আজ এমন এক নাটককারের জন্মদিন যিনি মাত্র ন’দিনে লিখেছিলেন ‘নবান্ন’। প্রগতি লেখক সংঘে সেই নাটক পড়া হয়। শুনে মানিক বন্দ্যোপাধ্যায় বিজনকে বললেন, ‘আপনি তো জাত চাষা’। বিজন ভট্টাচার্য নিজের জবানিতেই বলেছিলেন— “আমি তখন কমিউনিস্ট পার্টির সভ্য। অগস্ট আন্দোলনকে স্বাগত জানানো নিয়ে গোলমাল বাধল। এর অল্প পরে আমি আনন্দবাজারের কাজ ছেড়ে পার্টি হোলটাইমার হই। আট থেকে নয় ঘণ্টা রোজ রিহার্সাল হত ‘নবান্ন’ হ্যারিসন রোড পার্টি কমিউনে, পিপলস ক্লিনিকে, পার্টি অফিসে, ৪৬ ধর্মতলা স্ট্রিটে। প্রথম সাতটি অভিনয় হয় শ্রীরঙ্গমে।… আমরা নানা জায়গায় ‘নবান্ন’ নিয়ে যাই। আমাদের নীতি ছিল, আমরা পার্টির কথা বলব না। দেশের দশের কথা বলব। আমাদের কাজ জমি তৈরি করা, তোমরা বীজ বুনবে। আমরা মানুষকে তৈরি করতে চেয়েছিলাম ‘হিউম্যানিস্ট’ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে”।
ঋত্বিক ঘটকের কথায়- হটাৎ একটা প্রচণ্ড আলোড়ন বাংলার এক প্রান্ত থেকে আর এক প্রান্তকে বিদ্যুৎস্পৃষ্টবৎ শিহরিত করে তুললো। সেই বিদ্যুৎশিখার নাম ‘নবান্ন’। পৃথিবীর ইতিহাসে কোনও নাটকের দ্বারা সামাজিক বিপর্যয়ের জন্য দায়ী ক্ষমতাসীন সরকারের মুখোস খুলে গিয়েছে এমন উদাহরণ নবান্ন ছাড়া আর নেই। সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের বিশ্লেষণ- কেবলমাত্র সময়ের দাবি মিটিয়েই কি একটি নতুন যুগের হোতা হওয়া সম্ভব? বিজন ভট্টাচার্য না থাকলে আইপিটিএ তো বটেই, ‘বহুরপী’ও জন্ম নিত না।
গণনাট্য সংঘের শুরু থেকেই তিনি ছিলেন। কমিউনিস্ট পার্টির হোলটাইমার হওয়ার আগেই লিখেছিলেন ‘আগুন’। নাটকটির প্রযোজনা বেশ ভালভাবে উতরোলে রচনা করেন ‘জবানবন্দী’। তারপর ‘নবান্ন’। ১৯৭৬ সালে অ্যাকাডেমি পুরস্কার লাভের সময় বিজন ভট্টাচার্য বলেছিলে, তিনি যদি কমিউনিস্ট পার্টির হয়ে কাজ না করতেন এবং ৪৪-এর মন্বন্তর না দেখতেন, তা হলে তিনি ‘নবান্ন’ লিখতে পারতেন না।
কিন্তু দৃষ্টিভঙ্গিগত মতবিরোধ বাড়তে থাকায় তিনি ১৯৪৬ সালে গণনাট্য সংঘ ছেড়ে বেরিয়ে যান। ১৯৫০ সালে গড়ে তোলেন নিজস্ব নাট্য সংস্থা ‘ক্যালকাটা থিয়েটার’। দীর্ঘ ২০ বছর ধরে তিনি রচনা ও প্রযোজনা করেন ‘গোত্রান্তর’ (১৯৫৭), ছায়াপথ (১৯৬১), ‘দেবীগর্জন’ (১৯৬৬), ‘গর্ভবতী জননী’ (১৯৬৭) ইত্যাদি নাটক। ১৯৭০ সালে ক্যালকাটা থিয়েটার থেকে বেরিয়ে এসে তিনি গঠন করলেন নতুন নাট্যদল ‘কবচকুণ্ডল’। প্রযোজনা করলেন ‘আজ বসন্ত (১৯৭০), ‘চলো সাগরে’ (১৯৭৭) ইত্যাদি নাটক।
পরবর্তীতে তাঁর নাটক কদাচিৎ অভিনীত হয়েছে। হয়নি বললেও ভুল বলা হয় না। শুধু কি তাই, তাঁর হাতে গড়া দুটি দল ছাড়া আর কোনও দল কিংবা গ্রুপ থিয়েটার তার কোনও রচনা প্রযোজনা করেছে বলে তো মনে পড়ে না। এমনকী গণনাট্য সঙ্ঘ ‘নবান্ন’-র পরে তাঁর অন্য নাটক নিয়ে উৎসাহ দেখিয়েছে কি?
তার মানে নবান্ন পরবর্তী বিজন ভট্টাচার্যের নাটকগুলি কেবলমাত্র তার নিজের উদ্যোগে তাঁরই গড়া দলের প্রযোজনায় আটকা পড়ে রইল। তাও এক-দু বারের বেশি নয়। অবশ্যই সব নাটকগুলি নয়। ‘জননেতা’, ‘জতুগৃহ’, ‘অবরোধ’ তো কোনওদিন অভিনীত হয়নি কেউ প্রযোজনার কথা ভাবেওনি। একদিন গণনাট্য ছাড়তে যেমন বাধ্য হয়েছিলেন তেমনই তাঁর নিজের হাতে তৈরি নাট্যদল ক্যালকাটা থিয়েটারও তাঁকে ছাড়তে হয়েছিল।
কুমার রায় বহুরূপীতে ‘নবান্ন’ প্রযোজনা করেছিলেন। কয়েক বছর আগে একটি নাট্য দল ‘মরা চাঁদ’ প্রযোজনা করেছিল। এ ধরণের বিচ্ছিন্ন প্রয়াস ছাড়া কলকাতার বড় নাট্যদল বা ছোট, মেজ কোনও নাট্যব্যক্তিত্ব তাঁর নাটক নিয়ে ভেবেছেন এ কথা বলা যাবে না।

বিজন ভট্টাচার্য, মহাশ্বেতা দেবী, নবারুন ভট্টাচার্য
এর কারন কি তার নাটক সময়ের খড়ি টানা গণ্ডীতে আটকা? মানে দেশভাগ, দুর্ভিক্ষ, মন্বন্তর, অনাহার, মৃত্যু মিছিল, শ্রেণি সংগ্রাম, শ্রমিক, কৃষক… হ্যা এটা ঘটনা যে তাঁর নাটক সময়ের সঙ্গে খুব বেশি মাত্রায় জুড়ে রয়েছে। তবে কি সময় এতটাই বদলে গিয়েছে যে তাঁর নাটকগুলির গায়ে শ্যাওলা ধরেছে?
যাই হোক না কেন শেষরক্ষা হয় নি। বিজন ভট্টাচার্য যতটা আলোচিত ছিলেন মৃত্যুর পর তিনি আর তাঁর নাটক ততটাই বিস্মৃতির আড়ালে রয়ে গেলেন। কেন? আসলে জীবনযাপন আর নাট্যদর্শনকে কোনওদিন আলাদা না করতে পারার প্র্যাকটিক্যাল বুদ্ধির অভাব। সেই বুদ্ধির অভাবেই নাটকের অভিনয় শেষ হয়ে যাওয়ার পর সকলে যখন মেক আপ, জামা কাপড় পাল্টাচ্ছে বিজন ভট্টাচার্য তখন হঠাৎ হাউ হাউ করে কাঁদছেন আর বলছেন— আমরা তো নাটকে ইন্টারন্যাশনাল গাইছি। কিন্তু কবে তা আমাদের দেশের শ্রমিক কৃষক মেহনতি মানুষ স্বতঃস্ফূর্ত হয়ে গাইবে? জীবিত আমরাই কি কেবল গেয়ে যাব?
বাস্তব্বুদ্ধিহীন বিজন ভট্টাচার্য নাটককে কেবল একটা ‘পারফর্ম্যান্স’ হিসেবে দেখতে শিখে ওঠেন নি। শিল্প বলতে বুঝতেন সমাজ বদলের হাতিয়ার। থিয়েটারকে বুঝতেন গণের নাটক। যা কেবল সাধারণ মানুষের ভাল-মন্দ-দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কথা বলবে না। নাটকের মধ্য দিয়ে মানুষও হয়ে উঠবেন সেই গল্পের এক-একজন কুশীলব। দর্শক এবং রঙ্গকর্মী সকলে একত্রে ঢুকে পড়বেন থিয়েটারের অঙ্গনে।
৭৮ সালে মুক্তমঞ্চে নাটক চলাকালীন যখন পায়ে পেরেক ফুটে গিয়েছিল, তিনি অভিনয় বন্ধ করেননি। দুই সিনের মাঝখানে পা থেকে পেরেকটা বারও করতে পারেননি। রক্তাক্ত পায়ে শেষ হয় শেষ অভিনয়। রাতে বাড়ি ফিরে রক্ত বমি। পরদিন মৃত্যু।
মর্মস্পর্শী
শ্রদ্ধা।
অনেক ধন্যবাদ এমন একটা লেখার জন্য।
মদন দাস
নিজের কাছে নিজে সৎ হয়ে ওঠার প্রাণপণ লড়াই
করার প্রতিভা ছিল বলেই নিজের অবস্থানে শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত অবিচল মানুষটাই বলে গিয়েছিলেন ” আমরা পার্টির কথা বলব না,দেশ দশের কথা বলব,— কাজ হচ্ছে মানুষ তৈরি করতে চেয়েছিলাম
‘ হিউম্যানিস্ট ‘ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে”
আর সবার কথা, একমাত্র ঋত্বিকের জবান ছাড়া,
দলগন্ধী উদ্গার মাত্র
শ্রদ্ধা