পাহাড়ে ২০১৭ সালে জিটিএ-র মেয়াদ শেষ হয়েছে। কিন্তু তারপর থেকে জিটিএ নির্বাচন বন্ধ হয়ে আছে। রাজ্য সরকার প্রশাসক বসিয়েছে। কিন্তু সেখানে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব ভোটের মাধ্যমে নতুন জিটিএ বোর্ড গঠন করা দরকার। সম্প্রতি পাহাড় সফরে গিয়ে মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় জানিয়েছিলেন, জুন মাস নাগাদ জিটিএ নির্বাচন হতে পারে। এ বিষয়ে তিনি সমস্ত পাহাড়ি দলের সঙ্গে বৈঠক করে স্থির করেছিলেন যে শীঘ্রই জিটিএ নির্বাচন করবেন। রাজ্য সরকারও বেশি দেরি না করে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব জিটিএ নির্বাচনের পক্ষে সায় দিয়েছে। সেই অনুসারে মুখ্যমন্ত্রী জিটিএ নির্বাচনের দিনক্ষণও প্রায় স্থির করে ফেলেছেন। তিনি জানিয়েছেন, আগামী মাসেই জিটিএ নির্বাচন হতে পারে। রাজ্য নির্বাচন কমিশনকে সরকার জিটিএ নির্বাচনের বিষয়ে প্রস্তাবও পাঠিয়ে দিয়েছে।
রাজ্য সরকার যে বর্ষা নামার আগেই জিটিএ নির্বাচন করে নিতে চাইছে সেটা খুব স্পষ্ট। পাহাড় সফরকালে মুখ্যমন্ত্রীর ডাকা জিটিএ নির্বাচন নিয়ে বৈঠকেও অন্যান্য দলও নির্বাচন করার ব্যাপারে সহমত পোষণ করে। যদিও বিমল গুরুংয়ের গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা এখনই পাহাড়ে জিটিএ নির্বাচনের বিরোধিতা করেন। সেই বৈঠকেই গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সম্পাদক রোশন গিরি বলেন, তাড়াহুড়ো করে জিটিএ নির্বাচন করার দরকার নেই। তার আগে রাজনৈতিক সমস্যার সমাধান হোক, তারপর ভোট। তবে মুখ্যমন্ত্রীর ডাকা বৈঠকে মোর্চা নেতৃত্ব জিটিএ ভোট নিয়ে আপত্তি জানালেও পাহাড়ের পঞ্চায়েতগুলিতে ভোট করানোর পক্ষে সওয়াল করেছিলেন। প্রসঙ্গত পাহাড়ের পঞ্চায়েতগুলিতেও দীর্ঘদিন ভোট বন্ধ হয়ে রয়েছে।
প্রায় ১১ বছর বন্ধ থাকার পর ফের একবার জিটিএ নির্বাচনের দামামা বেজে উঠেছে। সম্প্রতি নবান্ন রাজ্যের স্বরাষ্ট্র ও হিল অ্যাফেয়ার্স দফতরের তরফে জেলাশাসক এস পুন্নমবলমকে নির্বাচনী আধিকারিক হিসেবে নিয়োগের জন্য রাজভবনে প্রস্তাব পাঠালে রাজ্যপাল জগদীপ ধনকড় সেই প্রস্তাবে ছাড়পত্র দেন। তারপরই জিটিএ নির্বাচন নিয়ে প্রস্তুতি শুরু করে দেয় নির্বাচন কমিশন। জিটিএ নির্বাচনের চূড়ান্ত দিনক্ষণ ঘোষণা না হলেও প্রস্তুতি দেখে বোঝা যাচ্ছে ভোট জুন মাসের তৃতীয় সপ্তাহে হতে পারে। নির্বাচন কমিশনের পাশাপাশি ভোটের প্রস্তুতি নিতে শুরু করেছে পাহাড়ের রাজনৈতিক দলগুলিও। তৃণমূল কংগ্রেস ও সিপিএম ছাড়াও ওয়ার্ম আপ শুরু করেছে নতুন রাজনৈতিক দল অজয় এডওয়ার্ডের হামরো পার্টি, অনিত থাপার ভারতীয় গোর্খা প্রজাতান্ত্রিক মোর্চা, এসপি শর্মার ভারতীয় গোর্খা সুরক্ষা পরিষদ, হরকা বাহাদুর ছেত্রীর জন আন্দোলন পার্টি। ঠিক এরকম পরিস্থিতিতে গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা প্রধান বিমল গুরুংয়ের চিঠি এল নবান্নে।

এখনই জিটিএ ভোট চাইছেন না গোর্খা জনমুক্তি মোর্চা নেতা বিমল গুরুং। তিনি চাইছেন আগে পাহাড়ের ১১টি গোর্খা জনগোষ্ঠীকে তফশিলি জাতির তকমা দেওয়া হোক। দ্বিপাক্ষিক আলোচনার মাধ্যমে স্থায়ী সমাধান হোক, তারপর নির্বাচন। চিঠিতে ২০১১ সালের চুক্তি অনুযায়ী স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের কথা লিখেছেন। অর্থাৎ তিনি আরও বেশি ক্ষমতা হস্তান্তরের দাবি করছেন। সেই মর্মে তিনি উত্তরবঙ্গের ৩৯৬টি মোর্চাকে জিটিএ-র অধীনে আনার দাবি জানিয়েছেন। মোর্চা পাহাড় সমস্যার রাজনৈতিক সমাধানের একটি খসড়া রাজ্যের কাছে আগেই জমা করেছিল। এবারের চিঠিতে সেই খসড়া অনুসারে নির্বাচনের বিষয়ে অগ্রসর হওয়ার আবেদন জানানো হয়েছে। প্রসঙ্গত, এর আগে ২০১৭ সালেও গুরুং জিটিএ নির্বাচনের বিরোধিতা করেছিলেন। তখন তাঁর দাবি ছিল পৃথক গোর্খাল্যান্ড। তখন বিজেপির বন্ধু গুরুংয়ের বিরোধিতায় নির্বাচন স্থগিত হয়ে গিয়েছিল। তখন মোর্চার হাতেই ছিল পাহাড়ের একচ্ছত্র ক্ষমতা। তারপর পাহাড়ের পট পরিবর্তন হয়েছে। পাহাড়ে মোর্চার সেই জন সমর্থনও নেই। গুরুংও বিজেপি ছেড়ে তৃণমূলের বন্ধু হয়েছেন।
কিন্তু কেন জিটিএ ভোট বানচাল করতে চাইছেন মোর্চা প্রধান বিমল গুরুং? গত বিধানসভা নির্বাচন থেকে তৃণমূলের প্রতি সমর্থন জানিয়েও কেন জিটিএ নির্বাচন নিয়ে তিনি বেঁকে বসলেন। বেশ কিছুদিন গা ঢাকা দেওয়ার পর গুরুং ২০২০ সালে পাহাড়ে ফেরেন। তার আগে অচমকা সল্টলেকে হাজির হন তিনি। তখন থেকেই গুরুং তৃণমূলের প্রতি আনুগত্য প্রকাশ করে আসছেন। তবে একুশের বিধানসভা ভোটে মোর্চার সঙ্গে জোট করেও পাহাড়ের তিন আসনে তৃণমূল তেমন সাফল্য পায়নি। এমনকি পরবর্তীতে দার্জিলিং পুরভোটেও মোর্চা ধরাশায়ী হয়। তখমই বোঝা যায় যে পাহাড়ে গুরুংদের জনভিত্তি কমেছে। নিজেরাও বুঝতে পারে যে এই অবস্থায় আগামী কয়েক মাসের মধ্যে পাহাড়ে জিটিএ ভোট হলে তেমন সুবিধা করতে পারবে না মোর্চা।
একুশের বিধানসভা নির্বাচনের আগে গুরুং তৃণমূলের সঙ্গে ঘনিষ্ঠতা বাড়িয়ে পাহাড়ে ফিরেছিলেন বিমল। কিন্তু তারপর তিনি নিজেও বোঝেন পাহাড়ে জনভিত্তির সেই জমি আর নেই। সেই জমিতে ইতিমধ্যেই ধস নামতে শুরু করেছে। পুরসভা নির্বাচনেই তার প্রমাণ রেখেছে সদ্য তৈরি হওয়া হামরো পার্টি। যারা দার্জিলিং পুরসভা দখল করেছে। এই অবস্থায় এখন জিটিএ ভোট হলে মোর্চা যে পাহাড়বাসীর মন তাদের পক্ষে আনতে পারবে না তা তাঁরা নিশ্চিত জানেন, বরং তাঁরা পাহাড়ে আরও কোণঠাসা হয়ে পড়বেন। এই আশঙ্কা থেকেই জিটিএ ভোট নিয়ে এত আপত্তি বিমল গুরুংয়ের। মুখ্যমন্ত্রীকে দেওয়া চিঠিতে বিমল গুরুং তৃণমূলের প্রতি গোর্খা জনমুক্তি মোর্চার সমর্থনের কথা বলেও পাহাড়ের স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধানের দাবি জানাচ্ছেন। কিন্তু সেটা যদি মুখ্যমন্ত্রীকে ‘আক্রমণ’ বা ‘চাপ সৃষ্টির’ চেষ্টাও হয় তাতেও মোর্চার পক্ষে আজ আর কোনও ফায়দা তোলা সম্ভব নয়।