| | |
এই মুহূর্তে ::
ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩১নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ আন্তর্জাতিক আদিবাসী দিবস — ন্যায়বিচার, সমঅধিকার ও জাতিসত্ত্বার স্বীকৃতি চাই : নিকোলাস বিশ্বাস নিকোলাসের ছবি বাস্তবকে তুলে ধরে কবিতার মতো : বোধিসত্ত্ব সঞ্জয় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (৩০নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বঙ্গবাণী-র রমাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায় ও শ্যামাপ্রসাদ মুখোপাধ্যায়ই জীবনানন্দের আবিষ্কর্তা : অসিত দাস দিকে দিকে ওঠে অবাধ্যতার ঢেউ : দিলীপ মজুমদার প্রতিদিনের রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৯নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ অথ তসলিমা কথা…. : অশোক মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৮নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৭নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বেগম রোকেয়ার সমাধি আবিষ্কার যেন প্রেমেন্দ্র মিত্র-র তেলেনাপোতা আবিষ্কার : অসিত দাস মিয়ানমারের গণতান্ত্রিক সরকার রোহিঙ্গা সংকটে কোন নির্দেশনা নেই : হাসান মোঃ শামসুদ্দীন ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৬নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ দ্বিখণ্ডিত নির্বাসন : অশোক মজুমদার শ্যামাপ্রসাদের সঙ্গে আর্থার কোনান ডয়্যালের সাক্ষাৎকার ও প্ল্যানচেট-আলোচনা : অসিত দাস শ্রাবণের ঝিরঝিরে হাওয়ায় কাঁচের চুড়ির রিমিঝিম : রিঙ্কি সামন্ত ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৫নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ রাখি বন্ধন ও রবীন্দ্রনাথ : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৪নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ কলকাতা ফিরিয়ে দিক তসলিমার দ্বিখন্ডিত বাসার একখণ্ড : অশোক মজুমদার তরুণের বিদ্রোহ : তখন এবং এখন : দিলীপ মজুমদার বিশ্বজিৎ মণ্ডল-এর ছোটগল্প ‘বনলতা সেন ও অভিমানের অন্ধকার’ শিক্ষা ও সমাজ-সংস্কারে ঈশ্বরচন্দ্র বিদ্যাসাগরের অবদান : যশোবন্ত রায় ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২৩নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ তসলিমা নাসরিন — সবিনয় নিবেদন : দিলীপ মজুমদার গুরুপূর্ণিমার ‘শতকোটি প্রণাম’-এর ব্যাখ্যা ও ব্যুৎপত্তি (দ্বিতীয় পর্ব) : অসিত দাস ওয়াল্টার কেলি ফার্মিঙ্গার সম্পাদিত দ্য ফিফথ রিপোর্ট (দ্বিতীয় খন্ড) (২২নং) অনুবাদ বিশ্বেন্দু নন্দ বিস্মৃত মানুষের বিস্ময়কর কাহিনি : দিলীপ মজুমদার
Notice :
❅ পেজফোরনিউজ অর্ন্তজাল পত্রিকার (Pagefournews web magazine) পক্ষ থেকে বিজ্ঞাপনদাতা, পাঠক ও শুভানুধ্যায়ী সকলকে জানাই শুভ দোল পূর্ণিমা-র আন্তরিক প্রীতি শুভেচ্ছা ও ভালোবাসা। ভালো থাকবেন সবাই। ❅ আপনারা লেখা পাঠাতে পারেন, মনোনীত লেখা আমরা আমাদের পোর্টালে অবশ্যই রাখবো ❅ লেখা পাঠাবেন pagefour2020@gmail.com এই ই-মেল আইডি-তে ❅ বিজ্ঞাপনের জন্য যোগাযোগ করুন, ই-মেল : pagefour2020@gmail.com

বিজয়া দেব-এর ছোটগল্প ‘অপনা মাংসে হরিণা বৈরি’

Reporter
বিজয়া দেব / ৬৩৯ জন পড়েছেন
আপডেট শুক্রবার, ১৩ অক্টোবর, ২০২৩

বুড়ি ঠাকুমা বিশ্বাস করত আমি সেই জঙ্গলের হরিণী, যাকে ঘিরে ঠাকুমা মায়ার বাঁধনে বাঁধা ছিল। সে এক গল্প। সবাই বলে গল্প নয়, সত্যি। আমিও বিশ্বাস করি, সত্যি। তাই আমিও হরিণীর মত ছুটতে পারি।  আমার ধান রোঁয়ানো দেখে তাক লেগে যায় পাঞ্চেত প্রধানের বউ-এর। সে দাঁড়িয়ে দেখে। ধানের চারার সার দেখে বলে- এমনটা কখনও দেখি নি। আমার হাতের আঙ্গুলের কাজ দেখে বলে- তোর হাতে তো জাদু আছে রে,এমনটা তো আগে দেখিনি! এসব কাজও বুড়ি ঠাকুমা আমাকে শিখিয়েছে। ধান রোঁয়ারও একটা তাল আছে, নাচের তালের মত। আমার ছোটো মেয়েটা মাঝে মাঝে ইশকুল থেকে এসে নাচে, আঙ্গুলের বাঁকানো চুরানো দেখে বলেছিলাম- এই পাঁচি, দ্যাখ, আমিও আঙুল নিয়ে খেলতে জানি। পাঁচি চোখ পাকিয়ে বলে- খেলা নয় মা, ওসব নাচের মুদ্রা। যাকগে, অতশত কি আর বুঝি? আমি জানি ওসব সবাই পারে না। আমার মত ধান রুইতে আমাদের গাঁয়ের কেউ পারে না। তাই তো প্রধানের বউ আমার কাজ দেখে তারিফ করে।

বুড়ি ঠাকুমা চলে গেছে দুনিয়া ছেড়ে, কিন্তু ও আমার সাথে আছে, ওর ছায়া আমি দেখি জঙ্গলে কাঠ কুড়োতে গেলে। আমার সাথে সাথে সে থাকে। আমায় বলে- তোর কেন এত কষ্ট রে হরিণী, কোনও জন্মেই তো সুখী হলি না। আমি বলি- চুপ কর ঠাকমা! সুখ আমার ছিল গো আগের জন্মে, যখন হরিণী ছিলাম! ঠাকমা বলে- কিন্তু তোকে তো মেরে নিয়ে গেল, মাংস খাবে বলে। সবটা কি ভুলে গেলি? তাহলে শোন, আবার বলি। একদিন জঙ্গলে কাঠ কুড়োতে এসে দেখি এক হরিণী জখম হয়ে পড়ে আছে। চলার শক্তি নেই। আমি এই জঙ্গলের গাছগাছালির পাতা এনে ওর জখম হয়ে যাওয়া জায়গাগুলোতে লাগালাম। সবুজ কচি ঘাস এনে মুখের কাছে ধরলাম। একটু একটু খেল। একটু জল খাওয়ালাম। মনে হল সে আরাম বোধ করছে। আমি ভরসা পেলাম। এরকম করে রোজ করি। একদিন সে উঠে দাঁড়াল। একদিন সে চলতে শুরু করল। একদিন সে ছুটল। তবে সে আমাকে ভুলে গেল না। যখনই আমি কাঠ কুড়োতে যেতাম, সে এসে দাঁড়াত। আমি ওকে কচি ঘাস এনে খাওয়াতাম। জঙ্গলে তো কচি ঘাসের অভাব নেই, তবু সে আমার কাছে খেতে চাইত। কিন্তু ওকে আমি লোকালয়ে নিয়ে যাইনি। অনেকে বলেছিল, ‘তোকে এত ভালবাসে ওকে পুষতে পারিস। ’ কিন্তু বনের হরিণকে বনেই মানায়, কিন্তু তারপরও ওকে ধরে রাখতে পারিনি। একদিন সে আর এল না। সরকারি বনরক্ষী বলল- শিকারির হাতে নাকি সে মরেছে। ঠাকমার ছায়া কাঁদে। বলে- তারপরই তো তোর জন্ম। ছোট থেকেই তো কত ছটফটে, আর আমাকে ছাড়া কিছু বুঝতিস না। তোর মা বাপ কাজে বেরোলে আমার কোলেই তো থাকতিস সারাক্ষণ। তাছাড়া তোকে নিয়ে জঙ্গলে এলে ঐ জায়গাটার দিকে আঙ্গুল দিয়ে কি দেখাতিস? আর এখনও ওর জায়গাটাতেই তো শুয়ে আছিস, যেখানে ও জখম হয়ে পড়েছিল! তা তুই বিয়ে কেন করলি? ওদের কথায় মানা করতে পারলি না? যখন শুনলি ছেলেটা বিয়ে করতে চাইছে না তোকে? তোর কষ্ট দেখে আমিও কাঁদছি… বলতে বলতে ছায়া মিলিয়ে যায়। আমি জঙ্গলে শুয়ে ভাবি কোনও বুনো জন্তু আমাকে মেরে ফেললে খুব ভাল। বেঁচে থাকতে চাই না তবু বেঁচে আছি। বেঁচে থাকি পাঁচির জন্যে, বেলির জন্যে। বেলিকে বিয়ে দিতে হবে, পাঁচিকে পড়াতে হবে, পাঁচি পড়তে চায়। পাঁচি নাচও শিখতে চায়। গাঁয়ের মেয়ে বঁইচি শহর থেকে নাচ শিখে এসে নাচের ইশকুল খুলেছে। পাঁচি বলে- আমিও নাচ শিখে নাচের ইশকুল খুলব। কিন্তু আমার এই মানুষের জনম ভাল লাগছে না। গায়ের রঙ আমার কালো। এই গায়ের রঙ নিয়েই দিব্যি ভাল করে বেঁচে থাকা যেত যদি আমার বিয়ে না হত। কিন্তু বিয়ে দিল ওরা। বাড়ির লোকেরা। আমি বিয়ের আগেই আমার বরকে বলতে শুনেছিলাম ‘আমি এ বিয়ে করব না, কালো পেত্নি’ আমাকে দেখে যাবার সময় তার বন্ধুদের সাথে বলছিল। কিন্তু গাঁয়ের মোড়ল মানে পাঞ্চেত প্রধান আমার বাবাকে বলছিল- তোর একটুকরো ধানের জমি সুহাসকে দিয়ে দে। তোর কালো মেয়ে কে বিয়ে করবে বল! আসলে ঐ সুহাস আমার এখনকার শাশুড়ি, দেখতে ভাল, সবাই বলে মোড়লের সঙ্গে ওর আসনাই আছে, গভীর রাতে সুহাসের বাড়ির দিকে মোড়লকে যেতে দেখা যায়। জোর করে দিয়ে দেওয়া হল বিয়ে। বাবার একটুকরো ধানী জমি নিয়ে গেল ওরা। সুহাসিনী খুব খুশি। প্রথম প্রথম আমাকে খুব আদরযত্ন করল।  রাতে শাশুড়ির ঘরে পুরুষমানুষের ফিসফিস কথা শুনতাম। শ্বশুর তো কবেই মরে গেছে। গাঁয়ের মানুষ আমরা, সবাই গরীব। একটা কি দুটো ঘর। কিন্তু সুহাসিনীর তিনটে বড়বড় ঘর। কেউ কেউ আড়ালে বলাবলি করে মোড়ল নাকি করে দিয়েছে। ওঘরে শাশুড়ি রঙ্গ করে, এঘরে নতুন বিয়ে হয়ে আসা আমার বর ঘরের বাইরে থাকে, পছন্দ হয়নি তার কালো মেয়েকে, শাস্তি সে বউকে দেবে, মা-কে কিছু বলবে না, মার জন্যেই তো তার জমি মিলল, মার জন্যেই এই গাঁয়ের মাঝে সবচাইতে বড় বাড়ি। অপছন্দের বউকে সে লাথিঝাঁটা মারবে ব্যস। তবে তার শরীরী চাহিদা থেকে আমি রেহাই পাই নি। তবু সেসব রাতে আমি খুশি ছিলাম। কেন? বর তো আমার শরীর ছুঁয়েছে! এটা কি ভালবাসা? দুটো মেয়েকে জন্ম দিলাম।ভাবলাম ধীরে বরটা  পালটে যাবে। মেয়েদুটোর তো বাবা! মায়া হবে না?

ঘন জঙ্গলের মাঝে একটু আধটু আকাশ উঁকি মেরে বলে, সেই রাতের কথা মনে পড়ে? কী ভয়ানক ছিল সেই রাত। সত্যি কী ভয়ানক! কারণ সে রাতে আকাশই তো সাক্ষী ছিল আর তো কেউ ছিল না। আমার পেটে খুব ব্যথা  করছিল। ঘর ছেড়ে বেরিয়ে এলাম। অনেক রাত তখন। রাস্তা যে দিকে জঙ্গলের দিকে গেছে সে দিকে তাকিয়ে খুব কান্না পেল। আমি হরিণী, কোন অভিশাপে এই বরের ঘরে বন্দি হয়ে আছি? কোন অভিশাপে আমার বাবার একটুকরো উর্বর ধানজমি ভোগ করছে আমার সুহাসিনী শাশুড়ি? এরা কে আমার? কেউ নয়। তবু সমাজ পাঞ্চেত জোর করে এদের সাথে জুড়ে দিল বলে আমাকে মার খেয়ে খেয়ে বাঁচতে হবে কেন? আকাশ সেদিন অন্ধকার, অনেক তারা জ্বলছে আকাশে। আমি মরতে চাইছি তখন নিজের মত করে। আগের জন্মে যেভাবে মরে গিয়েছিলাম শিকারীর হাতে সেভাবে নয়। তবে কীভাবে মরব সেটাও ঠিক বুঝতে পারছিলাম না। হঠাৎ পেছন থেকে কেউ আমায় জাপটে ধরল, তারপর লাথির পর লাথি লাথির পর লাথি। আমি চিনতে পারলাম লোকটাকে। সে আমার ফর্সা বর, যে আমায় আগাপাশতলা ঘেন্না করে। আমার নাকমুখ ফেটে রক্ত বেরোল, অচেতন হওয়ার আগে টের পেলাম আমাকে সে শূন্যে ছুঁড়ে দিয়েছে। আর তারপর সব অন্ধকার।

মরে যাইনি তবু। বেঁচে ছিলাম আধমরা হয়ে। সকালবেলা আমাকে রাস্তার লোকজনেরা উদ্ধার করেছিল। মরতে চেয়েছিলাম ঠিক, কিন্তু ওরকমভাবে নয়, একা একা মরতে চেয়েছি। কিন্তু যে মরতে চায় সে নাকি মরে না, সে নাকি যমের অরুচি হয়।

চারদিকে বড় শত্তুর। এই জঙ্গলেরও শত্তুর আছে। আমার হরিণী জন্মেও শত্তুর ছিল। তবে নাকি মানুষের অনেকরকম শত্তুর। খিদে একটা শত্তুর, ভালবাসার ইচ্ছে এটাও একটা শত্তুর, গায়ের রঙ কালো এটাও একটা শত্তুর। আরো কত শত্তুর বলে বলে শেষ করা যায় না। আর আমার কাছে সবচাইতে বড় শত্তুর বিয়ে। নাহলে আমি তো অতটা কষ্টে থাকিনি। হ্যাঁ, মেয়েজন্মটা সবচাইতে বড় শত্তুর। আমি কি পারব আমার ফরসা বরটাকে লাথির পর লাথি মেরে লাথির পর লাথি মেরে শূন্যে ছুঁড়ে দিতে? যখনই কথাটা ভাবি তখনই কাজটা করতে ইচ্ছে হয়। কিন্তু পারি না, কিন্তু কিছুই হয় না। আমি ধান রোঁয়ে চারাগাছগুলোর দিকে তাকিয়ে থাকি। সারিগুলো দেখি। পাঞ্চেতের বউও এসে দেখে। সে-ও তো আমার মতই, পাঞ্চেত রাতে সুহাসের ঘরে থাকে।

আমি এখন সুহাসের ঘরে থাকি না। মেয়েদুটোকে নিয়ে বাপের ঘরে চলে এসেছি সেই রাতেই যেদিন বর আমায় শূন্যে ছুঁড়ে দিয়েছিল। আমার বাবা আর আমাকে ওখানে যেতে দেয় নি। এখন বাবা মা কেউ বেঁচে নেই। আমি বেলি ও পাঁচিকে নিয়ে আছি। শুনছি বর নাকি আরেকটা বিয়ে করতে যাচ্ছে।

আজ অনেক রাত হয়ে গেল বেলি ফিরল না। বেলির বয়েস এখন আঠার। পড়াশোনায় মন নেই। ইদানিং একটু কেমন যেন হাবভাব। আমি খুঁজতে বেরোলাম। রাত দশটা পেরিয়ে গেছে। পাঁচিকে একা ঘরে রেখে বেরিয়েছি। সে পড়ছে মন লাগিয়ে। বেলিটা কেন যে পাঁচির মত হল না! তবে বেলি তার বাবাকে পছন্দ করত না যদিও সে দেখতে বাবার মত হয়েছে। একদিন বরটা বেলিকে বলছিল আমার সামনেই – বেলি, তোর লজ্জা করে না ঐটাকে মা বলে ডাকতে। কালো কুচ্ছিতটাকে। বেলি বলেছিল- মাকে নয়, তোমাকে আমি ঘেন্না করি। সেদিন খুব মার মেরেছিল বেলিকে আমার বর।

আমি খুঁজতে খুঁজতে জঙ্গলের দিকে চলে যাচ্ছিলাম। আমি বেলির কথা ভুলে যাচ্ছিলাম। জঙ্গল আমাকে টানছিল। জঙ্গলের গন্ধ আমাকে বিবশ করছিল। আমি আর নিজেকে মানুষ বলে ভাবতে পারছিলাম না। আমার ছুটতে ইচ্ছে করছিল। ঘন গাছপালার  ভেতর থেকে বাঁকা চাঁদ উঁকি মারছিল। কেউ একজন আমাকে বাধা দিল। কে ঠিক চিনতে পারলাম না। বলল-এত রাতে এদিকে কি! কি ব্যাপার! আমার মনে পড়ল বেলি ঘরে ফেরে নি, আমি বেলিকে খুঁজতে বেরিয়েছি। ফিরে এলাম। ফিরে এসে দেখলাম বেলি বিছানায় শুয়ে আছে। পাঁচি অঘোরে ঘুমোচ্ছে। কিছু জিজ্ঞেস করলাম না বেলিকে, কারণ তাতে পাঁচির ঘুম ভেঙ্গে যেতে পারে।

পরদিন বেলিকে কিছু জিজ্ঞেস করার আগেই পাঞ্চেত প্রধানের বাড়িতে আমার ডাক পড়ল। ভাবলাম কোনও কাজ বুঝি। যে লোকটা আমাকে ডাকতে এসেছে সে দাঁড়িয়েই আছে। খুব জরুরি? গতকাল পরপর দুটো ঘটনা ঘটেছে, এক, বেলির রাতে বাড়ি ফেরা, দুই, আমার জঙ্গলের দিকে চলে যাওয়া। লোকটা বলে-হেই জলদি চল।

মোড়ল বাড়ির সামনের চওড়া চাতালে বসে। পাশে দশ বারো জন বসে। কাছে যেতেই বলল- তোর নামে নালিশ আছে। কাল ঘোররাতে জঙ্গলে যাচ্ছিলি, কেন? আমি চুপ করে দাঁড়িয়ে রইলাম। আমার কথা কে বুঝবে! যদি বলি-জঙ্গলই আমার জায়গা, তখন ওরা আমাকে জঙ্গলেই ঠেলে দেবে। বলবে-ও ডাইনি। ওখানেই থাক বা ডাইনি সন্দেহে পাথর ছুঁড়ে মেরে ফেলতে পারে। এরকম ঘটনা এখানে আগে দু’বার ঘটেছে। যদি বলি বেলিকে খুঁজতে বেরিয়েছিলাম, তখন বেলির গায়ে কলঙ্ক লাগবে। যদি বলি আমি আগের জন্মে হরিণী ছিলাম তাহলে ওরা আমায় জিনপরী সাজাতে পারে। এই মোড়ল রাত হলে অন্য মেয়ের ঘরে যায় নিজের বউকে একা ঘরে রেখে, সবাই জানে, কিন্তু সবাই এই মোড়লের পায়েই মাথা খুঁড়ে। আমি চুপ করে রইলাম।

— সাধে কি বর মেরে তাড়িয়েছে? চরিত্তির ঠিক নয়। এই, কথা বল।

কথাটা বলল মোড়লের পাশে বসা লোকটি।

হঠাৎ ভেতর থেকে বেরিয়ে এল মোড়লের বউ, যে আমাকে ধানক্ষেতে ধানের চারা রুইতে দেখতে খুব ভালবাসে। সে চেঁচিয়ে উঠল। বলল- ওকে ছেড়ে দাও। ও তোমার জমিতে কাজ করে, আর তুমি ওকে ডেকে হেনস্তা করছ? ও বেলিকে খুঁজতে বেরিয়েছিল। ভয়ে বলতে পারছে না।

হবে না? যেমন মা! সারাদিন জঙ্গলের দিকে দৌড়য়।–আবার কেউ বলল।

মোড়ল কী যেন ভাবছে। আর এদিকে জড়ো হওয়া লোকগুলো অধীর অপেক্ষায়, একটা জোরদার শাস্তি, একটা জবরদস্ত বিচার সবটাই আমার বিরুদ্ধে যেন হয়। মনে হল মোড়লের বউ মোড়লকে কী যেন ইশারা করল। এবার মোড়ল আমাকে বলল — তুই এখন যা। কিন্তু যখনই খবর দেব, চলে আসবি।

আমি প্রায় ছুটে চলে আসলাম।

দুপুরে পাঁচি ইশকুলে বেরিয়ে যাবার পর আমি বেলিকে নিয়ে পড়লাম। বেলি কাঁদছে। বলছে- মা আমার কোনও দোষ নেই, বিশ্বাস কর। আমাকে পলাশ নিয়ে গেছে টেনে। হ্যাঁ একটু হাঁটছিলাম ওর সাথেই। আমাকে জঙ্গলে নিয়ে…কাঁদছে বেলি।

আমি শুকনো গলায় জিজ্ঞেস করলাম- জঙ্গলে নিয়ে কি?

— সব করেছে মা। আমার খুব ভয় করছে। কী হবে মা?

পলাশ মোড়লের বখে যাওয়া ছেলে। বাপ কা বেটা। আমি বেলিকে কিছু বললাম না। তবে মোড়লকে জানাতে হবে আজ, আজই। বেলি বলল-তুমি পলাশের মা-কে বল লুকিয়ে। নাহলে আমাদের বিপদ হবে।

আমি এখন জঙ্গলে শুয়ে আছি। মাথার ওপর খোলা আকাশ, অনেক অনেক তারা। আমি মরে যাবার জন্যে মাঝেমাঝে এখানে শুয়ে আকাশের কাছে বলি-আমাকে একটা তারা করে দাও।

বেলির পেটে বাচ্ছা। বেলির বিয়ে দিয়েছিল মোড়ল ওর ছেলের সাথে। খুব ভাল লোক মোড়ল? না না। সবাই বলে সুহাসের সাথে আর মোড়লের আশনাই নেই। সুহাস বুড়ি হয়েছে, আর মেজাজ হয়েছে খিটখিটে। আমার ছেড়ে আসা বরটা নাকি আবার বিয়ে করেছে। দিনরাত সুহাসের সঙ্গে বউটির ঝগড়া। মোড়ল এখন অন্য জায়গায় রাত কাটায়। মোড়লের আর কিসে অভাব! মোড়ল বলে কথা। আমাকে ডেকে নিয়ে বলল- পলাশ তোর মেয়েকে বিয়ে করতে চায়। তবে তুই পলাশকে একটুকরো ধানী জমি দিবি, বরপণ।

বললাম — আমি কোত্থেকে দেব?

মোড়ল বলল — আরে ভাবিস না, তোর শাশুড়িকে তোর বাবা একটুকরো জমি দিয়েছিল মনে আছে? ঐ জমি নাতনির বিয়েতে তোর শাশুড়ি দেবে। তুই ওদের সাথে থাকিস না। কিন্তু বেলি তো তোর শয়তান বরটার সন্তান। দিতে তো ওদের হবেই। ও নিয়ে তোকে ভাবতে হবে না। আমি সব করব। বেলি আমার ঘরে বউ হয়ে আসবে, আর আমার এতটুকু দায় নেই?

বিয়ে হল। সুহাসিনীকে জমি লিখে দিতে হল মোড়লের নামে।

বিয়ের তিনদিন পর বেলি ফিরে এসেছে। পলাশ বলেছে — তোর পেটের সন্তান আমার নয়। তুই বদ চরিত্তির মেয়ে। তোর মুখ দেখতে চাই না।

শুনছি গাঁয়ে আমাদের একঘরে করবে। পাঁচিকে নাকি ইশকুল যেতে দেবে না। শুধু মোড়লের বউ আজ বিকেলে একটুকরো কাগজে একটা ঠিকানা লিখে এনে বলল — তোরা শহরে চলে যা। এখানে ঠিকানা লিখে দিয়েছি, আমি ফোনে কথা বলেছি। ওরা তোদের একটা ব্যবস্থা করে দেবে।

ওরা কারা? কোথায় শহর কোথায় ঠিকানা কোথায় সাহায্য কে জানে!

শুধু পাঁচি বলছে সে নাকি সব ভাঙচুর করে নতুন গাঁ তৈরি করবে। পাঁচির কথা! এমনটা কি হয়!

আপনার মতামত লিখুন :

One response to “বিজয়া দেব-এর ছোটগল্প ‘অপনা মাংসে হরিণা বৈরি’”

  1. Gautam Dasgupta says:

    দারুণ একটা লেখা পড়ে প্রীত হলাম।

এ জাতীয় আরো সংবাদ

আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস বিশেষ সংখ্যা ২০২৬ সংগ্রহ করতে ক্লিক করুন


Currently Maintained by the2.dev