পারদচটা আয়নায় মুখটা দেখল সদানন্দ। তারপর মালিকের দেওয়া স্মার্টফোন দিয়ে একখানা সেলফি তুলল। আয়নাতে মুখ আর সেলফিটা মিলিয়ে দেখল। বয়েসটা বেড়েছে সত্যিই। কবে এই দুনিয়ায় এলো সে? আয়না বলে অনেকদিন আর সেলফি বলে ততদিন নয়, কষ্টের চেহারা এটা। ঘর হলো না, বউ আরেক পুরুষের সাথে পালিয়ে গেল। নাহ্ রতিসঙ্গমে তার কোন অসুবিধে নেই। ঘর নেই বলে ছিধরের সাথে চলে গেল, যাবার সময় বলে গেল-
-তোর সাথে আর থাকব না। এতদিনে একটা ঘর হলো না তোর। ছিধরকে দেখ গাঁয়ে একটা পোক্ত ঘর বানিয়েছে। যে মাথার ওপর ছাদ দেবে তার সাথেই থাকব।
মালিককে অনেক বলেছে সদানন্দ — একটা ঘরের ব্যবস্থা করে দেন স্যার। নাহলে রূপসী, আমার বউ আমার সাথে থাকতে চাইছে না। ও ছিধরের সাথে পালাবে।
মালিক একটা পুরনো স্মার্টফোন দিয়ে বলল — বউকে এটা দিয়ে দে। খুশি হয়ে সেলফি তুলবে। ফোন করবে। ঘর কি সহজে হয়? ধৈর্য ধরতে হবে।
স্মার্টফোন নিয়ে ঝোপড়িতে ফিরে আর রূপসীকে পেল না সদা। রূপসী চলে গেছে ততক্ষণে। পাশের ঝোপড়িতে বলে গেছে — সদা এলে বলিস আমি ছিধরের সাথে চলে গেছি। ও যেন আরেকটা বিয়ে করে নেয়। আমার ঘর চাই, সাফ কথা।
আয়নাতে আজ সকালে খুব যত্ন করে চুল বাঁধছিল রূপসী। পেছনে সদানন্দের ছায়া পড়তেই মুখঝামটা দিয়েছিল মেয়েটা।
—সরে দাঁড়াও। তবে দাঁড়াবেই কোথায়! ঝোপড়িতে কী আর দাঁড়াবার জায়গা আছে!
আয়না যেন ইশারায় বলেছিল — ভাবিস না, এরপর শুধু আমি আর তুই।
বউ চলে যাবারই ছিল, একদিক দিয়ে ভালোই হলো। দূর ছাই করার কেউ রইল না আর। আয়নাতে মুখ দেখে সদানন্দ, কেমন লাগছে? গোবেচারা? অসহায়? এবার সে সেলফি তোলে, সেলফি তোলার সময় একটা হাসি ঝোলাতে হয়, জানে সে। হাসি দেখে আর ভাবে কেমন লাগছে? গোবেচারা? অসহায়?
এখন ঐ প্লাস্টিক ব্যাগ তৈরি করার কারখানায় কাজ, দীনু রায়ের চায়ের দোকানে আড্ডা, দোকানের বারান্দায় গরম রুটি তড়কা বিক্রি করে যে বউটা ঐ মালতীর সাথে- মিতে পাতানো, লুকিয়ে চুরিয়ে মালতীর ভরা যৌবন চোখ দিয়ে দেখা আর ভরাট গলায় গান শোনানো এভাবে কাটছিল বেশ। এরই মাঝে এলো করোনা ভাইরাসের দ্বিতীয় ঢেউ। মানুষ মরছে। ভয় নিয়ে এলো সাথে। মরে যাওয়ার বাড়া সে ভয়। সে খিদের ভয়, আবার লকডাউনের ভয়। আয়না বলে — সাবধান সাবধান! সেলফির হাসি বলে — এখন ভালো তো সব ভালো। আরেকটু চওড়া হাসি হাসো সদা।
তার প্লাস্টিক কারখানার মালিকের তরতাজা যুবক ছেলেটি মারা গেল। মালিকের বউ পাগল পাগল। উল্টোপাল্টা বকছে। এরপর লকডাউন। কারখানা বন্ধ। বিপদ তো বটেই। আগের বার মালিক খানিকটা সদয় ছিল। এবার পুত্রশোকে ও বউয়ের এই অবস্থায় সে— ও আগের মানুষটা নেই। যা কিছু জমানো পয়সাকড়ি আছে তা ফুরোতে কতক্ষণ! খুঁড়িয়ে খুঁড়িয়ে ক-টা দিন গেল।
আয়নাতে নিজের প্রতিচ্ছায়ার পেছনে আরেকটা প্রতিচ্ছায়া — ফিসফাস করে। বলে — বড় বিপদ, বড় বিপদ! বিপদ তো বটেই, সকাল সাতটা থেকে ন-টা অব্দি দু’ঘণ্টার জন্যে মুদি দোকানগুলো খোলে। দীনুদার চায়ের দোকান বন্ধ, যথারীতি মালতীর রুটির দোকানও নেই। ক-টা টাকা সম্বল। শুধু খিদে তেষ্টা মেটানোর জন্যেই কি আর বেঁচে থাকা যায়! একটুকরো সাবান চাই পরনের কাপড় ছিঁড়ে গেলে কাপড় চাই। একেই চট পলিথিনের শিটের ঝোপড়ি, মাঝেমাঝে তা ঝড়ে উড়ছে কখনও, কখনও কর্পোরেশনের ষন্ডামার্কা গাড়ি থেকে নামছে ক্রেন, তাসের ঘরের মতো উড়ে যাচ্ছে ঝোপড়ি। তবু দিনে চারপাঁচটা সেলফি তোলে সদা। সেলফি তাকে হাসতে বলে, সদা হাসে।
আজ বুঝি উপোস দিতে হবে, টাকাপয়সা যা ছিল ফুরিয়েছে। আয়নাতে নিজের প্রতিচ্ছবির পেছনে প্রতিচ্ছায়াটি তাকে আজ আর কোনও ইঙ্গিত দিল না, সেলফি তোলার সময় তাকে কেউ বলল না — একটু হাসো। সে শুধু টের পেল খিদে। একটা আগ্রাসী খিদে তার পাকস্থলী থেকে বেরিয়ে তার হাত পা মগজ সব সবকিছুকে পাকিয়ে পাকিয়ে জড়িয়ে ধরেছে। কিছু নেই কোত্থাও, সুনীল আকাশ, গনগনে রোদ, দূর আকাশে উড়ন্ত চিল আর আগ্রাসী খিদে। পেছনের গাছ থেকে একটা কাক বিষ্ঠাত্যাগ করল তার মাথায়, একটা দুরন্ত রাগ চনমনিয়ে উঠল মগজে। পথ থেকে নুড়ি কুড়িয়ে সে ছুঁড়ে মারল গাছটির দিকে, কোথায় কাক! সে ততক্ষণে উড়ে গেছে। এর পরিবর্তে ভিক্ষেবুড়ি খনখনে গলায় হাতে একটা বঁটি নিয়ে নিজের ঝোপড়ি থেকে বেরিয়ে এল।
—কে রে?
সদা চটপট বলে — পালিয়েছে।
—কোন্ ছ্যামড়া? পথে তো লোক দেখি না।
—পালিয়েছে সে। দেখবে কী করে?
—হুঁ! আরেকটু হলে মরেই যেতাম। কানের পাশ দিয়ে গেল।
—আয়ু আছে গো বুড়িমা, রাখে কেষ্ট মারে কে!
একটা অ্যাম্বুলেন্স গেল। তীব্র হুটারের শব্দ দুপুরের ঝিমুনিকে ঝাঁকুনি দিয়ে গেল। কে যায়? ফিরবে তো আবার? কেউ জানে না।
—ও বুড়িমা? আজ খাব কি? ঘরে চাট্টি মুড়ি ছিল, তাই চিবিয়েছি সকালে। পয়সাকড়িও ফুরিয়েছে।
—ইদিকে এসো।
—কী বললে? আসব?
—হ্যাঁ হ্যাঁ।
ভিক্ষেবুড়ির ঝোপড়ি দিব্যি গোছানো।
বলে — আমরা মেয়েমানুষ তো, বিপদের জন্যে সবসময় কিছু কিছু জমিয়ে রাখি। পেট ভরে খাই না। রোজ যদি অল্প অল্প জোটে তাহলে তো হয়েই যায়। কী বলো? ভিক্ষের অন্ন, খাবে তো?
সদার পেট খিদের সাগর। খাবে না মানে?
—দাও গো মা, যা আছে তাই দাও, তবে তোমারটা রেখে….
—মা ডেকেছ? তবে চলো আজ মায়ে পোয়ে খাই।
পাঁচমিশালি চালের ভাত আর শাকভাজা — খিদের মুখে তাই যেন অমৃত।
—কলমিশাক কোথা থেকে জোগাড় করলে মা?
পরাণের ঝোপড়ির পেছনে পুকুরটা -তুলতে আর পারলাম কোথায়-একেবারে কাড়াকাড়ি। পরাণের বউ মালতী খানিকটা হাতে গুঁজে দিল। নাহলে পাই? মেয়েটার খুব কষ্ট। লাথিঝাঁটা খেয়ে বেঁচে আছে রে। পরাণ মারে, শাশুড়িও মারে। ছেলেপুলে বিয়োতে পারে নি, তাই রাগ। লকডাউনে রুটির দোকান বন্ধ, মারপিট ওদের বেড়ে গেছে। পরাণ নাকি আরেকটা বউ আনবে। খেতে পায় না, শখ কত! হ্যাঁ, বিকেলে নিজের খাবার নিজে জোটাবে। আমার চাল বাড়ন্ত। ভিক্ষে কোথায় পাবো! লকডাউন না কী — সব বন্ধ, মাস্ক একটা জোগাড় করে দিয়েছিল ঐ মালতী গতবছর, ছেঁড়াফাটা হয়ে গেছে।
—আর বাঁচতে ইচ্ছে করে না মা। কত বয়েস হলো আমার তাই জানি না।
—ঘরে একখান আয়না রাখবি, তাতে রোজ মুখ দেখবি, আয়না বলে দেবে দিন না রাত, মনটা খুশি না কি ভেতরটা পুড়ছে। ঘরে আয়না আছে?
—সে একখান আছে। তা তোমার আয়না কোথায়?
-ধুর আমার আয়না দিয়ে কী হবে? যখন আমি ভিক্ষেবুড়ি হলাম — তার আগে একখান ছিল — খুব যত্ন করতাম, ধুলোবালি জমতে দিতাম না, শাড়ির আঁচল দিয়ে মুছতাম-আমি যখন আয়নায় দাঁড়াতাম আমার পেছনে আরেকটা ছায়া পড়ত, আমার সোয়ামী। খুব ভালবাসত, বলত — তুই খুব সুন্দর রে কচি।
—তোমার নাম কচি? সোয়ামীটার কী হলো? মরে গেল না কি তোমাকে ছেড়ে চলে গেল?
—না না ছেড়ে গেল এক্কেবারে। ট্রাকের নিচে পড়ে….
—আহা! থাক থাক ওসব কথা।
—তারপর কত কষ্ট। কাজ করেছি মারধর খেয়েছি।আরও কত কী। মেয়েমানুষের দেহটাও এক কাল… সাতঘাটের জল খেয়ে তারপর এই ভিক্ষেবুড়ি।
—কত বয়েস হলো তোমার?
—ধুর আমার আবার বয়েস! ওর গাছপাথর নেই। আমি মরলে আরেকটা ভিক্ষেবুড়ি, সে মরলে আরেকটা ভিক্ষেবুড়ি — এইরকম আর কি! ভিক্ষেবুড়ি ফোকলা হাসে। কেমন মা মা লাগে সদার।
—ঐ মালতীকে তুই ঘরে তুলে নে। বেঁচে যাবে মেয়েটা।
অন্যসময় হলে খুশি হত সদা কথাটা শুনে। এখন বড় অসময়। সদার কোনও প্রতিক্রিয়া হয় না। বলে — আগে তো নিজে বাঁচি, তারপর অন্য সব।
ভিক্ষেবুড়ি বলে — তা ঠিক। রোগবালাই কমে যাবার পর যদি প্রাণে বাঁচিস তবে আমার কথাটা ভেবে দেখিস।
আধপেটা খেয়ে কী হয়! এরকম সময়ে ট্রাক বোঝাই হয়ে কারখানায় কাঁচামাল আসে। সে আনলোড করে, তারপর ক্যান্টিনে রুটি সবজি খেয়ে ফেরা।দীনুদার দোকান… মালতীর সুডৌল যৌবন, রুটি সেঁকতে সেঁকতে মালতী বলে”ও মিতে একখান গান শোনাও, সেই যে গো মাঝির গান”… গ্যাসের উনুনের আলোয় মালতীর চোখে মুখে আগুন খেলে…
ফের খিদে.. সেই হাত পা অবশ.. দেহ জোর হারিয়ে ফেলছে… আকাশে গোলগাল চাঁদ… দেহের কলকব্জাগুলো ঝিমিয়ে পড়ছে। লকডাউন শুরু হলেই শালা পেটেরও লকডাউন শুরু হয়ে যায়।” “লকডাউন” নামটা কেউ কোনদিন শুনেছে? “করোনা ভাইরাস” নাম শুনেছে? পারদচটা আয়নায় মুখ দেখে সে আবার — উঁহু, আয়না কথা বলে না। একখানা সেলফি তোলে, উঁহু হাসি নেই।
চাঁদের আলোয় থুপথুপ করে হাঁটে সদা। আকাশে চাঁদ কী ঝলমলে। পরিষ্কার চাঁদ। তার ভেতরের ছায়াগুলো দেখা যাচ্ছে। দীনুদার বাড়ি যাবে? খাবার চাইবে? এ-ও তো ভিক্ষে চাওয়াই হলো। এখন আবার কারো বাড়ি যাওয়া বারণ। দীনুদাকে একটা ফোন করবে? সে নাহয় বাইরে দাঁড়াল। দুখানা রুটি আর একথাবা সবজি — খেলে আবার দেহের কলকব্জাগুলো সতেজ হয়ে উঠবে। আবার আয়না কথা বলবে। সেলফি হাসবে।আজ যদি জোটে যায়, তাহলে কাল কারখানা মালিকের বাড়ি যাবে সদা। গিয়ে বলবে কিছু টাকা ধার দাও মালিক। বাঁচতে তো হবে। কারখানা খুলে গেলে বাড়তি ডিউটি দিয়ে পুষিয়ে দেব। আচ্ছা এখন দীনুদাকে একটা ফোন করে দেখা যাক। ফোন করতে গিয়ে দেখে ফোনে টাকা নেই। রিচার্জ করতে হবে। যাহ্ শালা! সোজা চলে যাবে দীনুদার বাড়ি? ঢুকতে কি দেবে? টলোমলো পায়ে হাঁটছে সদা। মিতে মালতীর ঝোপড়ির সামনে এসে সে দাঁড়িয়ে পড়ল। একটা অকথ্য চেঁচামেচি চলছে। হঠাৎই ঝোপড়ির ভেতর থেকে একটা দেহ ছিটকে তার পায়ের কাছে এসে পড়ল। মালতী না?
—মিতা ও মিতা? দেহ কথা বলে না। সদা উবু হয়ে পাশে বসে। রক্তে ভেসে যাচ্ছে পথ, মালতীর মুখমাথা রক্তে মাখামাখি।
পকেট থেকে স্মার্ট ফোন বের করে সদানন্দ। মালতীর পাশে শুয়ে জোছনার আলোয় নাইটমুড দিয়ে একখানা জুৎসই সেলফি তোলে।