দেশের সর্বোচ্চ আদালত বিলকিস বানো ধর্ষণ মামলায় যাবজ্জীবন সাজাপ্রাপ্ত ১১ জনকে দু’সপ্তাহের মধ্যে জেলে ফেরানোর নির্দেশ দিয়েছে। বিচারপতিরা বলেছেন, গুজরাত সরকার নিজের ক্ষমতার অপব্যবহার করেছে, অপরাধীদের সঙ্গে তাল মিলিয়েছে। কিন্তু রায়ের পর থেকেই অপরাধীরা নিখোঁজ। গুজরাতের দাহোদ জেলার রন্ধিকপুর এবং সিংভাদ গ্রামে তাঁদের বাড়িতে তালা ঝুলছে। কেউ জানে না কোথায় তারা গা ঢাকা দিয়েছে। অথচ ২০২২ সালের ১৫ অর্থাৎ যেদিন গুজরাতের বিজেপি সরকারের সৌজন্যে গণধর্ষণ এবং খুনের মামলার অপরাধীরা মুক্তি পেল, সেদিন সঙ্ঘ পরিবারের যে কর্মী-সমর্থকরা ফুলের মালা পরিয়ে, কপালে তিলক কেটে, মিষ্টি বিতরণ করে, ডিজে বাজিয়ে ধর্ষক-খুনিদের সংবর্ধনা দিলেন তারাও জানেন না।
প্রসঙ্গত, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তখন গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী। পুলিশ ও প্রশাসনের সহযোগিতায় সংঘটিত হয়েছিল গুজরাট দাঙ্গা। বলা ভাল সুপরিকল্পিত উপায়ে সংঘটিত হয়েছিল মুসলিম গণহত্যা অভিযান। ২৮ ফেব্রুয়ারি, ২০০২ সবরমতি এক্সপ্রেস অগ্নিকাণ্ডের পর গ্রাম ছাড়ে বিলকিস বানোর পরিবার। ২১ বছরের বিলকিস সপরিবারে পালিয়ে প্রাণ বাঁচানোর চেষ্টা করেন। কিন্তু পারেন না, ৩ মার্চ, দাহোদ জেলার লিমখেড়া, হিন্দুত্ববাদী দাঙ্গাবাজ খুনিদের কবলে পড়েন বিলকিস ও তাঁর পরিবারের ৬ সদস্য। দাঙ্গাবাজরা বিলকিসের সামনে জয় শ্রীরাম ধ্বনি তুলে আকাশ বাতাস কাঁপিয়ে একে একে খুন করে তাঁর পরিবারের ৬জনকে ও অন্য আরও ৮ জনকে। পাথরে আঁছাড় মেরে খুন করে বিলকিসের তিন বছরের শিশু কন্যাকে। এরপর রামভক্ত ধর্ষক-খুনিরা ছ’মাসের অন্তঃসত্ত্বা বিলিকিসের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ে তাঁকে ধর্ষণ করে।
গুজরাটের মোদী সরকারের পুলিশ বারবার বিলকিসের মামলা নথিভুক্ত করতে অস্বীকার করে, প্রমাণের অভাবের অজুহাত দেখায় এবং হুমকি দিয়ে বলে যে, যদি বিলকিস এই নিয়ে চাপাচাপি করে তাহলে তাঁর বিরুদ্ধে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে। যদিও বেশ কিছুদিন পরে বিলকিসের মেডিক্যাল পরীক্ষা করা হয়েছিল, কিন্তু ততদিনে গুরুত্বপূর্ণ প্রমাণ সব লোপাট হয়ে যায়। পুলিশ প্রাথমিকভাবে এফআইআর দায়ের করতে অস্বীকার করায় কোনও এফআইআর দায়ের হয়না। পরবর্তীতে তা হলেও ঘটনার গুরুত্বপূর্ণ বিবরণ বাদ দেওয়া হয়। অবশেষে বিলকিস জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের কাছে যান এবং ২০০৩-এর ডিসেম্বরে সুপ্রিম কোর্টের দ্বারস্থ হন। সুপ্রিম কোর্ট সিবিআই’কে তদন্ত করার আদেশ দেয়। ২০০৮ সালে মুম্বইয়ের একটি আদালতে বিচার শুরু হয়।
দীর্ঘ আইনি লড়াইয়ের পর ২০১৭ সালে মুম্বইয়ের আদালত ১১ জন অভিযুক্তকে দোষী সাব্যস্ত করে। কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ধর্ষক-খুনিদের জেলে রাখাটা একেবারেই মেনে নিতে পারছিলেন না মোদীর গুজরাট সরকার। একদিকে জেলেও তারা ছিলেন রাজার হালে, অন্যদিকে নানা অজুহাতে তাদের প্যারোলে মুক্তি দিয়ে বেশিরভাগ সময় জেলের বাইরে রাখার ব্যবস্থা হয়। শেষমেশ ক্ষমতার অপব্যবহার করে মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে, তাদের সাজা মকুব করে দেয় বিজেপি সরকার। ধর্ষক-খুনিদের সাজা কমাতে গুজরাট সরকার যুক্তি দেয়, অপরাধীরা ইতিমধ্যে ১৪ বছর জেল কেটেছেন তাছাড়া তাদের বয়স, জেলে থাকার সময় তাদের আচার-আচরণ, অপরাধের ধরন দেখে সাজা কমানো হয়েছে।
উল্লেখ্য, ওই ধর্ষক-খুনিদের সাজা মুকুব হলে তারা যখন গুজরাটের গোধরা সাব জেল থেকে বুক ফুলিয়ে বেরিয়ে আসছে তখন ৭৫তম স্বাধীনতা দিবসে অমৃত মহোৎসবের সূচনা করে প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেন, নারীদের প্রতি অসম্মান হলে তিনি খুব যন্ত্রণা অনুভব করেন। আসলে তা যে মোদীর কুমিরের কান্না, ভণ্ড, প্রতারক, মুখোশধারীর ছলনা তা বলার আপেক্ষা রাখে না। দেশের প্রধানমন্ত্রী নারীর অসম্মানে তাঁর যন্ত্রণার কথা বললেও দেশজুড়ে প্রতিদিন অগণিত নারী যখন যৌন হিংসার শিকার হন তখন তাঁর যন্ত্রণার কোনও প্রকাশ ঘটে না। দেশে একটার পর একটা বর্বর ঘটনা ঘটলে তিনি রা কাড়েন না। আন্তর্জাতিক প্রতিযোগিতায় জয়ী হয়ে যে মহিলা কুস্তিগিররা দেশের মুখ উজ্জ্বল করেছে তাদের উপর নিরন্তর যৌন নির্যাতনে তাঁর কোনও যন্ত্রণা হয় না। যোগী রাজ্যের উন্নাও, হাথরাসে ভয়াবহ ধর্ষণ ও খুনের ঘটনাতে মোদীর কোনও প্রতিক্রিয়া শোনা যায়না। ধর্ষিতা-নির্যাতিতারা দলিত বা নিম্নবর্গের হলে তো কথাই নেই। হিন্দুত্ববাদী শাসকদের চোখে ধর্ষকরা মোটেও অপরাধী নয়। মনুবাদী আদর্শে উচ্চবর্ণের পুরুষ দ্বারা নিম্নবর্ণের মহিলাদের ধর্ষণ ন্যায়সঙ্গত। সম্ভবত সেই জন্য নরেন্দ্র মোদী ধর্ষণের ঘটনায় নীরবতার আশ্রয় নেন।
এখন সুপ্রিম কোর্টের আদেশ অনুসারে বিলকিস বানো ধর্ষণ মামলায় অপরাধীদের জেলে ফেরানোর কখা। কিন্তু গুজরাতে মোদী-শাহর সরকার। অন্যদিকে ৯ জন খুনি-ধর্ষক বেপাত্তা। সুপ্রিম কোর্ট বিলকিস বানোর ধর্ষণকারীদের জেলে ফেরত পাঠানোর নির্দেশ দিয়ে মোদী-শাহের গুজরাত সরকারকে কার্যত কাঠগড়ায় তুললেও প্রধানমন্ত্রী মোদি সহ গোটা গেরুয়া পরিবার মৌনব্রত নিয়েছেন। শান্তি শৃঙ্খলা বজায় রাখতে গুজরাত সরকার অপরাধীদের বাড়ির বাইরে কনস্টেবল মোতায়েন করেছে। তাহলে কি বিলকিস বানোর ইনসাফ অধরাই থাকবে?