| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বিজয়া দেব-এর ছোটগল্প ‘যাত্রাপথে’

Reporter
বিজয়া দেব / ৫৪৩ জন পড়েছেন
আপডেট বৃহস্পতিবার, ১৪ এপ্রিল, ২০২২

যেন অন্তহীন এই চলা, মনে হচ্ছিল বুড়োঠাকুরের।

বুড়োঠাকুর— নাম, কৃষ্ণপ্রিয় ভট্টাচার্য-বর্তমানে কেষ্টঠাকুর এবং অতি বর্তমানে বুড়োঠাকুর। বয়স বিরাশি। দেখে অতটা বোঝা যায় না। সত্তর/বাহাত্তরে চলে যায় দিব্যি।

আকাশ থেকে আগুন ঝরছে। মাথার ওপর গনগনে সূর্য, শ্রাবণের সংক্রান্তিতে অতটা তাপ কখনও টের পায়নি ঠাকুর। সূর্যের তাপ কি বেড়েই চলেছে? এই এলাকায় একটিও গাছ নেই। গোটা শহরেই চোখ মেলে তাকালে দু-চারখানা হালকা ফুলগাছ চোখে পড়ে। তাঁর বাসাবাড়ি যেখানে সেখানেও গলির পাশ ঘেঁষে দাঁড়িয়ে থাকা গাছগুলি কেটে ফেলেছে সরকারি লোকেরা। গাছের ডালপালা ইলেকট্রিক তারে জড়িয়ে যায় তাই। তাই বলে খোলা জায়গাতে গাছ লাগাতে নেই? কে শোনে কার কথা! আর এই বুড়ো মানুষটার কথা তো কেউ শুনবে না।

বুড়োঠাকুর কাঁধে একখানা গামছা ফেলে রাখে। অতিরিক্ত গরমে ঘামতে থাকা গলা মাথা কাঁধের গামছা দিয়ে বারবার মোছে। পথের মোড়ে একটি বটগাছ ছিল, ছিল শাখাপত্রের বিস্তারে এক মোহময় ছায়া, সেখানে পথ চলতে চলতে জিরিয়ে নিত সে খানিকটা, সেই গাছটির ডালপালা একদিন ছেঁটে ফেলল সরকারি লোকেরা। তবু কিছু হালকা ডালপালা, কান্ড বেঁচে ছিল, হঠাৎ একদিন দা-কুড়ালের ঘায়ে গাছটার ইহলীলা সাঙ্গ হল। শোনা গেল,  এখানে নাকি ট্রাফিক কন্ট্রোলের পাকা চৌকোনো ঘর হবে। ভেতরে দুখানি চেয়ার থাকবে। দুজন ট্রাফিক কন্ট্রোলিং অফিসার বসবে। আশ্চর্য, বছরের পর বছর চলে গেল, কিছুই হল না। মাঝখান থেকে অমন মায়াময় গাছটি চলে গেল।

বুড়োঠাকুরের গলা শুকোয়।কাঁধের ঝোলায় প্লাস্টিক বোতলে জল। এক ঢোঁক এক ঢোঁক দু ঢোঁক ঢালতেই বুকের বাঁ পাশটায় কেমন ব্যথা ব্যথা করে।

বেশ খানিকটা দূরত্বে যেতে হবে। দুটো পুজো সেরেছে সে, এটা তিননম্বর পুজো, আজ মনসাপুজো।এই এলাকায়, এই শহরে বিষহরির পুজো বেশ ধুমধাম করে হয়। সারা শ্রাবণ মাস জুড়ে পদ্মাপুরাণ পাঠ, অন্তে পুজো। কী এক মন কেমন করা সুরে চারপাশ মুড়ে দেয় এই সুর।

এই বয়েসে আজও বুড়োঠাকুরের মন কেমন করে। মনসাপুজো… দক্ষিণের ঘর… কাকিমার সুরেলা কণ্ঠ… পদ্মাপুরাণ পাঠ… স্বপ্নের মত অস্পষ্ট ধোঁয়াটে স্মৃতি মূর্ত্ত হয়ে ওঠে।

যতই বয়েস হচ্ছে ততই যেন পূর্বস্মৃতি (না কি পূর্বজন্মকথা! এমনটাই মনে হয় আজকাল) চোখের সামনে, মনের ভেতর ধূসর জলছবির জন্ম দেয়। বুড়োঠাকুর দেখে কাঁটাতারের বেড়ার ওপারে এক বড় বাড়ি। মাঝখানে প্রশস্ত উঠোন ঘিরে ছড়ানো ছিটানো ঘর। দক্ষিণের ঘর, পুবের ঘর, উত্তরের ঘর — এভাবে সেজকাকা মেজজ্যাঠা বড়কাকা বড়জ্যাঠার ঘরকে চিহ্নিত করা হত। বড় বড় ছায়াদায়ী গাছ গোটা বাড়ি ঘিরে দাঁড়িয়ে আছে।

অতীত ও বর্তমানে একটি মোটাদাগের বিভাজনরেখা আছে জেনেও বুড়োঠাকুরের নিরন্তর যাত্রাপথে সেই বিভাজনরেখা মুছে যায়। কাঁটাতারের বেড়াও কোনও অদৃশ্য হাতের জাদুতে মুছে যায়, তৈরি হয় এক স্বপ্নময় পথ। সুরমা বরাক নদীর ওপর তৈরি হয় চমৎকার সেতু আর তার ওপর দিয়ে বুড়োঠাকুর হাঁটে। অক্লান্ত পায়ের নিচে নতুন সব কোমল দূর্বাঘাস জন্মায়। অনেক অনেক ধ্বনি ওপার থেকে এপারে ছুটে ছুটে আসে। বুড়োঠাকুর শোনে ভোলামামার গলা — এই কেষ্ট! মাছ ধরতে যাবি? বঁড়শিতে মাছ গেঁথেছে, সে-ও হাত লাগিয়েছে, সে কী জোরালো টান! মাছটাই না তাদের জলে ফেলে দেয়! কড়া রোদে হাঁটে কেষ্টঠাকুর আর ঠোঁটের কোণে এক অদ্ভুত রহস্যময় হাসি মিশে থাকে। কেউ দেখে কেউ দেখে না। কোন সুদূরের খন্ড অতীত একটুকরো হাসি হয়ে তার ঠোঁটে মিশে থাকে। লোকে বলে — ছিটিয়াল ঠাকুর।

এই মহকুমা শহরের ফুটপাথগুলোর ওপর দিয়ে হাঁটবার জো নেই। টুকরো টুকরো স্ল্যাব জুড়ে দিয়ে সেই আদ্যিকালের পুরনো ফুটপাথে অনেকদিন কোনও কাজ হয়নি। উপরন্তু মাঝেমাঝে স্ল্যাবগুলো সরে গিয়ে নিচের গহীন অন্ধকার হাঁমুখো হয়ে থাকে। খুব সাবধানে পা ফেলতে হয়, খুব সাবধানে। একটু এদিক ওদিক হলেই বিপদ। চারপাশে বিপদের হাঁমুখো অন্ধকার ওত পেতে থাকে। যে কোনও মুহূর্তে অন্ধবিবর থেকে উঠে এসে তাকে জড়িয়ে ধরতে পারে আষ্টেপৃষ্ঠে। ধরেছেও কতবার।আসলে ঐ গহীন অন্ধকার তার সাথে সাথেই আছে। রঙের সমাবেশ তার জীবনে কখনও ছিল? শুধু একমাত্রার কালো রঙই ছিল আর আছে। এর ওপর দিয়ে পথ চলা। মেনে নিয়েছে সে। না মানলেই বা কী হত! কিছু হত কি? ঐ গহীন আঁধারে ডুবে যেতে যেতে আবার সূর্যের দিকে মুখ তুলে তাকিয়েছে কেষ্টঠাকুর। কীভাবে তাকিয়েছে সে নিজেই জানে না। কসরতগুলো রপ্ত হয়েছে নিজে থেকেই।

এতসব ভাবা যায় না। ভাবতে গেলে ঝিমুনি আসে। মাথাটা ভারী হয়ে যায়। ভাবতে চায়ও না সে। তবু মাছির মত ভোঁ ভোঁ করে তারা মাথার চারপাশে। অতীত বড় টানে। সুখ হোক, দুঃখ হোক, ঘটনাগুলো যেন ঘরের এক কোণে বসে মগ্ন হয়ে ছায়াছবি দেখার মতই। একের পর এক ঘটনা আসছে। ধুলোর সাথে, ধোঁয়ার সাথে, ক্রমবর্ধমান তাপিত পৃথিবীর সাথে মিলে মিশে যায় ঘটনা, ঘটনাপ্রবাহ। বুড়োঠাকুর পথ হাঁটে।

কে যেন তার পিছু পিছু ছুটতে ছুটতে আসছে। বলছে— ও বুড়োঠাকুর, তোমার খুব কষ্ট হচ্ছে গো। বড্ড তাপ গো আজ। একটু জিরোবে না কি? ঐ কাছেই আমাদের বাড়ি। আমি রামু গো।

রামু… রামু… রামু তো ঐ জন্মের। এই ভাগ হয়ে যাওয়া জীবনের ওপারের গল্প রামু। উত্তরের ঘরের বাঁ দিকের বাড়িটা। তাঁদের প্রতিবেশি। হরিজ্যেঠার ছেলে রামু। কিন্তু রামু তাকে বুড়োঠাকুর কেন ডাকবে? বুড়োঠাকুর তো ভাগ হয়ে যাওয়া জীবনের বা চলার পথের এপারের নাম।

—ওগো শুনছ, একটু তো পেছন ফিরে তাকাও!

পেছন ফিরে তাকাতে গিয়ে দুরন্ত বাইক তাকে ধাক্কা দিয়ে ফেলেই দেয় আর কী! কোথায় কী! কেউ নেই। যন্ত্রদানবের মত যানবাহন ছুটছে। মোড়টা পেরিয়ে লম্বা রাস্তাটার একপাশে ফুটপাথ। খানিকটা চলনসই গোছের। ওখানে পা ফেলে একটুখানি স্বস্তি। ফুটপাথের ওপরেই গোলছাউনি দেওয়া একখানি দোকান। হালকা ছায়া পড়েছে।একটু হাঁপ নেওয়ার জন্যে দাঁড়িয়েছে কেষ্টঠাকুর। ঠান্ডা সরবতের দোকান। সারি সারি বোতলে লাল নীল সাদা জল। পাশে বরফের বাক্স। একখানা টানা বেঞ্চ। ওপাশে মেয়েদের কলেজ। এরা কি এইসব সরবত খায়? না কি পথচলতি মেহনতিরা খায়! এগুলো? সস্তার সরবত!

—খাবে নাকি ঠাকুর? — দোকানি দাঁত বের করে হাসে।

রসিকতা হচ্ছে! উত্তর দেয় না বুড়োঠাকুর। এখনও আরও মাইলখানেক পথ। এখন তো আবার কিলোমিটারের হিসেব। মগজে অনেক কোষ। কোনোটা সক্রিয় কোনটা নিষ্ক্রিয়। তাই মনে পড়ে না। এককালের অঙ্কের তুখোড় কৃষ্ণপ্রিয়, কিলোমিটার মাইলের হিসেব মেলাতে পারে না, আজ যে সে বুড়ো ঠাকুর! আজ যে সে ব যজমান খুঁজে খুঁজে বেড়ায়! অনেকে তাকে কিপটে ঠাকুরও বলে। হেঁটে পথ চলে, তাই। ট্যাঁকের পয়সা নাকি সে খরচা করতে চায় না। পয়সা আসবে কোথা থেকে? দক্ষিণা আর কতটুকু। যাকগে!

চন্দ্র সূর্যের মত বাঁধা আছে তার দিনরাত। আকাশ মাটি পথচারি এদের সাথে যেন অদৃশ্য সুতোয় সে-ও বাঁধা আছে। তবে জীবন মানে একটা গোটা জীবন, অনেক দীর্ঘ। জীবনটা আয়ত্তাধীনও নয়। জীবনের লক্ষ্য নিয়ে ইস্কুলে বড় বড় রচনা লিখতে হয়েছে, নিজের লক্ষ্য স্থির হলে কেউ নাকি সাফল্য থেকে আটকাতে পারে না। কিন্তু সত্যিই কি তাই? জীবন তো নিয়ন্ত্রণ করে দেশ সমাজ রাষ্ট্র। গড়তেও পারে সে, ভেঙে গুঁড়িয়েও দিতে পারে সে।

ছোটবেলায় বাবা আকাশ দেখাতেন। দেখাতেন মহাকাশ, নীলিমা, ছায়াপথ, নক্ষত্র। অরুন্ধতী, স্বাতী, অত্রি, অঙ্গিরা, কালপুরুষ, সপ্তর্ষিমন্ডল…. সেই মাটি সেই ভূগোল ছিল আলাদা। সেই পথঘাট, গাছপালা, ঘরবাড়ি, তুতো ভাইবোনদের সাথে দৌড়ঝাঁপ, মামাবাড়ি যাওয়া নৌকো করে, সুরমা নদীর ঢেউ, অবারিত উচ্ছ্বাস, ঈশ্বরচন্দ্র বুনিয়াদি বিদ্যালয়, মাস্টারমশাই বিমলেন্দু সেন — সব হারিয়ে গেল এক ভয়াবহ রাষ্ট্রিক দুর্বিপাকে। যেন দৈত্যাকার এক নির্দয় হাত সাজানো গোছানো নিশ্চিন্ত জীবনধারাকে মুঠোয় নিয়ে থ্যাঁতলে ফেলে দিল। এমনও হয়! যা কখনও কেউ কল্পনাও করতে পারে নি তাই ঘটে গেল। শৈশবের আনন্দ, আশা, পরিকল্পনা সব তছতছ হয়ে গেল, আতঙ্কের ঘূর্ণিতে ওলটপালট হয়ে গেল সব।

দেশভাগ। এক ভয়াবহ দুঃসহ স্মৃতি। শুধু স্মৃতি নয়, ঘটমান বর্তমানও। পশ্চিমের ঘরে রাতের অন্ধকারে জ্বলে উঠল আগুন। মানুষের তীব্র আর্তনাদে বাতাস বিষবাষ্পে পূর্ণ হয়ে গেল। নাহ্, ওসব ভাবতে চায় না কেষ্টঠাকুর। তবু কেন আজকাল স্মৃতি বিস্মৃতির ঘেরাটোপ থেকে গলগল করে বেরিয়ে আসে দুঃসহ দিনগুলো? বেপরোয়া হাওয়ার মত সে আসে ঘুমে জাগরণে… আসতেই থাকে। দেশভাগ হল। জ্যেঠামশাই বাবা মা-র হাত ধরে চলে এল সে এপারে, এদেশে।

আর নিজের জন্যে কিছু করতে পারেনি কেষ্টঠাকুর। ভুঁইফোঁড় হয়ে কেটে গেল এই দীর্ঘ জীবন। তার জীবনটা এক অঙ্ক না মেলানো খেলা। যাত্রাপথে নানা খানাখন্দ।

সে নাকি পড়াশুনোয় ভালো ছিল। ভালো অঙ্ক কষতে জানত। বিমলেন্দু স্যার বাবাকে বলেছিলেন – কৃষ্ণপ্রিয়ের অঙ্কের মাথা খুব সাফ। বাবা বলেছিলেন — আমাদের কুলধর্ম পুরোহিতের কাজ তোকে করতে হবে না। তুই জজ ম্যাজিস্ট্রেট হবি।

মা আড়াল থেকে অনুচ্চ কণ্ঠে বলেছিল — না না কেষ্ট ডাক্তার হবে।

জ্যেঠামশাই মাকে সমর্থন করে বলেছিল — একদম ঠিক। কেষ্টকে আমরা ডাক্তার করব। ওর অঙ্কের মাথা খুব ভালো। বিজ্ঞান বুঝবে ভালো।

সময় কত কী মেনে নেয় কত কী মেনে নেয় না। অতঃপর সময় তাকে দিল কিছু খন্ড স্মৃতি, কিছু টুকরো সংলাপ, কিছু ধূসর ছবি, কিছু মানুষের ভগ্নাংশ। তার চোখে দেখা জগতে সে আছে, কিন্তু সে বাঁচে সেই মোহময় শৈশবে। কারণ এই চোখে দেখা জগৎ তাকে উঁচুনিচু পথচলার নির্দেশ আর কিছু বিবশ ঘুম দিয়েছে, আর কিছু নয়।

স্বাধীনতা এল, দেশ দুভাগ হল. তারা ছিন্নমূল হল। চেনা মাঠঘাট, ইস্কুল, মাস্টারমশাই, তাদের পরিবারের লোকজন কেউ আর “কেউ” রইল না। কিছু ধুলোয় মিশে গেল, কেউ চিতার ধোঁয়ায় শূন্যগামী হল, কেউ নিরুদ্দেশ হয়ে গেল, তাদের খবর আর পাওয়া গেল না। তার মধ্যে ঈশ্বরচন্দ্র বুনিয়াদি বিদ্যালয়ের শিক্ষক বিমলেন্দু সেন ছিলেন। ঘটনার ঘনঘটায় সে প্রথম স্তব্ধ হয়েছে, কেঁদেছে, তার বাবা জ্যেঠা মাকে কাঁদতে দেখেছে, তাদের পুরনো বাড়িঘর জ্বলে যাওয়ায় , বেদখল হওয়ার খবর পেয়ে বোধহীন মানুষের মত বাবা মা জ্যাঠামশাই এর দিকে তাকিয়েছে, কাকার খবর পাওয়া যায়নি। গোটা একটি পরিবার খন্ড ভগ্নাংশে রূপান্তরিত হতে দেখেছে। অবশ হয়ে যাওয়া বোধশক্তি নিয়ে তখন সে যখন তখন ঘুমিয়ে পড়ত একটি মলিন বিছানায়। সেটি ছিল দুর্গন্ধময় এক শরণার্থী শিবির।

জীবনটা আসলে ইন্দ্রজাল। দ্রুত দৃশ্যপট পরিবর্তন। শরণার্থী শিবির থেকে ভাড়াবাড়ি। বাবার মৃত্যু, জ্যেঠা জ্যেঠির তিক্ত মেজাজ, মায়ের ভয়ে ভয়ে থাকা, সংসারের হাঁড়ি ঠেলা। এতসবের মাঝে পড়াশুনোয় ইতি টানতে হল তাকে। শুরু হল যজমান বাড়ি যাওয়া জ্যেঠামশাই এর সঙ্গে, বিয়ে শ্রাদ্ধ পুজোপার্বণ। অ্যাসিস্ট্যান্ট পুরোহিত, সবাই ডাকত ছোট পুরুত।

ঐ দ্যাখো, মাঠ ভেঙে আসছে বলাই। ঈশ্বরচন্দ্র বুনিয়াদি বিদ্যালয়ের ছাত্র। ছুটে এসে বলল — কেষ্ট, তোর অঙ্কের খাতাটা দিবি, জানিস তো, মাস্টারমশাই বলেছে কৃষ্ণপ্রিয়র সাথে থাকবি। ভালো ছাত্রের সঙ্গে থাকলে তোরই উপকার হবে। কৃষ্ণপ্রিয়র বুকটা ফুলে উঠেছে। আনন্দে গৌরবে।

মাকে গিয়ে কথাটা সে বলল। মা বলল — খুব মন লাগিয়ে পড় বাবা, ডাক্তার হবি। সুটবুট লাগিয়ে গলায় স্টেথো ঝুলিয়ে সে রোগী দেখছে… কত নীল নীল স্বপ্ন। সেই স্বপ্নগুলো তার ছোট্ট গোলোকের চৌহদ্দি ছাড়িয়ে কাঁটাতারের বেড়াজালের সীমানা ছাড়িয়ে এই ছোট্ট উপত্যকা শহরে এসে ধুলোর ভেতর, ধোঁয়ার ভেতর কীভাবে গুঁড়ো গুঁড়ো হয়ে মিশে গেল সেসব ভাবতে গেলে ঘটনার পর ঘটনা চোখের সামনে ভিড় করে আসে। হ্যাঁ, তাকে আর কেউ কখনও স্বপ্ন দেখায়নি, ওপারের স্বপ্ন ওপারেই বিলীন হল। এপারে কোনও স্বপ্ন নেই… স্ল্যাব সরে যাওয়া ফুটপাথে হাঁমুখো মরণফাঁদগুলো সতর্ক চোখে চিহ্নিত করতে করতে যজমান বাড়ি যাওয়া আসা… তার দিনগত পাপক্ষয়।

তাকে আবার বিয়ে দেওয়া হল। গরীব ব্রাহ্মণীর সাথে। উপকথার জীবন শুরু হল তার। “এক গরীব ব্রাহ্মণ ও ব্রাহ্মণীর” গল্পে কিন্তু উপকথার সারল্য নেই। হাসি পায় বুড়োঠাকুরের। ঠোঁটের কোণে লেগে থাকে হাসির রেশ। কেউ কেউ তাকে ছিটিয়ালও বলে। অতিরিক্ত খাটুনি, অপুষ্টি আর ক্লান্তিতে ভুগে ভুগে মা-ও চলে গেল একসময়। কাজ করতে করতেই অকস্মাৎ তাঁর মৃত্যু। উনুনে কড়াতে তেল ঢেলেছে, শাকসবজি ছেড়ে দিয়ে হলুদগুঁড়োও সবজিতে ছেড়েছিল মা, তারপরই পড়ে গেল। বুড়োঠাকুর যদিও সবাইকে বলে বেরিয়েছে — মা-র ভাগ্য খুব ভাল, উপুড় হয়ে যদি জ্বলন্ত উনুনে পড়ত! না তা হয়নি, মা পেছনে চিত হয়ে পড়েছিল শীতল মাটিতে। শীতল ঠান্ডা মাটির মেঝেতে। ভাগ্য বলতে হয়! যেন মা ধরিত্রী তাঁকে কোল পেতে নিলেন!

কালে কালে জ্যেঠাইমা জ্যাঠামশাই চলে গেলেন। একটি ছেলে বুড়োঠাকুরের। পড়াশুনোর দিকে মন নেই। পড়াশুনো করতেই চাইত না। এ একদিক দিয়ে ভালই হল। যদি চাইতও কতদূর আর পড়াতে পারত সে! একটা গ্যারাজে কাজ করে তার ছেলে কুশল। বুড়োঠাকুরের একমাত্র ছেলে। এই পরিবারে লেখাপড়া শিখে নিজের পায়ে দাঁড়ানোর স্বপ্নটাও চিরদিনের জন্যে ধুলোয় মিশে গেল।

কৃষ্ণপ্রিয় দেখে আকাশে সূর্যটা গনগনে লাল হয়ে উঠছে। তার রক্তচক্ষু থেকে বিকিরণ হচ্ছে জ্বালাময়ী আলো। আর সহ্য করা যাচ্ছে না। তবু পথ চলে বুড়োঠাকুর। সেই অন্ধকার রাতে পথ হেঁটে হেঁটে হেঁটে হেঁটে শরণার্থী শিবিরে ওঠা থেকে অন্তহীন সে তো হেঁটেই চলেছে। অনন্ত এই যাত্রাপথ?

কুশল বিয়ে করে আনল নলিনী নামের একটি মেয়েকে। মেয়েটির প্রকৃতি কেমন যেন হিংস্র। দৃষ্টিতে হিংস্র ভাষা আছে। শুরু হল কুশলের মা বিরজা ও বউ নলিনীতে ঝগড়া। শেষ পর্যন্ত কুশল মুখের ওপর বলে দিল — তোমাদের সঙ্গে থাকা সম্ভব নয়। দিনরাত অশান্তি। যজমান শিকদারবাবু অতঃপর বন্দোবস্ত করে দিলেন তাঁর বাড়ির ভেতরেই একপাশে একটা শোবার ঘর ও একটি রান্নাঘরের। চলে এল বুড়োঠাকুর স্ত্রী বিরজাকে নিয়ে। এখন বিরজার খুব অসুখ। কাজকর্ম করতে কষ্ট। হাঁটু ফুলে ঢোল। বুড়োঠাকুরকে এই বয়সে দুটো ফুটিয়ে খেতে হয়।

বুড়োঠাকুর টের পায় মাথাটা অল্প ঘুরছে। ফুটপাথের ওপরেই বসে পড়ল। ওদিকে পুজোর জন্যে হা পিত্যেস করে বসে আছে রমেনবাবুর বাড়ির লোকেরা। চাঁদুর দোকানের পাশ ঘেঁষে একখানা বেঞ্চ পাতা আছে। সেখানে ছোকরা তিনটে বসে গুলতানি মারছে। বুড়োঠাকুরকে এভাবে বসে পড়তে দেখে চাঁদু বলে — উঠে বসো গো বাবাঠাকুর। শরীর খারাপ লাগছে? এই তোরা বেঞ্চ ছাড় তো, বুড়োঠাকুরকে বসতে দে।তোদের কি সামান্য জ্ঞানটুকুও নেই?

—হ্যাঁ জ্ঞান দিও না তো! এই গরমে একটু জিরিয়ে নিতেই বসেছি গো। আমাদের দেহ বুঝি দেহ নয়?

—ওঠ ওঠ বলছি। — চাঁদু তাড়া লাগায়।

গজগজ করতে করতে ছোকরা উঠল।

—বসো গো, উঠে বসো গো বুড়োঠাকুর। জোর পাচ্ছ না? এই, এই আমার হাতটা ধর তো! কী অবস্থা হয়েছে! ঈসস! এই বুড়ো বয়সে এত হাঁট কেন? দশ/বিশটা টাকা রাহাখরচ সাথে রাখো না কেন? এক কাপ চা দিই? না কি বাইরে চা খেতেও মানা। ওসব মানা টানা ছাড়ো তো! আগে তো প্রাণটা বাঁচবে! রোদ দেখছ, ঝলসে যাচ্ছে চারপাশ।

বুড়োঠাকুরের মুখ দিয়ে কথা সরে না। সে দেখে পৃথিবীটা পুড়ছে। সে শোনে নলিনী বিরজাকে বলছে — বুড়ো হয়ে বেশ সুবিধে হয়েছে, তাই না? খালি অসুখের ওজর! আমাদের দেহে তো শোকতাপ নেই। আমাদের লোহার দেহ!… বুড়োঠাকুর দেখে ঈশ্বরচন্দ্র বুনিয়াদি বিদ্যালয় থেকে একটি বালক ছুটতে ছুটতে আসছে… হাতে তার একটি ঝকঝকে বই… ঈশপের গল্প… মাস্টারমশাই দিয়েছেন। বলেছেন — এটা তোর পুরস্কার। অঙ্কে ছিয়ানব্বই পেয়েছিস। বড় হয়ে কী হবি?

—ডাক্তার হব মাস্টারমশাই।

—তাই হবি। যা হতে চাস তাই হতে হবে তোকে। লক্ষ্যে স্থির থাকতে হবে…

… ঐ যে হাজার হাজার মানুষ জড়ো হয়েছে রেলস্টেশনে… একদিকে স্বাধীনতা, একদিকে দেশভাগ। কুয়াশার মত স্বপ্নেরা ডানা মেলে উড়ছে… স্বপ্নগুলো ওই… ওই তো দূরদিগন্তে বিলীন হয়ে গেল…

— ও বুড়োঠাকুর? বুড়োঠাকুর… আরে পড়ে যাচ্ছ যে, এ্যাই তোরা আয়… ধর ধর ধর… হ্যাঁ বেঞ্চটায় শুয়ে পড়ো তো! ঈস এত কড়া রোদে কেউ এত পথ হাঁটে? তুমিও বড় কিপটে ঠাকুর… কোথায় পুজো ছিল?

বুড়োঠাকুরের ঝোলার ভেতর মোবাইল ফোনটা বাজছে। পটল নামের গুলতানি মারা যুবকটি সাবধানে ঝোলাটি ধরে রেখেছে।

চাঁদু বলছে — ফোনটা ধর। বাড়ির লোক হলে খবরটা দে!

ফোনটা তুলতেই এক মহিলার কর্কশ কণ্ঠ — হ্যাঁ ঠাকুরমশাই? আপনি কি আক্কেল খুইয়ে বসেছেন একেবারেই? কতক্ষণ থেকে ঝুলিয়ে রেখেছেন আমাদের? কখন থেকে নৈবেদ্য সাজিয়ে বসে আছি! কিছু মনে করবেন না ঠাকুরমশাই, পুজো টাকে না, আপনারা একেবারে ব্যবসায় নামিয়ে এনেছেন। কতটা পুজোবাড়ি আছে আজ? নেহাত এতদিনের পুরনো আপনি তাই…

পটল ফোনটা বন্ধ করে দেয়।

চাঁদু বলে — কী রে? কার ফোন ছিল?

— যজমান। খুব রাগারাগি করছে।

চাঁদু কথা না বলে বুড়োঠাকুরের মাথায় জল দেয়।

বুড়োঠাকুর অর্থাৎ কৃষ্ণপ্রিয় এখন যাত্রাপথে। বাঁক বদল হচ্ছে। চলেছে সে ভিনদেশে। দেহটা কী হালকা! কী ভারমুক্ত আহা! চারপাশে পদ্মাপুরাণ গাইছে কারা! ওই দক্ষিণের ঘর থেকে কি ভেসে আসছে? সন্ধ্যা নেমেছে। পাখপাখালি উড়ে যাচ্ছে। ঘরে ফিরছে। কী সুরেলা কণ্ঠ কাকিমার –

“শুনো ওরে বেহুলা সায়বেনের ঝি/তোরে পাইল কালনিদ্রা মোরে খাইল কী…”

আচ্ছা, এটা কি নারায়ণ দেবের সেই পুঁথিটি? একদিন বাড়িতে দেখেছিল কৃষ্ণপ্রিয়…

পথের কি আবার বাঁকবদল হল? ওই যে ছোট্ট কুশল দুলে দুলে পড়ছে –

… গাঙুরের জলে ভাসাইয়া ভেলা

মৃত পতিদেহ আবরি বেহুলা

চলে অসহায় একাকিনী বালা

ঝরে নিশিদিন আঁখিজল….

আচ্ছা এই কবিতাটি যেন কার লেখা!

গুঁড়ো গুঁড়ো স্বপ্ন ডানা মেলে উড়ছে…

সুটবুট পরা ডাক্তার কৃষ্ণপ্রিয় ভটচায… গলায় স্টেথো… গটগট করে ওই নীল আলোর ভেতর দিয়ে করিডোর পেরিয়ে গেল…

গুঁড়ো গুঁড়ো স্বপ্ন ডানা মেলছে। দুধসাদা ডানা… কৃষ্ণপ্রিয়ও চলল।চলল তার ভারহীন ভরহীন দেহ ওই নীলাভ ধূসর দিগন্তের দিকে।

কোথাও শাঁখ বেজে উঠল কি?

সন্ধ্যা কি নামল?

আপনার মতামত লিখুন :

Comments are closed.

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev