ধুরা সবাই মন খারাপ করে হপকিন্সকে বিদায় জানিয়েছিল। আর অভিযানটাও শেষ হয়েছিল ঐখানেই। তারপর বন্ধুরা কেউ কোনোদিন আর হপকিন্সকে দেখেনি। এসব অনেক আগের কথা। ব্ল্যাক রিভারের সেই পুরনো গল্প।
কফি খাওয়া শেষ করলো নিক—হপকিন্স পদ্ধতির কফি। তেতো হয়েছে। হেসে ফেললো সে। এই তেতো স্বাদটার মধ্য দিয়েই গল্পটার সুন্দর একটা সমাপ্তি হলো। মনটা চঞ্চল হয়ে উঠলো এরপর কিছু করার জন্য। চাইলে কিছু নাও করতে পারে নিক—যেহেতু সে অনেক ক্লান্ত আজ। কফির পট থেকে বাকিটুকু ফেলে দিলে তা শুষে নিল মাটি। একটা সিগারেট ধরিয়ে তাবুর ভেতরে ঢুকে গেল সে। জুতো আর ট্রাউজার খুলে কম্বলের উপর বসলো। বালিশ বানিয়ে নিল ট্রাউজার দিয়ে জুতোগুলো পেঁচিয়ে। ঢুকে গেল কম্বলের ভেতর।
চুপচাপ—বাইরে জ্বালানো আগুনের উজ্জ্বল আলো দেখতে থাকলো ও। নৈশহাওয়া বয়ে যাচ্ছে তাবুর উপর দিয়ে। শান্ত এই রাতের মত নদীটিও শান্ত। কম্বলের ভেতরে আরাম করে শুয়ে পড়লো নিক। একটা মশার ভনভন শুনতে পেল কানের কাছে। উঠে বসে ম্যাচের কাঠি জ্বালালো। মশাটা ক্যানভাসের উপর বসে ছিল, মাথার ওপাশেই। দ্রুত কাঠিটা এর উপর ঘুরিয়ে আনলো নিক, সন্তোষজনক একটা শব্দ হল পুড়ে যাবার—মশাটা খতম। কাঠি নিভে গেল। আবার কম্বল মুড়িয়ে শুয়ে পড়লো ও। দু’চোখে ধীরে ধীরে ঘুম নেমে আসাটা টের পেল নিক।
সকালবেলা। সূর্য উঠল। তাবুটা উষ্ণ হতে শুরু করল ধীরে ধীরে। মশারির নিচ থেকে হামাগুড়ি দিয়ে বাইরে এলো নিক সকাল দেখতে। বেরুবার সময় শিশির ভেজা ঘাসে হাত ভিজে উঠল ওর। সূর্য মাত্রই উঁকি দিয়েছে পাহাড়ের ওপরে। দৃশ্যজুড়ে নদী, তৃণভূমি আর জলাভূমি। নদীর ওপাশের জলাভূমিতে গাছ-গাছালি বন।
ভোরবেলায় নদীর জল খুব পরিষ্কার আর তার ধারালো স্রোত—বয়ে যাচ্ছে। দুইশ গজ নিচে স্রোতে ভেসে যাচ্ছে তিনটি গাছের গুঁড়ি। নিক পুরনো ও পরিচিত সেই উত্তেজনা অনুভব করলো আবার। নদী আর ভোর দেখে ভেতরে এই উত্তেজনা কাজ করছিল ওর।
এখন খুব দ্রুত নাশতা সেরে ফেলতে হবে। আগুন জ্বালিয়ে কফির পট বসিয়ে দিল ও। জল গরম হবার সময় একটা খালি বোতল হাতে নিয়ে তৃণভূমির উঁচু জায়গাটির ওপাশে নেমে গেল। শিশিরস্নাত ঘাস। সূর্যের তাপে শুকিয়ে যাবার আগেই এগুলোর মাঝ থেকে কিছু ঘাসফড়িং ধরে নেয়া দরকার। মাছের আধার হিসেবে কাজে লাগানো যাবে। ঘাসের একেবারে তলায় থাকে এগুলো। কখনো কখনো ঘাসের ডগাতেই ঝুলতে দেখা যায়। শিশিরে ভিজে ওদের পাখা ঠাণ্ডা আর ভারী হয়ে আছে। সূর্যের তাপে শুকানো না পর্যন্ত লাফিয়ে সরে যেতে পারবেনা না, নিক জানে। তাই শিশির শুকিয়ে যাওয়ার আগেই ওগুলো ধরার নিয়ম। একটা কাঠের গুঁড়ি সরাতেই তার নিচে পাওয়া গেল শতশত ঘাসফড়িং-এর বসতি। প্রায় পঞ্চাশটা মাঝারি আকৃতির বাদামি ঘাসফড়িংগুলো বেছে বেছে ধরে নিল নিক। বোতলে ঢুকিয়ে রাখলো। শিশির না থাকলে বোতলের ঘাসফড়িংগুলো ধরতে সারাদিন লেগে যেতে পারতো। তখন মাথার হ্যাটটা দিয়ে পাকড়াও করতে হয়।
২.
জলের স্রোতে হাত ধুয়ে নিল নিক। স্রোতের কাছাকাছি হতেই কেমন একটা উত্তেজনা টের পেল নিজের ভিতরে আবার। তারপর তাবুর কাছে ফিরে এলো। ঘাসের ভেতর ফড়িংগুলো ছোটাছুটি শুরু করেছে। পাইনের একটা ডালের অংশ বোতলের ছিপি হিসেবে ব্যবহার করল ও। পুরোপুরি এঁটে গেল, এখন বোতল থেকে ফড়িংগুলো পালাতে পারবে না, আবার ওদের বেঁচে থাকার জন্য যথেষ্ট বাতাসও ঢুকছে ছিপির ফাঁক গলে।
একটা পাইন গাছের সাথে ঠেস দিয়ে রাখলো সে ঘাসফড়িংভর্তি বোতল। দ্রুত জলের সাথে কিছুটা ময়দা মিশিয়ে নেড়েচেড়ে নরম করে নিল। এক কাপ ময়দা, এক কাপ জল। গরম হওয়া পানিতে কফি ঢাললো। ময়দার কেক বাদামি রঙ ধারণ করলো আর ফুটতে শুরু করেলো কফি পটের জল। কয়েকটা পাইনের ডাল আগুনে ফেললো নিক। এরপর চর্বি লাগালো বড়শির মাথায়। দুটো ফ্ল্যাপজ্যাক পিঠা খেয়ে নিল চটজলদি। ব্যাগ থেকে আপেলের জেলি বের করে আরেকটা পিঠার উপর মাখালো। দুটো স্যান্ডউইচও বানিয়ে নিল ব্যাগ থেকে পাউরুটি আর পেঁয়াজ বের করে। খাকি শার্টের পকেটে এই খাবারগুলো ঢুকিয়ে গ্রিল থেকে কফি নামিয়ে চুমুক দিল। মিষ্টি হলুদাভ বাদামী বর্ণের কফি। কারণ এর সাথে কনডেন্সড মিল্ক মেশানো হয়েছে। আহ্ এই না হলো ক্যাম্পিং, প্রাণভরে শ্বাস নিল নিক এডামস।
তাবুর ভেতর থেকে বড়শির রড বের করলো। রডটা খুলে লম্বা করা যায়। অনেকদিন আগে আট ডলার দিয়ে কিনেছিল। এর সাথে জুড়ে দিল বড়শির তার। সরু বড়শি, স্প্রিং এর মতো ওঠানামা করছে তারটা। ফলাটা যেন নিজেরই আঙুলে গেঁথে না যায় এ ব্যাপারে সে পুরোপুরি সজাগ। রশিতে বেঁধে ঘাসফড়িং-এর বোতলটা ঝুলিয়ে নিল গলার চারপাশে, বড়শির রড হাতে স্রোতের দিকে নেমে পড়লো এরপর। কোমরের কাছে ময়দার ব্যাগ বাঁধা। হাঁটার সময় দুলে দুলে পায়ের সাথে মৃদু ধাক্কা খাচ্ছে ওটা। অদ্ভুত এক আনন্দ অনুভব করলো নিক। বুকের কাছে ঘাসফড়িং-এর বোতল ঝুলছে। পোকাগুলো লাফঝাঁপ করছে বোতলের ভেতরে। স্রোতে নেমে পড়লো নিক। ট্রাউজার ভেদ করে প্রচণ্ড ঠাণ্ডা জলের স্পর্শে চমকে উঠলো। স্রোতটা যেন ওর দুই পা টেনে নিয়ে যেতে চাইছে সঙ্গে করে। যেখানে পা ফেলে সেখানেই হাঁটুর উপরে জল। স্রোতের ভেতর দিয়ে হাঁটতে থাকলো ও। নিচের নুড়িগুলোতে কয়েকবার পাও হড়কালো। জলের নিচে—নিজের পায়ের দিকে তাকালো একবার, তারপর বুকে ঝোলানো বোতল থেকে একটা ঘাসফড়িং বের করার চেষ্টা করলো। ছিপি খুলতেই প্রথম ঘাসফড়িং বেরিয়ে গেল লাফ মেরে, গিয়ে পড়ল স্রোতের উপর। জলের মসৃণ উপরিতল—তাতে সামান্য ঢেউ তুলে অদৃশ্য হয়ে গেল বেচারা। একটা ট্রাউট এসে গিলে নিতে দেরি করেনি।
আরেকটা ফড়িং বোতল থেকে মুখ বের করে ঝাঁপ দিতে উদ্যত হতেই ওর মাথা চেপে ধরে ফেললো নিক। গেঁথে নিল বড়শিতে। বড়শির সুতো ছুঁড়ে দিল জলের উপর। ঘাসফড়িংটা প্রথমে বড়শিসুদ্ধ স্রোতের সাথে ভেসে যাচ্ছিল। এরপর ডুবে গেল আস্তে আস্তে।
প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই টোকা পড়লো। টান দিল নিক, এটা ছিল প্রথম দফা। স্রোতের সাথে শক্ত করে বড়শির রড ধরে ছিল সে, একটা ট্রাউট সেই টোপ গিলে নিল। নিক জানত, মাছটা ছোট। বড়শিটা তুলে নিল সে জলের উপর। মাছটা ছাড়িয়ে স্রোতের ভেতরে আবার ছেড়ে দিল।
সবকিছু ঠিকঠাক আজ। একটু ক্লান্ত লাগছে এই যা।
ছোট ট্রাউটটা হাত দিয়ে ধরার আগে হাত ভিজিয়ে নিয়েছিল জলে—যাতে মাছটার শরীর ফাঙ্গাস আক্রান্ত না হয়। শুকনো হাতে ট্রাউট ধরলে ধরার জায়গাটাতে ফাঙ্গাস আক্রমণ করে, মরে যায় মাছটা। কয়েক বছর আগের মাছ ধরার অভিজ্ঞতা মনে পড়ল ওর। স্রোতের ভেতর ও সামনে পেছনে যতদূর চোখ যায়—শুধু ছিল জেলে আর জেলে। তাদের কারণে তখন প্রায়ই ফাঙ্গাস আক্রান্ত মৃত ট্রাউট দেখা যেত পাথরের ঘুপচিতে বা জলের উপর। নদীতে অন্য লোকদের সাথে মাছ ধরা পছন্দ করে না নিক। বাকিরা যদি নিজের দলের সদস্য না হয়, তবে পুরো মাছ ধরার পরিবেশটাই তারা নষ্ট করে ফেলে।
হাঁটুর উপর বইছে স্রোত। তা থেকে ঘন হয়ে উঠে আসছে জলীয় বাষ্প। তার ভেতরে পা ডুবিয়ে দাঁড়িয়ে আছে নিক। কাঠের গুঁড়িটা যেখানে পড়ে ছিল সেখান থেকে পঞ্চাশ গজ দূরে হেঁটে গেল ও স্রোতের ভেতর। বড়শিতে নতুন আধার বসালো না। অগভীর জলে চাইলেই ছোট ছোট অনেক ট্রাউট ধরা যায়। কিন্তু ওগুলো ধরতে চাচ্ছে না ও। বড় কোনো ট্রাউট থাকার সম্ভাবনাও নেই অগভীর জলে।
যেখানে এগিয়ে এলো ও, সেখানে জল প্রায় কোমরের কাছাকাছি—ঠাণ্ডা জল, স্রোতটাও নিখুঁত। সামনে হেলে থাকা গাছের গুঁড়িটার উপর দিয়ে শক্তিশালী স্রোত বইছে। জলও গভীর, অন্ধকারাচ্ছন্ন, মসৃণ; বাঁ দিক থেকে তৃণভূমি নিচু হয়ে এসে ডুবে গেছে ডানের জলাভূমিতে। নিক আবার ঝুঁকে স্রোতের মাঝে দাঁড়িয়ে একটা ঘাসফড়িং বের করলো। বড়শিতে গেঁথে জলে ছুঁড়ে দিল। ছাড়তে থাকলো সুতা। ঘাসফড়িং ডুবে গেল তীব্র ও অন্ধকার স্রোতের নিচে। ডানহাতে রড ধরে রইলো নিক।
ঠোকর পড়লো বড় একটা। উপরে টান দিতেই জ্যান্ত হয়ে উঠলো বড়শি। একটা বিশাল ট্রাউট উঠে এলো জল ভেদ করে। মাছটা একবার ঝাঁপ দিতে গেলে নিক বড়শিটার মাথা মাছসহই আবার পানিতে নামিয়ে দিল। এতে দুর্বল হয়ে এলো ঝাঁপাঝাঁপি, সুতো ছিঁড়ে পালানোর সুযোগ রইলোনা। যদিও বড়শির সুতো যথেষ্ট শক্ত। মাছটারও আর আশা নেই ছুটে যাবার।
সুতোটা পেঁচিয়ে আনতে থাকলো নিক। এতবড় ট্রাউট আগে দেখেনি সে। ভারী, লাফাতে চাইছে খুব। প্রায় একটা স্যালমন মাছের সমান চওড়া। নিকের হাত নড়বড় করছে। ধৈর্যের সাথে গুটিয়ে আনতে হবে সুতো। দারুণ এক উত্তেজনা কাজ করছে ওর ভেতরে। একটু অসুস্থও লাগছে। তবে কোথাও আরাম করে বসলে সব ঠিক হয়ে যাবে।
রডের মাথাটা বেঁকে গেল সামান্য। ট্রাউটটা নিচেই কোথাও বড়শি গালে গেঁথে চুপ করে আছে, নুড়িপাথরের ফাঁকে, ভাবলো ও। অতটা জলের অন্ধকারে আলো পৌঁছায় না। গাছের গুঁড়ি পড়ে আছে নিচে। ট্রাউটটা দাঁত দিয়ে বড়শি কেটে ফেলতে পারে, নিক জানে। এবং সে নিশ্চিত, ট্রাউটটা রেগে গেছে। এই আকারের যে কোনো কিছুরই রাগ থাকে। উপরন্তু এটা ট্রাউট। খুব ভালোমতোই বড়শিতে গেঁথেছে। মাছটা বিশাল, আজতক তার দেখা যে কোনো ট্রাউটের মধ্যে সবচেয়ে বড়।
নিক উঠে পড়লো তৃণভূমির কিনারে। ট্রাউজার, জুতাজোড়া থেকে জল ঝরছে শব্দ করে। একটা গাছের গুঁড়ির উপর বসলো সে। তাড়াহুড়া করতে চায় না একদম। জুতোর ভেতরে পায়ের আঙুলগুলো নাড়াচাড়া করলো, একটা সিগারেট বের করলো বুক পকেট থেকে। সেটা জ্বেলে ম্যাচের কাঠিটা ফেলে দিল গাছের গুঁড়ির পাশেই। ছোট একটা ট্রাউট এসে ভেজা কাঠিতে ঠোকর দিতে যাচ্ছিল কিন্তু তার আগেই স্রোতে ভেসে গেল কাঠিটা। নিক হেসে উঠল। সিগারেটটা আয়েশ করে শেষ করা যাক।
কাঠের গুঁড়ির উপর বসে রইলো ও। রোদে শুকোচ্ছে। উত্তাপে পিঠ গরম হয়ে উঠছে। জঙ্গলের দিকে অগভীর হয়ে গেছে নদী। অগভীর জল, ভেতর থেকে রোদের আলোয় ঝিলিক দিচ্ছে বড় কয়েকটি মসৃণ পাথর। সাদা বার্চ গাছ উপড়ে আছে নদীর কিনারে, বাকলহীন, রোদে পুড়ছে। তার উপর আরাম করে বসা যায়। ছুঁ’লে উঠে আসে ধূসর ধুলো। সামান্য হতাশ লাগছিল আচানক। ধীরে ধীরে কেটেও গেল তা। তার মনে হল সব ঠিকঠাক আছে। গাছের গুঁড়ির সাথে বড়শির রড হেলান দিয়ে শোয়ানো। লিডারে নতুন হুক লাগালো সে। টেনে দেখে নিল যথেষ্ট শক্ত হয়েছে কিনা।
আবার আধার লাগালো বড়শিতে। সেটা হাতে নিয়ে জলে নেমে এলো। এখানে জল অগভীর। গাছের গুঁড়ির ওপাশেই নিচে একটা বড় গর্ত আছে। জলের অগভীর অংশ দিয়ে হেঁটে এগুতে থাকে নিক জলাজঙ্গলের কাছাকাছি। ওখানে স্রোত কিছুটা কম।
বাঁদিকে, তৃণভূমি শেষ হয়ে শুরু হয়েছে বন। বিশাল একটা এলম গাছ উপড়ে পড়ে আছে। ঝড়ের কবলে পড়েছিল, জঙ্গলের দিকে মাথা দিয়ে পড়েছে। তার শেকড়ে কাদা ময়লা। সামান্য ঘাসও জন্মেছে। নিক যেখানে এসে দাঁড়ালো, সেখানে পায়ের তলায় বিস্তৃত নুড়ি পাথর।
সে বড়শি ফেললো আবার। একটা ট্রাউট ঠোকর দিতেই নিক টান দিয়ে শূন্যে তুলে নিল মাছটাকে। নিয়ে এলো কাছে। লাফ দিতে চাইলো মাছটা, কিন্তু লাভ হল না। মাছটার লাফঝাঁপের ফলে বড়শির রড কেঁপে উঠতে থাকে। হাতে তুলে নিয়ে ওটার মুখ থেকে বড়শি খুলে, জালের তৈরি একটা থলের মধ্যে রাখলো নিক। জালের ভেতরে ভারী হয়ে আছে ট্রাউট। জালের রূপালি মুখের কাছে চলে এলো একবার। নিক সেটাকে ঠেলে থলের গভীর অংশে পাঠালো যেটা ওর কাঁধ থেকে ঝুলে জলের ভেতরে ডুবে আছে। থলের মুখ খুলে আরো জল ঢুকিয়ে নিল ও। জলের ভারে আরো ভারী হয়ে উঠলো থলেটা, হালকা করতে জল থেকে কিছুটা উপরে তুললো সে, ফলে বাড়তি জল ঝরে গেল কিনার গড়িয়ে। থলের নিচের দিকে দুটো বড় ট্রাউট, জলের ভেতর জীবন্ত।
বেলা বাড়ার সাথে সাথে দিনের উষ্ণতাও বাড়ছে। ঘাড়ের কাছে সূর্যের প্রখর তাপ টের পাচ্ছে ও। একটা দুটো ট্রাউটই ভালো। যেহেতু অনেক মাছ ধরবার ইচ্ছে নেই ওর। কম স্রোতের দিকে এগুতে থাকলো তাই। দুই তীরেই গাছপালা। বাঁদিকের তীরে একটা গাছ প্রায় দুপুরের রোদে যৎকিঞ্চিৎ ছায়া ফেলে আছে। প্রত্যেক ছায়ার নিচের জলেই ট্রাউট আছে, জানে নিক। বিকেলবেলা সূর্যের আলো পাহাড়ের ওপাশে আটকে গেলে শীতল ছায়াগুলোতে— স্রোতের ওপাশটায়, আরো ট্রাউট ভিড় করবে।
বড় ট্রাউটগুলোও তখন তীরের দিকে পাওয়া যায়। ব্ল্যাক রিভারে যখন তখন ওগুলো ধরা যেত। সূর্য ডুবে গেলে এরা স্রোতের সবখানেই ঘুরতে থাকে। সূর্য ডোবামাত্র যে কোনো জায়গা থেকেই বড় ট্রাউটগুলো ধরা সম্ভব। কিন্তু যখন সূর্য মাথার উপর, জল চিকচিক করতে থাকে রোদে, তখন ওগুলো ধরা প্রায় অসম্ভব। তবে বেশি স্রোতের দিকে ধরা যায়, আর তা কেবল ব্ল্যাক রিভারের স্রোতে সম্ভব। এই নদীটিতেও ধরা যাবে। স্রোতের বিপরীতে হেঁটে হেঁটে নদীর গভীর অংশে যেতে হবে সেক্ষেত্রে। স্রোত এসে ধাক্কা খেতে থাকবে শরীরে, টেনে নিতে চাইবে। ফলে অত স্রোতে মাছ ধরাটা খুব মজার বিষয় না।
নিক ধীরে ধীরে নিচের গর্তগুলো পরখ করে এগুতে থাকলো। নদীর কিনারে ছোট একটা বিচ গাছ, বড় হচ্ছে। ডালগুলো ঝুলে আছে, নদীর কাছাকাছি এসে উপুড় হয়ে ছুঁয়ে আছে জল। পাতার তলা দিয়ে স্রোত বইছে। ওরকম জায়গায় সব সময়ই ট্রাউট থাকে। তবে ওখানকার গর্তগুলোর কাছে মাছ ধরবার ইচ্ছে নেই ওর। ডালপালা আটকে যাবে বড়শিতে। যদিও ওখানটা বেশ গভীর মনে হচ্ছে। এগিয়ে গিয়ে বড়শিতে ঘাসফড়িং লাগিয়ে জলে ফেলল ওই ঝুলে থাকা ডালগুলোর নিচে।
শক্ত টান পড়ল বড়শিতে। নিক টান দিল, দেখলো আরেকটা বড় ট্রাউট। ডালপালার পাতার উপরে উঠে এলো প্রায়। জোরে টান দিল নিক, উপরে উঠেই এক মুহূর্ত হাওয়ায় ভেসে মাছটা নেমে গেল স্রোতের গভীরে। ওটা ছুটে গেল এ যাত্রায়। স্রোতের দিকে সামান্য ঝুঁকে রিল পেঁচাতে থাকলো নিক।
বাঁদিকের তীরে একটা বড় গাছের গুঁড়ি পড়ে আছে। আংশিক ছায়ায়, বাকিটা রোদে পুড়ছে। তলার দিকটা জলের ভেতর, মৃদু স্রোত বইছে গা বেয়ে, উপরের অংশ শুকনো, হলদেটে।
বোতল খুলে আরেকটা ঘাসফড়িং বের করে বড়শিতে গাঁথল নিক। তুলে ছুঁড়ে দিল যতটা সম্ভব দূরে, রডটা সামান্য নিচে নামিয়ে। এবার বড় একটা ঠোকর। শক্ত টান পড়েছে। তাতে একবার মনে হল, বড়শিটা বুঝি গাছের গুঁড়িতেই গেঁথে গেছে। কিন্তু প্রাণের স্পন্দন টের পেল ও। পরমুহুর্তে স্রোত থেকে তোলার চেষ্টা চললো… এবং উঠে এলো ভারী একটা ট্রাউট। এটাও বুঝি ছুটে গেল, নিকের মনে হয় একবার। তারপর দেখা দিল মাছটি, খুব কাছে, স্রোতের উপর, মাথা নাড়ছে, বড়শিতে গাঁথা মুখটা ছাড়িয়ে নেয়ার প্রাণান্ত চেষ্টায় যুদ্ধরত। ক্রমাগত মুক্তি পাবার চেষ্টা করে চললো মাছটি সর্বশক্তি দিয়ে। পরিষ্কার স্রোতের ভেতর দৃশ্যটা দেখতে পেল নিক। কাছে নিয়ে এলো মাছটাকে। বাঁ হাতে ওটার মুখ থেকে বড়শি খুলে সাবধানে চালান করে দিল থলের ভেতর। উঁকি দিয়ে বাকি দুটো ট্রাউটকেও দেখে নিল সেই ফাঁকে।
গভীর জল মাড়িয়ে গাছের গুঁড়িটার দিকে এগোলো নিক। থলেটাকে তুলে নিল মাথার উপরে। আর জল থেকে শূন্যে উঠে ট্রাউটগুলো লাফাতে থাকলো। শরীরটা টেনে গুঁড়িটার উপরে উঠে বসলো নিক। জুতো আর ট্রাউজার থেকে ঝরঝর করে জল ঝরছে। গুঁড়ির উপর বড়শির রডটাকে শুইয়ে রাখলো। তারপর পকেট থেকে স্যান্ডউইচ বের করে বসালো কামড়। এক কোণা ভেঙে ছুঁড়ে দিল জলে, স্রোতের পিঠে চেপে ভেসে টুকরোটা ভেসে গেল কিংবা কোনো মাছ এসে ঠোকর দিয়ে খেয়ে নিল। স্যান্ডউইচ শেষ করে মাথার হ্যাটে করে জল তুলে তৃষ্ণা মেটালো নিক। ছায়ায় জলটা অনেক শীতল। গুঁড়ির উপর বসে বসে একটা সিগারেট ধরালো আয়েশ করে। ম্যাচের জ্বলন্ত কাঠি ধূসর গুড়ির পাশে ডুবে গেল সামান্য ছ্যাঁত্ শব্দ তুলে। ঠোঁটে সিগারেট চেপে নদীটাকে দেখতে লাগল নিক।
সামনের দিকে সরু হয়ে জলাজঙ্গলের ভেতরে মিশে গেছে নদী। আর ওখান থেকে এদিকে এসেছে গভীর হয়ে। জলাভূমির দিকে প্রচুর দেবদারুর বৃক্ষ। শক্ত ডালপালা ঘন হয়ে নেমে এসেছে জলাভূমিটার উপর। ওসবের ভেতর দিয়ে জলাভূমিতে হেঁটে যাওয়া সম্ভব না। ডালগুলো অনেক নিচু। খুব বেশি ঝুঁকে না যেতে পারলে শরীর ছিলবে বা আঘাত লাগবে ডালপালার সঙ্গে লেগে। হয়ত তাই জলাভূমিতে বাস করা প্রাণিগুলো আকারে নিচু হয়ে থাকে, ভাবে নিক।
একবার মনে হলো, এখানে বসে পড়বার জন্য কোন বই আনা যেত। পড়তে ইচ্ছে করছে ওর। মন চাইছে না জলাভূমির ওদিকে যেতে। নদীর দিকে তাকয়ে ও দেখলো স্রোতের পাশে বড় একটা দেবদারু গাছ ঝুঁকে আছে। ওদিকে যেতে চায় না নিক। বাহুর সঙ্গে ঝোলানো ট্রাউট মাছের ঝোলাটিকে অনুভব করে। এগুলো নিয়ে ওদিকে যাওয়া কষ্টকর। দুটো দেবদারু গাছ ঘন হয়ে আছে ওপাশে। সূর্যের আলো ঢুকতে পারছে না ডালপালা গলে। অল্প আলো, তীব্র স্রোত, ওদিকে মাছ ধরা ভোগান্তির কাজ। জলাভূমিতে মাছ ধরার এডভেঞ্চারটাই ভোগান্তির। নিক আর কোনো ভোগান্তি চায় না। আজ তাই অত স্রোতের দিকে যাবার কোনো ইচ্ছেই ওর নেই।
পকেট থেকে ছুরিটা বের করে গুঁড়িতে গেঁথে রাখল সে। এরপর ঝোলা সামনে এনে একটা ট্রাউট বের করে লেজের কাছটায় ধরল। জীবন্ত ট্রাউট, হাতের ভেতর। গুঁড়ির উপর শুইয়ে দিল। লাফাতে চাইছে মাছটা। তাই ঘাড় ভেঙে দিল ট্রাউটটার। বাকিগুলোর ক্ষেত্রেও একই কাজ করল। এরপর পাশাপাশি শুইয়ে দিল। দারুণ মাছ এগুলো।
জলে ধুয়ে মুখের পাশ থেকে ছুরি দিয়ে কাটতে থাকলো নিক। ভেতরের সবকিছু বেরিয়ে এলো মাছগুলোর। দুটো ট্রাউটই পুরুষ। দীর্ঘ ধূসর সাদা দাগ, মসৃণ, পরিচ্ছন্ন। দুটোই ধুয়ে পরিষ্কার করলো একসাথে। জলে রাখার সময় মনে হলো, ওগুলো জীবন্ত, রঙ বিবর্ণ হয়নি তখনো। হাত ধুয়ে রোদে শুকিয়ে নিল সে। মাছগুলো আবার থলের ভেতরে ঢুকিয়ে পেঁচিয়ে নিল হাতের সঙ্গে। ছুরিটাও পরিষ্কার করে পকেটে ঢোকালো। উঠে দাঁড়ালো গুড়ির উপর। বড়শির রড তুলে জলে নেমে ধীরে ধীরে এগোতে থাকলো তীরের দিকে। উঠতে থাকলো তীরের কিনারের ঘাস বেয়ে, ক্যাম্পে ফিরে যাচ্ছে সে। পেছনে তাকালো একবার। নদীটা তেমনি বয়ে যাচ্ছে গাছগুলোর ভেতর দিয়ে। জলাভূমিতে মাছ ধরবার জন্য তার সামনে আরও অনেক দিন পড়ে ছিল তখনও।
ভাষান্তর রনক জামান : কবি, অনুবাদক। প্রকাশিত কবিতার বই- অগ্রন্থিত ওহী (২০১৯), ঘামগুলো সব শিশিরফোঁটা (২০১৬), অনুদিত বই- ইসমাইল কাদারের কবিতা (২০১৭), ভ্লাদিমির নবকোভের উপন্যাস ললিতা (২০১৬), সালমান রুশদির বড় গল্প দক্ষিণে (২০১৮), সেরা বিশ ছোট গল্প – আর্নেস্ট হেমিংওয়ে (২০১৮)