রাতে ঘুমোবার আগে তন্দ্রা নিজের ভেতর কিছু কিছু বস্তু গুছিয়ে নেয়— যেমন দুধসাদা ছোট্ট একটি বাক্স, যেখানে আছে অলৌকিক সাদা আলোর বিচ্ছুরণ, একটি ছোট্ট প্রশান্ত বুদ্ধমূর্তি, খুব পছন্দের একটি বিষ্ণুপুরি মৃত্তিকার গয়না সেট্, ঠান্ডা সেটি আর রঙের ভেতর ঘুম ঘুম নিঃসীম কিছু আছে। তবু ছায়াশক্তি আসে, তন্দ্রার গোছানো বস্তুগুলোকে তছনছ করে, সমস্ত প্রশান্তি ভেঙে ভেঙে যায়, খসে খসে পড়ে – অতঃপর ঘুম পালিয়ে যায়।
এমনটা হচ্ছে বছরখানেক হল। সকালবেলাতে খবরের কাগজে সব খবরগুলোতে চোখ বুলিয়ে একটি জায়গা লাল কালি দিয়ে চিহ্নিত করে রাখে। সেটি সূর্যোদয় সূর্যাস্তের সময়। সারাক্ষণ ঝিঁ ঝিঁ করে চারপাশ। আজ সূর্যোদয় হয়েছে ৬.০৬ মিনিটে, সূর্যাস্ত ৪. ৪৮মিনিটে। শীতের বিকেল চট করে মরে যায়।
তন্দ্রার বর অনীশ বড় দেখে টিভি এনেছে। স্মার্ট টিভি। তন্দ্রার ছেলেমেয়ে— তুতুল ও পাপাই, থ্রিলার সিনেমা দেখে – হাঁ হয়ে যায় দেখতে দেখতে, পারিপার্শ্বিক ভুলে যায়, চেঁচিয়ে চেঁচিয়ে ডাকতে হয় — এই তুতুল এই পাপাই খেতে আয় চানে যা কলেজ যা বাইরে যা পড়তে বোস। মাথার ভেতর ঝিঁ ঝিঁ ডাকে। পাশের মুদিখানার মেয়েটি হোম ডেলিভারি দেয় দুধের প্যাকেট ডিম চাপাতা… হাঁ করে স্মার্ট টিভি দেখে আর নিয়ে আসা বস্তুগুলো তন্দ্রার হাতে তুলে দিতে দিতে বলে — কাকিমা, তোমার কী মজা, হটস্টার, ইউ টিউব, হৈচৈ, নেটফ্লিক্স, প্রাইম ভিডিও, ডিজনি হটস্টার সব টিভিতে, সারাদিন ভালো ভালো সিনেমা দেখেই সময় কাটিয়ে দিতে পারো …
ঘুমের জন্যে আজকাল সত্যিই খুব দুশ্চিন্তা হয়। ছোটবেলার কথা মনে হয়। বিছানায় শুয়ে পড়ত লিলুকে নিয়ে। লিলু — তার পোষা বেড়াল। ছোট্ট ছোট্ট থাবা দিয়ে সে তাকে ঘুম পাড়াত। নরম মসৃণ লোমশ দেহে তার ছিল ঘুমের পেলব পরশ। এখানে বেড়ালেরা অনীশকে ভয় পায়। অনীশ কুকুর বেড়াল তেমন পছন্দ করে না।
ইদানিং অনীশের মাথায় খেয়াল চেপেছে, পুরনো গাড়িটাকে বদলে নতুন গাড়ি আনবে। পুরনো গাড়ির পেছনে রাখা কালো কুকুরটার হলুদ চোখের দিকে তাকিয়ে কেন কে জানে বুকের ভেতরটা কুলকুল করে। পুতুল ওটা, তবু চাউনিতে কিসের আর্তি? তুতুল ও পাপাই লাফাচ্ছে, নতুন গাড়ি আনো, নতুন গাড়ি আনো। তন্দ্রা ভাবছে চুপি চুপি কুকুরটাকে এনে নিজের কাছে রেখে দেবে। নাহলে ওটা সুদ্ধ অনীশ গাড়িটা দিয়ে নতুন গাড়ি নিয়ে আসবে। তুতুল কিনেছিল কুকুরটা, এখন ওটার দিকে ফিরেও তাকায় না। রিপ্লেস করার ইচ্ছে ওর। নতুন কিছু। আনকোরা নতুন।
দরজায় কে নক করছে। ডেলিভারি বয়। হাতে একটা মাঝারি মোটা সাইজের প্যাকেট। তন্দ্রা বলে— জলে ভেজা হাত, একটু মুছে আসি। — যুবকটি ফোনে কথা বলছে। তন্দ্রার কথাটা কানে গেছে মনে হল। উত্তর না দিয়ে তন্দ্রার পাশ ঘেঁষে মেঝেতে রেখে বেরিয়ে গেল।
আজ সূর্য উঠেছে ৬.০৭ মিনিটে, অস্ত যাবে ৪.৪৮ মিনিটে। ক’দিন থেকে তুতুল ও পাপাই জেদ ধরেছে বাইরে যাবে। সিঙ্কে জমানো এঁটো বাসন ধুতে ধুতে মালিনী বলে — আমাদের সুন্দরবনে যাও, বনবিবির পুজো আছে এরমধ্যেই, আমিও যাব। বনবিবির পুজো দেখে আসো, ভাগ্যে থাকলে দক্ষিণরায়ের দেখা মিলবে।
তুতুল ছুটে আসে।
বলে —
— বনবিবি কে গো?
— জঙ্গলের দ্যাবোতা। মা দ্যাবোতা।
— কখন পুজো হয়?
ঐ পোষ/ মাঘ মাসে!
— তুমি পুজো কর?
— করেছি কত। এখন ছুটি মেলে কি মেলে না। তাই… তবে ঐসময়ে তোমরা যদি যাও তবে আমি ছুটি নেব।
— বনবিবি কেন বলে? আর দক্ষিণরায়?
— এখন আর কথা বল না তো! আরও তিনটে বাড়ি… ঘরে গিয়ে রান্না করতে হবে না?
তন্দ্রা বলে — গুগল সার্চ করে দেখে নে— বনবিবি টাইপ করে সার্চ কর…
তুতুল বলে — সেই ভালো।
প্যাকেট খুলছে পাপাই। দু’চারটে মশা ওর চারপাশে বিনবিন করছে। মশা মারার ওষুধ স্প্রে করতে হবে এক্ষুনি।
সামনেই মিউনিসিপ্যাল ইলেকশন। মোড়ের মাথায় সন্ধ্যে হলেই রাজনৈতিক দলগুলোর মিটিং। রোজ রোজ। আজ ক পার্টি, কাল খ পার্টি পরশু গ পার্টি তরশু ঘ পার্টি এরকম। যত সময় যাবে তখন সকাল দুপুর বিকেল ওরকম হবে— যেমন সকালে ক পার্টি দুপুরে খ পার্টি বিকেলে গ পার্টি রাতে ঘ পার্টি। কত দোষারোপ। কত কত ভুল। কত ভুল শোধরানোর রঙবেরঙের আশাবেলুন, শীতের আবহে আকাশ বাতাসে উড়ছে। আজ শ্লোগান হচ্ছে। মনে হচ্ছে মিছিল… শ্লোগানের আওয়াজ দূর থেকে দূরে সরে যাচ্ছে, দূরে আরও দূরে। আওয়াজ ক্ষীণ থেকে ক্ষীণতর ক্ষীণতম হয়ে এল।
পাপাই কতগুলো স্মার্ট কেবল্ বের করল প্যাকেট থেকে।
— এগুলো কি রে?
— সে আছে।
অতি সংক্ষিপ্ত অস্পষ্ট উত্তর, ভগ্ন সেতুর মত। এমন নয় যে সময় ছোট হয়ে যাচ্ছে, সে তো সেই শুরু থেকে একইরকম। তবু দৃশ্যমান সময় কিংবা অনুভবের সময় ভাঙছে।
আজ সূর্যোদয় হয়েছে ৬.০৮ মিনিটে সূর্যাস্ত ৪.০৮। সন্ধ্যার পর অনীশ তন্দ্রাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেল।
ডাঃ তমোঘ্ন ষন্নিগ্রহী। ট্রিপল মাস্কে আটকানো নাক মুখ চিবুক। চশমার ভেতর বড় বড় চোখ।
— কী প্রবলেম?
— ঘুমটা কেমন ছাড়া ছাড়া, পাতলা কুয়াশার মতন, হিজিবিজি স্বপ্ন, জল কুয়াশা ডুবে যাওয়া উপর থেকে পড়ে যাচ্ছি ওরকম।
— কতদিন ধরে?
— প্রায় একবছর।
— এতদিন ডাক্তার দেখাননি?
— না।
— না? কেন?
— ভাবছিলাম সব ঠিক হয়ে যাবে।
— হুম। আপাতত এইটি খান। ঘুম হবে। আর এই এই টেস্টগুলো করিয়ে নিয়ে আসবেন। ঘুম এক আশ্চর্য ব্যাপার। স্বপ্ন তো অত্যাশ্চর্য। প্রেসক্রিপশন লিখতে লিখতে ডা.ষন্নিগ্রহী বললেন।
— কী বললেন ডাক্তারবাবু?
— ঘুম এক আশ্চর্য ব্যাপার, স্বপ্ন অত্যাশ্চর্য। — স্পষ্ট উচ্চারণে রিপিট করলেন ডাক্তার ষন্নিগ্রহী।
— কেন, প্রাণীমাত্রই তো ঘুমোয়।
— তাহলে ইনসমনিয়ার রোগী আসে কোথা থেকে? ঘুমের ওষুধ আপনাকে ঘুম দেবে আবার দেবেও না। অনিদ্রা রিপিট করবে।
— ঘুম আর ঠিকঠাক হবে না আমার?
— সে কথা বলছি না। টেস্টগুলো করান। অন্যান্য হেল্থ ইস্যু অনিদ্রার কারণ হতে পারে।
— ডাক্তার কী বলল ঘুম নিয়ে? – রাতে বিছানায় শুয়ে পড়ার পর অনীশ জিজ্ঞেস করল।
— ঘুম এক আশ্চর্য ব্যাপার, স্বপ্ন অত্যাশ্চর্য। — তন্দ্রা রিপিট করল।
অনীশ আধো অন্ধকার ঘরের ভেতর তন্দ্রাকে খুঁটিয়ে দেখে। বলে — হুম।
এবার সে ঘন হয়ে আসে। বলে — কীসব হাবিজাবি ভাবো। ভালো করে সেক্স করলে না ভালো ঘুম হয়! তোমার তো আবার এখন নয় তখন নয়.. শুচিবাই আছে।
তন্দ্রার মনে হয় কথাগুলো অনীশ অনেকবার বলেছে। রিপিট করছে।
অনীশ ঘুমোচ্ছে। পাশের ঘরে তুতুল পাপাই ঘুমোচ্ছে। একসময় তন্দ্রা তন্দ্রাচ্ছন্ন হল। ঘুম আসছে। ডাক্তার ষন্নিগ্রহীর ছোট্ট দানার মত ওষুধ কাজ করতে শুরু করেছে। ছায়াশক্তিগুলো মৃদু হেসে সরে যেতে যেতে বলল — আপাতত। উই উইল রিপিট।
আজ সূর্যোদয় হয়েছে ৬.০৯ মিনিটে। মালিনী ঝনঝন শব্দে ট্রে ফেলল মেঝেতে। স্টিলের ট্রে-টা।ওটা মেঝেতে পড়লে কানে ঝিঁঝি ধরে।
— কী ফেললে মালিনী?
— ট্রে। পড়ে গেল। — নির্বিকার মালিনী।
অনীশ বলে — ঘুমের ওষুধ না খেয়ে বিকেলের দিকে একটু লম্বা রাস্তায় হেঁটে এসো।
বিকেলে হাঁটতে গেল তন্দ্রা। সন্ধ্যে থেকে রাজনৈতিক দলগুলোর প্রচার চলছে জোরদার। পথের মোড়ে ক্লাবটার সামনে। আজ গুগল সার্চ করে দেখেছে সে ঘুম না হলে কী কী করা উচিত।
১. ঘুমের জন্যে ছটফট করা উচিত নয়।
২. ঘুম যখন আসছে না তখন ঘুমের অপেক্ষায় না থেকে বিছানা ছেড়ে বই পড়তে হবে।
৩. রোজ ঘুমের ওষুধ খাবে না তাতে চিরস্থায়ীভাবে ঘুম পালাতে পারে।
৪. ঘুমের আগে একগ্লাস গরম দুধ খেয়ে দেখতে পারো।
৫. হালকা মিউজিক চালিয়ে দেখতে পারো।
৬. ১০০ থেকে কাউন্টডাউন করে দেখতে পারো।
তন্দ্রা ফিরছে সান্ধ্য ওয়াকিং শেষ করে। মোড়ের মাথায় এসে আবার মাথায় ঝিঁ ঝিঁ। প্রচার তুঙ্গে। হাই কোয়ালিটি মাইক্রোফোন। চারদিক শব্দতরঙ্গে উত্তাল ভাসছে। কানে এল বক্তা বলছে—”ওরা কিছুই মানে না। গুরুজন মারা গেলে ন্যাড়া হয় না….” তন্দ্রা ফিরে তাকাল। বক্তা লোকটি কালোমতন, পুরু ভুরু, মাথায় খাটো, বয়েস এই চল্লিশ/বিয়াল্লিশ। আশ্চর্য হলেও সত্যি, তন্দ্রার সঙ্গে চোখাচোখি হল। কিছু শ্রোতা বসে, কিছু দাঁড়িয়ে, ছড়িয়ে ছিটিয়ে।
বাড়ি ফিরে দেখা গেল তুতুল আর পাপাইয়ের তুমুল যুদ্ধ চলছে গাড়ির রং পছন্দ নিয়ে। পোলার হোয়াইট আলফা গ্রিন আরও কীসব রঙের নাম কী জানি কখনও শোনে নি তন্দ্রা।
আজ সূর্যোদয় ৬.১০ মিনিটে।
গাড়ির বিশাল শোরুম। চমৎকার অফিস। ইউনিফর্মপরা চৌকস মেয়েরা… কথা তো বলছে না মুখে খই ফুটছে। একটিও বাড়তি কথা নেই… কী চমৎকার প্রফেশনাল এরা। তন্দ্রা চেয়ারে বসতে গিয়ে নিচে মানে মেঝেতে ধপাস করে বসে গেল। হুইল লাগানো চেয়ারটি সরে গেছে পেছনে। কী লজ্জা তুতুলের মুখ লাল… পাপাই মুখ ঘুরিয়ে নিয়েছে লজ্জায়… অনীশের বিরক্ত মুখ… কী হল? দেখে বসবে তো?
— ম্যাম উঠুন চোট লেগেছে? — কী সুন্দর সাজানো মুখশ্রী, চমৎকার হেয়ারস্টাইল, তন্দ্রার হাত ধরে ওঠালো। তাকে চেয়ারে বসিয়ে একটু ভেতরপানে গেল। এই সুযোগে অনীশ চাপাস্বরে হালকা ডেমোস্ট্রেশন দিল — কীভাবে বসতে হয় দ্যাখো, বাঁপায়ে চেয়ারের পায়া আগে চেপে ধরবে এইভাবে তারপর দুহাতে হাতল চেপে ধরবে এইভাবে তারপর দেহটা চেয়ারে ছাড়বে। কিছু হয় নি তো?
— তেমন কিছু নয়।
আচ্ছা, কুকুরশুদ্ধ আগের গাড়িটা ভেতরপানে চলে গেছে? অনীশ তাকে ওটা সরাতে দেয়নি। বলেছিল পরে হবে ওসব। বলেছিল — এটাকে হাতে নিয়ে শোরুমে ঢুকবে নাকি? এখন কুকুরটি একা একা.. চোখে জল এল তন্দ্রার।
কাগজপত্র সই ইত্যাদি কথাবার্তা এটা ওটা ইত্যাদি অতঃপর ‘ম্যাম এই নিন গাড়ির চাবি’ আরেকজন মহিলা স্টাফের হাতে পুজোর থালা। সাজানো গাড়িতে পুজোর থালা ঠেকানো হল, ছুঁইয়ে দেওয়া হল থালার ফুল, লাগানো হল সিঁদুরের ফোঁটা পরপর পরপর অন্তত পাঁচটি। দ্রুত আরতিও হল। এখন চাবির মডেলের একপ্রান্ত ধরেছে তন্দ্রা অপরপ্রান্ত ধরেছে কোটপ্যান্ট পরা এক চৌকস যুবক। ক্যামেরায় আলো ঝলসে উঠল কয়েকবার। পোজ দিয়ে দাঁড়িয়েছে অনীশ পাপাই তুতুল সেই পূজারিণী আরও জনা দশেক শোরুমের স্টাফ।
— ম্যাম সব ছবি হোআটস অ্যাপে পাঠিয়ে দেব। — অতঃপর নতুন ফোর হুইলার বাড়ি এল। আগের গাড়িটার ভেতর একা কুকুরটি…
রাতে মালিনীর ফোন এল – আগামী তিনদিনের ছুটি চাই বৌদি, বড় মেয়েটার খুব অসুখ, জামাই বাড়ি নেই।
মালিনীর বড়মেয়ের বর খুব খারাপ। মেয়েটিকে মারধর করে।পরনারীর সাথে রাত্রিযাপন করে। এমনিতেই মালিনী খুব শক্ত টাইপের মানুষ। পোড়ামাটির মত গায়ের রঙ। আমফান ঝড়ে তার ঘরদোর উড়ে গেছে, পানের খেত নষ্ট হয়েছে লোনা জলে, প্রায় হপ্তাখানেক সে বাড়ির লোকজনের কোনও খবরাখবর পায় নি। তার স্বামী দুই মেয়ে এরা বেঁচে আছে কিনা তাও সঠিক জানে না তবু সে নিজের কাজটুকু করে গেছে নির্বিকার, তন্দ্রাই বারবার জিজ্ঞেস করত, নিজের থেকে মালিনী এতটুকু হা হুতাশ করেনি।
তুতুল বলে — সুন্দরবনে যাবে না? কবে যাবে? বনবিবির পুজো দেখতে যাবে?
তুতুলের লোকায়ত দেবতা, প্রান্তিক জীবনে খুব আগ্রহ আছে। ওর ডাইরি আছে। ডাইরিতে টুকটাক লিখে রাখে।
বলে — মালিনী বলছে ওদের ঘর যেখানে তার কাছাকাছি হোটেল আছে, কাছাকাছিই বেশ বড় করে বনবিবির পুজো হয়। জানো, বনবিবির পুজো সবাই করে, হিন্দু মুসলমান নির্বিশেষে। বাঘের আক্রমণ থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যে সুন্দরবনে যারা মধুসংগ্রহে যায় গভীর জঙ্গলে যারা কাঠ কাটতে যায় তারা বনবিবির পুজো করে যায়। বনবিবি হিন্দুধর্মের দেবী আবার মুসলমানদের পীরানি।
— আর দক্ষিণরায়? — পাপাই জিজ্ঞেস করে।
— দক্ষিণরায় নামে এক নিষ্ঠুর রাজা বাঘের ছদ্মবেশে মানুষের ওপর হামলা চালাত।
— বাপরে এ তো দেখছি পরতে পরতে কাহিনি।
— কাহিনি প্রবাদ কিংবদন্তি! কী নেই রে, নিষ্ঠুরতা পাশবিকতা যেমন আছে তেমনি মানুষের মানুষ হয়ে ওঠার গল্পও আছে।
— হুম। অতশত বুঝি না। সুন্দরবনে কত গেছি। নতুন জায়গা দ্যাখ।
— ধুর। তোর সঙ্গে আমার হবে না। তুই বাড়ি থাক। আমরা ঘুরে আসব।
অনীশ ধমক দেয় — আবার শুরু করেছিস? চুপ কর তোরা।
অনীশ বেরিয়ে যায়। পাপাই নিজের ঘরে যায়।
তুতুল তন্দ্রার কাছে সরে আসে। বলে – কবে যাবে মা? গেলে কিন্তু বনবিবির পুজোতে। আমি কিন্তু মালিনীর ঘর দেখে আসব।
— মালিনীর ঘর দেখে কী হবে?
— ডাইরিতে লিখব।
— আচ্ছা।
— কোথায় যাবে?
— বনবিবির পুজোয়। মালিনীর বাড়ির কাছে।
— তোমার ইচ্ছে আছে তো?
— আছে হয়ত।
— তোমার নিজের ইচ্ছেটা কি? আমার ইচ্ছের রিপিট করছ না তো?
— রিপিট করলেই বা দোষ কি?
— মানে?
— মানে কিছু নেই, কোনই মানে নেই— দ্যাখ, তোর মতই শৈশব কৈশোর ছিল আমার…
— আমার মত? তাহলে যে বলো আমাদের সময় ঐরকম ছিল তোমাদের সময় এরকম।
— এটাও আমার মা আমাকে বলত… ঐ রকমফের আর কি! সকাল দুপুর বিকেল একইরকম, ঋতুপরিবর্তনও একইরকম। মানুষের চেহারার আদল কারো সাথে কারো বা কারোর মিলেই যায়।আবহাওয়া অনুযায়ী মানুষের গায়ের রং মাথার চুল চোখ একইরকম।
তুতুল চিন্তিতমুখে তন্দ্রাকে দেখে, তারপর বলে — অতশত বুঝে কাজ নেই, বেশ ইচ্ছে টিচ্ছে সবই রিপিটেশন। হোক গে। বনবিবির পুজো দেখতে যাব, ব্যস।
আজ সূর্যোদয় ৬.১১ মিনিটে, সূর্যাস্ত ৪.৪৯ মিনিটে।
রাজনৈতিক প্রচার জোরদার আজ। ক্লাবের মোড়ে ক পার্টি, কালভার্টের মোড়ে খ পার্টি, বড়রাস্তার মোড়ে গ পার্টি আর ঘ পার্টি গান বেঁধে মাইকে প্রচার করছে।
রাতে ডাক্তারের দেওয়া বিন্দুবৎ সাইজের একটা ট্যাবলেট খেতেই হল তন্দ্রার।” ঘুম বড় আশ্চর্যের স্বপ্ন তো অত্যাশ্চর্য” কথাটা মস্তিষ্কে পুনরাবৃত্ত হওয়ায় মুচকি হাসল তন্দ্রা। ছায়াশক্তি মৃদু হেসে দূরে সরে যেতে যেতে বলল – আপাতত আজকের জন্যে। উই উইল রিপিট….।
২২৫ পূর্বাচল রোড নর্থ। কলকাতা – ৭০০০৭৮।