ক্রিসমাস মানে বরফে ঢাকা সাগর পাড়ের দেশের লালকোট গায়ে সান্টা বুড়ো, ক্রিসমাস মানে ঝলমলে আলোয় ক্রিসমাস ট্রি, ক্রিসমাস মানে চড়ুইভাতি, চিড়িয়াখানা, ক্রিসমাস মানে টার্কি রোস্ট, প্লাম পুডিং আর রিচ ফ্রুট কেকের সমাহার। ক্রিসমাস আর কেক যেন একে অপরের পরিপূরক। আজ বরঞ্চ ঘুরে আসা যাক সেই কেক আবিষ্কারের ইতিহাসের পাতায়।
খাদ্য ঐতিহাসিকদের মতানুসারে, ৩৩৬ সালে রোমান সম্রাট কনস্টান্টাইনের আমলে প্রথম বড়দিন পালিত হয় — যদিও বড়দিনের কেক খাওয়াটা অনেক পর থেকে শুরু হয়েছিল। মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডে ক্রিসমাসের আগের দিন উপবাস করার নিয়ম ছিল। ক্রিসমাসের দিন পরিজ (যবের মন্ড) খেয়ে তাদের উপবাস ভঙ্গ করতেন। দুধে বা জলে মেশানো খাদ্যশস্য সিদ্ধ করে তাতে শুকনো ফল, মধু, কিসমিস যোগ করে বানানো হতো পরিজ।

প্রকৃতপক্ষে, কেকের আবিষ্কারটি প্রাচীন মিশরে হয়েছিলো। একটি গরম পাথরে রান্না করা গোলাকার, সমতল, খামিরবিহীন রুটি হিসাবে খাওয়া হতো কেক। নতুন উপাদানের প্রবর্তন এবং বেকিংয়ের নতুন কৌশল উদ্ভাবনের মাধ্যমে বেকড কেক পরে আসে।
প্রথম কেকগুলি প্রাচীন গ্রীকদের দ্বারা তৈরি করা হয়েছিল বলে বিশ্বাস করা হয়। তাঁরা চাঁদের প্রতীক হিসাবে বৃত্তাকার বা চাঁদের আকারের কেক বা মধু দিয়ে মিষ্টি রুটি বেক করেছিল। চাঁদের দেবী আর্টেমিসকে খুশি করার জন্য তারা মোমবাতি দিয়ে কেক সাজিয়ে দেবীর উদ্দেশ্যে নিবেদন করেছিলেন। বর্তমানের বিখ্যাত ব্যালাক্লাভা কেক (Balaclava cake) প্রথম নাকি গ্রীকদের দ্বারা তৈরি। পরে রোমানরা তাদের দেখে কেকে ক্রিম বাদাম বিভিন্ন ফল দিয়ে খেতে শুরু করে।
১৬ শতকে বর্তমান কেকের আদি রূপের জন্ম হয় ইউরোপে। যবের পরিবর্তে ময়দা, মাখন, ডিম, শুকনো ফল দিয়ে মন্ড তৈরি করে গরম জলে সিদ্ধ করা হতো। ঘনফেনার মত দেখতে যে বস্তুটি তৈরি হত তার নাম ছিল ক্যানন বল। ক্যানন বলটি অনেক সময় আগুনে সেঁকে নেওয়া হতো।

সপ্তদশ শতকের মাঝামাঝি ইউরোপের প্রযুক্তিগত উন্নতির কারণে কেক বানানোর জন্য বিভিন্ন আকৃতির ধাতু, কাগজ বা কাঠ দিয়ে ছাঁচ আবিষ্কৃত হয়। ফলে কেক তৈরির ব্যাপারটা অনেক সহজ হয়ে ওঠে। ইতিমধ্যে কেক প্যানও ব্যবহারের প্রচলনও চালু হয়।
প্রকৃতপক্ষে পৃথিবীর সবচেয়ে আদিম মানুষরা ময়দা আবিষ্কার করার পরপরই কেক তৈরি করতে শুরু করে। মধ্যযুগীয় ইংল্যান্ডে, লেখায় বর্ণিত কেকগুলি প্রচলিত অর্থে কেক ছিল না। এগুলিকে রুটির বর্ণনার বিপরীতে ময়দা-ভিত্তিক মিষ্টি খাবার হিসাবে বর্ণনা করা হয়েছিল, যা মিষ্টি ছাড়াই কেবল ময়দা-ভিত্তিক খাবার ছিল।
রুটি এবং কেক কিছুটা বিনিময়যোগ্য শব্দ ছিল যেখানে “কেক” শব্দটি ছোট রুটির জন্য ব্যবহৃত হতো। প্রাচীনতম উদাহরণগুলি নিওলিথিক গ্রামের ধ্বংসাবশেষগুলির মধ্যে পাওয়া গিয়েছিল যেখানে প্রত্নতাত্ত্বিকরা চূর্ণ শস্য থেকে তৈরি সাধারণ কেকগুলি আবিষ্কার করেছিলেন, আর্দ্র, সংকুচিত এবং সম্ভবত একটি গরম পাথরে রান্না করা হয়েছিল। এই প্রথমদিকের কেকের আজকের সংস্করণটি ওটকেক হবে, যদিও এখন আমরা সেগুলিকে বিস্কুট বা কুকি হিসাবে বেশি মনে করি। মূলত, ১৮৪০ সালের দিকে বেকিং পাউডার আবিষ্কার কেক তৈরির সহজ করে দেয়।
আমেরিকানরা কেক এতটাই পছন্দ করত যে প্রত্যেক ২৬ শে নভেম্বর দিনটিকে তারা জাতীয় কেক দিবস হিসেবে পালন করে থাকে। ১৩ শতকে অক্সফোর্ড ইংলিশ ডিকশনারি অনুযায়ী পুরনো নর্স (Norse) শব্দ থেকে ‘কাকা’ (Kaka) ও কাকা থেকে কেক শব্দের উৎপত্তি।

ক্রিসমাসের দিন থেকে শুরু করে দ্বাদশ দিন পর্যন্ত কেক খাওয়ার চল ছিল। কালক্রমে এই কেকগুলি ক্রিসমাস কেক নামে পরিচিতি হয়। ব্রিটিশদের সেই পুরোনো ট্রাডিশন অনুসরণ করে যিশুখ্রিস্টের জন্মদিনে কেক খাওয়ার রীতি চালু হয় যা আজও চলছে।
ব্রিটিশরা দেশে তাদের আধিপত্য বিস্তার করায় ক্রিসমাসের সময় কলকাতা পরিণত হতো এক টুকরো লন্ডনে। নানান অনুষ্ঠানে বিশেষ করে ক্রিসমাস ও নিউ ইয়ারে সাহেব বাড়িতে দেদার চাহিদা থাকতো কেকের। শহরে তখন নিত্য নতুন ব্যবসার সম্ভবনা। ১৯০২ সালে সুদূর ইরাক থেকে কলকাতা, মুম্বাই আসেন ইজরায়েল নাহুম মোরদেকাই। পুঁজি কম তাই ডোর টু ডোর বিক্রির ময়দানে কোমড় বাঁধলেন নবাগত ব্যবসায়ী। এক অচেনা স্বাদের রসনা ছড়িয়ে দিলো তার নাম কলকাতায়। হগ সাহেবের বাজারের পাশে চিজ, কেক, পাউরুটি, পেস্ট্রি নিয়ে একটা ছোট্ট দোকান নিলেন। সেই হলো শুরু।

শোনা যায়, বিখ্যাত কৌতুক অভিনেতা ভানু বন্দোপাধ্যায় তার মাস্টার মশাই বিশ্ব বিখ্যাত বিজ্ঞানী সত্যেন্দ্রনাথ বসুর জন্মদিনে একটি নামী দোকান থেকে কেক কিনে নিয়ে এসে একসঙ্গে বাড়িতে বসে খেতেন।
১৯১৪ সালে ধর্মতলা চত্বরে মনোরঞ্জন বড়ুয়া চট্টগ্রাম থেকে এসে কিসমিস মোরব্বা টুটিফ্রুটি দিয়ে কলকাতার প্রতিষ্ঠিত করলেন বড়ুয়া বেকারী। সে আমলে যেকোনো বনেদি বাড়িতে ফ্রুট কেক বা পাম কেক বলতে বড়ুয়া বেকারীর নাম উঠে আসতো। কিন্তু ধীরে ধীরে পারিবারিক গোলযোগ, ভাই-ভাই মতের অমিল, নোটবন্দী ইত্যাদি কারণে কেকের নস্টালজিয়া প্রায় এখন শেষের পথে।

ভারতীয় ও ইউরোপিয়ান কেকের স্বাদ পেতে পার্ক স্ট্রিটে ফ্লুরিজ বেকারির নাম না বললেই নয়। ১৯২৭ সালে সুইস দম্পতি জোসেফ এবং ফ্রেডা ফ্লুরিজ কেকের দোকানটি প্রতিষ্ঠা করেন। উত্তম কুমার, সৌমিত্র চট্টোপাধ্যায়ের মতো প্রথম সারির অভিনেতারা অভিনয়ের ফাঁকে প্রায়ই ঢুঁ মারতেন এই দোকানে।
এইসব কথা থেকেই বোঝা যায় ভারতীয় তথা বাঙ্গালীদের কেকের প্রতি ভালোবাসা সাহেবদের থেকে কম কিছু নয়। ছেলেবেলার নস্টালজিয়া থেকে পথচলতি খুচরো খিদে — কেক এখন বাঙালি খাবারের অঙ্গ। তাই পিওর দিশি উপাদেয় বাপুজি কেক আজো বাঙালির জীবনে লেপটে আছে।।
Source : Various sources have been referred to for information.
আমার বাবা কোলকাতা থেকে জামসেদপুর আসতেন এক বিরাট কেক নিয়ে আর
এর মধ্যে খুব বেশি পরিমানে স্ট্রবেরি থাকতো ফ্রুট কেক এখন আর আগের মত
পাওয়া যায়না,কেক বিপ্লব এখন হাজার রকমের ক্রিম মাখন ডিমের বিভিন্ন স্বাদে
পাওয়া যাচ্ছে।আপনার প্রতিবেদন ও কেক ইতিহাস নস্টালজিক করলো*
ভালোলাগা ইতিহাস মিষ্টি মধুর কেক”র মাধ্যমে।
ভীষন ভালো লাগলো আপনার মতামত পেয়ে। আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই ????????