রোজই যেমন, আজও বাড়ি ফিরে শোভনা প্রথমেই বলল, “তোমার ফেরিঅলা এসেছিল?”
মাথা নাড়লাম। না, আসে নি।
শোভনা তার চটির স্ট্র্যাপ খুলছিল। বলল, “ঠিক বলছ?”
“আসে নি।”
দু-পায়ের চটি খুলে পিঠ সোজা করল শোভনা। “মুখ তুলে কথা বলতে পার না?”
মুখ তুলে কথা বলার অভ্যেসটা আমার নষ্ট হয়ে গিয়েছে। এখন আর বড় একটা মুখ তুলতে পারি না। অন্তত এখন নয়, যখন সারাদিন খেটেখুটে অঙ্গ কালি করে শোভনা বাড়ি ফেরে সন্ধেবেলায়।
ঘরের দিকে পা বাড়িয়ে শোভনা বলল, “তোমার যা মুখ, দেখলেও কিছু বোঝা যায় না, সত্যি বলছ, মিথ্যে বলছ!”
শোভনার পেছন পেছন আমি ঘরে ঢুকলাম। বাতি জ্বলছে। পাখা চলছিল না। আমার আর পাখা লাগে না এখন। কার্তিক মাস পড়ে গিয়েছে কবেই। পাখা চালিয়ে পয়সা নষ্ট করা আমার উচিত নয়।
শোভনা কাঁধের অফিসব্যাগটা বিছানায় ফেলে দিয়ে পাখা চালিয়ে দিল। দিয়ে কয়েক মুহূর্ত পাখার তলায় দাড়িয়ে থাকল দুহাত কপালের কাছে তুলে। যেন মাথার যন্ত্রণা কমাতে কপালের রগ টিপে ধরেছে। ভঙ্গিটা বেশ নাটকীয়।
ক্লান্তির অস্ফুট শব্দ করল বারকয়েক শোভনা। তারপর গায়ের আঁচল সরিয়ে সরসর করে শাড়ি খুলে আলনায় ফেলে দিল। “আজ তাহলে কী বিক্রি করলে? ফেরিঅলা আসে নি তো তোমার চলল কেমন করে?”
আমি চুপ। শোভনাকেও দেখছিলাম না। তবু বুঝতে পারছিলাম, ও জামাটামা খুলে একটা জোব্বা তুলে নিয়ে বাথরুমে চলে গেল। শাড়িটাড়ির নাকি আজকাল ভীষণ দাম। মালি গামছার মতন একটা শাড়ি বা সুতো ধরতে যাও, সত্তর আশি নিয়ে নেবে। তার চেয়ে দুটো ডানা মেলা আলখাল্লায় হেসেখেলে বছর কেটে যায়। আর কীই বা বয়েস শোভনার। এই তো সবে উনত্রিশ।
আমার স্ত্রী বাড়ি ফিরলে আমাকেই দরজা খুলে দিতে হয়। দরজা খোলার কাজটা একসময় আমি ঠিক মতন করতে পারতাম না। কষ্ট হত। যার ডানহাত মাত্র কনুই পর্যন্ত, আর বা হাতের কবজি থেকে আঙুল পর্যন্ত নীচের দিকে ঝুলে থাকে—তার পক্ষে দরজার ছিটকিনি খোলা সহজ ব্যাপার নয়। খুবই কঠিন। প্রায় অসম্ভব।
তবে জগতে বারো আনা অসম্ভবই সম্ভব হয়ে যায়। আমারও হয়েছে। বছর দেড়েকের বেশি চেষ্টা করতে করতে কাজটা রপ্ত করে নিয়েছি। হুড়কো এবং ছিটকিনি দুটোই এখন চট করে খুলে ফেলতে পারি। তার জন্যে আমাকে সামান্য বুদ্ধি খাটাতে হয়েছে।
দিনের বেলায় এ-সব দরজা খোলার ঝঞ্ঝাট আমাকে পোয়াতে হয় না। তখন ও বাড়িতে থাকে। ও মানে আর স্ত্রী। শোভনা। গোপালের মাসী বলে যে মেয়েটি কাজ করে সেও থাকে দু-এক ঘন্টা। দরজা খোলা বন্ধের কাজটা ওরাই করে।
শোভনা দশটা নাগাদ বেরিয়ে যায়। চাকরি বলে কথা। আহা, কত কষ্ট তার। সকালে ঘুম ভাঙতে না ভাঙতেই কাজের বোঝা যেন তার ঘাড়ের ওপর ঝপঝপ করে পড়তে থাকে। বিছানা পরিষ্কার, চায়ের ব্যবস্থা, দুধের বোতল আর বাজার করা প্লাস্টিকের ঝুড়ি নিয়ে বাজার, মাঝে মাঝে আমাকেও বাজার যেতে হয় বা কাঁধে থলি ঝুলিয়ে। কিন্তু শোভনা আমার বাজার যাওয়া পছন্দ করে না। আমি পয়সা সরাই। শোভনাই বাজার যায়, ফিরে এসেই রান্নাবান্না, স্নান, দুটো মুখে খুঁজতে খুঁজতেই ঘড়ির কাটা নয়ের ঘর ধরধর করছে। শাড়ি জামা পালটে ব্যাগ কাঁধে ঝুলিয়ে শোভনা যখন ‘আসছি’ বলে বেরিয়ে যায় — তখন সারা কলকাতায় অফিসের প্রথম, ঘণ্টী পড়তে শুরু করেছে।
বাড়ি ফিরতে ফিরতে শোভনার সন্ধে। সাত, সাড়ে সাত। কোনো কোনোদিন রাতও হয়ে যায়। কলকাতা শহর বলে কথা। মিছিল, জ্যাম, ট্রামের ধাক্কা, বাস মিনিবাসের খেয়াল-খুশি ফুটবল মাঠের জের — এসব তো ধরে নিতেই হবে। তা ছাড়া কাজ। কাজও মানুষকে দেরি করিয়ে দেয়। শোভনা আবার লাইব্রেরিয়ান। স্কুল কলেজের নয়, টেকনিক্যাল ইনস্টিটিউটের। সেখানকার সাত আটজন লাইব্রেরিয়ানের সে একজন। সাড়ে সাতশো টাকার অ্যাসিসট্যান্ট লাইব্রেরিয়ান গ্রেডে কাজ শুরু করে এখন তিনবছরের মাথায় ন-শো পঁচিশে এসে দাঁড়িয়েছে।
তিনবছর আগে পরে অনেক তফাত। বছরতিন আগে আমিই বা কী কম ছিলাম। রাজ অ্যান্ড রাজু অটোমোবাইলে আমার মাইনে ছিল আঠারশো টাকা। ঝাড়াঝাড়িতে আরো দু-চারশো টাকা হয়ে যেত। না, চুরি-চামারি নয়; ভদ্রলোকের ছেলে চুরি করব কেন? এক আধজন ভালো পার্টি হাতে কিছু গুঁজে দিয়ে যেত, ‘সরকার, তুমি নিজে একবার চেক করবে! এত তেল পুড়ছে! তেলের কী দাম বুঝছো তো! তারপর তোমার মোবিল চেম্বার:ব্যাপারটা কী হে, রোজই শুনি লিক করে…।’
মোটর মেকানিক বা মিস্ত্রি বলতে যা বোঝায় আমি তা ছিলাম না। আমার ডিপ্লোমা ছিল। ডিপ্লোমা এঞ্জিনিয়ার। কাজকর্ম বুঝতাম। দু-একশো টাকা যা বাড়তি আসত সেটা একরকম হাতযশের জন্যে।
কেন এমন হল আমি জানি না। কিন্তু সংসারে অহরহ এই রফা হচ্ছে। পল্টু দত্তের মতন দারুণ ফুটবল খেলোয়াড়, বিধবা মায়ের একটি মাত্র সন্তান বা গেল ক্যান্সারে, মাত্র পঁচিশ বছর বয়সে। পল্টু আমার স্কুলের বন্ধু ছিল। ও মারা যাবার পর আমার ঘুম বন্ধ হয়ে গিয়েছিল। রাজ অটোমোবাইলের আনন্দ, যেমন দেখতে তেমন ঝরঝরে — মোটর বাইক অ্যাকসিডেন্টে চুরচুর হয়ে গেল। হাত-পা বুক গুঁড়ো গুঁড়ো। আহা, বেচারি! এই রকম তো হচ্ছেই। কোথাও কিছু নেই, ট্রামের চাকার তলায় চলে গেল, বাসের ধাক্কায় মাথা থেঁতলে পাচ সাত ঘণ্টার মধ্যে মারা গেল। সুজিত কীভাবে আগুনে পুড়ল, পুড়ে মারা গেল কল্পনা করা যায়!
আমার বেলাতেও কী যে হয়ে গেল, পুরোনো একটা গাড়ির কাজ দেখতে গিয়ে জখম হয়ে গেলাম। বড় রকমের জখম। গ্যাংগ্রিন। আমার একটা হাত চলে গেল। পুরো হাত হল আধাআধি। আর বা হাতের জখম ওপর ওপর সামলানো গেলেও কবজির কাছ থেকে ঝুলে থাকল, যেন ডানাভাঙা পাখি।
তখন থেকেই আমি অকেজো, অক্ষম, অচল। আর আমার করার কিছু থাকল না। বাড়িই আমার সব। কদাচিৎ একটু হাওয়া খেতে, লোকজনের মুখ দেখতে বাইরে যাই। অবশ্য যদি আমার বউ শোভনা তখন বাড়িতে থাকে।
এই ফ্ল্যাটটা আমিই জোগাড় করেছিলাম। তখন আমার হাতযশের দৌলতে এক বাবুর গাড়ি সারাই করে তার মন গলিয়েছিলাম। তিনি উচু দরের লোক। তার জন্যেই এই এক ঘরের ফ্ল্যাট।
শোভনার সঙ্গে আমার বিয়ে হয়েছিল বিরাশি সালে। তখন ওর বয়েস তেইশ-চব্বিশ। আমার সাতশ-আঠাশ। প্রেম ভালোবাসা করে বিয়ে। মাসের পর মাস ভালোবাসাবাসি করেছি। মাঠ-ময়দান, সিনেমা, খাওয়া-দাওয়া, দীঘা-পুরী করে যখন দুজনে দুজনের চোখের তলায় মিশে আছি — বিয়েটা হয়ে গেল। শোভনার বাড়ি থেকে আপত্তি ছিল। মিস্ত্রির সঙ্গে বিয়ে? শোভনা গ্রাহ্য করল না। বিয়ে হয়ে গেল।
আমরা খুবই সুখী হয়েছিলাম। খুশি ছাড়া আমাদের বাড়িতে কিছু ছিল না। আমাদের সকাল-বিকেল রাত খুশি আর আহ্লাদের মধ্যে কেটে যেত। আমরা ভাবতাম, এই ভাবেই আমরা থেকে যেতে পারব।
ঠিক দুবছরের মাথায় আমার যা যাবার চলে গেল। আট দশ মাস হাসপাতাল। মাঝে মাঝেই কী যে সব হত কে জানে! তারপর হাসপাতাল থেকে বাড়ি। আর তারপর ধীরে ধীরে আমি আমার স্ত্রীর নিতান্তই পোষ্য হয়ে উঠলাম।
###
মুখ মুছে চুল সামনে নিয়ে শোভনা হঠাৎ তার কাঁধে ঝোলানো অফিসব্যাগ তুলে নিয়ে বলল, “অফিসে একটা ফেয়ারওয়েল ছিল। প্যাকেট দিল সবাইকে।” বলে ব্যাগ খুলে একটা ছোট প্যাকেট বার করল। তোমার জন্যে রেখে দিয়েছি। নাও, খাও।”
হাতে দিল না শোভনা, গোল টেবিলটার ওপর রেখে দিল।
“মাথা ছিড়ে যাচ্ছে। আগে চা খাই।” শোভনা ঘরের বাইরে চলে গেল। রান্নাঘরে।
প্যাকেটটা খুলে দেখি, একটা চটকানো প্যাসট্রি, আর ভেজিটেবল চপ। চপটা ফেটে গিয়ে চেপটে গিয়েছে।
খিদে জিনিশটা মানুষকে অনেক কিছু ভুলিয়ে দেয়। বিকেলে এক টুকরো বাসী পাউরুটি আর শুকনো কয়েকটা বাদাম খেয়েছিলাম। আমার খিদে ছিল। প্যাসট্রিটা খেতে লাগলাম।
রান্নাঘরে স্টোভ জ্বালিয়ে শোভনা চা করছে। একটু-আধটু শব্দ আসছিল।
শোভনা মাঝে মাঝে এইভাবে আমার জন্যে কিছু খাবার আনে। কোনোদিন হয়তো ঝালমুড়ি, কোনোদিন শুকনো চিড়েভাজা-বাদাম, কোনোদিন বা একটা টিফিন কেক। রোজ নয়, কোনো কোনোদিন। তার ফেরার দেরি হয়ে গেলে, আট নটা বেজে গেলে রাস্তা থেকে ‘রোল’-ও কিনে এনেছে। এই তো দিন দশ বারো আগে, শোভনা আসে না আসে না করে প্রায় সাড়ে নটায় ফিরল। আমার ভাবনা হচ্ছিল খুবই। কী হল?
শোভনা যখন ফিরল দেখি তার চোখ সামান্য লালচে, মুখজোড়া হাসি। হাতে কষামাংসর ভাড় আর কাগজে মোড়া রুটি। বলল, “জয়ারা সিনেমা দেখতে ধরে নিয়ে গেল। একটা দল। পালিয়ে আসতে পারি না। …নাও, তোমার জন্যে রুটি মাংস নিয়ে এলাম। আমি আর খাব না। ওদের পাল্লায় পড়ে মোগলাই পরোটা খেয়েছি। পেট ঠাসা।”
সেই রুটি মাংস আমি একলা বসে বসে খেয়েছি। একটুও ফেলি নি। এমনকি কুকুরের মতন হাড়গুলোও চিবিয়েছি। নিজের বউয়ের রোজগারে খাই; লজ্জার কী আছে!
চা নিয়ে ফিরে এল শোভনা। “নাও।”
নিজের জন্যে কাচের গ্লাশে করে চা এনেছে।
আমার জন্যে সরু কাপে। অ্যালুমিনিয়ামের কাপ। ধরতে সুবিধে হয় আমার।
বিছানায় বসে পড়ল শোভনা। দু-চার ঢোঁক চা খেল। চুপচাপ।
“খেয়েছ?” শোভনা বলল।
“প্যাসট্রি খেয়েছি।”
“চপ?”
“গন্ধ। পচে গেছে।”
“পচে গেছে!” শোভনা আমার দিকে এমন করে তাকাল যেন, টাটকা পচা এ-সব কথা মুখে আনাই আমার অন্যায়। হঠাৎ তার গালের একটা পাশ একটু কুঁচকে গেল। “আমাদের অফিস ক্যান্টিনে তৈরি। রেপসিডে ভাজা। পচবে কেমন করে?”
আমি কথার জবাব দিলাম না।
শোভনা চায়ের গ্লাশটা একবার কপালে ঠেকাল। যেন মাথার যন্ত্রণায় তাত লাগল। গ্লাশ সরিয়ে নিয়ে বলল, “তোমার জিব তো এমনিতেই পচে থাকে, স্বাদটাদ আর বুঝবে কেমন করে? ফেরিঅলা এসেছিল? আসে নি আজ?”
“না।”
“মিথ্যে কথা বলছ?”
“আসে নি।”
“ঠিক আছে। সত্যি কি মিথ্যে বলছ — আমি দেখছি!”
“তুমি সব ব্যাপারে এত অবিশ্বাস কর কেন?”
“তোমার গুণে করি। একটা জিনিশও তো রাখলে না বাড়িতে, যা পারছ লুকিয়ে ফেরিঅলার হাতে গুজে দিচ্ছ। যা আসে তাই, দুটাকা পাঁচ টাকা, এক টাকা। একটা আধুলি এলেও হল। ছি ছি!”
ধরা পড়া পাকা চোরের মতন আমি চুপ করে থাকলাম, অন্য দিকে তাকিয়ে।
আর কোনো কথাবার্তা নেই। দুজনেই চুপচাপ।
শাভনা চা শেষ করে কাঁচের গ্লাশটা মাটিতে নামিয়ে রাখল। রেখে বিছানায় শুয়ে পড়ল। খানিকক্ষণ জিরিয়ে নেবে। আধ ঘন্টা কি চল্লিশ পঁয়তাল্লিশ মিনিট। ঘুমিয়েও পড়ে কোনো কোনোদিন। ছোট ঘুম। তারপর উঠে রান্নাঘরে যায়। পাঁচ সাতখানা রুটি সেঁকে নেয়, ভাজাভুজি করে নেয় সামান্য।
খাওয়া দাওয়া শেষ করে শুতে শুতে দশ, সোয়াদশ।
শোভনা প্রথমে সোজা হয়ে শুয়েছিল। ডান হাত দিয়ে চোখ আড়াল করল, করে নড়েচড়ে পাশ ফিরল। দেওয়ালের দিকে মুখ। সামান্য পরেই বলল, “অম্রুতাঞ্জন’। শিশিটা খুঁজে নিয়ে শোভনাকে দিতেই সে শিশির ঢাকনা খুলে —“মাথার যন্ত্রণায় মরে যাচ্ছি” — বলতে বলতে আঙুলে খানিকটা মলম তুলে কপালে রগড়াতে লাগল।
পরিশ্রম, ক্লান্তি, ফেয়ারওয়েল, ট্রামবাস — মাথা ধরাই স্বাভাবিক। তার ওপর বিরক্তি দিনের পর দিন কত আর বিরক্তি সহ্য করা যায়।
“আর পারি না,” শোভনা যন্ত্রণার গলায় বলল, “সারা গা ভেঙে যাচ্ছে। পিঠ কোমর…”
“ফ্লু হবে নাকি?”
“হতেই পারে। হলেই হল। সবই হতে পারে। হলে কী! …এখন মরতে পারলেই বাঁচি।”
“একটু ঘুমিয়ে নাও।”
“ঘুম আমার কেনা!” “বাতিটা নিবিয়ে দিচ্ছি। দেখো যদি আরাম লাগে।”
“আরাম! …আসছে জন্মে।”
আমি আর কিছু বললাম না। পশ্চিমের জানলার দিকে আমার একটা চেয়ার আছে। চেয়ারের পাশে হাত-দেড়েকের একটা র্যাক-মতন। র্যাকের মাথায় টুকিটাকি।
শোভনা দেওয়ালের দিকে মুখ করে শুয়ে থাকল। আমি তার কাধ পিঠ মাথার পেছন, পায়ের গোড়ালি দেখতে পাচ্ছিলাম। এত খাটাখাটুনি সত্ত্বেও শোভনা রোগা হচ্ছে না, বরং খানিকটা ফুলে যাচ্ছে। ওর কোমর আর পেছন এখন বেশ ভারি ভারি দেখায়।
শুয়ে শুয়েই শোভনা বলল, “কাল থেকে আমি নটার মধ্যে অফিস বেরিয়ে যাব।”
“কেন?”
“কাজ পড়েছে।”
“বেশি খাটাচ্ছে।”
“খাটাক। তবু ভালো। বাড়িতে আছে কী?”
বাড়িতে সত্যিই কিছু নেই। হাতকাটা, নুলো স্বামী। ময়লা দেওয়াল, দুচারটে আসবাবপত্র, যা প্রায় আবর্জনার মতন হয়ে উঠেছে। আর ভাঙাচোরা টোল খাওয়া কয়েকটা বাসনপত্র।
তখনো তিনটে বিড়ি র্যাকের ওপর পড়েছিল। সারাদিনে আট-দশটা বিড়ি আমার বরাদ্দ। শোভনাই পয়সা দেয়।
বিড়ি ধরানো আমার অভ্যেস হয়ে গিয়েছে। দেশলাইয়ের কাঠিও বড় নষ্ট হয় না।
বিড়ি ধরাবার সঙ্গে সঙ্গে শোভনা বলল, “আবার বিড়ি?”
“না, একটা খাচ্ছি।”
“আর কত খাবে! … ফেরিঅলা বুঝি খাইয়ে যায় নি আজ? … আমি দেখছি। মাথা একটু কমুক।”
আজ ফেরিঅলা আসে নি। রোজ সে আসে না। মাঝে মাঝে আসে। দুপুর বেলায়। তখন সব চুপচাপ। বাড়িতে আমি একলা। সে এসে বাইরে থেকে খুটখুট করে কড়া নাড়ে। বাবু, আমি।
দরজা খুলে দি ফেরিঅলা রামসদয়কে। বছর চল্লিশ বয়েস। শুকনো পাতার মতন গায়ের রং। দোহারা চেহারা। তার মাথায় একটা বড় ঝুড়ি, কাঁধে বস্তার মতন কাপড়ের গাটরি। ফেরিঅলার ঝুড়ির মাথায় দড়ির জাল। অ্যালুমিনিয়ামের জিনিশপত্র বিক্রি করে ফেরিঅলা রামসদয়। কেটলি, বাটি, চায়ের কাপ, হাতা, খুন্তি — এই সব।
তার কাঁধের ঝোলাটা রয়েছে পুরোনো জিনিশ কেনার জন্যে। তোবড়ানো হুঁড়ি কুড়ি থেকে যা পায় কিনে নেয়। বলে, শুধু বাসন-বেচে চলে না বলেই বেচাকেনা দুই-ই করে।
রামসদয় আমার কাছে অনেক দিন ধরেই আসছে। আসে বসে, জল খায়, খইনি পাকায়, আমাকে দেয়। খইনির নেশাটা রামসদয় শিখিয়েছে। লোকটা গল্পবাজ। হরেকরকম গল্প করে। তার ছাপরা জেলার গল্প থেকে কলকাতার হাতিবাগানের গল্প পর্যন্ত। তার বউয়ের, বুড়ো বাপের, ছেলের গল্পও শোনায়।
রামসদয়কে আমি একসময় লুকিয়ে লুকিয়ে ঘরের এটা-ওটা বেচে দিয়েছি। এমনকি আমার পুরোনো জামাপ্যান্ট পর্যন্ত। এখন আর বেচার মতন কিছু নেই। তবু যদি কিছু চোখে পড়ে যায় বেচে দিই। শোভনার কাছে ধরাও পড়ে যাই। গালমন্দ খাই।
রামসদয় এখন আর আমার কাছে ফেরিঅলা নয়, বন্ধু। তার সঙ্গে আমার একটা বোঝাপড়া আছে। মাঝে মাঝেই সে তার কাধ-ঝোলার মধ্যে করে আমার জন্যে বোতলে করে দিশি মদ, চোলাই এনে দেয়। আমি সেটা বাড়ির কোনো পাত্রে ঢেলে নিয়ে বোতলটাকে তাকে ফেরত দিয়ে দি। না দিলে শোভনার কাছে ধরা পড়ে যাই। শোভনার ভীষণ চোখ। তার কাছে ধরাও পড়েছি অনেকবার।
দুপুর দুপুর নেশাটুকু সেরে নিলে সন্ধেবেলায় শোভনা যখন ফেরে তখন আর বাড়ির মধ্যে কোনো গন্ধ থাকে না। আমাকেও দেখে বোঝার উপায় নেই — একটু নেশাটেশা সেরে রেখেছি অনেক আগেই।
যে-লোক মাঝে মাঝে আমার নেশা জুগিয়ে যায় বাড়ি বয়ে এসে তার হাতে কিছু না তুলে দিল কেমন করে চলে। আমাকেও লুকিয়ে চুরিয়ে খুঁজে পেতে কিছু না কিছু জোগাড় করতে হয় বিক্রির জন্যে।
কিন্তু এখন আর বাড়িতে বিক্রি করার মতন কিছু নেই। নিজের পুরোনো জামাপ্যান্ট, জুতো, শোভনার পুরোনো শাড়ি, ছেড়া মশারি, কাসার বাসনপত্র, ভাঙাচোরা লোহার টুকরো এমনকি শোভনার কানের দুল, পায়ে পরা রুপার আংটি পর্যন্ত বেচে দিয়েছে। এখন আর শোভনা কাঠের আলমারির চাবি বাড়িতে রেখে যায় না। আমার জন্যে শুধু ঘরটুকু ফেলে রেখে যায়।
###
রোজ যেমন হয়, আজও সেই রকম হল। ছোট্ট একটু ঘুম সেরে শোভনা উঠে পড়ল। উঠে রান্নাঘরে চলে গেল।
খাওয়া দাওয়া সারতে সারতে প্রায় দশ। এখন খানিকটা ঠাণ্ডা লাগছিল। শোভনা বিছানায় শুতে যাবার আগে তার ব্যাগ থেকে কিসের একটা ওষুধ বার করে খেল। খেয়ে শুয়ে পড়ল। বলল, “পাখাটা বন্ধ করে দাও।”
পাখা বন্ধ করে আলো নিভিয়ে শুতে এসে দেখি শোভনা রোজকার মতন শুয়ে রয়েছে। দেওয়ালের দিকে মুখ করে। ও আমার দিকে পাশ ফিরে আজকাল শোয় না।
শুয়ে থাকতে থাকতে হাই তুলল শোভনা। সামান্য উশখুশ করল। একবার মাথার খোপায় হাত দিয়ে বোধ হয় চুল আলগা করল। তারপর বলল, “কাল আমার ফিরতে দেরি হবে। রাতও হতে পারে।”
“অফিসের কাজ?”
“না। একজনকে দেখতে যাব। নার্সিং হোমে আছে। সেই নিউ আলিপুর।”
“কী অসুখ?”
“অসুখ নয়। বাচ্চা হয়েছে। নন্দিতা।”
“ও!”
একটু চুপচাপ। শোভনাই আবার বলল, বাঁকা করেই, “তোমারই সুবিধে। ফেরিঅলা এলে ঘটিবাটি বেচে বসে থাকবে! সত্যি! লজ্জাও করে না তোমার। পেটে ভাত জোটে না মদ জোটে।”
আমি চুপ। শোভনাও কথা বলল না।
কে কখন ঘুমিয়ে পড়লাম, কে জানে!
###
সকালে ঘুম ভাঙতে দেখি ফরশা হয়ে গিয়েছে। শীত শীত করছিল। শোভনা খানিকটা সোজা হয়ে শুয়ে রয়েছে। কিন্তু হেমন্তের ভোরের শীতে সামান্য কুঁকড়ে আছে, দুহাত বুকের কাছে।
পায়ের তলায় কিছু নেই। একটা ছেঁড়া চাদর আলনার দিকে পড়েছিল। চাদরটা আনতে উঠলাম। খোলা জানলা দিয়ে ঠাণ্ডা আসবে।
চাদর এনে শোভনার গায়ে আলতো করে ঢাকা দিতে গিয়ে দেখি তার গায়ের আলখাল্লার মাঝখানটা খুলে ফাক হয়ে রয়েছে। শোভনা কিন্তু গায়েগতরে খানিকটা ফুলে উঠেছে আজকাল। এত পরিশ্রম, কষ্ট, মনস্তাপ, বিরক্তি — তা সত্ত্বেও ও ফুলে উঠছে। বয়েসের গুণ হয়তো। মেয়েরা কী বয়েসে ভারি হয়ে ওঠে। শোভনার কোমর পেট বেশ ভারি।
না, না, আমি সন্দিগ্ধ হবার মতন স্বামী নই। কেনই বা হব! পুরুষ মানুষ হয়েও আমি অকর্মণ্য, অক্ষম। আমার কোনো মেধা ছিল না। ছিল শ্রম বিক্রি করার ক্ষমতা। সে-ক্ষমতা আর আমার নেই। ভগবান আমায় মেরে রেখেছেন। আমি আমার স্ত্রীর মুখাপেক্ষী, তারই পোষ্য।
শোভনা, আমার স্ত্রী, ভাগ্যবতী। তার হাত পা, মন, চোখ শরীর — কত কী আছে। সে পরিশ্রমী। তার কত না দেবার আছে!
###
শোভনার জামা গুছিয়ে চাদরটা আলগা করে তার গায়ে বিছিয়ে দেবার সঙ্গে সঙ্গে শোভনা পাশ ফিরে কুঁকড়ে গেল। গিয়ে ঘুমের মধ্যে বিড়বিড় করে বলল, “জানলাটা বন্ধ করে দাও।”
জানলা বন্ধ করতেই সকালের ফরশা ঘরের মধ্যে কালো হয়ে উঠল।
শোভনা ঘুমিয়ে থাকল।
আমি বাইরে এসে প্যাসেজে দাঁড়িয়ে থাকলাম চুপচাপ। তার পর আমার আধখানা ডান হাত আর নুলো গোছের বা হাত দিয়ে সদর খোলার চেষ্টা করতে লাগলাম। সকালে কি সব অসাড় লাগে! কে জানে! দরজা খুলতে বড় কষ্ট হচ্ছিল।