সুতকাগেনদর নিয়ে ভারতের কোনও হরপ্পাবিশেষজ্ঞ কোনও কাজ করেননি। কেন করেননি, তাঁরাই জানেন। যেহেতু জায়গাটি পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে, তাই তাঁদের উৎসাহ নেই। ১৯৬০-এর পরে সেখানে কোনও খননকার্যও হয়নি। এটি সিন্ধু সভ্যতার পশ্চিমতম কেন্দ্র। ইরানের লাগোয়া। তাই মেসোপটেমিয়া থেকে হরপ্পাসভ্যতার অন্যান্য কেন্দ্রগুলির চেয়ে এই অঞ্চলের দূরত্ব সবচাইতে কম ছিল। দ্বিভাষিক লিপি বা রোসেটা স্টোনের খোঁজ এখানে মেলার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। যে দ্বিভাষিক লিপির অভাবে হরপ্পাসভ্যতার লিপি তথা সিন্ধুলিপির রহস্যোদ্ঘাটন সম্ভবপর হচ্ছে না, সেই দ্বিভাষিক লিপি হয়তো এখানেই মিলতে পারে।
১৮৭৫-এ মেজর এডওয়ার্ড মকলার আবিষ্কার করলেও ১৯২৮-এ অরেল স্টেইনের (Aurel Stein) আগে কেউ সেখানে সেরকম খননকার্য চালাননি। পরে জর্জ এফ ডেলস সাহেব আরও বিস্তৃতভাবে খননকার্য করেছিলেন ১৯৬০-এ। তার পর থেকেই প্রত্নতাত্ত্বিক মহলে এ নিয়ে দীর্ঘ নীরবতা।
সিন্ধুসভ্যতার (Indus Valley Civilization) লিপি আজও আমাদের কাছে এক অপার রহস্য হয়ে রয়ে গেছে। শত শত মুদ্রা, পাত্র এবং অন্যান্য জিনিসপত্রে এই লিপি পাওয়া গেলেও, এখনও পর্যন্ত এটির সম্পূর্ণভাবে পাঠোদ্ধার করা যায়নি। এই রহস্য ভেদ করার অন্যতম কার্যকর উপায় হতে পারে একটি দ্বিভাষিক লিপির আবিষ্কার—একই পাঠ দুইটি ভাষায় বা লিপিতে লেখা, যেমন রোসেটা স্টোনের সাহায্যে প্রাচীন মিশরের হায়ারোগ্লিফ লিপি পাঠোদ্ধার সম্ভব হয়েছিল।
অনেক হরপ্পা প্রত্নস্থানের মধ্যে সুতকাগেনদর (বর্তমান পাকিস্তানের বেলুচিস্তানে অবস্থিত) এমন একটি স্থান যেখানে এই ধরনের দ্বিভাষিক লিপি পাওয়ার সম্ভাবনা সবচেয়ে বেশি। এর পেছনে মূল কারণগুলো হলো: সুতকাগেনদরের ভূগোলগত অবস্থান, সংস্কৃতির বিনিময়ের প্রমাণ, নগর পরিকল্পনা, এবং এর ঐতিহাসিক প্রেক্ষাপট। এই সকল বিষয় একত্রে এটিকে এমন এক স্থান হিসেবে গড়ে তোলে যেখানে দুই ভিন্ন সভ্যতার মধ্যে লিখিত যোগাযোগ ঘটতে পারে এবং সেখান থেকে একটি দ্বিভাষিক দলিল রচিত হতে পারে।

সুতকাগেনদর ছিল হরপ্পা সভ্যতার পশ্চিম সীমান্তে অবস্থিত, আরব সাগরের উপকূলে। দাস্ত নদীর মোহনার কাছে অবস্থিত হওয়ায় এটি একটি গুরুত্বপূর্ণ সমুদ্রবন্দর হিসেবে কাজ করত। প্রত্নতাত্ত্বিক প্রমাণে দেখা গেছে যে হরপ্পাবাসীরা মেসোপটেমিয়া (বর্তমান ইরাক), এলাম (ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিম অঞ্চল), ওমান এবং সম্ভবত আরও দূরবর্তী অঞ্চলের সঙ্গে বাণিজ্য করত।
মেসোপটেমীয় পুঁথিতে “মেলুহা” নামক একটি অঞ্চলের উল্লেখ পাওয়া যায়, যেটিকে বেশিরভাগ গবেষক হরপ্পা সভ্যতার সঙ্গে যুক্ত করেন। এই বাণিজ্যের মাধ্যমে পণ্য যেমন কার্নেলিয়ান, তামা, ল্যাপিস লাজুলি এবং তুলা রপ্তানি হত। যখন দুটি লিখিত ভাষায় দক্ষ সভ্যতা বাণিজ্যে লিপ্ত হয়, তখন দ্বিভাষিক লিপি তৈরি হওয়া একান্তই স্বাভাবিক—বিশেষ করে বাণিজ্যিক নথি, চালান বা চুক্তিপত্র হিসেবে। সুতকাগেনদর ছিল এই ধরনের আন্তঃসভ্যতা যোগাযোগের এক আদর্শ স্থান।
সুতকাগেনদরে খুঁজে পাওয়া শিল্পকর্ম ও বস্তুগুলি শুধুমাত্র হরপ্পা সংস্কৃতির নয়, বরং বিদেশি প্রভাবের ইঙ্গিতও দেয়। যেমন মেসোপটেমিয়ায় পাওয়া একটি সিলমোহর, যাতে মেলুহার একজন বণিককে দেখানো হয়েছে এবং সেখানে সিন্ধু উপত্যকার আদলে খোদিত চিহ্ন দেখা যায়।
এই ধরনের আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের মধ্যে পারস্পরিক বোঝাপড়ার জন্য কিছু ক্ষেত্রে দ্বিভাষিক লিপি থাকা আবশ্যক ছিল। সুতকাগেনদর যেহেতু আরব সাগরের উপকূলে অবস্থিত এবং বাণিজ্যের অন্যতম কেন্দ্র ছিল, তাই এখানে এমন দলিল রচিত হওয়ার সুযোগ বেশি।
সুতকাগেনদরের পরিকল্পিত শহর কাঠামো—দুর্গ ও নিচু শহর নিয়ে—মহেঞ্জোদারো বা হরপ্পার মতো অন্যান্য বড় শহরের সঙ্গে সাদৃশ্যপূর্ণ। এতে বোঝা যায়, এটি কেবল একটি ছোট বাণিজ্যকেন্দ্র নয়, বরং একটি সংগঠিত প্রশাসনিক কেন্দ্রও ছিল।
এখানে গুদামঘর ও নৌঘাটির প্রমাণ পাওয়া যায়, যা বাণিজ্যের সুনির্দিষ্ট পরিচালনার ইঙ্গিত দেয়। এই ধরনের সংগঠিত কাঠামোর মধ্যে লিখিত দলিল, বিশেষ করে বিদেশি বণিকদের সঙ্গে বাণিজ্য সম্পর্কিত, অনিবার্যভাবে প্রয়োজনীয় ছিল। এই পরিস্থিতিতে একটি দ্বিভাষিক লিপি—হরপ্পা ও অন্য কোনও ভাষায়—তৈরি হওয়াটা খুবই সম্ভব।
সুতকাগেনদরের অবস্থান ছিল এলাম অঞ্চল (বর্তমান ইরানের দক্ষিণ-পশ্চিমাংশ)-এর খুব কাছেই। এলাম সভ্যতা ছিল একটি লিখিত ভাষা সম্বলিত সভ্যতা, যারা প্রোটো-এলামাইট, কিউনিফর্ম প্রভৃতি লিপি ব্যবহার করত।
হরপ্পা ও এলামের মধ্যে যদি সরাসরি যোগাযোগ থেকেও থাকে, তাহলে সুতকাগেনদরই সেই সম্ভাব্য সংযোগস্থল। সেই প্রেক্ষিতে এখানে কোনও দ্বিভাষিক দলিল যেমন চুক্তিপত্র বা লেনদেনের রেকর্ড লেখা হতে পারে, যেখানে একটি অংশ হরপ্পা লিপিতে এবং অন্য অংশ এলামাইট বা আক্কাদীয় লিপিতে লেখা।
ইতিহাসে এমন বহু উদাহরণ রয়েছে যেখানে বন্দর নগরীগুলিতে দ্বিভাষিক বা বহু ভাষার লিপি তৈরি হয়েছে। যেমন :
রোসেটা স্টোন — গ্রিক, ডেমোটিক ও হায়ারোগ্লিফিক তিন ভাষায় লেখা, মিশরের এক বহু-সংস্কৃতির শহরে আবিষ্কৃত হয়।
বেহিসতুন শিলালিপি — ইরানে তিন ভাষায় লেখা (পুরাতন পার্সীয়, এলামাইট, এবং ব্যাবিলোনীয়)।
উগারিত ও এবলা — এগুলি ছিল আন্তর্জাতিক বাণিজ্যের কেন্দ্র এবং বহু ভাষায় লিখিত দলিল সংরক্ষণ করত।
এইসব উদাহরণ থেকে দেখা যায়, যখন একটি শহর বিভিন্ন সংস্কৃতির মিলনস্থল হয়, তখন ভাষার পার্থক্য দূর করতে দ্বিভাষিক লিপির প্রয়োজনীয়তা দেখা যায়। এই দিক দিয়ে সুতকাগেনদর ছিল একটি আদর্শ মিশ্রসংস্কৃতির জায়গা।
সুতকাগেনদর এখনও পর্যন্ত হরপ্পার অন্যান্য প্রধান নগরীর মতো বিস্তৃতভাবে খনন করা হয়নি। এই অল্প খননের মানে, সেখানে অনেক কিছু এখনও মাটির নিচে লুকিয়ে থাকতে পারে। আধুনিক প্রযুক্তি যেমন স্ট্র্যাটিগ্রাফি, রিমোট সেন্সিং ও 3D ম্যাপিং ব্যবহার করে খনন করলে সম্ভাবনা অনেক বাড়বে।
হরপ্পা লিপি এখনও অপাঠ্য, কিন্তু এর পাঠোদ্ধারের চাবিকাঠি হতে পারে একটি দ্বিভাষিক লিপির আবিষ্কার। সুতকাগেনদরের পটভূমিকা, উপকূলবর্তী অবস্থান, প্রশাসনিক কাঠামো, আন্তঃসংস্কৃতি সংযোগ ও ভবিষ্যৎ খননের সম্ভাবনা এটিকে সেই ধরনের সন্ধানের জন্য সবচেয়ে সম্ভাবনাময় স্থান করে তোলে। এটি কেবল হরপ্পা সভ্যতার এক প্রান্তিক শহর নয়, বরং সম্ভাব্যভাবে দক্ষিণ এশিয়ার রোসেটা স্টোন-এর স্থান। তাই এই স্থানটির প্রতি নতুন করে গুরুত্ব দিয়ে প্রত্নতাত্ত্বিক অনুসন্ধান করা প্রয়োজন, কারণ এখানে হয়তো লুকিয়ে আছে হারিয়ে যাওয়া এক প্রাচীন ভাষার সন্ধানলিপি।
আমাদের গবেষকরা যে যার নিজের মতো করে ব্যাখ্যা দিচ্ছেন সিন্ধুলিপির। চটজলদি ফল লাভের আশায় এ আই ব্যবহার করছেন অনেকে। গ্রামভারি আলোচনা লিখছেন নেচারের মতো পত্রিকায়। কিন্তু তারপরেই সব কারিকুরি থেমে যাচ্ছে। দ্বিভাষিক লিপির সন্ধানে আরও প্রত্নতাত্ত্বিক খননের কথা কেউ বলছেন না। কারণ তাতে তো আর ব্যক্তিগত লাভ নেই, সেটায় আছে সমষ্টিগত প্রাপ্তি। অতএব আমরা যে তিমিরে, সেই তিমিরেই।