নদিয়া জেলা তথা বাংলার সুসন্তান বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় ছিলেন বহুবিধ প্রতিভার অধিকারী। তিনি কবি, প্রাবন্ধিক, স্বাধীনতা সংগ্রামী, সম্পাদক, সাংবাদিক হওয়ার পাশাপাশি একজন গ্রাম সংগঠক ও সমাজ সংস্কারক হিসেবেও বিশেষভাবে স্মরণীয়। ২০২৩-এর সেপ্টেম্বরে প্রায় নিরবে বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের ১২৫তম জন্মবর্ষ অতিক্রম করল। কিন্তু এহেন মহতী ব্যক্তিকে ঘিরে যে ধরনের উন্মাদনা কাঙ্খিত, তার খুব বেশি যেন চোখে পরলো না। তাঁর জন্মভূমি ও কর্মস্থলের ক্ষেত্রে তো বটেই, সমগ্র বাংলার ক্ষেত্রে কথাটি যেন আরও বেশি প্রযোজ্য। বিজয়লালকে বিস্মৃত করে রাখা বা তাঁকে শ্রদ্ধা-স্মরণ করার ক্ষেত্রে এমন অনীহা আগামী প্রজন্মের কাছে মোটেই ভালো বার্তা দেবে না।
বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের জীবন ও কর্ম সম্পর্কে সবিস্তারে কিছু কথা জেনে নেওয়া যাক। ১৮৯৯ খ্রিস্টাব্দের ৯ সেপ্টেম্বর নদিয়া জেলার সদর শহর কৃষ্ণনগরে বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের জন্ম। তাঁর পিতা কিশোরীলাল চট্টোপাধ্যায় ও মাতা কিরণময়ী দেবী। বিজয়লাল তাঁদের পরিবারের জ্যেষ্ঠ পুত্র। বিজয়লাল ১৯১৭ খ্রিস্টাব্দে কৃষ্ণনগরের সি. এম. এস. সেন্ট জনস্ হাই স্কুল থেকে প্রবেশিকা পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হন। তিনি সেযুগে বাংলার অন্যতম উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান কৃষ্ণনগর কলেজের (বর্তমান নাম কৃষ্ণনগর গভর্নমেন্ট কলেজ) শিক্ষার্থী ছিলেন। তবে ১৯২০ খ্রিস্টাব্দে কৃষ্ণনগর কলেজে বি.এ. পড়ার সময় গান্ধিজির আহ্বানে তিনি কলেজ ত্যাগ করেন এবং দেশজোড়া অহিংস অসহযোগ আন্দোলনে সক্রিয়ভাবে যুক্ত হন। তিনি মহাত্মা গান্ধির সমাজ ভাবনা, রাজনৈতিক দর্শন দ্বারা বিশেষভাবে প্রভাবিত হয়েছিলেন। অসহযোগ আন্দোলনের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে যুক্ত হয়ে যাওয়ায় বিজয়লাল সে সময় গৃহত্যাগ পর্যন্ত করেছিলেন। গান্ধিজির অনুপ্রেরণায় ১৯২১-১৯২২ খ্রিস্টাব্দে তিনি অবিভক্ত নদিয়ার গ্রামে গ্রামে ঘুরে স্বরাজের আদর্শ প্রচার করেছিলেন এবং অসহযোগের বার্তা চতুর্দিকে ছড়িয়ে দিয়েছিলেন। ব্রিটিশ সরকার বিরোধী এ ধরনের কার্যকলাপের জন্য অসহযোগ আন্দোলনকালে তাঁকে কারাবরণও করতে হয়েছিল। ১৯২২ খ্রিস্টাব্দে বিজয়লাল সত্যাগ্রহীদের পথনির্দেশক প্রবন্ধ পুস্তক ‘স্বরাজ সাধন’ রচনা করেন। উল্লেখ্য, ব্রিটিশ সরকার এই গ্রন্থটি নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেছিলেন।
১৯২৬ ও ১৯২৭ খ্রিস্টাব্দে ব্রিটিশ বিরোধী কর্মকাণ্ডে জড়িত থাকার অভিযোগে বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়কে একাধিকবার ব্রিটিশ কারাগারে বন্দী থাকতে হয়। এই সময়কালে বহরমপুর জেলে তিনি কিছুদিন কাজি নজরুল ইসলামেরও কারাসঙ্গী ছিলেন। বিজয়লাল রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বিশেষ অনুগামী ছিলেন। কবিগুরুর সঙ্গে তাঁর একাধিকবার পত্রবিনিময় হয়েছিল বলে জানা যায়। ১৯২৭-১৯২৮ খ্রিস্টাব্দ নাগাদ তিনি রবীন্দ্রনাথের সান্নিধ্যলাভ করেছিলেন এবং রবীন্দ্রনাথের আহ্বানে শান্তিনিকেতনে কিছুকাল সমহিমায় শিক্ষকতা করেন। ১৯২৬ খ্রিস্টাব্দে তাঁর ‘বন্দীর উক্তি’ প্রকাশ পায়, যা ছিল প্রথম কারাবাসের প্রাক্কালে আদালতে তাঁর জবানবন্দী।
১৯২৮-২৯ খ্রিস্টাব্দে বিজয়লালের অতি উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ ‘সব-হারাদের গান’-এর প্রথম সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে এই কাব্যগ্রন্থের পরিবর্ধিত দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে তাঁর ‘ডমরু’ কাব্যগ্রন্থটি প্রকাশ পায়। এটি ছিল উদ্দীপক কবিতা সংকলন, যেখানে রবীন্দ্রনাথের চারটি, সত্যেন্দ্রনাথ দত্তের দুটি, নজরুল ইসলামের দুটি এবং বিজয়লালের চারটি কবিতা ছিল। এই পুস্তিকাটি তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়েছিল। একই বছর তাঁর রাজনৈতিক প্রবন্ধ সংকলন ‘কালের ভেরী’ প্রকাশ পায়। এটিও ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়। ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে বিজয়লালের প্রবন্ধ পুস্তক ‘বিদ্রোহীর স্বপ্ন’ প্রকাশিত হয়। ক্যাথলিক চার্চ মিশন কর্তৃক প্রকাশিত বিজয়লালের একটি পুস্তিকা হলো ‘খ্রীষ্টকে নিবেদিত একগুচ্ছ কবিতার সংকলন’।

১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় নদিয়া জেলা কংগ্রেসের সভাপতিরূপে গান্ধিজির ডাকা সর্বভারতীয় আইন অমান্য আন্দোলনে যোগদান করেন। সেই সময়েও ব্রিটিশ বিরোধী কর্মকাণ্ডে লিপ্ত হওয়ার জন্য তাঁকে কারাবরণ করতে হয়েছিল। ১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে তাঁর ‘বিদ্রোহী রবীন্দ্রনাথ’ গ্রন্থটি প্রকাশ পায়। এটি ছিল রবীন্দ্রসাহিত্য আলোচনামূলক একটি প্রবন্ধ সংকলন। গ্রন্থটি তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার নিষিদ্ধ বলে ঘোষণা করেছিল। রবীন্দ্রসাহিত্য আলোচনা ও বিশ্লেষণমূলক তাঁর আরও তিনটি বই পরবর্তীকালে প্রকাশিত হয়েছিল। এগুলি হলো— ১৯৩৬ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘রিয়ালিস্ট রবীন্দ্রনাথ’, যেটি ছিল রবীন্দ্রসাহিত্যে মনস্তত্ত্ব-আলোচক প্রবন্ধ সংকলন। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়েছিল তাঁর ‘রবীন্দ্র সাহিত্যে পল্লীচিত্র’ গ্রন্থটি। আর ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দে তাঁর ‘রবিতীর্থে’ গ্রন্থটি প্রকাশিত হয়। এই গ্রন্থটি বিজয়লাল তাঁর বিশ্বস্ত বন্ধু অধ্যাপক রেজাউল করিমকে উৎসর্গ করেছিলেন। বিজয়লালের প্রয়াণের পর শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগারের উদ্যোগে কবি বিজয়লাল স্মৃতিরক্ষা উপসমিতি বিজয়লালের রবীন্দ্রসাহিত্য বিষয়ক এই চারটি গ্রন্থ একসঙ্গে করে ‘রবীন্দ্রনাথ’ (১৯৯১ খ্রি.) নামে একটি সংকলন প্রকাশ করে।
এভাবেই দেশ মাতৃকার সেবায় তিনি পুরোপুরি নিয়োজিত হয়েছিলেন। ১৯৩২ খ্রিস্টাব্দে বিজয়লাল নিজগৃহে অন্তরীণ থাকাকালে গোপনে কৃষ্ণনগর ত্যাগ করেন। এরপর তিনি আত্মগোপন ক’রে গ্রামবাংলার মানুষদের মধ্যে স্বদেশের মুক্তির জন্য প্রচারকার্য চালান। এই সময় তিনি আরেকবার গ্রেফতার হন এবং তাঁকে কারাবরণ করতে হয়। ১৯৩৩ খ্রিস্টাব্দে বিজয়লালের বিবাহ হয় ইলা দেবীর সঙ্গে। ইলা দেবী ছিলেন পণ্ডিত প্রিয়নাথ দাশগুপ্তের কন্যা এবং বিপ্লবী শৈলেন দাশগুপ্ত (রুণু)-র বোন। বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় মনস্তত্ত্ববিষয়ক বেশ কিছু পুস্তকও রচনা করেছিলেন। ১৯৩৪ খ্রিস্টাব্দে মনস্তত্ত্ব বিশ্লেষক তাঁর প্রবন্ধ পুস্তক ‘মনের খেলা’ প্রকাশিত হয়। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে তাঁর মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে আলোচনা পুস্তক ‘মনের গভীরে’ প্রকাশ পায়। এটি তিনি বিপ্লবী হেমন্তকুমার সরকারকে উৎসর্গ করেছিলেন। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে মনস্তত্ত্ব বিষয়ক ছয়টি প্রবন্ধের সংকলন ‘স্বর্গের ঠিকানা’ প্রকাশিত হয়। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে যৌন মনস্তত্ত্ব সম্পর্কে তাঁর আলোচনা পুস্তক ‘হ্যাভেলক এলিস্ ও যৌন বিজ্ঞান’ প্রকাশ পায়।
১৯৩১ খ্রিস্টাব্দে বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় এডওয়ার্ড কার্পেন্টারের গ্রন্থ ‘সিভিলাইজেশন এন্ড ইটস কিওর’ অবলম্বনে ‘সভ্যতার ব্যাধি’ আলোচনাগ্রন্থটি রচনা করেন। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে বিজয়লাল সাতজন পাশ্চাত্যের মনীষীর জীবনাদর্শ সম্পর্কে ‘অগ্রদূত’ নামে একটি পুস্তক রচনা করেন। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে তাঁর তিনটি ভিন্নধর্মী প্রবন্ধ সংকলন ‘ত্রয়ী’ নামে প্রকাশ পায়। একই বছরে ছয়জন প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মনীষীদের নিয়ে তাঁর আলোচনাগ্রন্থ ‘মরুজয়ের সেনা’ প্রকাশিত হয়। ১৯৩৭ সালেই মার্কিন কবি ওয়াল্টার হুইট্ম্যানের জীবন ও আদর্শ সম্পর্কে প্রবন্ধ পুস্তিকা ‘চারণকবি হুইট্ম্যান’ প্রকাশ পায়। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে তিনি হ্যারল্ড ল্যাস্কির ‘এ গ্রামার অফ পলিটিক্স’ অবলম্বনে প্রবন্ধ ‘মানুষের অধিকার’ রচনা করেন। এছাড়া সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকায় প্রকাশিত বিজয়লালের ধারাবাহিক প্রবন্ধ এবং বর্ধমানের ধামাস গ্রামে প্রদত্ত তাঁর রাজনৈতিক ভাষণ ‘অভিশাপ না আশীর্ব্বাদ’ নামে ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়েছিল। চারণ আন্দোলন উপলক্ষে প্রাচ্য ও পাশ্চাত্যের মনীষীদের বাণী অবলম্বনে বিজয়লালের ছয়টি গানের সংকলন হলো ‘চারণগীতি’, যেটি পুস্তিকা আকারে প্রকাশ পায় ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে। একই বছর তিনি চারণ আন্দোলনের তাৎপর্য বিষয়ে ‘চারণের মর্ম্মবাণী’ ও ‘চারণের মর্ম্মকথা’ প্রবন্ধ রচনা করেন। এছাড়া ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় অধ্যাপক রেজাউল করিমের সঙ্গে যৌথভাবে চারণ আন্দোলনের দর্শন সম্পর্কে আলোচনাগ্রন্থ ‘আমরা যাহা বিশ্বাস করি’ রচনা করেন।
বিজয়লাল রবীন্দ্রসাহিত্য, মার্কসীয় দর্শন, গান্ধিদর্শন বিষয়ে বিশেষ আগ্রহী ছিলেন এবং একাধিক পুস্তকও রচনা করেছিলেন। মার্কসীয় দর্শন সম্পর্কে বিজয়লালের ‘সাম্যবাদের গোড়ার কথা’ গ্রন্থটির প্রথম সংস্করণ ১৯৩৫ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয়। প্রকাশের সঙ্গে সঙ্গে এই গ্রন্থ তৎকালীন ব্রিটিশ সরকার কর্তৃক নিষিদ্ধ হয়। পরে অবশ্য নিষেধাজ্ঞা উঠে যায়। ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে এর দ্বিতীয় সংস্করণ প্রকাশিত হয়। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে বিজয়লালের ‘সাম্যবাদের মর্ম্মকথা’ প্রকাশ পায়। মার্কসবাদ ও গান্ধিদর্শনের তুলনামূলক আলোচনা প্রসঙ্গে ‘কমিউনিজম্’ নামে তাঁর একটি গ্রন্থ প্রকাশ পেয়েছিল, যার প্রকাশকাল ও প্রকাশক সম্পর্কে তথ্য অপ্রতুল। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে ‘সোভিয়েত কমিউনিজম— এ নিউ সিভিলাইজেশন’ অবলম্বনে তাঁর প্রবন্ধ গ্রন্থ ‘রাশিয়ার কথা’ প্রকাশিত হয়।
গান্ধিজির জীবনদর্শন সম্পর্কে বিজয়লাল প্রণীত গ্রন্থগুলি হলো— ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত ‘সেনাপতি গান্ধী’, একই সালে প্রকাশিত হয়েছিল গান্ধিদর্শন সম্পর্কিত তাঁর প্রবন্ধ সংকলন ‘দ্রষ্টার চোখে’। ১৯৪১ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় সমসাময়িক রাজনৈতিক পরিস্থিতি বিষয়ক তাঁর প্রবন্ধ সংকলন ‘ঝটিকার ঊর্ধ্বে’। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে গান্ধিজি সম্পর্কিত প্রবন্ধ ‘হে রুদ্র সন্ন্যাসী’ প্রকাশিত হয়। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশিত হয় মাদকদ্রব্যের সর্বনাশা কুফল সম্পর্কিত তাঁর পুস্তিকা ‘মাদকদ্রব্য বর্জন’। গান্ধীজীর জন্মশতবর্ষ উপলক্ষে পশ্চিমবঙ্গ গান্ধী শতবার্ষিকী সমিতি কর্তৃক এই পুস্তিকা প্রকাশিত হয়েছিল। একই সালে প্রকাশিত হয় তাঁর ‘গান্ধী বন্দী কেন?’ পুস্তিকাটি। ব্রিটিশ সরকার এই পুস্তিকাটি নিষিদ্ধ ঘোষণা করেছিল। ১৯৬৯ খ্রিস্টাব্দে বিজয়লালের লেখা একমাত্র ইংরেজি পুস্তিকা ‘Gandhi— Champion of the Proletariet?’ প্রকাশিত হয়। এছাড়া ১৯৩০ খ্রিস্টাব্দে বিজয়লালের রাজনৈতিক প্রবন্ধ সংকলন ‘মহাত্মাজীর জীবন ও বাণী’ প্রকাশিত হয়েছিল।
এছাড়া তিনি বঙ্কিমচন্দ্রের সাহিত্য, মনস্তাত্ত্বিক বিষয়াদি এবং পাশ্চাত্য মনীষীদের জীবনাদর্শ সম্পর্কে বিশেষভাবে আগ্রহী ছিলেন। ১৯৩৭ খ্রিস্টাব্দে বিজয়লালের ঋষি বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায়কে নিয়ে প্রবন্ধ সংকলন ‘বঙ্কিমের স্বপ্ন’ প্রকাশিত হয়েছিল। আর ১৯৩৯ খ্রিস্টাব্দে বঙ্কিমচন্দ্র ও তাঁর সাহিত্য সম্পর্কিত আলোচনা গ্রন্থ ‘মুক্তি-পাগল বঙ্কিমচন্দ্র’ প্রকাশ পায়। বিংশ শতকের চল্লিশের দশক নাগাদ বিজয়লাল তাঁর চারণ দল নিয়ে রাজনৈতিক ও অর্থনৈতিক স্বাধীনতার আদর্শ প্রচারের উদ্দেশ্যে চারণ আন্দোলন সংগঠিত করেন। বিজয়লাল ছিলেন প্রকৃত জনদরদি। তাঁর নেতৃত্বে নদিয়ায় সফল কৃষক আন্দোলন সংগঠিত হয়। ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দে দেশব্যাপী ভারত ছাড়ো আন্দোলনের সময় বিজয়লাল কলকাতার রাজপথে ব্রিটিশ সৈন্য দ্বারা আক্রান্ত হন। এতে তিনি মারাত্মকভাবে আহত হয়েছিলেন। এরপরে তিনি কৃষ্ণনগর জেলে বিনা বিচারে বন্দী হয়েছিলেন। ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে তিনি জেল থেকে মুক্তি পান। সেই বছরই তিনি কৃষ্ণনগরে শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগার স্থাপন করেন। একই বছর বিজয়লাল কৃষ্ণনগরে হরিজন বিদ্যালয় স্থাপন করে গঠনমূলক কর্মে আত্মনিয়োগ করেন।
বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের এক বিরাট পত্র-পত্রিকার জগৎ ছিল। সাংবাদিক বিজয়লাল সম্পর্কেও আমাদের অবগত হতে হবে। ১৯৩৪ থেকে ১৯৪০ খ্রিস্টাব্দ এই কালপর্বে তিনি ‘আনন্দবাজার’, ‘দেশ’, ‘বঙ্গবাণী’ প্রভৃতি পত্রিকার সঙ্গে যুক্ত ছিলেন। পত্রিকা সম্পাদনার ক্ষেত্রে বিজয়লালের প্রথম উল্লেখযোগ্য কাজ বলা যায় ‘বঙ্গবাণী’ পত্রিকার সহ-সম্পাদক হিসেবে। সাপ্তাহিক ‘দেশ’ পত্রিকার অন্যতম সংগঠক ছিলেন তিনি এবং এই পত্রিকার সহ-সম্পাদকও ছিলেন বিজয়লাল। এছাড়া এই সময় তিনি ‘প্রবাসী’, ‘ভারতবর্ষ’, ‘দেশ’ পত্রিকায় রবীন্দ্রসাহিত্য বিশ্লেষণ করে একাধিক প্রবন্ধ লিখেছিলেন। তিনি ১৯৪৫-৪৬ খ্রিস্টাব্দে কলকাতার ‘কৃষক’, ‘স্বরাজ’ ও ‘ঊষা’ পত্রিকা সম্পাদনার দায়িত্বে ছিলেন। ১৯৬৭-৭৪ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে ‘উদ্বোধন’, ‘প্রবাসী’, ‘যুগান্তর’ (রবিবাসরীয়) প্রভৃতি পত্র-পত্রিকায় তাঁর লেখা একাধিক প্রবন্ধ, কবিতা ও সরস কাহিনী প্রকাশিত হয়। এই সময় আকাশবাণীতে তিনি নানা বিষয়ে কথিকা পাঠ করেন।

১৯৪৬ খ্রিস্টাব্দে স্বাধীনতা সংগ্রামী বিজয়লালের জীবনবোধ ও কর্মকাণ্ডে এক বড়ো বাঁক লক্ষ্য করা যায়। তিনি নাগরিক জীবন একেবারে ত্যাগ করেন এবং গান্ধিজির ভাবাদর্শে গ্রাম গঠনের কাজে নিজেকে পুরোপুরি নিয়োজিত করেন। এর জন্য তিনি জলঙ্গি নদীর তীরে অবস্থিত নদিয়ার বড়ো আন্দুলিয়া গ্রামকে বেছে নেন। সেখানে তিনি লোকসেবাশিবির স্থাপন করেন। লোকমুখে এখন জায়গাটি ‘শিবির’ নামে পরিচিত। আমৃত্যু বিজয়লাল এই বড়ো আন্দুলিয়া গ্রামেই বসবাস করেছিলেন। লোকসেবাশিবির স্থাপন করে বিজয়লাল গান্ধিজির দেখানো পথে পল্লিপুনর্গঠন, শিক্ষাবিস্তার ও সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতিরক্ষার কাজে আত্মনিয়োগ করেন। এর পাশাপাশি তিনি পল্লি-মানুষের সাংস্কৃতিক জাগরণে নিজেকে নিয়োজিত করেন। ১৯৬৩ থেকে ১৯৬৬ খ্রিস্টাব্দ— এই কালপর্বে তিনি বড়ো আন্দুলিয়া গ্রামে একটি উচ্চ বালিকা বিদ্যালয়-সহ চারটি বিদ্যা নিকেতন স্থাপন করেছিলেন। সেই সময় বড়ো আন্দুলিয়ায় তিনি শ্রীরামকৃষ্ণ পাঠাগার নামে একটি গ্রামীণ গ্রন্থাগারও প্রতিষ্ঠা করেছিলেন। পরবর্তীকালে প্রধানত বিজয়লালের উদ্যোগেই সেখানে সরকারি নিম্ন বুনিয়াদি শিক্ষকশিক্ষণ মহাবিদ্যালয় স্থাপিত হয়। বর্তমানে সেটির নাম পি টি টি আই কলেজ। বিজয়লাল শিবিরের মাঠে ‘গদাধরের মেলা’ নাম দিয়ে একটি গ্রামীণ মেলার প্রবর্তন করেছিলেন, সেই থেকে এই মেলা এখনও ফি-বছর সেখানে হয়ে আসছে। সম্ভবত গদাধরের মেলা ১৯৬৪ সালে প্রথম হয়েছিল। শিবিরে গদাধরের মন্দিরকে কেন্দ্র করে এই মেলা ক্রমান্বয়ে আশেপাশের জনপদের মধ্যে অন্যতম মিলন উৎসবে পরিণত হয়। গদাধরের মন্দির আনুষ্ঠানিকভাবে প্রতিষ্ঠা এবং মেলার প্রবর্তন সম্ভবত একই বছরে হয়েছিল। বড়ো আন্দুলিয়ায় থাকাকালেই তিনি যক্ষ্মায় আক্রান্ত হয়েছিলেন এবং যাদবপুর টি. বি. হাসপাতালে তাঁর চিকিৎসা চলেছিল। সময়টা ছিল ১৯৬০-৬২ খ্রিস্টাব্দ।
১৯৪৭-এর ১৫ আগস্ট ভারতবর্ষ স্বাধীনতা অর্জন করে। অবিভক্ত বাংলার নদিয়া জেলা শেষ পর্যন্ত বিভক্ত হয়ে প্রায় তার আয়তনের অর্ধেক হয়। সাম্প্রদায়িক উত্তেজনা কোথাও কোথাও চরম আকার ধারণ করে। দেশ বিভাগের পর বিজয়লাল সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জীবনরক্ষা করতে গিয়ে নিজের জীবনকে বিপন্ন করতেও দ্বিধা করেননি। তাঁর বাড়িতে আগুন লাগিয়ে দেওয়া হয়েছিল। বিজয়লাল তৎকালীন বাংলায় সাম্প্রদায়িক সম্প্রীতি রক্ষায় অনন্য নজির সৃষ্টি করেছিলেন। তাঁর রাজনৈতিক কর্মকাণ্ড এখানেই শেষ নয়। দেশ স্বাধীন হওয়ার পর ১৯৫১ থেকে ১৯৬২ খ্রিস্টাব্দের মধ্যে তিনি কৃষ্ণনগর ও করিমপুর কেন্দ্রের কংগ্রেস প্রার্থীরূপে দুটি টার্মে বিধায়ক নির্বাচিত হয়েছিলেন। দু’বারের বিধায়ক হিসেবে উন্নয়নমূলক কাজে বিজয়লালের সক্রিয়তা বিশেষভাবে উল্লেখের দাবি রাখে।
১৯৬৭ খ্রিস্টাব্দের ১২ মে বিজয়লালের পত্নী ইলা দেবীর প্রয়াণ ঘটে। তাঁর প্রয়াতা পত্নী ইলা চট্টোপাধ্যায়ের স্মৃতিচারণ করে ১৯৬৮ খ্রিস্টাব্দে প্রকাশ পায় তাঁর ‘সেই মঞ্জুভাষিণী নম্র নীরব নারী’ গ্রন্থটি। এটি ইলা দেবীর প্রথম মৃত্যুবার্ষিকীতে বড়ো আন্দুলিয়ার লোকসেবাশিবির থেকে প্রকাশ পায়। বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায় তাঁর সমগ্র জীবনে প্রায় চল্লিশটি গ্রন্থ রচনা করেছিলেন। এছাড়াও তাঁর বহু অপ্রকাশিত রচনা ছিল। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দের ফেব্রুয়ারি মাসে নদিয়ার রাণাঘাটে একটি সভায় শ্রীঅরবিন্দের দর্শন নিয়ে আলোচনাকালে বিজয়লাল অসুস্থ হয়ে পড়েন। ১৯৭৪ খ্রিস্টাব্দের ১৮ ফেব্রুয়ারি প্রত্যুষে কল্যাণীর গান্ধি মেমোরিয়াল হাসপাতালে তিনি শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন। বিজয়লাল চট্টোপাধ্যায়ের প্রয়াণের পঞ্চাশ বছর পরেও তাঁর মতো দেশসেবকের অনুপস্থিতি আমাদের সমাজে যে শূন্যস্থান তৈরি করেছিল, তা পূর্ণ করা যায়নি।
লেখক: আঞ্চলিক ইতিহাস লেখক, নদিয়া।
বাংলার এমন সব রত্নদের কথা জেনে নিজেকে ধন্য মনে হয় ।
তাই তো! উনিশ শতকের বাংলায় এমনই সব রত্নের আবির্ভাব ঘটেছিল। ধন্যবাদ।
নদীয়ার উল্লেখযোগ্য ব্যক্তিদের নিয়ে তথ্যভিত্তিক লেখা অবশ্যই সাধুবাদ প্রাপ্তির দাবিদার। লেখককে জানাই আন্তরিক ধন্যবাদ। আগামী দিনে আরও মানুষের কথা লিখুন – যাদের আদর্শ সামনে রেখে নতুন প্রজন্মের ছেলেমেয়েদের মধ্যে স্বর্থত্যাগের মানসিকতা এবং দেশপ্রেমের ভাবনা জাগ্রত হয়।
অনেক ধন্যবাদ। আপনার মূল্যায়ন, পরামর্শ প্রাণিত করল। অবশ্যই চেষ্টা করবো।