বাংলা নাট্য জগতের ইতিহাসে চিরাচরিত ঐতিহ্য থেকে সরে এসে সাধারণ মানুষের জীবন সমস্যা ও বাস্তবতা নিয়ে যারা নাটক রচনা করেছেন তাঁদের মধ্যে অন্যতম হলেন বিজন ভট্টাচার্য। বিজন ভট্টাচার্য ছিলেন গণনাট্য আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ। কেবল নাটক রচনায় নয়, অভিনয় এবং নাট্য প্রযোজনার ক্ষেত্রেও তাঁর ভূমিকা উল্লেখযোগ্য।
১৯১৫ সালের ১৭ জুলাই বর্তমান বাংলাদেশের ফরিদপুর জেলার খানখানাপুর গ্রামে বিজন ভট্টাচার্যের জন্ম হয়। তাঁর বাবার নাম ক্ষীরোদ বিহারী ও মা সুবর্ণপ্রভাদেবী। তাঁর বাবা একজন স্কুল শিক্ষক ছিলেন৷ ১৯৩০ সালে পড়াশোনার জন্য বিজন ভট্টাচার্য কলকাতা চলে আসেন। তাঁর স্ত্রী ছিলেন বিখ্যাত লেখিকা মহাশ্বেতা দেবী এবং পুত্র ছিলেন প্রথাবিরোধী কবি নবারুণ ভট্টাচার্য। যদিও এক সময় মহাশ্বেতা দেবীর সঙ্গে ছাড়াছাড়ি হয়ে যায়।
তাদের বিবাহিত জীবন পনেরো বছরের বেশি স্থায়ী না হলেও মহাশ্বেতা দেবী কিন্তু বিজন ভট্টাচার্যের প্রতি কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করেন এ কথার মাধ্যমে— Bijan has shaped my talent and given it permanent form. He has made me into what I am today.
বিজন ভট্টাচার্য প্রাথমিক পড়াশোনা শেষ করে ভর্তি হয়েছিলেন প্রথমে আশুতোষ কলেজে এবং তারপরে রিপন কলেজে। কিন্তু তিনি পড়াশোনা শেষ করেননি৷ তিনি ছাত্র আন্দোলন, লবণ সত্যাগ্রহ ও অসহযোগ আন্দোলনে জড়িয়ে পড়েন ফলে তাঁর লেখাপড়ায় সেখানেই ছেদ পড়ে।
বিজন ভট্টাচার্যের কর্মজীবন শুরু হয়েছিল ১৯৩৮-৩৯ সালে আনন্দবাজার পত্রিকায় যোগদানের মধ্য দিয়ে। সেই সময় প্রগতিশীল মানুষদের সঙ্গে থেকে মার্কসীয় দর্শনের প্রতি তিনি আকৃষ্ট হয়েছিলেন। এই দেশে সমকালীন রাজনৈতিক পরিস্থিতি, ইউরোপে ফ্যাসিবাদের উত্থান সবকিছু মিলিয়ে বিজন ভট্টাচার্য মার্কসীয় ধারণার প্রতি আকৃষ্ট হন। বিজন ভট্টাচার্যের মামা সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদারের একটি পত্রিকা ‘অরনি’ র সঙ্গে তিনি যুক্ত ছিলেন এবং সেখানে বিভিন্ন লেখাও লিখেছিলেন। ১৯৪২ সালে তিনি কমিউনিস্ট পার্টির সদস্য হন। এছাড়া ভারত ছাড়ো আন্দোলনেও তাঁর বিশেষ ভূমিকা ছিল। প্রগতি লেখক সংঘ এবং ইন্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার গ্রুপকে সংগঠিত করতে তিনি গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিলেন।
বিজন ভট্টাচার্য নবনাট্য আন্দোলনের অন্যতম পথিকৃৎ ছিলেন। তিনি মানুষের সংগ্রাম তাদের দুঃখকে নাটকের মাধ্যমে সকলের কাছে পরিবেশন করেছিলেন।হিন্দু পৌরাণিক কাহিনী প্রভাব থেকে থিয়েটারকে মুক্তি দিয়ে তিনি রচনা করেছিলেন শ্রমজীবী ও নিচু স্তরের মানুষদের জীবন যাত্রার কথা। কৃষকদের জীবনের বিবরণ নিয়ে লেখা তাঁর প্রথম নাটক ‘জবানবন্দী’। তাঁর লেখা ‘নবান্ন’ (১৯৪৪ সাল) নাটকটি তাঁকে জনসমাজের কাছে পরিচিত করে তুলেছিল। সাহিত্যিক মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় নবান্ন নাটকের সংলাপ শুনে বিজন ভট্টাচার্য কে বলেছিলেন “আপনি তো জাত চাষা”। এই নাটকে বিজন ভট্টাচার্য ব্যবহার করেছিলেন যশোর ও খুলনার উপভাষা। ‘নবান্ন’ নাটকে সংগীতের ব্যবহারেও অভিনবত্ব দেখা যায়। গ্রাম্য জীবনের সহজ-সরল পরিবেশে তাদের জীবন চর্চার মধ্য দিয়ে এই গানগুলি উঠে এসেছিল। বিজন ভট্টাচার্যের ‘নবান্ন’ নাটকটি বাংলা রঙ্গমঞ্চের ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা গ্রহণ করেছিল। এই নাটক প্রথম অভিনীত হয় শ্রীরঙ্গম মঞ্চে। এছাড়াও গ্রাম বাংলার বিভিন্ন জায়গায় জায়গায় কৃষকেরা সভা আয়োজন করে নাটকটি অভিনয় করেছিল। এই নাটকে অভিনয় করেছিলেন শম্ভু মিত্র ও বিজন ভট্টাচার্য স্বয়ং।
বিজন ভট্টাচার্যের নাটকে সাধারণ মানুষের জীবন সমস্যার পাশাপাশি লৌকিক জীবন ও বিজন ভট্টাচার্যের নাট্যজীবনের শুরু হয় ১৯৪০ এর দশকে। প্রচলিত বাণিজ্যিক থিয়েটারের ধারার বাইরে স্বতন্ত্র নাট্য আন্দোলনের সূচনা করেন কিছু ফ্যাসিবাদ বিরোধী লেখক শিল্পী গোষ্ঠী। এঁদেরই সাংস্কৃতিক শাখা ছিল ভারতীয় গণনাট্য সংঘ বা ইণ্ডিয়ান পিপলস থিয়েটার অ্যাসোসিয়েসন যা আইপিটিএ নামে বেশি পরিচিত। বিজন ভট্টাচার্য ছিলেন এই গণনাট্য সঙ্ঘের প্রথম সারির নাট্যকর্মী। চিন্তা, চেতনা এবং সংগ্রামের প্রগতিশীল চিন্তা ভাবনার দিশারী ছিল ভারতীয় গণনাট্য সঙ্ঘ। বিজন ভট্টাচার্যের নাটক রচনা, অভিনয় এবং নির্দেশনা সাফল্য লাভ করেছিল এই গণনাট্য আন্দোলনের মধ্য দিয়ে।
গণনাট্য সঙ্ঘের (সেই সময় ফ্যাসিবিরোধী লেখক শিল্পী সঙ্ঘ) প্রথম নাটক আগুন বিজন ভট্টাচার্যের রচনা। এই নাটকটি ১৯৪৩ সালে মঞ্চস্থ হয়েছিল। ১৯৪৪ সালে তার লেখা নাটক জবানবন্দী এবং নবান্ন অভিনীত হয়েছিল। এই নাটকগুলিতে তিনি প্রধান অভিনেতা এবং নির্দেশকের দায়িত্ব পালন করেছিলেন।
১৯৪৪ সালের ২৪ অক্টোবর শ্রীরঙ্গম মঞ্চে নবান্নের প্রথম অভিনয় হয়। এই নাটকটির পটভূমিকা ছিল দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অস্থিরতা, ১৯৪২ সালের আগস্ট আন্দোলন, পঞ্চাশের মন্বন্তর এবং প্রাকৃতিক দুর্যোগ। গণনাট্য আন্দোলন এবং বিজন ভট্টাচার্যের নাটক বাংলা নাটক রচনা এবং অভিনয়ের এক যুগবদলের সূচনা করে।
১৯৪৮ সাল থেকে গণনাট্য সঙ্ঘের সঙ্গে বিজন ভট্টাচার্যের মতান্তর ঘটে। ১৯৪৮ থেকে ১৯৫০ তিনি বোম্বাইতে হিন্দি সিনেমার সঙ্গে যুক্ত থাকেন। ১৯৫০ সালে তিনি আবার বাংলায় ফিরে আসেন এবং নিজের নাটকের দল ক্যালকাটা থিয়েটার প্রতিষ্ঠা করেন। এখানেও তিনি নাট্যকার, প্রধান অভিনেতা এবং নির্দেশকের ভূমিকা পালন করেন। এই থিয়েটারে তার রচিত নাটকের মধ্যে অন্যতম ছিল কলঙ্ক, গোত্রান্তর, মরাচাঁদ, দেবী গর্জন, গর্ভবতী জননী প্রভৃতি।
১৯৭০ সালে তিনি ক্যালকাটা থিয়েটার ছেড়ে দিয়ে কবচ-কুণ্ডল নামে নতুন দল গঠন করেন। এখানে তার রচিত নাটকগুলির মধ্যে অন্যতম ছিল কৃষ্ণপক্ষ, আজবসন্ত, চলো সাগরে, লাস ঘুইর্যা যাউক প্রভৃতি।
বিজন ভট্টাচার্য মার্কসীয় দর্শনে বিশ্বাসী ছিলেন। কৃষক শ্রমিক মেহনতী মানুষের জীবন সংগ্রামের কথা ও বাঁচবার কথা তার নাটকগুলির মুখ্য বিষয় হয়ে উঠেছিল। কিন্তু আস্তে আস্তে তিনি এই ভাবনা থেকে সরে যান। গণনাট্য সঙ্ঘ ত্যাগ এবং নিজের নাটকের দল একাধিক বার ভেঙে গড়ে তিনি তৈরি করেন। ক্রমে মার্কসীয় দর্শনের পরিবর্তে বা সঙ্গে তার রচনায় লোকায়ত ধর্ম দর্শন, হিন্দু ধর্মের সমন্বয় প্রয়াসী মানসিকতা কাজ করেছিল। চিরকালীন মাতৃকা ভাবনা তার নাটকে প্রায়ই লক্ষ্য করা যায়।
অভিনেতা হিসাবে বিজন ভট্টাচার্য অসামান্য কৃতিত্ব দেখিয়েছিলেন। নানারকম চরিত্রকে মূর্ত করে তুলতে তিনি দক্ষ ছিলেন। নানা উপভাষার সংলাপ উচ্চারণেও তিনি সাফল্য অর্জন করেছিলেন। তার অভিনীত উল্লেখযোগ্য চরিত্রের মধ্যে ছিল বেন্দা (জবানবন্দী), প্রধান সমাদ্দার (নবান্ন), পবন ও কেতকাদাস (মরাচাঁদ), হরেন মাস্টার (গোত্রান্তর), প্রভঞ্জন (দেবীগর্জন), মামা (গর্ভবতী জননী), কেদার (আজ বসন্ত), সুরেন ডাক্তার (চলো সাগরে) প্রভৃতি।
নাট্যনির্দেশক হিসাবেও তিনি সমান সফল ছিলেন। গণনাট্য সঙ্ঘে তার নাটক জবানবন্দী এবং নবান্ন ছিল অসাধারণ দুটি প্রযোজনা। পরে তিনি তার নিজের গ্রুপ থিয়েটারেও বহু নাটকের সফল প্রযোজক এবং নির্দেশক ছিলেন।
বিজন ভট্টাচার্য ১৯ জানুয়ারি, ১৯৭৮ সালে কলকাতায় মারা যান। নাট্যব্যক্তিত্ব বিজন ভট্টাচার্য নাট্য আন্দোলনের পথিকৃত হিসাবে চিরঞ্জীব হয়ে থাকবেন।
মনোজিৎকুমার দাস, প্রাবন্ধিক, লাঙ্গলবাঁধ, মাগুরা, বাংলাদেশ।