আমি পয়মন্তী। এইমাত্র আমার অপারেশন হয়েছে। অপারেশন থিয়েটার থেকে ট্রলি বিছানায় শুইয়ে যে ছেলেগুলো আমাকে নিয়ে আসছিল তাদের ধোঁয়াশার আড়ালে ঢেকে থাকা মুখগুলো আমি দেখছিলাম আর দেখছিলাম কর্পোরেট হাসপাতালের এঁকেবেঁকে যাওয়া করিডোর আর মাথার ওপরের ছুটন্ত সিলিং। ওরা আমাকে কেবিনে এনে ট্রলি বিছানার চাদরশুদ্ধ আমার দেহটাকে শূন্যে তুলে দু’দিকে দোলাতে দোলাতে বিছানায় ফেলে দিল আর অদ্ভুত দক্ষতায় আমার পিঠের নিচ থেকে চাদরটা সরিয়ে নিল। সিস্টার এসে উজ্জ্বল আলোটি নিভিয়ে দিয়ে এসিটা বাড়িয়ে দিয়ে বলল — কেউ এদিকে আসবেন না, পেশেন্টকে কথা বলাবেন না। আমি সব শুনতে পাচ্ছিলাম, তবে কথা বলতে পারছিলাম না।
আমার ঠিক কী হয়েছিল বুঝতে পারছি না। অপারেশন করেছেন যিনি অর্থাৎ সার্জন, অপারেশনের পর আমার কপালে হাত রেখে বললেন — অপারেশন ভালো হয়েছে। — আমার কত কী জিজ্ঞাস্য ছিল কিন্তু ডাক্তারবাবু বললেন — এখন কথা বলবেন না। আপাতত চিকিৎসা ও বিশ্রাম চলুক।
অন্ধকার ও নৈঃশব্দের আলাদা গন্ধ আছে। হাসপাতালে কাজ করে যারা তাদের গায়েও ঝাঁঝালো গন্ধ আছে, তারা নিজেরা হয়ত টের পায় না কিন্তু আমি গন্ধটা পাচ্ছি। তীব্র, ঝাঁঝালো এই গন্ধ আলাদা করে দেওয়া, এই গন্ধের ঘনত্ব জানিয়ে দেয়, যে দিন আজ যাচ্ছে তা আর পাঁচটা দিনের মত নয়।
অপারেশন থিয়েটারের গন্ধ তীব্রতম। ভেতরে যারা আছে ডাক্তার নার্স সহকারিরা, একজন পেশেন্টের চোখে এরা যেন ভিন্নগ্রহের বাসিন্দা, কখনও ঈশ্বর কখনও দেবদূত। অপারেশন থিয়েটারে যখন আমার জ্ঞান ফিরল তখন আমার তাই মনে হচ্ছিল। কিন্তু আমার তো কোনও অসুখ ছিল না। কী হয়েছে আমার?
আমি এখনও ব্যথা জ্বালা কিছুই টের পাচ্ছি না, মনে হচ্ছে অ্যানাসথেসিয়ার প্রভাব এখনও রয়ে গেছে। আমার ঠিক কী হয়েছিল কিছুতেই মনে করতে পারছি না। কেন অপারেশন হয়েছে ভাবছি। শেষ সময়টুকু মনে করতে পারি আমি অফিস থেকে ফিরে বাথরুমে ঢুকতে যাচ্ছিলাম। সেটা ঠিক কবে? তারপর কী হল কী হয়েছিল কিছুতেই মনে পড়ছে না। শুধু হাসপাতালে আমাকে যখন অ্যাম্বুলেন্স করে নিয়ে আসা হচ্ছিল তখন আমার জ্ঞান ফিরেছিল। খুব রক্তক্ষরণ হচ্ছিল আর নিদারুণ যন্ত্রণায় আমি চেতন অচেতনের মাঝখানে ছিলাম।
সময়টা এখন খুব ভারী হয়ে আছে। ঘড়ির টিকটিক শুনতে পাচ্ছি। এভাবে কতক্ষণ গেল কে জানে! আমার চোখ সিলিং, উল্টোদিকের লম্বা সোফা, ঘড়ির আবছা কাঁটা এইসব দেখছিল আর কান করিডরে মৃদু পদশব্দ ও হালকা কথাবার্তা শুনছিল আর একটা সুস্থ সবল স্বাভাবিক দিনের সঙ্গে এই দিনটির তুলনা করছিল। কতক্ষণ কাটল এভাবে জানি না, সিস্টার এসে আলো জ্বালিয়ে দিল।
বলল — এখন খাবেন।
এক কাপ লিকার চা, দুটো বিস্কুট। একটি বাটিতে প্লেন স্যুপ।
সকাল থেকে হয়ত জলবিন্দুও পেটে পড়েনি। ড্রিপ চলছে, তাই নেতিয়ে পড়িনি। এইটুকুনি খুব যত্ন করে খেলাম। সিস্টার খুব যত্ন করেই খাওয়াল। এখন সে আমার ফ্লোরেন্স নাইটেঙ্গল।
২
আমি তমোনাশ। এখন শুয়ে আছি হাসপাতালের সামনের চওড়া বারান্দায়। ঠান্ডা মেঝে, নিচে ম্যাডামের বাড়ি থেকে আনা চাদরটা দিয়েছি। সামনে কিছু ফুলগাছ, মনে হয় বেলফুলের গন্ধ আসছে, হাসপাতালের গন্ধের সঙ্গে বেলফুলের গন্ধ মিলেমিশে গেছে। উপরে তারাগুলো ঝিকমিক করছে। দরজায় দাঁড়ানো সিকিউরিটি গার্ড এখন চেয়ারে বসে ঘাড় কাত করে ঢুলছে। আমার চোখে ঘুম নেই। সারাদিন ছুটোছুটির পরও ঘুম আসছে না। কতদিন থেকে একটা সুস্থির কাজ খুঁজে বেড়াচ্ছি।এখন মনে হচ্ছে সুস্থির কাজ বলে কিছু নেই। যার বাড়িতে এখন কাজে আছি, পয়মন্তী ম্যাডাম, তিনি আজ খুন হতে হতে বেঁচে গেছেন। পুলিশ আমাকে সন্দেহ করছে কিন্তু আমি তখন বাড়ি ছিলাম না।
পয়মন্তী চাকরি করেন এক সরকারি অফিসে। একার জীবন তাঁর। আমি তাঁর বাড়িতে কাজকাম দেখাশোনার লোক কাম দারোয়ান কাম বাজার সরকার কাম তাঁর বডিগার্ড।
আপনারা শুনলে অবাক হয়ে যাবেন আমি কিন্তু এক গ্রাজুয়েট বেকার। এখন আমারও মনে হয় না আমি কলেজে পড়েছিলাম। বোহেমিয়ান জীবনের প্রতি আমার আকর্ষণ ছিল, তার মানে এই নয় যে চাকরির চেষ্টা করিনি। কিন্তু কোনও সুস্থির চাকরি পাই নি।
আমি বাড়ি থেকে পালিয়ে গিয়েছিলাম বছর সাতেক আগে। বাড়ি বলতে একটা অস্থায়ী আস্তানা। দাদার সংসার।
ছোটবেলায় আমার মা মারা যান। বাবাও আমার কলেজ চলাকালীন হঠাৎ নিখোঁজ হন। কেন জানি না, বাবার মনে হয়ত নিগূঢ় কোন দুঃখ ছিল। টানাটানির সংসার ছিল তো! আমার এক দিদি বিয়ের পর পণ যৌতুকের বলি হয়ে আত্মহত্যা করে। আত্মহত্যা না খুন তার কোনও প্রমাণ করা যায়নি। এর কারণও অর্থাভাব। হয়ত সেই দুঃখে বাবা গৃহত্যাগ করেন।
দাদা বৌদিদির সুখের সংসার ছেড়ে চলে আসি। কারণ আমি ওখানে স্বস্তিতে ছিলাম না। দাদারও আর্থিক অবস্থা তেমন কিছু নয়। তবে বৌদিদি নিজের মত করে নিজের সংসার গুছিয়ে নিয়েছে। সেখানে আমি এক উটকো বেকার যুবক অন্নধ্বংস করছি। এভাবে চলতে থাকলে যা যা হয় সংসারে, আমাদেরও তাই তাই হচ্ছিল। তাই সব ছেড়েছুড়ে বেরিয়ে পড়েছিলাম।
একটা জাহাজে চাকরি খুঁজছিলাম, এমনকি খালাসির চাকরিও আমার পছন্দের ছিল। জলে ভেসে বেড়ানোর স্বপ্ন ছোটবেলাতে খুব দেখতাম। তাই জাহাজে চাকরি খুঁজেছিলাম। পাই নি।
মাঝেমাঝে ভাবি স্বপ্ন আমার সফলই হল। সেই ভেসেই বেড়াচ্ছি।
তবে জলে নয়, ডাঙায়।
সমস্যা যেটা হচ্ছিল সেটি হল মাথার ওপর ছাদের অভাব। রেস্তরাঁতে কাজ করেছি, ওখানে মেঝেতে শুয়েছি। হাসপাতালের বয়ের কাজ করেছি, সেখানেও মেঝেতেই শুতে হত।
এরপর সরকারি অফিসের ক্যান্টিন চালানো। ওখানেই আমার বর্তমান মালকিন পয়মন্তী চাকরি করে।
একদিন কথাপ্রসঙ্গে আমার অসুবিধের কথা পয়মন্তীকে বলেছিলাম। ম্যাডাম আমায় প্রস্তাব দিল ওর দেখভাল করতে, বলল আমাকে থাকার জন্যে গোটা একটা ঘর ও একখানা ভালো বিছানা দেবে। তখন আমার প্রাইম স্বপ্ন একটি ঘর ও একটি বিছানা। সুতরাং ক্যান্টিনের কাজ ছেড়ে দিয়ে ম্যাডামের বাড়ি চলে এলাম।
এখানে সব দেখভাল করি। ম্যাডাম আমাকে একটি সুন্দর ঘর ও নরম বিছানা দিয়েছে।
চলে যাচ্ছিল ঠিকঠাক। ইদানিং আমার ভেতর একটা পরিবর্তন টের পাচ্ছিলাম। ম্যাডামের প্রতি একটা আকর্ষণ অনুভব করছিলাম। বলতে দ্বিধা নেই একদিন ম্যাডামকে লুকিয়ে দেখছিলাম। অফিসফেরত ম্যাডাম তখন চেঞ্জ করছিল। দরজাটা খোলা ছিল। ইচ্ছে করেই কিনা কে জানে, ম্যাডাম দরজা খোলা রেখেছিল।
কিছুদিন পর এক ভদ্রলোক এল ম্যাডামের সাথে দেখা করতে। সেদিন রোববার ছিল। লোকটা লাঞ্চ করল ম্যাডামের সঙ্গে গল্প করতে করতে। ওসব গল্পের কোন মাথামুন্ডু নেই। গাঁজাখুরি গল্প করছিল লোকটা। ব্যাঙ, গরিলা, তিমি ওসব নিয়ে অদ্ভুত গল্পের কোলাজ যেন।
আমাকে দেখে জিজ্ঞেস করছিল — ও কে?
ম্যাডাম বলল — সব দেখেশুনে রাখে।
লোকটি চাপাস্বরে বলল — তোমাকেও?
চাপাস্বরে বললেও কথাটা আমার কানে এল।
পয়মন্তী রাগ না করে রহস্যময়ীর মত হাসল।
আমার অস্বস্তি ও রাগ হচ্ছিল। ঈর্ষায় মরে যাচ্ছিলাম আর কেন জানি আবার ফুটপাথে কিংবা রেস্তরাঁর ঠান্ডা মেঝেতে ঘুমোতে ইচ্ছে করছিল। লোকটা বেশ রাতে বেরিয়ে গেল, সারাদুপুর ম্যাডামের শোবার ঘরে দরজা লাগানো ছিল। ম্যাডামের দিকে আমি আর তাকাই নি। কী জানি কেন ঘেন্না করছিল। নরম বিছানাটাকে অন্ধ রাগে তছনছ করছিলাম। কিন্তু এরজন্যে কিন্তু আমি কোনও বদলা নিতে যাইনি। আমি তো বাজার করতে গিয়েছিলাম।
ম্যাডাম অফিস থেকে তাড়াতাড়ি ফিরে এসেছিল। কেন সেটাও জানি না।
সেদিন ঝুমা মানে রান্নার মেয়েটি ছুটি নিয়েছিল হঠাৎই। বলল, তার শাশুড়ির শরীর হঠাৎ খারাপ হয়েছে। পাঁচদিনের ছুটি তার চাই। পয়মন্তী ম্যাডাম ছুটি মঞ্জুর করল।
আমাকে বলল — এই পাঁচদিন রান্নার কাজটা চালিয়ে যেতে হবে তমোনাশ।
মাঝেমাঝে ভাবি তমোনাশ নামটা কেন রাখা হয়েছিল আমার? এই নাম দাঁত খিঁচিয়ে ক্রমাগত ব্যঙ্গ করে গেল আমায়।
বাজার সেরে ফিরে এসে দেখি পয়মন্তী শোবার ঘরের ঠিক মুখে করিডোরে রক্তাক্ত হয়ে পড়ে আছে। ঘরের আলমারিটি খোলা হয়েছিল মনে হয়। ওটা আলতো করে ভেজানো ছিল। পুলিশকে আমিই খবর দিই। এখন পুলিশ আমাকেই সন্দেহ করছে। এখানে কার্যত আমি নজরবন্দি। দুজন পুলিশ পাহারায় আছে যদি আমি পালিয়ে যাই!
আচ্ছা, ঝুমা কেন ছুটি নিল? সত্যিই কি তার শাশুড়ির শরীর খারাপ? নাকি তার পেছনে কোনও রহস্য আছে?
ম্যাডামের ঐ বয়ফ্রেন্ড? কী সম্পর্ক ওর ম্যাডামের সাথে?
এটি আত্মহত্যার কেস? ঐ বন্দুকটা কোথায় ছিল? ম্যাডাম ঘরে কি বন্দুক রেখেছিল? ঐ আলমারিতে?
এসব রহস্যের কোনও উত্তর মিলবে না। যেমন ভাবে আমার দিদির মৃত্যুরহস্যের কোনও সুরাহা হয়নি! আমি জানি, আমাকে এই সময়, এই সমাজ, এই ব্যবস্থা আর বাঁচতেই দেবে না। আত্মহত্যা করার শখ আমার নেই, বেঁচে ওঠার খুব ইচ্ছে আছে।
হয়ত পয়মন্তী ম্যাডামের আত্মহত্যার শখ ছিল। সে সবার যত্নে বেঁচে উঠবে। আর এই তমোনাশের বাঁচতে হবে অদ্ভুত এক পরিচয়ে, সে পরিচয় হয়ত হবে এক আততায়ীর! এমনটা হতেও পারে, আত্মহননে বাধ্য করতে পারে এই সমাজ, এই ব্যবস্থাপনা। অথচ জীবন আমার খুব প্রিয়।
৩
পয়মন্তী আমি। এই নামটি আমার কোনও কালে পছন্দের ছিল না। পয়া, সুলক্ষণযুক্ত। ঠাকুমাসুলভ ব্যাপারস্যাপার।
এখন সিস্টার এসেছে। ড্রিপের গতি রেগুলেট করছে। আমি দেখছিলাম। সিস্টারের চেহারা বেশ কমনীয়।
আমি ধীরে জিজ্ঞেস করলাম — সিস্টার, আমি মনে করতে পারছি না, আমার ঠিক কী হয়েছিল।
—আপনার অনেক রক্ত গেছে। আপনি ঠিক হয়ে উঠুন, তারপর কথা বলবেন। আপনাকে রক্ত দেওয়া হচ্ছে। নিশ্চয়ই সব মনে পড়বে। একটু সময় দিন নিজেকে। মনের ওপর চাপ দেবেন না এখন।
আমি এবার দেখলাম সত্যিই আমায় রক্ত দেওয়া হচ্ছে। মুখোমুখি বেশ বড় টিভি দেয়ালে ঝোলানো। সিস্টার একটু হেসে বলল — টিভি দেখবেন? চালিয়ে দি?
বলে উত্তরের অপেক্ষা না করে হালকা ভল্যুমে একটি বাংলা চ্যানেল চালিয়ে দিল। সিরিয়াল চলছে। শূন্যচোখে তাকিয়ে রইলাম। সিরিয়াল এর চরিত্ররা কথা বলছে। কী বলছে শুনছি না। ওদের সাজগোজ ভঙ্গিমা আমার চোখের ওপর দিয়ে ভেসে ভেসে যাচ্ছিল।
আমার জীবনের চারদিকেই তো শূন্যতা। একটা ভ্যাকুয়াম। না, জীবনকথা ভাবছি না আপাতত। তবে মনে হচ্ছে এখন বুঝি স্মৃতিশক্তিতে সেই ভ্যাকুয়াম থাবা বসিয়েছে। সবকিছুই মনে আছে। শুধু মনে নেই ঠিক আমার কী হয়েছে। ঐ জায়গাটাতে কিছু জমাট আঁধার ঘাপটি মেরে আছে।
সারাটা দিনরাত টিভি, সিস্টার, ইনজেকশন, রক্ত ইত্যাদিতে কেটে গেল, বেশ রাতের দিকে একবার ডাক্তারবাবু এসে দেখে গেলেন, নার্সকে কিছু প্রয়োজনীয় নির্দেশ দিয়ে গেলেন।
আমি জিজ্ঞেস করলাম — আমার কী হয়েছে? মানে আমার ঠিক কী অপারেশন হয়েছে?
ডাক্তারবাবু বললেন — আপনি এখন ঘুমোন। পরে কথা হবে।
ডাক্তারবাবু কথা না বাড়িয়ে চলে গেলেন।
আমি সিস্টারকে ডেকে বললাম — কে আমাকে হাসপাতালে ভর্তি করল বলতে পারবেন?
সিস্টার বলল — সেটা তো আমাদের জানার কথা নয়। ওটা হয়ত রিসেপশন বলতে পারবে। হ্যাঁ, একজন আছে যে মাঝেমাঝে আপনার খোঁজ নিচ্ছে। বিকেলের দিকে এসেছিল আপনি তখন ঘুমোচ্ছিলেন।
—কে? তমোনাশ?
—নামটা তো জিজ্ঞেস করা হয়নি। উনি আপনার কে হন?
—আমার বাড়িতে থাকে। হেল্পার।
—এক কাজ করুন, আপনি ওকে ফোন করে দেখতে পারেন। ও নিশ্চয়ই যা জানতে চাইছেন তা বলতে পারবে। এই নিন আপনার ফোন।
দেখলাম কেবিনের ভেতর একটি কাবার্ডও রয়েছে। সিস্টার ভেতর থেকে ব্যাগ এনে দিল।
বলল — ব্যাগের ভেতর আপনার মোবাইল ফোন। অফ করে রাখা আছে।
ফোন করলাম।
তমোনাশ ফোন তুলল।
বললাম — একটু কেবিনে এসো।
তমোনাশকে দেখে অবাক হয়ে গেলাম। এই একদিনে তার চেহারা এমন হল কী করে! অনিদ্রার ছাপ চোখে মুখে, খোঁচা খোঁচা দাড়ি, মলিন বেশ, ভীরু চাউনি। ইদানিং সে বেশ গুছিয়ে ফিটফাট রাখত নিজেকে।
বললাম — কী হয়েছে তোমার? শরীর খারাপ?
বলল — আপনি ঠিক নেই, আমি কী করে ভালো থাকি! আমি তো আপনার আশ্রিত। খুব চিন্তা হচ্ছে।
আমি এবার জিজ্ঞেস করলাম — আমার ঠিক কি হয়েছে বলতে পারো? কিছুই মনে পড়ছে না।
তমোনাশ ইতস্তত করতে লাগল। অ্যানাসথেসিয়ার প্রকোপ কমে যাওয়ায় এখন আমি যন্ত্রণা অনুভব করছিলাম। যন্ত্রণার তীব্রতা বাড়ছিল।
চাপা রাগত কন্ঠে বললাম — কী হয়েছে আমার সত্যি করে বলো, কারণ আমি কিছুই মনে করতে পারছি না। জানাটা জরুরি।
তমোনাশ অসহায়ের মত ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়ে রইল।
আমি বললাম — তোমাকে আমি মাথার ওপর ছাদ দিয়েছি, থাকার জন্যে নরম বিছানা দিয়েছি, আশা করি তুমি অকৃতজ্ঞ নও।
তমোনাশ কিছু ভাবছিল।
তারপর ধীরে ধীরে বলল — আপনি গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। কিন্তু বিশ্বাস করুন আমি করিনি এ কাজ। বন্দুক আপনার হাতে ছিল, আপনি রক্তাক্ত অবস্থায় শোবার ঘরের দরজায় করিডোরের মুখটায় পড়েছিলেন। আমি বাজার সেরে এসে আপনাকে রক্তাক্ত অবস্থায় পড়ে থাকতে দেখে পুলিশে খবর দিই। এখন পুলিশ আমাকে সন্দেহ করছে। আমি পুলিশের নজরবন্দি আছি।
এর চাইতে আমার রেস্তরাঁ অফিসের বারান্দায় ঘুমোনো অনেক ভালো ছিল।
ওর কথা শেষ হতে না হতেই কয়েকজন পুলিশ অফিসারকে নিয়ে একজন জুনিয়র ডাক্তার ও একজন নার্স এসে ঢুকল।
আমি চমকে উঠলাম।
শুরু হলো জেরা।
তমোনাশের দিকে সন্দেহের তিরটা বারবার যাচ্ছিল, আবার লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়ে ফিরেও আসছিল। ইদানিং তমোনাশ আমার প্রতি দুর্বল হয়ে পড়ছিল, আমি সেটা বুঝতাম। ব্যাপারটা আমার ভালোই লাগত। একদিন আমার সাথে সম্পর্ক টুটে যাওয়া আমার পূর্বতন প্রেমিক ও সহপাঠী রমিত আমার সঙ্গে সারাদিন কাটিয়ে রাতে বাড়ি ফিরেছিল। তমোনাশ ব্যাপারটাকে ভালোভাবে নেয় নি, এটা ঠিক।
তবে কি তমোনাশ?
আমি আলমারিতে একটা পিস্তল রাখতাম। ওটা লোডেড ছিল। ওটা আমার বাবার পিস্তল। বাবা পুলিশ ডিপার্টমেন্টের পদস্থ অফিসার ছিলেন। বছর সাতেক আগে বাবা মারা যান। মাঝেমাঝে আমি ওটাকে মুছে রাখতাম। তমোনাশ কি ওটা দেখেছিল?
তাহলে কি রমিত? ঐদিন রমিতের সামনেই আলমারি খুলেছিলাম। যদিও বন্দুকটা একটু ভেতরের দিকেই থাকত, তবু বলা যায় না হয়ত সেটি ভেতর থেকে উঁকি মারছিল। রমিত আমাকে বলেছিল — ঐ যুবক ছেলেটিকে তুমি রেখেছ। বেশ ভালো। ওকে নানাভাবেই ব্যবহার করতে পারবে। ওর কথায় আমি রাগতস্বরে বলেছিলাম — ছিঃ রমিত ইত্যাদি ইত্যাদি।
আচ্ছা, আমি কি আত্মহত্যা করতে চেয়েছিলাম? মাঝে মাঝে আমার মনে হত বটে — আত্মহত্যা করি। তাই বন্দুকটাকে লোডেড রাখতাম। আত্মহত্যা নিয়ে আমি একসময় অনেক ভেবেছি — মানুষ নিজেকে কখন কেন কোন সময় হত্যা করে। আত্মহত্যা কেউ কারণে করে, কেউ অবচেতন মনের জটিল অবস্থান থেকেও করে, কেউ সামাজিক ভাবে নিজের অস্বস্তিকর অবস্থান থেকেও করে। আমার ক্ষেত্রে ঠিক কী হয়েছিল?
কেউ কি আমাকে আক্রমণ করেছিল, আলমারি কি খোলা ছিল? ওখান থেকে বাবার পিস্তলটা কেউ তুলে নিয়ে আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল? আর কেউ? ঝুমা হঠাৎ ছুটি নিল কেন?
আমার স্মৃতি ঠিক ঐ জায়গাটায় বিশ্বাসঘাতকতা করছে। আশ্চর্য!
এখন পুলিশ অফিসার তমোনাশকে নিয়ে যাবে পুলিশ স্টেশন, তার আগে আমাকে জিজ্ঞাসাবাদ করবে। কিন্তু এই তীব্র যন্ত্রণার দাহে পুড়তে পুড়তে আমি অনুভব করছি — মৃত্যু কিংবা জীবন উভয়ের মাঝেই কোন ফারাক নেই। এই প্রবল আত্মবিশ্বাসী পুলিশ অফিসার যে কোন সময় খুন হতে পারে, মরে যেতে পারে কিংবা তার মধ্যে আত্মহত্যা করার প্রবণতাও জাগতে পারে।
এবার পুলিশ অফিসার এগিয়ে এসে বলল — কেমন ফিল করছেন এখন? কয়েকটি প্রশ্ন করতে পারি?
মাথা নেড়ে বললাম — না। তাতে লাভ হবে না। আমি কিছু মনে করতে পারছি না।
পুলিশ অফিসার যেন আশাহত হল।
বলল — একটু কষ্ট করে মনে করার চেষ্টা করুন ম্যাডাম, ঠিক কী হয়েছিল?
আমি মহাশূন্যে ডুবে যাচ্ছিলাম আর দুর্বহ যন্ত্রণার ভারে নিজের কাছে নিজে অসহ হয়ে উঠছিলাম। শূন্য সাদা দেয়াল ক্রমশ সাদা আরও সাদা হয়ে উঠছিল।
পুলিশ অফিসার একটা শ্বাস ফেলে বললেন — ঠিক আছে, আমরা আগামীকাল আসব, আপাতত আপনি বিশ্রাম নিন। তবে এটা জেনে রাখুন, আপনার কিছু মনে না হলে এই তমোনাশকে পিটিয়ে সব জেনে নিতে পারব। মার খেলে সব গলগল করে বেরিয়ে আসবে।
বিবর্ণ তমোনাশ বিবর্ণতর হল।
সিস্টার ঢুকে একটা ব্যথাহর ইঞ্জেকশন দিয়ে গেল।
অথৈ ঘুম এল। আমি দেখলাম তমোনাশকে ওরা পাকড়াও করে নিয়ে যাচ্ছে। একরাশ সমুদ্রের ঢেউয়ের ঝাপটের মত ঘুমের আবেশ আমাকে জড়িয়ে ধরছিল।
ঘুমিয়ে পড়ার মুহূর্তে ঘুম জড়ানো কণ্ঠে বললাম — অফিসার, তমোনাশকে ছেড়ে দিন। পারলে ওর মাথার ওপর একটি ছাদ ও শোবার জন্যে একটি বিছানার ব্যবস্থা করে দিন। কেউ আমাকে হত্যা করতে চেয়েছিল কিম্বা আমি আত্মহত্যা করতে গিয়েছি দুটোই হতে পারে। কিম্বা কোনওটাই না হতে পারে। বাবার বন্দুকটাকে ঝাঁড়মোছ করতে গিয়ে হয়ত আচমকা ট্রিগারে হাত লেগে গেছে। এতগুলো প্রশ্নচিহ্নের আপনি কি তদন্ত করবেন অফিসার?
অফিসার ঘাড় বাঁকিয়ে বললেন — তদন্ত চলবে। এবার আপনার মোবাইল ফোনটা একটু দেখতে হয়। সিস্টার, ওটা পাওয়া যাবে? আমাদের অপারেশন জারি থাকবে। এর শেষ না দেখে আমরা ছাড়ছি না।
বললাম — অফিসার! শেষ বলে কি সত্যিই কিছু আছে?
বিজয়া দেব, পূর্বাচল রোড নর্থ, কলকাতা -৭০০০৭৮।
An exceptional short story. Beautiful!