দেবী দুর্গা — দুর্গতিনাশিনী ভবভয়হরিণী দশপ্রহরণধারিনী মহিষমর্দিনী সিংহবাহিনী সংকটনাশিনী। দুর্গার পরিচয় মেলে তৈত্তিরীয় আরণ্যকের অন্তর্গত যাজ্ঞিকা উপনিষদে। দুর্গা শব্দটির উৎপত্তি নিয়েও বহুমুনির বহু মত। শব্দকল্পদ্রুমে বলা হয়েছে দেবী ‘দুর্গ’ এক ভয়ঙ্কর অসুরকে নাশ করেছিলেন বলেই তার নাম দুর্গা। আবার তিনি রোগব্যাধি মহাবিঘ্ন ভববন্ধন কুকর্ম মহাভয় ইত্যাদি দুর্গতি থেকে মানুষকে ত্রান করেন বলেই তার নাম দুর্গা।
এই দেবী দুর্গার ১০৮টি রূপের মধ্যে অন্যতম হলেন দেবী বিপত্তারিণী। বিপত্তারিণী দেবী পশ্চিমবঙ্গ, ওড়িশা রাজ্য এবং তার পার্শ্ববর্তী অঞ্চলে পূজিতা। ভক্তরা মূলত বিপদের হাত থেকে রক্ষা পাওয়ার জন্যই এই দেবীর পূজা করেন। দেবী দুর্গার মতই তিনি সিংহবাহিনী। কোথাও তিনি রক্তবর্ণা আবার কোথাও তিনি কালীর মতো কৃষ্ণবর্ণা। তার চারটি হাতে খড়গ, ত্রিশূল ও বড়াভায়ের মুদ্রা রয়েছে। অনেক ভক্তগণ মনে করেন মা বিপত্তারিণী আসলে বাংলার একটি লৌকিক দেবী।
সমুদ্রমন্থনের সময় ভগবান শংকর দুর্গা নাম স্মরণ করে বিষ পান করেছিলেন। ছোটবেলায় মা যশোদা শ্রীকৃষ্ণের হাতে দুর্গা নাম স্মরণ করে রক্ষাকবচ বেঁধে দিতেন যাতে কোন বিপদ আপদ না হয়। কৃষ্ণ যখন বিপদে পড়তেন তখন তিনিও মা দুর্গাকে স্মরণ করতেন। এমনকি কালীয় দমনের সময় শ্রীকৃষ্ণ দুর্গা নাম স্মরণ করেই করেছিলেন।
একটি পৌরাণিক গাঁথা অনুসারে একদা ভগবান মহাদেব হাস্যচ্ছলে পার্বতীকে কালী বলে উপহাস করেন। এতে দেবী ক্ষুব্ধ হয়ে তপস্যার মাধ্যমে নিজের কৃষ্ণবর্ণা রূপ পরিত্যাগ করলেন। সেই কৃষ্ণবর্ণা স্বরূপা দেবী হলেন পার্বতীর অঙ্গ থেকে সৃষ্টা জয়দুর্গা, কৌশিকীদেবী ও বিপদতারিনীদুর্গা।

আষাঢ় মাসের সোজা রথ ও উল্টো রথের মাঝে যে শনি ও মঙ্গলবার থাকে, সেই দিনেই বিপত্তারিণী মায়ের পুজো করা হয়। এবছর বিপত্তারিণী পুজোর প্রথম দিন আজ অর্থাৎ ৯ জুলাই ২০২৪ (২৪ আষাঢ় ১৪৩১) এবং পুজোর দ্বিতীয় দিন শনিবার ১৩ জুলাই ২০২৪ (২৮ শে আষাঢ়) পড়েছে।
ব্রতের উপকরণ ও নিয়ম : ১৩ রকমের ফুল, তেরো রকমের ফল (অর্ধেক করে কাটা) ১৩টি চালের পিঠা, তেরগাছি লাল সুতা, তেরোটি পান সুপারি, ১৩টি পৈতে ১৩টি লবঙ্গ ১৩টি ছোটএলাচ ও বড়এলাচ, চুন ময়দা ঘি একটি ভোজ্য নৈবেদ্য। তেরগাছা লাল সুতোকে ১৩টি দুর্বাঘাস সহযোগে ১৩টি অথবা ১৪ টি গিঁট বেঁধে ডোর তৈরি করা হয়। পুজোর পর ছেলেদের ডানহাতে ও মেয়েদের বাম হাতে এই সুতোর ডোর বেঁধে দেয়া হয়। এই লাল সুতোকে বিপত্তারিণী মায়ের প্রতীক হিসেবে ধরা হয়।
ব্রত পালনের আগের দিন ব্রতীকে নিরামিষ আহার করে সংযম পালন করতে হয়। পরের দিন স্নান করে আলতা, সিঁদুর, শুচিবস্ত্র পরিধান করে ব্রত পালন অর্থাৎ বিপত্তারিণী মায়ের পুজো করতে হয়।
ব্রত পালনের পরে ব্রতকথা শুনে ব্রতীকে ১৩টি লুচি ঘিয়ে ভেজে খেতে হয় এবং সঙ্গে দই চিঁড়ে ফলাহারও করতে পারে। এই পুজোর দিন কোন ব্যক্তি কে চিনি দান করা উচিত নয়। জ্যোতিষ শাস্ত্র অনুসারে চিনি শুক্র ও চন্দ্রের সঙ্গে সম্পর্কিত। শুক্র বস্তুগত সুখের কর্তা তাই এদিন চিনি প্রদান করলে শুক্র দুর্বল হয়। সংসারে অশান্তির পাশাপাশি আর্থিক সমস্যা দেখা দেয়।
বিশ্বাস করা হয় যে সধবা নারী এই ব্রত পালন করে, মা বিপদতারিনী তাকে সমস্ত আপদ বিপদ থেকে রক্ষা করেন। তাই স্বামী সন্তানের মঙ্গল কামনায় সধবা নারীরা এই ব্রত পালন করেন।

গ্রামাঞ্চলে বিপত্তারিণী পুজো চারদিন ধরে পালিত হয়। প্রথম দিনে দেবীর আরাধনা ও মেয়েরা দন্ডী কেটে মানত পূরণ করেন। ব্রাহ্মণ পুরোহিত আম্রপল্লব-সহ ঘট স্থাপন করা হয়। নাম গোত্র সহযোগে পুজো দেন সকলে। পূজোর পরের দিন বিপত্তারিণী ব্রতকথা পাঠ ও শোনা হয় যা পুজোর অন্যতম একটি অংশ বিশেষ। খুব ধুমধাম করে চলে এই পূজার উদযাপন। দুই রাত ধরে লোকগান ভজন কীর্তন অনুষ্ঠিত হয়। আর চতুর্থ দিনে দেবীর নিরঞ্জন অর্থাৎ বিসর্জন হয়ে যায়। ব্রতী একবার এই যদি ব্রত পালন করে তবে তাঁকে অন্তত পর পর তিন বছর উপবাস থেকে ব্রত পালন করার কথা বলা হয়েছে শাস্ত্রে।
মার্কন্ডেয় মুনি বিপত্তারিণী ব্রতকথা প্রথম প্রকাশ করেন। জেনে নেওয়া যাক এই ব্রতের নেপথ্যে প্রচলিত কাহিনীগুলি।
প্রাচীনকালে বিদর্ভ দেশে এক রাজার রানী ভক্তি সহযোগে বিপত্তারিণী ব্রত পালন করতেন।
তার একটি মুচির বউ বন্ধু ছিল। রানী তাঁকে নানান ফল খাবার উপহার দিতেন। মুচির বউয়েরও খুব ইচ্ছা হতো রানীকে উপহার দেওয়ার। একদিন রানীর ইচ্ছা হল মুচি বউয়ের কাছ থেকে রান্না করা গরুর মাংস দেখার। মুচির বউ তো রানীর আবদারে খুব খুশি। তিনি খুব যত্নে গোমাংস রান্না করে লুকিয়ে রানীর কাছে আনলেন।

রাজবাড়ীর এক চাকর সেটি দেখতে পেয়ে সোজা রাজাকে গিয়ে নালিশ করে দেয়। রাজা শোনা মাত্রই প্রচন্ড রেগে রানীর ঘরে উপস্থিত হলেন এবং ঘোষণা করলেন যদি আপত্তিকর কিছু থাকে তাহলে রানীর মুন্ডচ্ছেদ করা হবে। ভয় পেয়ে রানী আকুল হয়ে মা বিপত্তারিণীকে ডাকতে লাগলেন। মা বিপত্তারিনী ভক্তের ডাকে সাড়া দেন। রাজা যখন পরীক্ষা করতে এলেন তখন কাপড় খুলে দেখেন সেখানে রয়েছে পুজোর জবা ফুল, ফল। রানী বিপদের হাত থেকে রক্ষা পেলেন এবং সারাটা জীবন নিষ্ঠা ভরে বিপত্তারিণী ব্রত পালন করেছিলেন। এইভাবেই ব্রতের কথা চারিদিকে ছড়িয়ে পড়ে।
অন্য একটি কাহিনী অনুসারে —
বিদর্ভের রাজা সত্যদাসের পুত্র অলকেশ একবার মৃগয়ায় বেরিয়ে ভুল করে পাশের রাজ্য অবন্তির রাজার মৃগয়া কাননে ঢুকে পড়ে। সে একটি মৃগকে শরাঘাত করলে বনরক্ষীরা তাকে বেঁধে নিয়ে যায় অবন্তিরাজ চক্রধারের কাছে —
‘রক্তচক্ষু মহারাজ হেরিয়া তাহারে
আদেশিল রাখ গিয়া অন্ধ-কারাগারে।’
খবর পেয়ে পুত্রকে বাঁচাতে বিদর্ভরাজ তখনই ছুটে গেলেন অবন্তিরাজের দরবারে। কিন্তু রাজা তাকেও পাঠালেন কারাগারে। সংবাদ জেনে বিদর্ভের রানী রত্নাবতী ধুলোয় লুটিয়ে কাঁদতে লাগলেন। হঠাৎ দৈববাণী হলো —
‘বিপত্তারিণী দুর্গায় পুজহ বিশেষ।
আমার প্রতি ভক্তিশ্রদ্ধা তোমার অশেষ।।’
দৈববাণী শুনে রানীর মনে ভরসা এলো, তিনি পূজোর আয়োজন করলেন। সেদিন ছিল মঙ্গলবার রথযাত্রার পরের ভৌমবার। ভক্তি ভরে দেবীর স্তব স্তুতি করলেন রানী —
‘বিপদনাশিনী মাগো জগৎজননী।
এঘোর সংকট হতে রক্ষা করো তুমি।।’

‘মা তুমি মুখ না তুলে তাকালে এ দেহ আমি ত্যাগ করব’ — এই সংকল্প করে রানী দেবীর চরণে পড়ে রইলেন। রানীর বেদনা প্রাণে বাজলো মহামায়ার। সেই রাতেই রাজা চক্রধরকে দেবী স্বপ্ন দিলেন —
‘সে যে মোর প্রিয় ভক্ত জানো নাকি তুমি।
তারে বন্দি রাখিয়াছো দুঃখ পাই আমি।।’
মায়ের ব্যথা, দেবীর অনুযোগ গলিয়ে দিলে অবন্তীরাজের হৃদয়। সত্যদাসের সঙ্গে আত্মীয়তার বাঁধন স্বীকার করে দেবীর প্রসন্নতা ভিক্ষা করলেন চক্রধর। অলকেশের সঙ্গে কন্যার বিবাহ দিয়ে দুই রাজ্যের মধ্যে বিবাদমুক্তির বিপদমুক্তির স্বস্তির আবহাওয়া তৈরি করলেন।
আজও দুই রথযাত্রার মাঝে জগৎমাতার মন্দিরে এই ব্রত পালনের ভিড় থেকে মনে হয় এই যুগেও এ বিপত্তারিণী ব্রতের আশ্বাস মানুষের বড় প্রয়োজন।।
বেশ লেখা
থ্যাঙ্ক ইউ
বিপত্তারিণী কথা পড়লাম,,,,, দুটো সুন্দর গল্পকথা পড়লাম,,,,, ১৩ রকমের ফল ফলাদি আধা আধি করা শিখলাম,,,,,
সুন্দর লেখা খুব সুন্দর
আন্তরিক ধন্যবাদ জানাই আপনাকে