শিরোনামটি কবি বিনয় মজুমদারের (১৭ সেপ্টেম্বর, ১৯৩৪—১১ ডিসেম্বর, ২০০৬) ‘ফিরে এসো, চাকা’ কাব্যগ্রন্থের ‘২৯শে জুন ১৯৬২’ কবিতার একটি পয়ার। কবিতাটি পড়া যাক—‘তুমি যেন ফিরে এসে পুনরায় কুণ্ঠিত শিশুকে/ করাঘাত ক’রে ক’রে ঘুম পাড়াবার সাধ ক’রে/ আড়ালে যেও না; আমি এতদিনে চিনেছি কেবল/ অপার ক্ষমতাময়ী হাত দুটি, ক্ষিপ্র হাত দুটি—/ ক্ষণিক নিস্তারলাভে একা একা ব্যর্থ বারিপাত।/ কবিতা সমাপ্ত হতে দেবে নাকি? সার্থক চক্রের আশায়/ শেষের পঙিক্ত ভেবে ভেবে নিদ্রা চ’লে গেছে।/ কেবলি কবোষ্ণ চিন্তা, রস এসে চাপ দিতে থাকে;/ তারা যেন কুসুমের অভ্যন্তরে মধুর ঈর্ষিত স্থান চায়,/ মালিকায় গাঁথা হয়ে ঘ্রাণ দিতে চায়।/ কবিতা সমাপ্ত হতে দাও,/ নারী, ক্রমে-ক্রমাগত ছন্দিত, ঘর্ষণে, দ্যাখো, উত্তেজনা শীর্ষলাভ করে,/ আমাদের চিন্তাগত, রসপাত ঘটে, শান্তি নামে।/ আড়ালে যেও না যেন, ঘুম পাড়াবার সাধ ক’রে।’
কাকে কবি বিনয় মজুমদারের ঘুম পাড়াবার সাধ করে আড়ালে যেতে বারণ করছেন, তা এতকাল পর এসে উচ্চ স্বরে বলার কিছু প্রয়োজন আছে বলে মনে হয় না। কবিতার প্রেমিক, বিনয় আগ্রহী বা ভক্তমাত্রই বিনয় মজুমদারের গায়ত্রী কাহিনি কমবেশি সবারই জানা; জানা ‘ফিরে এসো, চাকা’ কাহিনি। আলাপের প্রসঙ্গও সেটি নয়; বরং ‘আড়ালে যেও না যেন, ঘুম পাড়াবার সাধ ক’রে’—এ আমারই বিনয়-তৃপ্তির শ্রদ্ধাবনত অনুরোধ এক। যদিও বিনয়ের আর আড়াল হবার সুযোগ নেই। এককালের বিনয় মহাকালের কোলে উঠে বসেছেন এমন করে, তাঁকে কোল থেকে ফেলে দেবার অনাদর কারো হবে না। বাংলা সাহিত্যের ষাটের বলি আর সত্তরের বলি, কবি বিনয় মজুমদার দশকের প্রাচীর ভেঙে মুক্তাঙ্গনে প্রবেশ করেছেন অনেক আগেই; শতকের আঙিনাও ছেড়ে যে যাবেন তা বলার অপেক্ষা রাখে না। বাংলা সাহিত্য যত পুরনো হবে, যত দীর্ঘায়ুর হবে, তার সঙ্গে সঙ্গে বিনয় মজুমদারও উচ্চারিত হবেন বিশিষ্টতায়, তাঁর বৈশিষ্ট্যে।
একবার এক কবিকে হাস্যরস করে বলেছিলাম, আপনার কবিতা পড়ি না, খাই। সে জ্যেষ্ঠ কবি—কবিতা পড়ার সঙ্গে খাই-শব্দটির মিল-তাল না পেয়ে রাগ করে কথা বন্ধ করে দিয়েছিলেন কয়েকদিন। পর সাক্ষাতে বুঝিয়ে বলেছিলাম যে, কতটুকু সুখপাঠ্য হলে পড়া খাওয়া যায় তা পাঠক জানে, আপনাকে না জানলেও হবে। পরে তিনি রাগ কমিয়েছিলেন। বিনয় মজুমদারের কবিতা খাওয়া যায়। গিলা যায় অনবরত। কোথাও পানি পান করে গলাকে সরস করতে হয় না। শব্দের ব্যবহার, কল্পনার তল পাঠকদৃষ্টিকে এমন একটা গভীর খাদে নিয়ে ছেড়ে দেয় যে, পাঠক সেখানে কিছুক্ষণ হতভম্ব হয়ে পূর্ব অভিজ্ঞাতার খোলস ছিঁড়ে নতুন এক খোলসে স্থির হন। আবিষ্কার করেন নতুন এক বিস্ময়। সে বিস্ময় বিনয় মজুমদার বার বার তৈরি করেছেন। প্রতিটি কবিতায় তৈরি করেছেন। ‘ফিরে এসো, চাকা’তেও করেছেন, ‘বাল্মীকির কবিতা’য়ও করেছেন আবার ‘অঘ্রানের অনুভূতিমালা’তেও করেছেন। অভূতপূর্ব ভাষা, সংকেত, প্রতীক বিনয় মজুমদারের কবিতার প্রাণ। যা অদ্বিতীয় বলেও মনে হয় কখনো কখনো। উত্পলকুমার বসু তাঁর ‘বিনয় মজুমদার : তাঁর কবিতা’ নামক এক প্রবন্ধে বিনয়ের কবিতা সম্পর্কে বলেছেন, ‘কবিতায় আমরা প্রায়শ স্বসিত বস্তু বা ‘অরগানিক’ অস্তিত্বের চিহ্ন দেখে থাকি। এই দুই কেন্দ্রে— অর্থাত্ বস্তু ও প্রাণ, ব্যাকরণ ও বিদ্রোহ, শৈলী ও প্রথামুক্তিকে জুড়ে রয়েছে এক সেতু যার নাম নশ্বরতা। কবিতার মৃত্যু নয়। লুপ্ত হয় তার ভাষা, সংকেত, উপদেশ ও কলাকৈবল্য। বিনয়ের অনেক কবিতা পড়তে পড়তে মনে হয়েছে আমরা বুঝি কবিতায় তেমন এক অন্তিম অবস্থায় পৌঁছে গেছি। যেন এর পর আর কোনও কবিতা হয় না। অর্থ্যাত্ এই কবিতাগুলোর মধ্যে ‘ফাইনালিটি’-র উপাদান আছে। রবীন্দ্রনাথেও এমন উদাহরণ পাই। জীবনানন্দেও এমন অনেক উদাহরণ খুঁজে পাওয়া যায়। তারপর বিনয় মজুমদার-এ। এগুলো কবিতা রচনার কোনও কৌশল নয়। এটি নির্ণয়বাক্য বা প্রপোজিশনের উপস্থাপন।’ যেমন : ‘…ডানা না-নেড়েই ঊর্ধ্বে যে-চিল সন্ধান ক’রে ফেরে/ তার মতো ক্লান্তি আসে; কোনো যুগে কোনো আততায়ী শত্রু ছিল বলে/ আজো কাঁটায় পরিবেষ্টিত হ’য়ে গোলাপ যেমন থাকে,/ তেমনি রয়েছো তুমি; আমি পত্রের মতন ভুলে/ অন্য এক দুয়ারের কাছে।’ (১৬ই জুন ১৯৬১)।
কবিতাকে, প্রেমের কবিতাকে বিনয় মজুমদার অন্তিম অবস্থানে ছুড়ে দিয়েছিলেন। তারপর ‘আর শেষ নেই’ অবস্থায় নিয়ে গিয়েছিলেন বলে বিনয় মজ্ুমদারকে বাদ দেওয়া যায় না। ছেড়ে যাওয়া যায় না। পাতায়, পৃষ্ঠায় তাঁকে বুকে নিয়ে সমাদর করতে ইচ্ছা করে, মাথা থেকে নিচে নামাতে গেলেই ভাবনা হয়, যদি পিঁপড়ায় ধরে! কিন্তু বিনয় মজুমদার তাঁর যাপিত জীবনকে পিঁপড়ার কাছেই সঁপে দিয়েছিলেন নিজের প্রতি অযত্নে, অবহেলায়, অবজ্ঞায়, জেদে। বিনয় মজুমদারের কবিতা ও নানা গুণ সম্পর্কে আহমদ ছফা তাঁর ‘যিকঞ্চিত্ বিনয় মজুমদার’ প্রবন্ধে বলেন, ‘যখন বিনয় মজুমদারের কবিতাগুলো পড়তে আরম্ভ করি, আমার মনের ভেতরে অন্যরকম একটা দোলা অনুভব করতে থাকি। এইটা একটা ব্যাপার, অপেক্ষাকৃত স্পষ্ট করে বললে ভেতর থেকে ধাক্কা দেয়ার সঙ্গে তার তুলনা করা যায়। কবিতাগুলো পাঠ করার পর আমার মনে হতে থাকল আমার ভেতরে একটা দাহনক্রিয়া শুরু হয়েছে। এই কবির রচনার শরীরে এমন একধরনের সুপ্ত আগুন রয়েছে যা মনের ভেতর একটা মৃদু প্রীতিপদ অগ্নিকাণ্ডের সৃষ্টি করে দিয়েছে। বিনয় নানা গুণে গুণাম্বিত পুরুষ। তিনি যদি কবিতা না লিখে অন্যান্য বিষয়ের চর্চা করতেন, আমার ধারণা অনায়াসে সিদ্ধি অর্জন করতে পারতেন। তাঁর নানারকম যোগ্যতা এবং পারঙ্গমতা ছিল। তিনি সব বাদ দিয়ে শুধুই কবিতার সঙ্গে লটকে রইলেন। এটা একটা অবাক ব্যাপার। অথচ বিনয়ের ক্ষেত্রে এটাই সত্য হল।’ প্রকৃতপক্ষে জীবনকে তিনি ধরতে পারেননি, কানাকড়ির মূল্যও দেননি যাপনের কর্তব্যকে। দুই পা দিয়ে সোনার মেডেল দূরে ঠেলে কয়লার কাঠি কাছে নিয়ে প্রথাহীন পথে কেবল পুড়েছেন আর পুড়েছেন অভাব আর অনটনের আগুনে। অথচ চাইলেই এই গণিতবিশারদ, প্রখর মেধাবী বিনয়—সুখের খাটে পিঠ এলিয়ে দিন কাটাতে পারতেন স্বাচ্ছন্দ্যে। না করে, কবিতার বিপ্লবী তিনি ফুঁ দিয়ে উড়িয়ে দিলেন আনন্দের দিন। আর দিনান্তে জীবনের সাথে অভিমান করে লিখলেন, ‘সময়ের সঙ্গে বাজি ধ’রে পরাস্ত হয়েছি।/ ব্যর্থ আকাঙ্ক্ষায়, স্বপ্নে বৃষ্টি হয়ে মাটিতে/ যেখানে একদিন জল জমে, আকাশ বিস্মিত হয়ে আসে/ সেখানে সত্বর দেখি, মশা জন্মে।…’ (২৭ শে জুন ১৯৬১)।
পরাস্ত হয়েছেন বলেই হয়তো যুগের পর যুগ পেরিয়ে এসেও কবি বিনয় মজুমদার আমাদের ভাবায়, ভাসায়। আরো পরেও হয়তো ভাবাবে, ভাসাবে; কেননা, বিনয় যে নিজেই বলেছেন তাঁর তারুণ্যে, ‘আমার সব কবিতাই আসলে দিনপঞ্জি। আমি এখন যা লিখছি সে হচ্ছে বিশ্ববিদ্যালয়ের পাঠ্যপুস্তক। তার মানে ভবিষ্যতে আমার কবিতা ছাত্রছাত্রীরা পড়তে বাধ্য হবে। সেহেতু আমার এখন পাঠক না হলেও চলবে।’ অত্যুক্তি নয়, তাঁর ভবিষ্যদ্বাণীই সত্য হয়েছে; ভবিষ্যত্ বিনয়কে পড়ছে, পড়বে এরূপ বহু পয়ারে পঙিক্ততে ‘আমার আশ্চর্য ফুল, যেন চকলেট/ নিমিষেই গলাধঃকরণ তাকে না করে/ ক্রমশ রস নিয়ে তৃপ্ত হই/ দীর্ঘ তৃষ্ণা ভুলে থাকি আবিষ্কারে, প্রেমে।/ অনেক ভেবেছি আমি, অনেক ছোবল নিয়ে প্রাণে/ জেনেছি বিদীর্ণ হওয়া কাকে বলে, কাকে বলে নীল—/ আকাশে হূদয়ের : কাকে বলে নির্বিকার পাখি।/ অথবা ফড়িঙ তার স্বচ্ছ ডানা মেলে উড়ে যায়/ উড়ে যায় শ্বাস ফেলে যুবকের প্রাণের উপরে।/ আমি রোগে মুগ্ধ হয়ে দৃৃশ্য দেখি/ দেখি জানালায় আকাশের লালা ঝরে/ বাতাসের আশ্রয়ে আশ্রয়ে।/ আমি মুগ্ধ, উড়ে গেছ; ফিরে এসো, ফিরে এসো, চাকা,/ রথ হয়ে, জয় হয়ে, চিরন্তন কাব্য হয়ে এসো।/ আমরা বিশুদ্ধ দেশে গান হবো, প্রেম হবো, অবয়বহীন/ সুর হয়ে লিপ্ত হবো পৃথিবীর সব আকাশে।’ (আমার আশ্চর্য ফুল)।