সিন্ধুসভ্যতার লিপির পাঠোদ্ধার এখনও সম্ভব হয়নি।অনেক আকাশকুসুম কল্পনা ও অনেক প্রচারসর্বস্ব দাবি আছে যদিও। সুতকাগেনদর নামক নগরের কথা অবশ্যই বলা উচিত এ প্রসঙ্গে। যেখানে প্রাপ্ত স্টোন ভেসেল বা পাথরের জারের গায়ের উৎকীর্ণ লিপির মধ্যে কোনও একটায় দ্বিভাষিক লিপি থাকতেই পারে। মিশরীয় হাইরোগ্লিফিক লিপির পাঠোদ্ধার হয়েছিল পাথরের রসেট্টা স্টোনের গায়ে উৎকীর্ণ ত্রিভাষিক লিপির সাহায্যে। স্টোন ভেসেলের গায়ে উৎকীর্ণ দ্বিভাষিক লিপির সাহায্যে পাঠোদ্ধার করা হযেছিল প্রাচীন গ্রিসের ভাষারও।
সুতকাগেনদর অবস্থিত পাকিস্তানের বালুচিস্তান প্রদেশের মাকরান উপকূলবর্তী অঞ্চলে, ইরানের সীমান্তের কাছে। এটি সিন্ধুসভ্যতার পশ্চিমতম নগর। এটি বর্তমান ‘পাঞ্জগুর’ জেলার কাছাকাছি, হালকা মরুভূমিসদৃশ এক অঞ্চলে। এর অবস্থান ছিল উপকূলের খুব কাছেই, দাস্থ নদীর তীরে। এটি এমন এক স্থানে যেখানে পাহাড়, মরুভূমি ও নদী একত্রে মিশেছে। এখান থেকে আরব সাগর খুব দূরে নয়, যা এটিকে একটি কৌশলগতভাবে গুরুত্বপূর্ণ বন্দরনগরীতে পরিণত করেছিল। এর পশ্চিমে রয়েছে কাসি ও হেলমন্দ নদী উপত্যকা, যেখান থেকে সেতু হয়ে আফগানিস্তান ও ইরানের মধ্যে যোগাযোগ গড়ে উঠেছিল।

সুতকাগেনদর প্রথম প্রত্নতাত্ত্বিকভাবে শনাক্ত করা হয় ১৯২৭ সালে ব্রিটিশ প্রত্নতত্ত্ববিদ স্টেইন (Sir Marc Aurel Stein)-এর মাধ্যমে। পরবর্তীতে পাকিস্তানের প্রত্নতত্ত্ব বিভাগ ও আন্তর্জাতিক প্রত্নতাত্ত্বিক দলগুলো ১৯৬০-এর দশকে সাইটটি আরও বিস্তৃতভাবে খনন করে। খননে ধ্বংসপ্রাপ্ত প্রাচীর, ইঁটের নির্মাণ, ধাতব দ্রব্য, স্টোন ভেসেল বা পাথরের পাত্র, শিলমোহর ও সিরামিক নিদর্শন পাওয়া যায়, যা দেখে নিঃসন্দেহ হওয়া যায় সুতকাগেনদর ছিল হরপ্পা-সভ্যতার একটি গুরুত্বপূর্ণ উপনগর।
সুতকাগেনদরের স্থাপত্যে হরপ্পা ও মহেঞ্জোদারোর মতই বৈশিষ্ট্য দেখা যায় — সুশৃঙ্খল নগর পরিকল্পনা, কাঁচা ইটের গৃহ, বৃহৎ প্রাচীর ও কৃত্রিম জলাধার। নগরটি প্রায় ৪ কিমি দীর্ঘ এবং ১ কিমি চওড়া ছিল। এর চারপাশে মজবুত প্রতিরক্ষা প্রাচীর নির্মিত ছিল, যা বিদেশি আক্রমণ থেকে রক্ষা করত। নগরের ভেতরে বড় রাস্তা ও সরু অলিগলি ছিল, যেগুলি পরিকল্পিতভাবে সাজানো ছিল।
এ নগরে জল সরবরাহ ও নিষ্কাশনের জন্য উন্নত নিকাশী ব্যবস্থা ছিল। খননে আবিষ্কৃত কূপ, পাথরের নির্মিত নালা, এবং জলাধার প্রমাণ করে যে বাসিন্দারা জলের গুরুত্ব গভীরভাবে অনুধাবন করতেন।
সুতকাগেনদর মূলত একটি বন্দরনগরী হিসেবে কাজ করত, যা সিন্ধুসভ্যতার বাণিজ্য সম্প্রসারণে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করেছিল। এখান থেকে আরব সাগর ও পারস্য উপসাগরীয় অঞ্চলগুলোর সঙ্গে সমুদ্রপথে যাতায়াত সম্ভব ছিল। এখানকার ধ্বংসাবশেষে মেলে নানাবিধ ধাতব দ্রব্য,মূল্যবান পাথরের জপমালা, খোদাই করা শিলমোহর, যা বাণিজ্যিক ক্রিয়াকলাপের প্রত্যক্ষ প্রমাণ।
বিশেষ করে ল্যাপিস লাজুলি (নীলকান্তমণি), কার্নেলিয়ান, তামা ও শাঁখজাত দ্রব্য এখানে পাওয়া গেছে, যেগুলোর উৎস ছিল পূর্ব আফগানিস্তান ও ইরান। এটি সহজেই বোঝা যায় যে, সুতকাগেনদর একটি আন্তর্জাতিক বাণিজ্য কেন্দ্র ছিল, এবং সিন্ধুসভ্যতার পণ্য বিশ্বের বহু প্রান্তে পৌঁছে যেত এর মাধ্যমে।
সুতকাগেনদরের প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শনে পাওয়া যায় হরপ্পার মত স্টোন ভেসেল, সিলমোহর, পোড়ামাটির খেলনা, ও অলংকার (বালা ইত্যাদি)। এতে বোঝা যায়, নগরটির সংস্কৃতিগত দিক থেকে হরপ্পার সঙ্গে গভীর সম্পর্ক ছিল। তবে স্থানীয় সংস্কৃতির প্রভাবও এখানে অনুপস্থিত ছিল না। বিশেষত, সিরামিক তৈজসপত্রে স্থানীয় আঞ্চলিক শৈলীর ছাপ পাওয়া যায়, যা উপকূলীয় ও মরু অঞ্চলের সংস্কৃতির সঙ্গে সেতুবন্ধন গড়ে তোলে।

সুতকাগেনদর কৌশলগত গুরুত্ব ছিল বিরাট গুরত্বপূর্ণ জায়গা। এটি শুধুমাত্র বাণিজ্যিক যোগাযোগের জন্যে নয়, পশ্চিম দিক থেকে আসা বহির্গামীদের বিরুদ্ধে একটি প্রতিরক্ষা কেন্দ্র হিসেবেও ব্যবহৃত হতো। পারস্য, আফগানিস্তান ও আরব অঞ্চল থেকে আগত বণিক বা আগ্রাসীদের বিরুদ্ধে সিন্ধুসভ্যতার এই পশ্চিম প্রান্ত ছিল একটি প্রাকৃতিক দুর্গ।
অন্যান্য হরপ্পা নগরগুলোর মতো সুতকাগেনদরও হঠাৎ করেই পতনের মুখোমুখি হয়। পরিবেশগত পরিবর্তন, ভূমিকম্প, জলাভাবে কৃষিভিত্তিক অর্থনীতির ধস, বা সমুদ্রপথের পরিবর্তন এই পতনের কারণ হতে পারে। যদিও এখানে ধ্বংসের নির্দিষ্ট প্রমাণ মেলে না, তবে নগরটির পরিত্যক্ত হওয়ার চিহ্ন পাওয়া গেছে।
সম্ভবত এখানেই প্রত্নতাত্ত্বিক খননে মিলতে পারে এখনও পর্যন্ত না মেলা দ্বিভাষিক লিপির বয়ান। কারণ এটি একটি সীমান্তবর্তী অঞ্চল। এখানে পাশাপাশি দুটি ভিন্নভাষী ভূখণ্ডের (ইরান তথা পারস্য ও সিন্ধুসভ্যতার বালুচিস্তান) লোকেরই আনাগোনা ছিল। সমস্ত সীমান্তবর্তী নগরের মতো এখানকার পাথুরে সাইনবোর্ড বা দেওয়ালে উৎকীর্ণ লিপিতে দুটি ভাষার উল্লেখ থাকার সম্ভাবনা খুবই। যেটির একটি ফার্সির পূর্বসূরী কোনও ভাষা ও একটি সিন্ধুলিপি হতেই পারে।