| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বিজন ভট্টাচার্যের নবান্ন — প্রত্যাশা ও প্রতিরোধের প্রতিবেদন : আনন্দগোপাল হালদার

Reporter
আনন্দগোপাল হালদার / ২৫৩৯ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ১৮ জুলাই, ২০২৫

১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ভারতবর্ষ তথা বিশ্বের ইতিহাস কলঙ্কময় আখরে মুদ্রিত। বিপর্যস্ত বিশ্বব্যবস্থায় চেকশ্লোভাকিয়া ও পোল্যান্ডে গণহত্যালীলার নায়ক নাজী হেড্রিনচককে বোমা মেরে হত্যা করা হলে ৪ জুন এরই প্রতিক্রিয়ায় হিটলারী ন্যাৎসী বাহিনী ২০১ নারী সহ ৩৩১ জন চেকস্লোভাকিয়ার জনগণকে হত্যা করে। এই বছরই ৮ মার্চ ঢাকার রাজপথে ফ্যাসিবাদ-বিরোধী মিছিলে তরুণ কমিউনিস্ট নেতা ও বিখ্যাত কথাসাহিত্যিক সোমেন চন্দ নিহত হন। কলকাতার পথে পথে সাইরেনের শব্দ, আমেরিকান সৈন্যবাহিনীর ঘন ঘন আস্ফালন যার মধ্যে সন্ত্রস্থ মানুষ নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে শহর ছেড়ে পালাচ্ছে। এরই মধ্যে ২০ ডিসেম্বর মধ্যরাতে কলকাতায় জাপানী বোমার অগ্নিস্রাবী থাবা মানুষের হাড়-মজ্জায় সন্ত্রাসী শিহরন সৃষ্টি করেছিল। ২৯ সেপ্টম্বর মেদিনীপুর জেলার তমলুক শহরে জাতীয় পতাকা হাতে স্বাধীনতার লড়াইয়ে মাতঙ্গিনী হাজরা শহিদ হলেন। এই সালেই ‘ভারতছাড়ো’ বা আগস্ট আন্দোলনে ব্রিটিশ রাজশক্তির বিরুদ্ধে জনমানুষের সশস্ত্র সংগ্রাম ব্রিটিশপুলিশ মিলিটারির নির্মম অত্যাচার আর বুটের আঘাতে পাপড়ি ছিন্ন ভারতীয় জনগণের বর্ণমালায় দেখা দেয় বিপর্যয়, নষ্ট হয় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য। একদিকে রাজনৈতিক ভয়ঙ্কর সন্ত্রাস অন্যদিকে সাইক্লোন এবং বন্যা—ক্ষুধার্ত মানুষ পাগলের মতো পথে পথে ফেরে সামান্য খাবারের সন্ধানে। জাপানী আক্রমণের ভয়ে ব্রিটিশ শক্তি ‘পোড়ামাটি’ নীতি গ্রহণ করে। গ্রামবাংলার খাদ্যশস্য আগুনের লেলিহান শিখায় ভস্ম হয়ে যায়, যার মাশুল পড়ে গ্রামবাংলার কৃষক-শ্রমিক-মেহনতি জীবনে—দেখা দেয় মন্বন্তর। দুর্দশাগ্রস্ত নিরালম্ব কৃষকরা কোনো মতে দিন গুজরানের জন্য সামান্য দরে জমি-বাড়ি, বাটিঘটি বিকিয়ে দেয়। এমনকি সে-সময় মানুষও বিপণনের সামগ্রীতে পরিণত হয় বেশি করে। বিশেষত নারী হয়ে ওঠে সুলভ পণ্যবস্তু। একদিকে দুর্দশা অন্যদিকে রিরংসা দুই-ই উত্তুঙ্গ বিভীষিকার মতো ছড়িয়ে পড়েছিল গ্রামবাংলার মাটিতে। এদেশী সুযোগসন্ধানী উচ্চবিত্তরা তখন বিপর্যস্ত অসহায় মানুষের খাবার আর অর্থের লোভ দেখিয়ে ব্যাবসা করতে শুরু করে—মানুষ কেনাবেচার ব্যাবসা, বিশেষত বাড়ির বউ মেয়েদের তারা পণ্যে পরিণত করে। আমাদের মনে পড়বে ‘১৯৪৬-৪৭’ কবিতায় জীবনানন্দ দাশ এমনই এক পরিস্থিতির সম্মুখীন করেছিলেন আমাদের, তিনি লিখেছিলেন—

“কোথাও পরের বাড়ি এখুনি নিলেম হবে—মনে হয়,

জলের মতন দামে।

সকলকে ফাঁকি দিয়ে স্বর্গে পৌঁছুবে

সকলের আগে সকলেই তাই।

**

অনেকেরই ঊর্ধ্বশ্বাসে যেতে হয়, তবু

নিলেমের ঘরবাড়ি আসবাব—অথবা যা নিলেমের নয়

সে সব জিনিস

বহুকে বঞ্চিত ক’রে দু জন কি একজন কিনে নিতে পারে।

পৃথিবীতে সুদখাটে: সকলের জন্যে নয়।

অনির্বচনীয় হুণ্ডি একজন দু জনের হাতে।

পৃথিবীর এইসব উঁচু লোকেদের দাবি এসে

সবই নেয়, নারীকেও নিয়ে যায়।”

চারের দশকের এই ঘুরপাক-খাওয়া বিপর্যস্ত বিশ্বব্যবস্থায়, দুর্ভিক্ষপীড়িত এক গ্রাম তাসের প্রাসাদের মতো ভেঙে-পড়া আমিনপুরের পটভূমিকায় বিজন ভট্টাচার্য ‘নবান্ন’ নাটকটি রচনা করেন।

সীমিত শৈল্পিক অবয়বে এই নাটকটির জন্ম হওয়ায়, আমিনপুর নামে এক গ্রামের বিপর্যস্ত জীবনকথা বর্ণিত হলেও আমিনপুর আর আমিনপুরে সীমাবদ্ধ থাকেনি—সারা বাংলাদেশই তখন আমিনপুরে পরিণত হয়ে উঠেছে।

নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্য ছিলেন কমিটেড বামপন্থী। তাঁর নাট্যচিন্তা ও সৃজনের মূল উৎস ছিল শোষিত-নিপীড়িত-বঞ্চিত মানুষের প্রতি গভীর সহানুভূতি ও সমাজ পরিবর্তনের আকাঙ্ক্ষা। মন্বন্তরের বিভীষিকা এবং কৃষক-শ্রমিক আন্দোলনের জায়গা থেকে তিনি ‘নবান্ন’ (১৯৪৪)-র মতো নাটক রচনা করেন, যা প্রগতিশীল সাহিত্য ও গণনাট্য আন্দোলনের এক অন্যোন্যসম্পৃক্ত অঙ্গ হয়ে ওঠে। গণনাট্য সংঘের সঙ্গে তাঁর ঘনিষ্ঠ যোগাযোগও তাঁর বামপন্থী রাজনৈতিক বোধেরই তাৎপর্য-প্রকাশক। শিল্পকে তিনি কেবল বিনোদনের মাধ্যম নয়, বরং শোষণবিরোধী লড়াইয়ের এক শক্তিশালী অস্ত্র হিসেবে দেখেছিলেন।

সমকালীন সমগ্র কৃষকজীবনের আত্মার কথাকার হয়ে বিজন ভট্টাচার্য আমিনপুর তথা সমগ্র বাংলাদেশের দুঃখ-দুর্দশার কথামালা রচনা করেছেন। ‘নবান্ন’ নাটকের পটভূমি এমনই হওয়ায়, উপর্যুপরি দুর্ভোগ, যন্ত্রণা এবং নিরুপায় দুর্গতির কথা বারবার বর্ণিত হয়েছে।

দুই

একদিকে শোষক শ্রেণির অত্যাচার, অন্যদিকে প্রাকৃতিক দুর্যোগে—শতছিন্ন প্রাণঘাতী ছিন্নমূল মানুষের আর্তনাদ—গাঢ়স্থ আশ্রমের খুঁটি ভাঙার শব্দ মিলেমিশে একাকার হয়ে উঠেছে। তাদের এই বিপন্ন অবস্থার সুযোগে একশ্রেণির বিবেক বন্ধক রাখা মানুষ, তাদের লালসার প্রবৃত্তি নিয়ে হাজির হয়। লেলিহান ষড়যন্ত্রে বিপর্যস্ত হয়ে পড়ে দুর্দশাগ্রস্ত কৃষক-পরিবার।

মোটামুটি শুরুর দিক থেকেই নাটকটিতে অভাবের রোষানলে প্রধান সমাদ্দারের পরিবারের সুখ-শান্তি বিঘ্নিত হওয়ার ছবি দেখা যায়। প্রধান সমাদ্দারের দুই পুত্র ভূপতি ও শ্রীপতি আগস্ট আন্দোলনের ফলে মিলিটারির গুলিতে নিহত হয়। বৃদ্ধ পিতা সারা নাটক জুড়ে তাদেরই শোকে সমাচ্ছন্ন থেকেছেন। তাঁর আশা ছিল, তাঁর পুত্রদ্বয় জীবিত থাকলে হয়তো এমন অবস্থার প্রতিরোধ হতো। ঘরে অভাব-অনটনে পারিবারিক শেষ সম্বল বাসন-কোসন বেচে ফেলতে হয় কুঞ্জকে, তারপর ভিটেমাটি…। শিকড়ছিন্ন মানুষ কোথায় দাঁড়াবে? একে একে আশা, স্বপ্ন, সফলতা বন্যার তোড়ে হাবুডুবু খেতে থাকে। একদিকে পেটের জ্বালা, অন্যদিকে মড়কের মিছিলে ‘হরিবোল’ ধ্বনি গ্রাম থেকে গ্রামান্তরে আতঙ্কের সন্ত্রস্ত ছাপ—এসবেরই মধ্যে সমুদ্র সমান তালে চলে আসে গ্রামের উঠোনে। নিষ্ঠুর তরল চোরাস্রোতে ডুবে যায় গ্রাম্যভূমি, ডুবে যায় সাংসারিক আবরণ। ঘরবাড়ি ভেসে যায় বন্যার তোড়ে। দয়ালের স্ত্রী মারা যায়। কুঞ্জর স্ত্রী রাধিকা ঘরের চালে চাপা পড়ে। অনাহারে মৃত্যু হয় মাখনের। এইভাবেই দুর্গতিরই প্রতিধ্বনি ফিরে ফিরে আসে কৃষক-জীবনের উপর।

নাটকের দ্বিতীয় ও তৃতীয় অঙ্কে পরিস্ফুট বন্যা, দুর্ভিক্ষ এবং মহামারির করাল ছবি। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের খরচ যোগান দেওয়ার ফলে গ্রামীণ কাঁচামাল এবং অর্থ বিদেশের বাজারে চালান হয়ে যায়। গ্রামগুলিতে খাবারের প্রবেশ বন্ধ হয়ে যায়। খোলা বাজার থেকে গ্রামীণ খাদ্যশস্য শহুরে ফড়ে ও দালালরা গুদামজাত করে। এভাবে ফসল মজুত হওয়ায় গ্রাম ও শহরের সাধারণ মানুষকে একই সমস্যার সম্মুখীন হতে হয়। ক্ষুধাতুর মানুষ তখন স্বরাজের স্বপ্ন ভুলে, এক মুঠো ভাত, এক টুকরো রুটি বা এক ছটাক ফ্যানের জন্য আস্তাকুঁড়ে কুকুরের সঙ্গে লড়াই করে। গ্রাম ও শহর তখন একই মুদ্রার ভিন্ন পিঠ।

নাটকে শহরের এক ভদ্রলোককে কালীধনের গুদামে এসে, নিরুপায় হয়ে সামান্য দুটো চালের জন্য কাতর আর্তি জানাতে শুনি— “এখন আমি কী করি বলুন তো! আপনি বোধ হয় ঠিক বুঝতে পারছেন না আমার প্রয়োজনটা। গুচ্ছের কাচ্চাবাচ্চা নিয়ে মশাই শহরে বাস। ঘরে একদানা চাল নেই।” ভদ্রলোকের এই নিরুপায় আর্তকণ্ঠের আততি আসলে সমগ্র শহরের সাধারণ বাসিন্দাদের বুকভাঙা কান্নার সম্মিলিত প্রতিধ্বনি। শহর থেকে গ্রাম, গ্রাম থেকে আমিনপুর, আমিনপুর থেকে সারা বাংলার মানচিত্র—দুর্ভিক্ষের আক্রমণাত্মক থাবায় ক্ষতবিক্ষত, রক্তস্নাত।

সুকান্তের মোরগ একদিন ভালো খাবারের স্বপ্ন দেখতে দেখতে যেমন সুদৃশ্য টেবিলের সাদা প্লেটে মাংস হয়ে উপস্থিত হয়েছিল, তেমনি গ্রামীণ কৃষক-পরিবারও স্বপ্ন দেখেছিল দুরাশার কুহেলিকা বোধ হয় শহুরে সূর্য ঢেকে ফেলতে পারবে। তাই গ্রামীণ মানুষ শহরের অন্নকূটে আসতে শুরু করে দলে দলে। ঠিকানাহীন উদ্‌বাস্তু মানুষের ঢল—পথপার্শ্বে, ফুটপাথে, স্টেশনে-স্টেশনে, রাস্তায় রাস্তায়—আশ্রয় নেই।

এদের দেখে শহুরে সুযোগসন্ধানী নির্মম ফটোব্যবসায়ী সংবাদপত্রে ছাপাবার জন্য এদের ‘মডেল’ হিসেবে ব্যবহার করে। খিস্তি দেয়, বেআব্রু ছবি তোলে, ব্যবসায়িক নাম দেয়—‘বাংলার ম্যাডোনা’।

এই দৃশ্যের পরেই নাট্যকার শহরের এক ধনী ব্যবসায়ীর বিয়েবাড়ির দৃশ্য দেখিয়েছেন, যেখানে অপচয়ের দৃশ্যই বেশি। সেখানে কুঞ্জ ও রাধিকা উচ্ছিষ্ট নোংরা খাবার সংগ্রহ করছে কুকুরের সঙ্গে পাল্লা দিয়ে। কুকুরের দংশনে কুঞ্জর হাত ক্ষতবিক্ষত হয়েছে। প্রধানের আর্তচিৎকার ধ্বনিত হয়েছে বাবুসাবদের নির্মমতা ও নির্দয়তার উপর।

নাটকের তৃতীয় অঙ্কে লঙ্গরখানার চিত্র এবং চিকিৎসাকেন্দ্রের বিবরণ—সেখানেও আমরা দেখতে পাই—চিকিৎসার নামে প্রহসনের প্রহেলিকায় একে একে মৃত্যুর মিছিলের ছবি। পুলিশ ও মিলিটারিরা এই অর্ধমৃত মানুষকে লরিতে তুলে গ্রামে চালান করে। অতঃপর পর দুঃখের আঁধার-রাত্রে নিমজ্জিত একক মানুষ আস্তে আস্তে স্বাভাবিক জীবনে ফেরার স্বপ্ন বপন করে।

এতক্ষণ নাটকটিতে আমরা শুধু অভাব-অনটনেরই উলুঙ্গরূপ দেখছিলাম, চতুর্থ অঙ্কে আমিনপুরের মানুষ ফিরে এসেছে গ্রামে, নিজস্ব মাটির ঠিকানায় । তারপর নাটকটিতে আস্তে আস্তে মনুষ্যসৃষ্ট মন্বন্তর এবং অন্নাভাবের অবসান হতে দেখি। কোনো রকমে যারা টিকে ছিল আধখানা শরীর নিয়ে, তারা গ্রামে ফিরে মাঠভরতি ধান দেখে উৎফুল্ল হয়ে উঠেছে। ভবিষ্যতের জন্য সবাই একজোট হয়ে গাঁতাই খেটে ধান তুলেছে ঘরে। সম্মিলিত প্রয়াসে ধর্মগোলা স্থাপন করেছে, নবান্ন উৎসব করেছে।

হারুদত্ত বা কালীধন ধাড়াদের মতো এক শ্রেণির বুর্জোয়া ব্যবসাদারদের সৃষ্ট দুর্গতির প্রতিদ্বন্দ্বী প্রতিরোধ হয়েছে। তাদের পুলিশে ধরে নিয়ে গেছে। সাম্রাজ্যবাদী শক্তির হাত ধরে গোপনে এমন পরিস্থিতির জালবিস্তার হয় ঠিকই, কিন্তু সবার সম্মিলিত প্রয়াসে আবার তা প্রতিরোধী প্রতিবাদী আকল্পও তৈরি করে।

বিজন ভট্টাচার্য এক ব্যক্তিগত সাক্ষাৎকারে জানিয়েছিলেনও—”আমাদের প্রস্তুতি ছিল একটা হিউম্যানিস্টিক পয়েন্ট অফ ভিউ থেকে। আমরা চেয়েছিলাম মজুতদার ও কালোবাজারিদের বিরুদ্ধে একটা জাগরণ ঘটুক।” (অপ্রকাশিত সাক্ষাৎকার।) এই জাগরণ ঘটানোর জন্যই, প্রতিরোধ ঘটানোর জন্যই বিজন ভট্টাচার্য নাটকের শেষে প্রতিরোধের কথা বলেছেন। ‘প্রতিবাদ’ এবং ‘প্রতিরোধ’ শব্দ দুটি মোটামুটি একই সঙ্গে উচ্চারিত হয়ে থাকলেও, এর মধ্যে বিস্তর প্রভেদও পরিলক্ষিত হয়। প্রতিবাদ হল কোনো অন্যায় বা অমানবিক, অসামাজিক কাজের বিরুদ্ধে অসমর্থন বা শব্দ প্রক্ষেপণ; কিন্তু প্রতিরোধ সামগ্রিক অর্থে সেই অন্যায় বা অমানবিক ক্রিয়াকর্মের বিরুদ্ধে সর্বজনীন, যুক্তিসম্মত, ইতিবাচক ব্যবস্থাগ্রহণ বা তার প্রেক্ষিত রচনা করা।

বিজন ভট্টাচার্যের এই নাটকে প্রত্যন্ত এক গ্রামের নিরন্ন কৃষকদের সম্মিলিত প্রতিবাদপ্রয়াস আসলে মার্কসীয় বীক্ষায় দীক্ষিত নাট্যকার বিজন ভট্টাচার্যের সর্বহারা-তত্ত্বদর্শন থেকেই আগত। এর প্রমাণ মেলে তাঁর নিজের কথায়। তিনি আরও একটি সাক্ষাৎকারে বলেছিলেন— “কমিউনিস্ট পার্টি আমার বাহ্য ঘ্রাণেন্দ্রিয়ের পিছনে মানসিকতার দিক দিয়ে সেই দিব্যশক্তির কাজ করেছে। যেকোনো ঘটনা বা বিষয়বস্তুকে সঠিক দৃষ্টিকোণ থেকে বুঝতে, দেখতে শিখিয়েছে।”

১৯৪৩ খ্রিস্টাব্দে ভারতীয় গণনাট্যের প্রতিষ্ঠাবর্ষ। পাশ্চাত্য দার্শনিক মনীষী রমা রলার ‘পিপুলস্ থিয়েটার’ থেকে ভারতীয় গণনাট্য প্রভাবপুষ্ট। মার্কসীয় ফিলজফিতে বিশ্বস্ত এই সংঘের মূল বিশ্বাস ছিল—মানুষের ইতিহাস মূলত কৃষক, শ্রমিক সহ মেহনতি মানুষের সম্মিলিত সংগ্রামের ইতিহাস। আর গণনাট্য হল তাই—“যে নাটকে শোষিত, বঞ্চিত, নির্যাতিত, অদৃষ্টবাদী একক সাধারণ মানুষ আত্মরক্ষার প্রয়োজনে কালগত অভিজ্ঞতা, নির্বার চেতনার পরিবর্তনের ফলে অসাম্প্রদায়িক, সংঘবদ্ধ গণজাগরণ এবং সমস্ত প্রতিকূলতার বিরুদ্ধে প্রতিরোধের সার্বিক প্রয়াস ও সম্ভাব্য জয়ের ইঙ্গিত পরিস্ফুট—সেই নাটককে বলা যায় গণনাট্য।”

এই নাটকেও মেহনতি মানুষ, অদৃষ্টবাদী একক মানুষ, সর্বহারা মানুষ সম্মিলিতভাবেই শহরের উদ্দেশে পাড়ি দিয়েছে। আবার ফিরে এসেছে গ্রামে, জোট বেঁধে ধান তুলেছে গোলায়। আবার বুর্জোয়া শ্রেণির প্রতিনিধি, মালিক শ্রেণির প্রতিনিধি হারুদত্ত ও কালীধন ধাড়ার পরাজয় ঘটিয়েছে।

তিন

এই নাটকের প্রথম তিনটি অঙ্কের বারোটি দৃশ্যে বন্যার জল আর ক্ষতের রক্ত, বুর্জোয়া শোষণ আর সাম্রাজ্যবাদী আগ্রাসন মানুষের শুভবোধ, শুভচৈতন্যে মরচে ফেলে দিয়েছিল। কিন্তু তারপরেই আমীনপুরের যে-নতুন ভূমি বর্ষিত হল, সেখানে কৃষক-চাষিদের প্রাণখোলা গানের অবতারণা ঘটেছে। আমরা জানি, যে-কোনো সমাজ দৃঢ় হয় মৈত্রী, প্রীতি ভ্রাতৃত্বের বন্ধনের মধ্য দিয়ে। নবান্ন নাটকেও এই গানের মধ্যে দিয়েই কৃষকসমাজ তাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য বজায় রেখেছে।

নাটকের প্রথম অংশে যে ঝঞ্ঝাবিক্ষুব্ধ পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয়েছিল গ্রামবাংলাকে, সেই গ্রামবাংলাই আবার গানের সুরের মধ্য দিয়ে ‘নবান্ন’ উৎসবের আগমন সূচনা করেছে। সর্বমোট নাটকটির শেষের দিকে, অর্থাৎ চতুর্থ অঙ্কের তৃতীয় দৃশ্যে তিনটি গানের ব্যবহার হয়েছে, যা প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধেরই গর্জনসুরকে ধ্বনিত করে।

প্রথম দৃশ্যে নিরঞ্জনের গান—

“বড়ো জ্বালা বিষম জ্বালায়…”,

দ্বিতীয় দৃশ্যে ফকিরের গান—

“আপনি বাঁচলে তো বাপের নাম…”,

এবং তৃতীয় দৃশ্যে কৃষক-রমণীদের গান—

“নিসলো চেয়ে সামনের হাটে গলার হাঁসুলী…”।

নাট্যকারের সচেতন চৈতন্যবীক্ষা এই গান তিনটির মধ্যে দিয়েই পরিস্ফুট হয়ে উঠেছে। প্রথম দিকে আমীনপুরের কৃষক-সমাজ রাজনৈতিক এবং প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে ছিন্নভিন্ন হয়ে গিয়েছিল ঠিকই, কিন্তু নাটকের শেষে আমীনপুর বন্যার জলে পঙ্কিলতা ধুয়ে ফেলে নতুন করে বাঁচতে শেখে।

নিরঞ্জনের গানে স্বজন হারানোর বেদনা যেমন প্রচ্ছন্নভাবে প্রকাশিত, তেমনি গানটির মধ্যে দিয়ে মানুষের মিলিত হওয়ারও প্রয়াস আছে। দ্বিতীয় গানটি ফকিরের কণ্ঠে গীত হয়েছে। গ্রামের মানুষ এত লড়াই করে ঝঞ্ঝা, রক্তক্ষত, মড়ক মাড়িয়ে ঘরে ফিরেছে। স্বাভাবিক, স্বচ্ছন্দ জীবন ফিরতে শুরু করেছে গ্রামীণ পরিসরে।

নাটকটির প্রথম তিন ভাগে যে-পরিমাণ দুঃখ-দুর্দশার কথা বর্ণিত হয়েছে, তাতে করে শেষের এই সামান্য অংশ কেমন যেন বেমানান ঠেকে। কিন্তু আমাদের ভুলে গেলে চলবে না, বিজন ভট্টাচার্য মার্কসীয় সর্বহারাতত্ত্বে আত্মস্থ। আমরা জানি, মার্কসীয় তত্ত্বের মূলকথাই ছিল—সর্বহারা শ্রেণি সম্মিলিত হবে, লড়াই করবে প্রতিকূল অবস্থার বিরুদ্ধে এবং তাদের জয় ঘোষিত হবে। ফকিরও তাই জাতি-ধর্মের বিদ্বেষ ভুলে সম্প্রীতির গান গেয়েছে—

“আপনি বাঁচলে তো বাপের নাম মিথ্যা সে বয়ান।

হিন্দু মুসলিম যতেক চাষি দোস্তালি পাতান।।

… … …

শক্ত করে ধর হাল, হালে পাবে পানি।।

… … …

আমন ফসল শুভ-লক্ষণ প্রতি ঘরে ঘরে।

গাঁতায় ঘাটিয়া তোলা মিলি পরস্পরে।।”

স্বাভাবিক সংসারজীবন ফিরে পাওয়ার পর গ্রামীণ জীবনে কুঞ্জু-রাধা, নিরঞ্জন-বিনোদিনী সুখে ঘরকন্না শুরু করেছে। তাদের এই মিলনে ফকিরের গান গভীর জীবনপ্রীতিরই দ্যোতক হয়ে উঠেছে। গানটির মধ্য দিয়ে যেমন সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতির সুর বেজেছে, তেমনি সংঘচেতনারও প্রকাশ পরিস্ফুট হয়েছে—যা গণনাট্যেরই লক্ষণাক্রান্ত।

এও এক ধরনের প্রতিরোধী, প্রতিবাদী চেতনারই স্ফুরণ—দুঃখের আঁধার-রাত্রির বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং নতুন যুগের ভোর দেখবার স্বপ্নব্যাকুলতা।

নাটকটির শেষে নবান্ন উৎসবের প্রস্তুতিপর্বে কৃষক রমণীরা কোরাস গেয়েছে; সে-গানে এতদিনের সুপ্ত বাসনা এবং প্রচ্ছন্ন আদিরসের প্রকাশও ঘটেছে।

“নিসলো চেয়ে সামনের হাটে গলার হাঁসুলি

ডুরে শাড়ি পাছাপাড় আর হার সাতনলি।”

গানের শেষে লাল ঝুঁটিওয়ালা মোরগের ছটফটানির মধ্যে দিয়ে প্রতীকী প্রতিবাদের চিত্রও ফুটে উঠেছে; বিজন ভট্টাচার্য ব্যক্তিগত জীবনেও এমনই এক পরিস্থিতি লক্ষ করেছিলেন। সমকালীন যুগযন্ত্রণাও সাধারণ মানুষের আত্মঘাতী মর্মবেদনা বিমূর্ত বিভাব নিয়ে ফিরে এসেছিল তাঁরই চরিত্রে। সাহিত্যের সৌখিন মজদুরি না-করে তিনিও একদিকে যেমন দ্রোহের ছবি এঁকেছেন, অন্যদিকে তেমন আশা, আকাঙ্ক্ষার স্বপ্নবীজ বপনও করেছেন। প্রতিবাদ এবং প্রতিরোধের মধ্য দিয়ে তিনি যেমন সংঘশক্তির জয় কামনা করেছেন, তেমনি নবান্নের সংসারে পুনর্মিলনও সাধিত হয়েছে এই সম্মিলিত প্রতিরোধেরই প্রয়াসে। দুর্ভিক্ষ বা অভাব-অনটন মানুষের জীবনে সাময়িক নিরাশা আনতে পারে ঠিকই, কিন্তু সে নিরাশায় নিমজ্জিত হয়ে থাকা গণনাট্যের বৈশিষ্ট্য নয়। সম্মিলিত জনগণের শক্তি একদিন তার পরাজয় নিশ্চিত করবেই। প্রসঙ্গত, নাটকের শেষ সংলাপটি উল্লেখযোগ্য।

“কিন্তু এ কথাও জেনো প্রধান, যে গতবারের মতো এবার আর আকাল আচম্বিতে এসে আমার চোখের উপর থেকে আমারই পরিজন, আমারই স্বজন, আমারই বন্ধুবান্ধব… ছিনিয়ে নিয়ে যেতে পারবে না।… জোর প্রতিরোধ প্রধান এবার। জোর প্রতিরোধ। জোর প্রতিরোধ।”

সহায়ক গ্রন্থপঞ্জি :

১. নবান্ন: বিজন ভট্টাচার্য, প্রথম দে’জ সংস্করণ, জানুয়ারি ২০০৪।

২. গণনাট্য আন্দোলনের সেকাল ও একাল: প্রবন্ধ, বিজন ভট্টাচার্য, শারদীয় কালান্তর, ১৩৭৪ বঙ্গাব্দ।

৩. বাংলা নাটকের ইতিহাস: ড. অজিতকুমার ঘোষ, দ্বিতীয় সংস্করণ, দে’জ, ২০১০।

৪. দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধকালীন বাংলা নাটক ও নাট্যশালা: সুপ্রভাত চক্রবর্তী, পুস্তক বিপণি, ২০০০।

৫. নাট্যতত্ত্বমীমাংসা: ড. শ্রীসাধনকুমার ভট্টাচার্য, প্রথম প্রকাশ, মে ১৯৬৩, বিদ্যোদয় লাইব্রেরী প্রাইভেট লিমিটেড।

৬. গণনাট্য আন্দোলন: দর্শন চৌধুরী, দ্বিতীয় প্রকাশ, জুন ১৯৯৪, অনুষ্টুপ প্রকাশনী।

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev