বিশ শতকের বাংলা নাট্যকলার ইতিহাসে ট্র্যাজিক নায়কের বিপজ্জনক প্রথম শিরোপা যদি শিশিরকুমার ভাদুড়ির প্রাপ্য হয়, তা হলে ওই শিরোপার দ্বিতীয় দাবিদার সম্ভবত বিজন ভট্টাচার্য। তাঁর যে ছবিগুলি আমাদের সামনে আসে, তার মধ্যে থেকে একটি বিষাদের ছায়া যেন কিছুতেই সরে যেতে চায় না। তাঁর এই ম্লান মূর্তিটি কে এমন চিরস্থায়ী করে নির্মাণ করেছে? তিনি নিজে, না তাঁর জীবন ও সময় – সেটাই প্রশ্ন।
তাঁর নাটকের সংলাপের মতোই বাড়ির ইট-কাঠ-কংক্রিটের পাঁজর সময়ে সময়ে শুনছে, ‘বাঁচতি গেলি খাওয়া জোটে না, খেতি গেলি বাঁচা যায় না…’ কিন্তু তখনও তিনি বিশ্বাস করছেন, দিন বদলের স্বপ্নই বাঁচিয়ে রাখে জীবন। বিশ্বাস করছেন, থিয়েটার একদিন জনগণের হয়ে উঠবে। সংলাপ আর কেবল সংলাপে আটকে থাকবে না। সাধারণ মানুষের বিপ্লবের ভাষা হয়ে উঠবে। বিজন ভট্টাচার্য।
বিজন ভট্টাচার্য। নাটককে যিনি কেবল একটা ‘পারফর্ম্যান্স’ হিসেবে দেখতেন না। শিল্প বলতে বুঝতেন সমাজ বদলের হাতিয়ার। থিয়েটারকে বুঝতেন গণের নাটক। যা কেবল সাধারণ মানুষের ভাল-মন্দ-দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কথা বলবে না। নাটকের মধ্য দিয়ে মানুষও হয়ে উঠবেন সেই গল্পের এক-একজন কুশীলব। দর্শক এবং রঙ্গকর্মী সকলে একত্রে ঢুকে পড়বেন থিয়েটারের অঙ্গনে। তার পরে বিপ্লব ঘটে যাবে। জীবন, রাজনীতি এবং থিয়েটার নিয়ে এ ভাবেই মিলেমিশে ছিলেন বিজন। কোনও একটি সত্তাকে বাদ দিয়ে তাঁর অন্য সত্তাকে বোঝা মুশকিল। যাপন-অর্থনীতি-রাজনীতি-পরব – সব নিয়ে মাখামাখি যিনি, তিনি নিজেই আসলে একটা থিয়েটার! মোনোলগ।
১৯১৫ সালে বাংলাদেশের ফরিদপুর অঞ্চলের খানখানাপুরে ব্রাহ্মণ জমিদার পরিবারে জন্ম বিজনের। বাবা ক্ষীরোদবিহারী। মা সুবর্ণপ্রভা আর ঠাকুরদা রাসবিহারী। রাসবিহারীর জমিজায়গা সে সময়ে গ্রাম্য সমাজে রীতিমতো আলোচনার বিষয় ছিল। আর চর্চিত ছিল তাঁর লেঠেলদের কাহিনি। তেমনই এক লেঠেল ছিলেন বাবর আলি। শোনা যায়, চল্লিশের দশকে চরের কিছু জমি নিয়ে কিরণশঙ্কর রায়ের নায়েবদের সঙ্গে বাবর আলির তীব্র সংঘর্ষ হয়েছিল। এবং শেষ পর্যন্ত চরের দখল রেখেছিল বাবর আলি। পরবর্তী কালে ঘনিষ্ঠ মহলে বিজন নাকি রসিকতা করে বলতেন, ’৪৬-এ বাংলায় মুসলিম লিগের সঙ্গে কিরণশঙ্করের জোট হয়েই যেত! কিন্তু নিজের জমি-জায়গা নিয়ে কিরণবাবু এতই উদ্বিগ্ন ছিলেন এবং বাবর আলির কাছে পরাজিত হয়ে এতটাই মনোবল হারিয়েছিলেন যে, রাজনীতিতে বিশেষ মন দিতে পারেননি। জোটটাও তাই হয়নি।
জমিদারিতে অবশ্য খুব বেশি উৎসাহ ছিল না ক্ষীরোদবিহারীর। দেশ ভাগের অনেক আগেই বিজনকে নিয়ে তিনি চলে এসেছিলেন অধুনা উত্তর ২৪ পরগনার আড়বেলিয়ায়। শিক্ষক বাবার মতো বিজনও কোনও দিন জমিজায়গা নিয়ে বিশেষ আগ্রহ বা উৎসাহ দেখাননি। তবে ষাটের দশকে একবারই কেবল জমি নিয়ে মামলা লড়েছিলেন।
বিজন ভট্টাচার্য পাঁচ ভাই বোনের জ্যৈষ্ঠ। শৈশবের পাঠশালা খানখানাপুর সুরাজমোহনী ইনিস্টিটিউশান। সেই পাঠশালার প্রধান শিক্ষক তাঁর পিতা। পরবর্তীকালে বসিরহাট, সাতক্ষীরা হয়ে ১৯৩০ সালে কোলকাতায়। প্রাথমিক স্কুলের পাঠ শেষ করে বিজন ভর্তি হয়েছিলেন প্রথমে আশুতোষ এবং পরে রিপন কলেজে। তবে সম্ভবত পড়াশোনা শেষ করেননি। বাম রাজনীতির জোয়ারে তত দিনে গা ভাসিয়েছেন। রুশ বিপ্লব তখন পৃথিবী জুড়ে বিপ্লবের স্বপ্ন দেখাচ্ছে ‘প্রগতিশীল’ ছেলেমেয়েদের।
ভর্ত্তি হলেন আশুতোষ কলেজে। কিন্তু মহিষবাথনে লবণ-আইনভঙ্গে অংশগ্রহণ, অতএব বিএ পড়ার ছেদ। ১৯৩৮ আনন্দবাজার পত্রিকায় যোগদান করেন এবং নাম লিখান পুরদস্তর সাংবাদিকতায়। ১৯৪০ সালে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি আসক্ত হলেন এবং ১৯৪২ সালে তৎকালীন কমিউনিস্ট নেতা কমরেড মুজফ্ফর আহমেদের স্নেহধন্য হয়ে হোলটাইমার হলেন পার্টির। ১৯৪২-এ ‘ভারত ছাড়ো আন্দোলন, দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ। সাম্রাজ্যবাদী যুদ্ধ থেকে ফ্যাসি-বিরোধী জনযুদ্ধ ইত্যাদীতে ভারত উপমহাদেশ তখন উত্তাল। ওয়াই-সি-আই-এর সাংস্কৃতিক অভিযান শুরু হয়েছিল ১৯৪০ সাল থেকে। ‘ফ্যাসি বিরোধী লেখক ও শিল্পী সংঘ’ গঠিত হয় ১৯৪২ সালে। আর এখান থেকেই গড়ে উঠল ‘ভারতীয় গণনাট্য’।
জন্মের পর তাঁর বেড়ে ওঠার সাথে সাথে বেড়ে উঠতে থাকে শিকড়ের প্রতি মমত্ববোধ, দেশভাগের অপূরনীয় মর্মযন্ত্রনা। ছাত্রাবস্থাতেই যুক্ত হন স্বদেশি আন্দোলনে। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ হওয়ার পর তাঁর মাতুল প্রখ্যাত সাংবাদিক সত্যেন্দ্রনাথ মজুমদার কর্তৃক অরণি পত্রিকা প্রকাশিত হলে শুরু হয় সেখানে তাঁর গল্প লেখা। একইসময়ে খ্যাতিমান মার্কসবাদী রেবতী বর্মণের লেখা পড়ে কমিউনিস্ট পার্টির প্রতি তিনি আকৃষ্ট হন। ১৯৪২-৪৩ সালে সদস্যপদ লাভ করেন ভারতের কমিউনিস্ট পার্টির। ১৯৪৪ সালে আনন্দবাজারের চাকরি ছেড়ে পার্টির হোলটাইমার হন।
১৯৪২-সালে প্রতিষ্ঠিত ‘ভারতীয় গণনাট্য সংঘের’ সদস্য ছিলেন উপমহাদেশের এই প্রখ্যাত বাঙালি নাট্যব্যক্তিত্ব। যাঁর তুলনা শুধু তিনি। গণনাট্য আমাদের অনেক তুখোড় অভিনেতা দিয়েছেন – দিয়েছেন নাট্যকার কিম্বা নাট্যবোদ্ধা।
মূলত বিজন ভট্টাচার্যের নাট্যজীবনের শুরু হয় ১৯৪০-এ। বিজন ভট্টাচার্য ছিলেন ভারতীয় গণনাট্য সংঘের প্রথম সারির নাট্যকর্মী। ১৯৪৮ সালে গণনাট্য থেকে বেরিয়ে এলেন। ১৯৫০ সালে প্রতিষ্ঠা করলেন ‘ক্যালকাটা থিয়েটার’। নবান্ন’র বিজন ভট্টাচার্য গণনাট্যের কাছে যে শপথ নিয়েছিলেন, শোষিত জনগণের আত্মপ্রতিষ্ঠার সংগ্রামকে এগিয়ে নিয়ে যাওয়ার- সেই বক্তব্যকেই বুকে লালন করে এগিয়ে গেলেন এক মহীরূপে। কিন্তু ‘ক্যালকাটা থিয়েটার’র সংগে বিশ বছরের সংসার জীবন ক্ষান্ত করে আবার নতুন করে শুরু করলেন এবং আমৃত্যুই থেকেছেন নতুন সাজানো ‘কবচ-কুন্ডল’-এ। ‘কবচ-কুন্ডল’ তাঁর শেষ সংসার।
বিজন ভট্টাচার্যই বোধ হয় এই উপমহাদেশে একমাত্র নাট্যকার, যিনি জীবনে কোন অরাজনৈতিক নাটক লেখেননি। কেননা কোনো সাহিত্য কীর্তিই অরাজনৈতিক নয়। অর্থাৎ, লেখকের মননে যে আর্দশ লুকিয়ে থাকে তারই উন্মেষ ঘটে তার প্রতিটি সাহিত্যকর্মে।
১৯৪০ থেকে ১৯৪২ সাল, বাংলার রাজনৈতিক জীবনে শুরু হয়ে গেছে নিয়মিত পরিবর্তন। জাতির জীবনে নেমে এসেছে নিদারুণ বিপর্যয়। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের ভয়াবহতা বিপর্যস্ত করে তুলেছিল মানুষের দৈনন্দিন স্বাচ্ছন্দ্যকে এবং স্বাভাবিক জীবনযাপন ব্যাহত হতে শুরু করেছিল সমগ্র বিশ্বে। বাংলার জীবন-চেতনা ঘেঁটে গিয়েছে মন্বন্তর, মড়ক, কালোবাজারি, অনাহার, হানাহানি, মৃত্যু – এসবের ভয়াবহ স্থিতিতে। সেইসব সময় এক বিদগ্ধ-হৃদয়, মাটিতে রাখা জলচৌকির উপর ঝুঁকে পড়ে চোখের জলে কুঁকড়ে-ফুলে যাওয়া পাতায় খস খস কলম চালিয়েছেন, থামেন নি। অন্তরাত্মা নিংড়ে লিখেছেন – ‘নবান্ন’, ‘জবানবন্দী’, ‘দেবীগর্জন’, ‘মরা চাঁদ’, ‘আগুন’, ’জীয়নকন্যা’, ’লাস ঘ্যুইরা যাউক’।
দুই বিশ্বযুদ্ধের মধ্যবর্তী সময়ে পৃথিবীময় তখন বাম ভাবাদর্শে ফুটছে অনেকেই। বিজনরা দেওয়াল লিখন পড়তে পেরেছিলেন। চলতি স্রোতে অবগাহন করতে সময় নেননি। আর তারই প্রেক্ষাপটে ঘটে যায় বঙ্গদেশের ভয়াবহ দুর্ভিক্ষ। বিজনরা যে মন্বন্তরকে মনে করতেন ‘ম্যান মেড’। জোতদারদের গোলায় খাবার আছে। মহাজনেরা চড়া দামে তা বিক্রি করছে কালো বাজারে। কিন্তু সাধারণ মানুষের কাছে খাবার পৌঁছচ্ছে না। রাস্তাঘাটে, অলিতে গলিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে বুভুক্ষু লাশ। সেই প্রেক্ষাপটেই তৈরি হচ্ছে ‘নবান্ন’। কিছু দিনের মধ্যেই শম্ভু মিত্রের নির্দেশনায় যা মঞ্চস্থ হবে। দেশ জুড়ে সাড়া ফেলে দেবে। কয়েক বছরের মধ্যে ‘নবান্ন’ হয়ে উঠবে নতুন ধারার সাহিত্য রচনা এবং নাট্যশিল্পের দিকনির্দেশ। ‘নবান্ন’ অবলম্বনে ছবি তৈরি হবে হিন্দিতে। আর নাটকের অনুকরণে ‘প্রগতিশীল’ সাহিত্যে জোয়ার লাগবে। গণনাট্য সঙ্ঘের ভিত তৈরি হয়ে যাবে।
ভারতীয় থিয়েটারের এক ঐতিহাসিক দিকচিহ্ন ‘নবান্ন’। এই নাটকের নাট্যকার ও ভারতীয় গণনাট্য সংঘের প্রযােজনায় ১৯৪৪ সালে তাঁর প্রথম উদ্যোগের ( শম্ভু মিত্রের সঙ্গে ) যুগ্ম নির্দেশক রূপে তাঁর প্রথম স্বীকৃতি ঘটলেও বিজন ভট্টাচার্যের লেখকজীবন ও সৃষ্টিকার্য বহু বৈভবে সম্পন্ন। নাট্যকার রূপে জীয়নকন্যা, গােত্রান্তর, মরাচাঁদ, দেবীগর্জন, গর্ভবতী জননী , চলাে সাগরে -র মতাে নাটকে তিনি যেমন তাঁর কালের ইতিহাসের ঘাতপ্রতিঘাত ও আবেগকে মূর্ত করেছেন , তেমনই পূর্বাচরিত বাংলা নাট্যধারার মৌলিক রূপান্তর ঘটিয়েছেন। গ্রাম বাংলা ও বহু ব্রাত্য , দলিত ও অন্তেবাসী সম্প্রদায়ের জীবনচর্যা ও সহজাত বাকরীতির অভিজ্ঞতা ও জ্ঞানে তাঁর নাটক ও গান জারিত। তাঁর গল্প ও উপন্যাস যুদ্ধোত্তর চল্লিশ -পঞ্চাশের দশকের বাংলায় নবােত্থিত শিল্পপতি সম্প্রদায়ের আবির্ভাবে শ্রেণিবিরােধের বিস্ফোরণ ও নব্যধনীসম্প্রদায়ের মধ্যেও লােভের ও ক্ষমতার দ্বন্দ্বের উদঘাটনে বাংলা কথাসাহিত্যের অন্য এক প্রদেশে পদক্ষেপ করে।
পরিচালক ঋত্বিক ঘটক একবার বলেছিলেন, “বিজনবাবুই প্রথম দেখালেন কি করে জনতার প্রতি দায়িত্বশীল হতে হয়, কি করে সম্মিলিত অভিনয়-ধারার প্রবর্তন করা যায় এবং কি করে বাস্তবের একটা অংশের অখণ্ডরূপ মঞ্চের উপর তুলে ধরা যায়। আমরা যারা এমন চেষ্টা করেছিলাম, সেসব দিনের কথা ভুলব না। হঠাৎ একটা প্রচণ্ড আলোড়ন বাংলার একপ্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠবৎ শিহরিত করে তুলল।”
’৪৮-এ গণনাট্য ছাড়ার পর বিজনও গিয়েছিলেন মুম্বইয়ে। চিত্রনাট্য লেখার কাজে। গণনাট্যের সঙ্গে মনোমালিন্য হলেও, কখনও কি কাইফি আজ়মির বাড়িতে যাননি বিজন? মলিন হয়ে গিয়েছে ইতিহাস।
গণনাট্যের পর্বেই বিজনের সঙ্গে আলাপ মহাশ্বেতার। শোনা যায়, বিজনের নাটক ‘জিয়ন কন্যা’য় অভিনয়ও করেছিলেন লেখিকা। তবে মহাশ্বেতার স্মৃতিতে প্রেমপর্বে বিজন যতটা না নাট্যকার, তার চেয়ে বেশি গল্পকার। পরবর্তী কালে যিনি গল্প লিখবেন ‘সহযাত্রী’ ছদ্মনামে। ’৩৬ সালে তৈরি হওয়া প্রগতিশীল লেখক সঙ্ঘেরও অংশ ছিলেন তাঁরা। সুভাষ মুখোপাধ্যায় তাঁকে নিয়ে লিখছেন, ‘বিজন ভট্চায এসেছিলেন গল্পলেখক হিসেবে, পরে দল ভেঙে তিনি গান-নাটকের শিল্পীদের দলে ভিড়ে গেলেন।’ বস্তুত, তাঁকে নিয়ে লিখতে গিয়ে শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় পরে বলেছেন, ‘বিজন ভট্টাচার্যের প্রথম প্রকাশিত ও নির্দেশিত নাটক ‘আগুন’কে ছোট গল্পের রীতির মধ্যেই গণ্য করা যায়; ছোট গল্প নিয়ে যে পরীক্ষানিরীক্ষা তখন বাংলা সাহিত্যে চলছে, তাতে এ ধরনের একটি গল্প, যাতে বিভিন্ন সাংসারিক পরিবেশ থেকে পারস্পরিক পরিচয়হীন কিছু মানুষ প্রাত্যহিক ক্ষুণ্ণিবৃত্তির অমোঘ টানে একটা জায়গায় এসে মিলিত হয়, আবার ছড়িয়ে যায়, কেউ লিখতেই পারতেন।’
চারপাশে ছড়িয়ে থাকা অতি সাধারণ সেই মানুষগুলোই তখন হয়ে উঠছে সময়ের আখ্যান। ‘রিফিউজি’ গল্পে বিজন লিখছেন, ‘আগে ছিল বাগান বাড়ি, মাঝখানে হলো ভূতের বাড়ি, তারপর রিফিউজি কলোনি। দু’বছর পর এখন অবিশ্যি কলোনিও ঠিক বলা যায় না। তিরিশ-চল্লিশ ঘর উদ্বাস্তু পরিবার, কমে কমে এখন মাত্র দশ-বারো ঘরে এসে দাঁড়িয়েছে। জায়গাটা ঠিক বসবাসের উপযোগী নয়।’ তাঁর বিভিন্ন লেখায়, নাটকে এভাবেই উঠে এসেছে খেটে খাওয়া, তাড়া খাওয়া মানুষের সমাজ। সমাজবীক্ষণ।
শতাব্দীর বীভৎসতম মন্বন্তরে যেখানে মৃত্যু হচ্ছে লক্ষ লক্ষ মানুষের, শহর কলকাতার রাস্তায় রাস্তায় ‘ফ্যান দাও মা’-র মর্মভেদী চীৎকারে চরম বীভৎসার মুখোমুখি বাংলার মানুষ, শিল্পী সাহিত্যিকরাও দলমত নির্বিশেষে পথে নেমে পড়েছেন সেই দুঃসময়ের দিনে; ঋত্বিক ঘটকের বয়ানে – “বিজনবাবুই প্রথম দেখালেন কী করে জনতার প্রতি দায়িত্বশীল হতে হয়, কী করে সম্মিলিত অভিনয়-ধারার প্রবর্তন করা যায় এবং কী করে বাস্তবের একটা অংশের অখণ্ডরূপ মঞ্চের উপর তুলে ধরা যায়। আমরা যারা এমন চেষ্টা করেছিলাম, সেসব দিনের কথা ভুলব না। হঠাৎ একটা প্রচণ্ড আলোড়ন বাংলার একপ্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তকে বিদ্যুৎস্পৃষ্ঠবৎ শিহরিত করে তুলল। আর সেই আলোড়ন ছিল ‘নবান্ন’ নাটক।”
মাত্র ন’দিনে লেখা হয় ‘নবান্ন’। নাটক শুনে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিজনকে বলেছিলেন – ”আপনি তো জাত চাষা”। সত্যিই তো, বিজন মাটি ও তার ভাষাকে ঠিক চিনতেন। তিনি অক্লান্ত ঘুরে বেড়িয়েছেন আখড়ায় আখড়ায়, মালো পাড়ায়, শোলার কারিগরদের ঘরে ঘরে। অক্লেশে বলতেন, ”সব কিছুর মধ্যে গিয়ে বসতাম, প্রতিমা গড়া দেখতাম, একটু কাদা মেখে দেওয়ার সুযোগ পেলে খুব ভালো লাগত। আমার মাখা কাদা দিয়ে যদি প্রতিমার নাকটা হয় তাহলে আমার যেন ধন্য মনে হত।”
‘আবেগ না হলে বোধহয় কবিতার জন্ম হয় না – অনুভূতি না থাকলে , জীবনযন্ত্রণা না থাকলে কোনো সৃষ্টিই বোধহয় সম্ভব নয়।’ -একথাই মনে ধরে রেখে বলে গিয়েছেন বিজন…যাবজ্জীবন।
এ কথা না বলে কোনো উপায় নেই। আমাদের সব ছিল। পারিবারিক নাটক ছিল, ঐতিহাসিক নাটক ছিল, মহাকাব্য ছিল। কিন্তু বিজনবাবু যেভাবে ‘নবান্ন’ নাটকে আমাদের পথে নামিয়ে আনলেন, নাটককে সরাসরি সড়কে নিয়ে এলেন – তা আমরা অনুমানও করতে পারিনি। রবীন্দ্রনাথ বলেছেন, দুর্গেশনন্দিনী বাঙালির হৃদয় লুঠ করে নিয়েছিল। উপন্যাসের মত একটা বিদেশি ফর্ম যেমন বঙ্কিমচন্দ্রের হাতে পড়ে আমাদের চমৎকৃত করেছিল, তেমনি নবান্নও এক নতুন আলোকসম্পাত। একে শুধুমাত্র দুর্ভিক্ষ, অনশনের মঞ্চায়ন বলে পার পাওয়া যাবে না।
ভারতীয় গণনাটকের প্রথম স্রষ্টা বিজন ভট্টাচার্য রচিত ‘নবান্ন’ নাটকটি দেখে ইংরেজ সৈনিকদের অন্যতম বৈমানিক, বিল বাটলার উদ্বুদ্ধ হয়ে একটি আবেগঘন চিঠি লিখেছিলেন তাঁকে। শুধু বিলের চিঠিই নয়, এদেশে ঘটে যাওয়া ভয়াবহতম দুর্ভিক্ষ সম্বন্ধে ব্রিটিশ সরকারের নীরবতায় ক্ষুব্ধ হয়ে সে দেশের গণতন্ত্রপ্রিয় মানবতাবাদী নাগরিকদের বিভিন্ন সংবাদপত্রে তাঁর একের পর এক লেখায় প্রকাশ পেতে থাকে পরিস্থিতির নির্মমতার কথা এবং তারই ফলে সৃষ্ট ব্যাপক জনমতের চাপে ব্রিটিশ প্রধানমন্ত্রী উইন্স্টন চার্চিল বাধ্য হন ১৯৪৪-এর ‘দুর্ভিক্ষ তদন্ত কমিশন’ গঠন করতে। এমনই ছিলেন তিনি তেজী।
পৃথিবীর ইতিহাসে কোনও নাটকের মাধ্যমে সামাজিক বিপর্যয়ের পিছনে ক্ষমতাসীন সরকারের মুখোশ উন্মোচন করার এ ছাড়া দ্বিতীয় নজির মেলে না। বিজন ভট্টাচার্য রচিত ‘নবান্ন’ নাটক সেই অর্থে পৃথিবীর নাট্য ইতিহাসে বিরলতম এক উদ্ভাস। ঐতিহাসিকভাবে আলোড়ন ফেলে দেওয়া এমন একটি নাটক কিভাবে বাংলা তথা ভারতীয় নাট্যমণ্ডলের আমূল দিকবদল ঘটিয়ে দিয়েছিল, সে স্বীকৃতি পাওয়া যায় খ্যাতনামা নাট্যব্যক্তিত্ব উৎপল দত্তের কথায়। তিনি বলছেন, “অমরেন্দ্রনাথের মঞ্চসজ্জা ব্যবসায়িক চটোকে পরিণত হয়ে পরবর্তীকালে নাট্যশালায় বহু সস্তা জিনিসের প্রবেশপথ করে দিয়েছিল। ভারতীয় গণনাট্য সংঘ স্রেফ চট টাঙিয়ে অভিনয় করে ঐ জীর্ণ ব্যবসায়িকতার মৃত্যুবাণ হানেন। বুর্জোয়া বাস্তববাদের বিরুদ্ধে ‘নবান্ন’ ছিল শ্রেণীসচেতন গণনাট্য সংঘের অভিযান।”
গণনাট্য ছাড়ার পর নিজের দল তৈরি করেছিলেন বিজন – ‘ক্যালকাটা থিয়েটার’। সেই গণনাট্যের আমল থেকেই তিনি বিশ্বাস করতেন নাটক আসলে ‘ইন্টার্যাকশন’। দর্শকও যার অংশ। সংলাপের মধ্য দিয়ে সরাসরি মানুষের কাছে পৌঁছে যাওয়া। কথোপকথনের পরিমণ্ডল তৈরি করা।
শিক্ষক বাবার কাছে শেক্সপীয়র শুনেছিলেন বিজন। পড়েওছেন। কিন্তু ক্লাসিক্যাল থিয়েটার কখনওই টানেনি তাঁকে। আকর্ষণ করেনি পেশাদার ব্যবসায়িক থিয়েটার। মনে রাখা দরকার, যে সময়ে বিজন বড় হচ্ছেন, সেই সময়ে কলকাতায় পেশাদারি থিয়েটার যথেষ্টই জনপ্রিয়।
পরবর্তী কালে বিজন বারবার বলেছেন, ওই ধরনের থিয়েটারের রীতি, শৈলী কোনও কিছুই তাঁকে আকর্ষণ করেনি। নাটক রচনার ক্ষেত্রেও নয়, পরিচালনার ক্ষেত্রেও নয়। বরং তাঁকে নাটক লিখতে অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে রেশনের লাইন। যেখানে তিনি দেখেছেন, ধর্ম-জাতি-সামাজিক স্তরের বেড়া ভেঙে সকলে একত্রে দাঁড়িয়েছেন। যোগাযোগ তৈরি হয়েছে একের সঙ্গে অপরের। কথোপকথন হয়েছে। শুধু তাই নয়, এই লাইনেই তিনি দেখেছেন, সংকীর্ণ স্বার্থ বিসর্জন দিয়ে প্রশাসন, জোতদারের বিরুদ্ধে শ্রেণিস্বার্থ না ভেবে একত্রে প্রতিবাদ করছে জনসাধারণ। ওই জনসাধারণের মধ্যেই কমিউনিস্ট আস্ফালন দেখেছিলেন বিজন।
বাদল সরকারের কয়েক দশক আগেই বিজনরা বুঝে গিয়েছিলেন নাটক কেবল মঞ্চে নয়, রাস্তাঘাটে ঘুরে ঘুরে করার বিষয়। দর্শক আর অভিনেতার মধ্যে যেখানে মঞ্চের দূরত্ব তৈরি হবে না। আজীবন এ বিশ্বাস লালন করেছেন বিজন। পরবর্তী কালে বাদলরা যার নাম দেবেন ‘থার্ড থিয়েটার’।
নাটক রচনার তাগিদ ও মানসিকতা বোঝাতে গিয়ে বিজন বলেছেন – ”সেই সময় ডি. এন. মিত্র স্কোয়ারের পাশ দিয়ে রোজ আপিস যাই। রোজই দেখি গ্রামের বুভুক্ষু মানুষের সংসারযাত্রা, নারী-পুরুষ-শিশুর সংসার। এক একদিন এক একটা মৃতদেহ নোংরা কাপড়ে ঢাকা। মৃতদেহগুলো যেন জীবিত মানুষের চেয়ে অনেক ছোট দেখায়। বয়স্ক কি শিশু, আলাদা করা যায় না, … আপিস থেকে ফিরবার পথে রোজই ভাবি, এইসব নিয়ে কিছু লিখতে হবে। কিন্তু কীভাবে লিখব? ভয় করে গল্প লিখতে, সে বড় সেন্টিমেন্টাল প্যানপেনে হয়ে যাবে। একদিন ফেরবার পথে কানে এলো, পার্কের রেলিঙের ধারে বসে এক পুরুষ আর এক নারী তাদের ছেড়ে আসা গ্রামের গল্প করছে, নবান্নের গল্প, পুজো-পার্বণের গল্প। ভাববার চেষ্টা করছে তাদের অবর্তমানে গ্রামে এখন কী হচ্ছে। আমি আমার ফর্ম পেয়ে গেলাম। নাটকে ওরা নিজেরাই নিজেদের কথা বলবে।”
মঞ্চের ভাষা আর কথ্য ভাষা নিয়ে দীর্ঘ দিন কাজ করেছেন বিজন। কাজে লেগেছিল ’৪২-’৪৩ সাল জুড়ে সমগ্র বাংলা প্রদেশ পরিক্রমা। শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় লিখছেন, ‘টুনে, মালো, বেদে, শোলার কারিগর, প্রতিমাশিল্পী, সাপুড়ে, আউল-বাউল, জেলে, এমন নানা সম্প্রদায়ের সঙ্গে ঘনিষ্ঠ মেলামেশার মধ্য দিয়ে বিজনবাবু তাদের লোকাচার, জীবনদর্শন, লোকশ্রুতি, সংস্কার ও বিশ্বাস, ভাষা, কথার টান ও সুর আত্মস্থ করেছেন। ওই অভিজ্ঞতা ও শিক্ষাই তাঁর নাটকের ভাষা ও চাল নির্ধারণ করেছে।’
মঞ্চে যখন এই অভিনয় চলছে, তখন বাড়িতেও ধুন্ধুমার অবস্থা। ’৪৮ সালে জন্ম হচ্ছে নবারুণ ভট্টাচার্যের। মতাদর্শের লড়াই করে বিজন ছাড়ছেন গণনাট্য। মহাশ্বেতা-বিজন তখন ভাড়াবাড়িতে। এক চিলতে ঘরে অভাব নিত্যদিন। বাড়িতে ভাত ফুটবে কি না, জানা নেই। অথচ বিজন বাড়িতে ধরে আনছেন কখনও সাপুড়ে, কখনও লোকগায়ক, আউল-বাউলদের। প্রবল অনটনেও শিল্পের খিদে, লোকসংস্কৃতির খিদে মরছে না। অন্য দিকে ক্রমশ দূরে চলে যাচ্ছেন মহাশ্বেতা। সম্পর্কে দূরত্ব তৈরি হচ্ছে। ৬-৭ বছরের নবারুণ বড় বয়সে বারবার রোমন্থন করেছেন সেই সব স্মৃতি – রোজ বাড়িতে অশান্তি লেগে থাকত। এবং এ ভাবে চলতে চলতে শেষ দিনের তাণ্ডবও মনে ছিল নবারুণের। ভালবেসে মহাশ্বেতাকে নাকি একটা বালা কিনে দিয়েছিলেন বিজন। পার্থিব ভালবাসা। পঞ্চাশের দশকের শেষ পর্বে বাড়ি ছেড়ে যাওয়ার মুহূর্তে সেই বালা বিজনের কপাল লক্ষ করে নাকি ছুড়ে মেরেছিলেন মহাশ্বেতা। নবারুণ দেখেছিলেন এক দিকে বাবার কপাল থেকে গলগল করে রক্ত বেয়ে নামছে, অন্য দিকে এক কাপড়ে বাড়ি ছাড়ছেন মা।
বড় হওয়ার পরে নবারুণকে নাকি বিজন বারবার বলেছেন, মহাশ্বেতার অন্য সম্পর্ক ভাল ভাবে মেনে নিতে পারেননি তিনি। বস্তুত, মহাশ্বেতা চলে যাওয়ার পরে বিজন আর কখনও কোনও সম্পর্কেও জড়াননি। বাকি জীবন কেটেছে ছেলেকে নিয়ে।
বাড়িতে নবারুণকে নিয়ে পাঁঠার মাংস আর ‘বাংলা’র সংসার। তাঁর নাটকের সংলাপের মতোই বাড়ির ইট-কাঠ-কংক্রিটের পাঁজর সময়ে সময়ে শুনছে, ‘বাঁচতি গেলি খাওয়া জোটে না, খেতি গেলি বাঁচা যায় না…’ কিন্তু তখনও তিনি বিশ্বাস করছেন, দিন বদলের স্বপ্নই বাঁচিয়ে রাখে জীবন। বিশ্বাস করছেন, থিয়েটার একদিন জনগণের হয়ে উঠবে। সংলাপ আর কেবল সংলাপে আটকে থাকবে না। সাধারণ মানুষের বিপ্লবের ভাষা হয়ে উঠবে। বিজন ভট্টাচার্য।বাংলা নাটকের অন্যতম ‘চর্চিত অথচ বিস্মৃত’ চরিত্র। নাট্যকর্মীরা যাঁকে রোজই আবিষ্কার করছেন এবং তুলে রাখছেন আপাত গোছানো বইয়ের তাকে। ধুলো ঢাকা বিজন নস্টালজিয়ায় ভাল, বাস্তবে ছ্যাঁকা খাওয়ার মতো।
অভাবের কারণ ছিল না। কারণ ছিল না এই অনিশ্চিত জীবনেরও। পারিবারিক সম্পত্তি কিছু কম ছিল না ভট্টাচার্যদের। শুধু তাই নয়, বছর কয়েক চাকরিও করেছেন তিনি। সাংবাদিক হিসেবে চাকরি করেছেন আনন্দবাজার পত্রিকায়। মাইনে নেহাত কম ছিল না। কিন্তু কোনওটাই পছন্দ হয়নি তাঁর। বছর কয়েকে বুঝে গিয়েছিলেন, ও কাজ তাঁর জন্য নয়।
আর জায়গাজমি? বিশেষ খবর রাখেননি কোনও কালেই। তবে ষাটের দশকে ও পার বাংলায় ফেলে আসা জবর দখল হয়ে যাওয়া জমি নিয়ে মামলা করেছিলেন। পাকিস্তান সরকার তত দিনে সে জমি ‘খাস’ করে দিয়েছে। দীর্ঘ দিন লড়াই করে বিজন সেই মামলা জিতেও ছিলেন। কিন্তু পাক সরকার তখন সে সম্পত্তি ‘শত্রুর জমি’ বলে চিহ্নিত করে!
তাঁর রচিত নাটকের তালিকা খুব দীর্ঘ নয়। ‘সংসদ বাংলা নাট্য অভিধান’ অনুযায়ী সেই তালিকা : ‘আগুন’ (একাঙ্ক, ১৯৪৩), জবানবন্দী (১৯৪৩), ‘নবান্ন’ (১৯৪৪), ‘মরা চাঁদ’ (১৯৪৮, প্রথমে একাঙ্ক, ১৯৬০-এ পূর্ণায়িত), ‘অবরোধ’ (১৯৪৭), ‘জতুগৃহ’ (১৯৫১), ‘গোত্রান্তর’ (রচনা ১৯৪৭, ১৯৫৬-৫৭), ‘ছায়াপথ’ (১৯৬১), ‘দেবীগর্জন’ (১৯৬৬), ‘কৃষ্ণপক্ষ’ (১৯৬৬), ‘গর্ভবতী জননী’ (১৯৬৯-৭১), ‘আজ বসন্ত’ (১৯৭০), ‘সোনার বাংলা’ (১৯৭১), ‘চলো সাগরে’ (১৯৭২)। রবীন্দ্রনাথের গল্পের নাট্যরূপও দিয়েছিলেন তিনি, আর আকাশবাণীর জন্য লিখেছিলেন গীতিনাট্য ‘জীয়নকন্যা’ (১৯৪৮)। মৃত্যুর ছ’বছর আগে তাঁর নাট্যরচনার সমাপ্তি ঘটে।
অথচ নাটককার হিসেবে তাঁর কলমে শক্তি কম ছিল না। তাঁর অভিজ্ঞতা-পরিধি ছিল বিশাল, উচ্চমধ্যবিত্ত জীবন থেকে গ্রামীণ চাষি বেদে শ্রমিকদের জীবন পর্যন্ত – সকলের মুখের বাগ্ভঙ্গিটি তিনি অনায়াসে তুলে আনতে পারতেন। দু’একটি ক্ষেত্রে অনাবশ্যক অতিনাটকীয়তার আক্রমণ তিনি এড়াতে পারেননি (যেমন প্রভঞ্জন যখন সরদারকে দিয়ে কর্জের টিপছাপ নেয় সেই দৃশ্যটি), কিংবা উচ্চবিত্ত চরিত্রের বেলায় কিছু আরোপিত কৃত্রিম নাটকীয়তা তাঁকে নির্মাণ করতে হয়েছে। তবু স্বাভাবিক নাটকীয় সংলাপ রচনায় ছিল তাঁর প্রবল নিপুণতা। ‘গোত্রান্তর’-এ উদ্বাস্তু হরেন্দ্র মাস্টারের বস্তির প্রাথমিক স্কুল থেকে সব ছাত্ররা চলে যাচ্ছে, মোক্তার অভয়ও তার ভাইপোকে টাউন স্কুলে ভর্তি করেছে। তাকে রাস্তা দিয়ে যেতে দেখে হরেন্দ্র মাস্টার তাকে ডাক দেয়, ‘অভয়বাবু নাকি, আর ও অভয়বাবু, এই যে… অভয়বাবু দাঁড়িয়ে বলে, ‘কিছু বলছেন?’ তখন হরেন্দ্র মাস্টার বলে, ‘শোনেন তো বলি’।
এই ‘শোনেন তো বলি’ সংলাপটি বুঝিয়ে দেয়, এই নাটককারের কলম একটি চরিত্রের রক্তমাংসের মূর্তি তার ভাষার মধ্যে ফুটিয়ে তুলতে জানত। আর জানত গান, পল্লির মানুষের গলার স্বতোৎসারিত গান, যা তার সংলাপের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে ফুটে বেরোতে চায়। তাঁর ওই গীতিরচনার সম্ভাবনাটি খুব বেশি নাটকে তিনি ব্যবহার করলেন না দেখে একটু অতৃপ্তিও জেগে থাকে।
অভিনয়কে, থিয়েটারকে বোধহয় খুব ‘অর্গানাইজ়ড’ ভাবে দেখতেও চাননি বিজন। দল গোছাতে চাননি। বরং সংগ্রামের পথটাই ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। হয়তো সে জন্যই ’৭৮ সালে মুক্তমঞ্চে নাটক চলাকালীন যখন পায়ে পেরেক ফুটে গিয়েছিল, তিনি অভিনয় বন্ধ করেননি। দুই সিনের মাঝখানে পা থেকে বারও করতে পারেননি পেরেক। পেরেক বেঁধা রক্তাক্ত পায়ে শেষ হয় শেষ অভিনয়। রাতে বাড়ি ফিরে রক্ত বমি। দু’বার। পরদিন মৃত্যু।
কার মৃত্যু? ব্যক্তি বিজনের? নাকি একটা সংগ্রামের? বামপন্থী স্বপ্নের? ইন্টারন্যাশনালের? প্রশ্ন ঘুরতে থাকে হাওয়ায়। বাংলা থিয়েটার অগ্রসর হতে থাকে গ্রুপ থেকে গ্রুপে। মঞ্চ থেকে মঞ্চে। ক্রমশ বইয়ের তাকে জায়গা পেতে থাকেন বিজন। বাংলা ভাষার ডায়লেক্ট চর্চার মতোই। শহরমুখী বামপন্থা ক্রমশ বিজনচর্চা বেঁধে দেয় নবান্ন-পর্বে। নস্টালজিয়ায়।
বিজন ভট্টাচার্য তাঁর সূদৃঢ় চেতনার লাঙ্গল ফলায় জেনেছেন সংস্কারের জগদ্দল পাথরকে। যেমন জেনেছেন গ্রামীণ চেতনাকে অবরুদ্ধ করে রেখে, কোনো রাজনৈতিক ফয়সালা কিংবা অর্থনৈতিক ভাবে শহুরে মসনদ আলোকিত হয়নি -হবেনা। তাই গ্রামীণ বিশ্বাসকে নাড়া দিতে হবে? এর কোন বিকল্প নেই।
বিজন ভট্টাচার্যের নাটকে আমরা দেখতে পাই গ্রামের মুক্তি মানেই রাজনৈতিক মুক্তির পথ। এমন কি সেদিনের নকশালবাদীরা পর্যন্ত বিজন ভট্টাচার্যের দেখানো পথেই ওদের নির্দেশনা স্থির করেন। আর সেদিনের ক্ষমতাবানরা নকশালবাদীদের অস্বীকার করতে গিয়ে গ্রামের রাজনৈতিক রূপান্তরের গুরুত্বও কমিয়ে দেখেছিলেন। একধরনের ফ্যসিবাদী চিন্তার মননের কাছে আমরা বারবার নিগৃহীত হচ্ছি। এই পরিপ্রেক্ষিতে বিজন ভট্টাচার্যের নাটকগুলির গুরুত্ব আজও অপরিসীম বলে আমার মনে হয়।
জনগণই তাঁর নায়ক-শৈশব থেকে যে দর্শন লালিত ছিল মননে সেই মানবদর্শন হতে পিছু হটেননি বিজন ভট্টাচার্য। আপোষহীন ভাবে ছুটে গিয়েছিলেন মানুষের কাছে। মানুষের কাছ থেকে পাঠ নিয়েছেন। সারা বঙ্গদেশের মানুষের জীবন দেখে চিনেছেন এবং চিনতে শিখিয়েছেন। অগণিত ভুখা মানুষের মিছিলে পথ হেঁটে খুঁজে বেরিয়েছেন মানবিক মুখ। সেই অন্তহীন খোঁজার মধ্য দিয়ে জীবনের পথ চলা। অন্ধকার থেকে আলোয়- অতীত থেকে কালাকাল পার হয়ে জনচিত্তে বেঁচে থাকা, বেঁচে ওঠা, প্রতিরোধ, প্রতিবাদ, গণ অভ্যুত্থান। রিয়ালিজম্ থেকে অ্যাবস্ট্রাকশনের অভিমুখী যাত্রা। এক চলমান ট্র্যাজেডির নায়ক বিজন ভট্টাচার্য। তাই তিনি প্রায় বলতেন, ‘গণনাট্য তখনই সম্ভব হইবে যখন গণেরা নাট্যে অনুষ্ঠান করিবে।’
তাঁর লেখা সংলাপ নিয়েও আলাদা করে ভাবা দরকার। তিনি বলতেন, দু মাইল অন্তর অন্তর আমাদের মুখের ভাষা পালটে যায়। এই পালটে যাওয়া তিনি সংলাপে ধরে রাখতেন। একেবারে মূলধারার জনপ্রিয় ছবিতে তাঁর কাজ লক্ষ করলেও টের পাওয়া যাবে ব্যাপারটা। অনেকেই খেয়াল করেন না যে বিজনবাবু নির্মল দে নির্দেশিত দুটো ছবি – ‘বসু পরিবার’ (১৯৫২) আর ‘সাড়ে চুয়াত্তর’ (১৯৫৩)-এর চিত্রনাট্যকার। এই ছবি দুটো আমাদের আধুনিকতার মাইলফলক। প্রথমটা উত্তকুমারকে জনমানসে প্রতিষ্ঠিত করেছিল আর দ্বিতীয়টা উত্তম-সুচিত্রার প্রথম হিট ছবি। দ্বিতীয় ছবিতে ভানু বন্দ্যোপাধ্যায়ের যে সংলাপ অসম্ভব জনপ্রিয় হয়েছিল এবং এখন প্রবাদে পরিণত হয়েছে – “মাসিমা মালপোয়া খামু” – তা বিজন ভট্টাচার্যের পক্ষেই লেখা সম্ভব ছিল।
বিজনবাবুর নাটক স্টেজ ছাড়িয়ে দরকার পড়লে একটা সামান্য তক্তপোষ বা ছেঁড়া চটের উপর তৈরি হত। সেই নাটক সারা ভারতবর্ষে ছড়িয়ে পড়ল, হাবিব তনবীর বা বিজয় তেন্ডুলকরের মত সমস্ত বড় বড় নাট্যকার এই নাটকগুলোর সামনে হাঁটু মুড়ে বসতেন। নবান্ন থেকে পরবর্তীকালে ধরতি কে লাল ছবি পর্যন্ত হল।
আসলে আজ বুঝতে পারি নবান্ন, জবানবন্দী-র মত নাটক দলগত নৈপুণ্যকে সম্মুখবর্তী করে। আর বিজনবাবু কখনো নাটকে, কখনো সিনেমায় একা, অনেকটা বিবেকের মত, শ্মশানের দিকে এগিয়ে যান। সুবর্ণরেখা ছবিতে তাঁর সংলাপ ছিল “ঈশ্বর, আমারে একবার কইলকাতায় নিয়া যাবা?” আজকের কলকাতা তো শূন্যতার পরিসর। এই কলকাতা তো হোয়াটস্যাপ বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র। এই কলকাতায় বিজন ভট্টাচার্যের স্মৃতিচারণ অবাক করে। অবজ্ঞাই তাঁর নিয়তি। তাঁর সেই হাই পাওয়ারের চশমা পরে রাসবিহারীর মোড়ে হাঁটার কথা মনে পড়ে। কোথাও এক বিন্দু অহঙ্কার তো ছিলই না, কখনো এ কথাও ভাবতেন না, কবে কাগজে আমার ছবি ছাপা হবে।
অথচ নাটকে তাঁর অবদানের কথা বাদ দিয়ে যদি শুধু সিনেমায় অভিনয়ের কথাও ভাবি, বিশেষ করে ঋত্বিক ঘটকের ছবিতে তিনি যেসব চরিত্রে অভিনয় করেছেন তা অন্য কারোর পক্ষে করা সম্ভব ছিল বলে হয় না। মেঘে ঢাকা তারা ছবিতে নীতার বাবার চরিত্রে যে তীব্রতায় বিজন “I accuse” বলেন, বা সুবর্ণরেখা ছবিতে যেভাবে “ঢালো ঢালো ঢালো। মধ্যাভাবে গুড়ং দইদ্যাৎ। মধু না পাইলে গুড় দিবা” বলেন, তাতে অনুভূত হয় উনি গোটা সভ্যতাকে দণ্ডদান করছেন।
আসলে বিজন এবং ঋত্বিক, দুজনেই এক অর্থে জনতার শিল্পী। সেকথা জনতা হয়তো তখন বোঝেনি, সবসময় গ্রহণ করেনি। কিন্তু ওঁরা জনতার মুখপাত্র হিসাবেই ইতিহাসের কাছে নিজেদের নিবেদন করেছেন।
আজকের সভ্য ইতিহাস হয়তো আলো আঁধারের তাপস বিজন ভট্টাচার্যকে ‘নিঃসঙ্গ সম্রাট’ উপাধিতে ভুষিত করতে পারবেনা, কিম্বা মঞ্চ সম্রাটের মুকুট হয়তো তাঁকে পরাবে না। তবুও সব পার্থিব উপকরণে একটু চেষ্টা করি থিয়েটারের তাঁকে অমৃতপূরুষ বলতে।
এত বিচিত্র সম্বল নিয়েও মানুষটি ইতিহাসের শিকার হয়ে গেলেন, এই যা দুঃখ। নাট্যকারের, বিশেষত বিজন ভট্টাচার্যের মতো দীক্ষিত নাট্যকারের উপায়ও ছিল না এই সংকট এড়ানোর, ইতিহাসের কণ্ঠস্বর হয়ে না-ওঠার, আবার তারই জন্য তাঁকে হয়তো ইতিহাস কিছুটা নিজের সঙ্গে জড়িয়ে নিয়েছে, পরেকার সময়ের ব্যবহারের জন্য রেখে দেয়নি।
বিজন ভট্টাচার্য যেন একজন তপস্বী। নৈরঞ্জনা নদীতীরে গৌতম বুদ্ধ যেমন নির্বিকল্প হয়ে বসেছিলেন, বিজন ভট্টাচার্যকে তেমনভাবে বসে থাকতে দেখেছি। আমার তাঁকে দেখার কারণটা অবশ্য ব্যক্তিগত। তাঁর ছেলে নবারুণ আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু ছিল। ওরা তখন ভবানীপুরের চোদ্দ নম্বর রাজেন্দ্র রোডে থাকত। আমি নবারুণের সঙ্গে আড্ডা মারতে গিয়ে বিজনবাবুকে মাঝে মাঝে দেখতে পেতাম। শুভ্র ধুতি পরিহিত, হয়তো দাঁত মাজছেন কি টুকটাক সাংসারিক কাজ করছেন। অথচ এই মানুষটা আসলে আধুনিক ভারতীয় নাটকের স্রষ্টা!
এমন একটা মানুষ কি অবহেলায় কাটিয়েছেন! তাঁর মৃত্যুও অবহেলার মধ্যেই। মুক্তাঙ্গনে অভিনয় করতে গিয়ে পায়ে পেরেক ঢুকে গেল। সামান্য কয়েকজন দর্শকের সামনে আধুনিক ভারতের একজন অন্যতম শ্রেষ্ঠ প্রতীক বিজন ভট্টাচার্য চলে গেলেন। কিন্তু এ নিয়ে একটা কথাই বলার আছে। তা হল শিল্পীকে এইরকম ছদ্মবেশী সম্রাটের মতই জীবন কাটাতে হয়। তাঁর যে সুনির্দিষ্ট রাজনীতি ছিল তা বলাই বাহুল্য, কিন্তু এটাও লক্ষ করার মত যে বিজনবাবু সেই রাজনীতির কাছ থেকেও তেমন সম্মান পাননি। কারণ দলীয় রাজনীতি সবসময়েই আনুগত্য দাবি করে, আর বিজন ভট্টাচার্য ছিলেন স্বাধীন মানুষ।
কারো বলাবলিতে তাঁর কোনো আসক্তি ছিল না। কিন্তু ইতিহাস? আমরা যারা আজ পথের কথা বলি কিম্বা গণমুখী নাট্য আন্দোলন করি তাঁকে ‘একলা পাগল’ হিসাবে অনেকদিন মনে রাখবো। মনে রাখতেই হবে, কেননা থিয়েটার থেকে তিনি যতটুকু পেয়েছেন তার চেয়ে অনেক বেশি এই থিয়েটারকে তিনি দিয়ে গেছেন।
আজ ১৭ জুলাই। আজ বাংলা নাট্য ও চলচ্চিত্র জগতের অন্যতম স্মরণীয় চরিত্র বিজন ভট্টাচার্যের জন্মদিবসে শ্রদ্ধাঞ্জলি জানাই।
তথ্যঋণ ও কৃতজ্ঞতা স্বীকার : আনন্দবাজার পত্রিকা, ডেইলি পূর্বদেশ ডট কম, নবারুণ ভট্টাচার্য ও শমীক বন্দ্যোপাধ্যায় সম্পাদিত ‘বিজন ভট্টাচার্য রচনা সংগ্রহ’, অভি চক্রবর্তীর ‘বিজন ভট্টাচার্য – নাট্যকার, নির্দেশক ও সংগঠক’, বহুরূপী পত্রিকা ২০১৫, ‘এক্ষণ পত্রিকা’ – ‘বিজন ভট্টাচার্য বিশেষ সংখ্যা’ – শামীম আহমেদ, সঞ্জয় মুখোপাধ্যায় – নাগরিক ডট নেট, মৌনি মন্ডল – জিয়ো বাংলা ও অন্যান্য সূত্র।