হেলিকপ্টার দুর্ঘটনায় দেশের প্রথম প্রতিরক্ষাপ্রধান বিপিন রাওয়াতের মৃত্যু অত্যন্ত বেদনাদায়ক ঘটনা। দেশের বিভিন্ন এলাকায় তিনি কমান্ডার হিসেবে কাজ করেছিলেন। যার মধ্যে জম্মু-কাশ্মীর ও অরুণাচল প্রদেশ অন্যতম। তাঁর আগের দুজন বর্ষীয়ান সেনা কর্মকর্তাকে ডিঙিয়ে তিনি সেনা সর্বাধিনায়ক হয়েছিলেন। বিপিন রাওয়াত প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর অত্যন্ত প্রিয়পাত্র ছিলেন। ২০১৯ সালে তাঁর অবসরের ঠিক সাতদিন আগে, ২৪ ডিসেম্বর চিফ অব ডিফেন্স স্টাফের পদ ঘোষণা করে নরেন্দ্র মোদীর সরকার। আর রাওয়াতের অবসর নেওয়ার ঠিক একদিন আগে তাঁকে ওই পদে নিযুক্ত করা হয়। এর জন্য বিজেপি সরকারকে সামরিক আইন সংশোধন করে বয়সসীমাও বাড়াতে হয়েছিল। ৩১ ডিসেম্বর সেনা সর্বাধিনায়ক হিসেবে দায়িত্ব নেন রাওয়াত। তিন সামরিক বাহিনীর সংযোগ রক্ষাকারী ‘সিঙ্গল পয়েন্ট অ্যাডভাইজার’ হিসেবেও নিযুক্ত হন।
কিন্তু কেন রাতারাতি ওই পদ তৈরি হয়েছিল, বিপিন কেন পেলেন সেই দায়িত্ব, কেনই বা তাঁর ওপর মোদী সরকার তাঁর ওপর এত ভরসা করেছিল? কেন্দ্র সরকার ওই পদ ঘোষণার পরই এইসব প্রশ্ন দানা বেঁধেছিল। পাশাপাশি বিপিন রাওয়াতের সেই সময়ের কিছু উক্তি ও কাজকারবার বিরোধীরা স্বাভাবিকভাবে নিতে পারেনি। যে কারণে বুধবারের মর্মান্তিক কপ্টর দুর্ঘটানার পরও বেশ কয়েকটি ঘটনার কথা সামনে এসে পড়ছে। বিপিন বছর দুই আগে মেজর জেনারেল লিতুল গগৈকে চিফ অব আর্মি স্টাফের প্রশংসাপত্র দিয়েছিলেন। সেই গগৈই পাথরের আক্রমণ থেকে বাঁচতে এক কাশ্মীরি যুবককে নিজের জিপের সামনে বেঁধে নিয়ে গিয়েছিলেন। সেই চূড়ান্ত অমানবিক কাজের তীব্র সমালোচনা করেছিল মানবাধিকারকর্মী থেকে রাজনৈতিক নেতারা। রাওয়াত অবসরপ্রাপ্ত সৈনিকদের আচরণবিধি নিয়ে মন্তব্য করেও তাদের বিক্ষোভের মুখে পড়েছিলেন।
কিন্তু মোদী সরকার তাদের প্রিয়পাত্র জেনারেল বিপিন রাওয়াতের হাতে তিন বছরের জন্য প্রতিরক্ষার বড় দায়িত্ব দিয়েছিল। তার আগে থেকেই অবশ্য জেনারেল রাওয়াত চিফ অব স্টাফ কমিটির চেয়ারম্যান হিসেবে কাজ করছিলেন। এরপর সেই নতুন পদটি তৈরি করে ঘোষণা করেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী। সাধারণভাবে সেনার তিন বাহিনীর শীর্ষ পদাধিকারীদের অবসরের বয়স ৬২ বছর। কিন্তু নতুন পদের অবসরের বয়স করা হয় ৬৫। অর্থাৎ সেনাবাহিনী থেকে অবসরের পরও নতুন পদে চাকরির মেয়াদ আরও তিন বছর বেড়ে যাবে। অন্যদিকে সরকারকে প্রতিরক্ষাসংক্রান্ত বিষয়ে সব পরামর্শ দেবে চিফ অব ডিফেন্স স্টাফ। মোদীর ঘোষণার পর প্রতিরক্ষা মন্ত্রণালয় সেই পদে নিয়োগের ব্যাপারে তৎপরতা শুরু করে। মন্ত্রণালয়ের তরফে বিজ্ঞপ্তিতে বলা হয়, সামরিক বাহিনীর চার তারকা মানের কর্মকর্তাকে সেনা সর্বাধিনায়ক হিসেবে নিয়োগ করা হবে। বোঝাই যাচ্ছিল অবসরের আগেই সেনাপ্রধান বিপিন রাওয়াতই দেশের প্রথম সেনা সর্বাধিনায়ক হতে চলেছেন। ইতিমধ্যে রাওয়াতের সঙ্গে মোদীর সরাসরি যোগাযোগ শুরু হয়। বিপিন তার আগেই পাকিস্তানের সঙ্গে এলওসি, চীনের সঙ্গে এবং উত্তর-পূর্বে এলওসি ছাড়াও বিভিন্ন অপারেশন পরিচালনা করেছেন।
কিন্তু নতুন সেই পদে কেন রাওয়াত? এক্ষেত্রে বিপিনের অতিরিক্ত মোদী ভক্তি কিম্বা মোদির সুরে সুর মিলিয়ে কথার উল্লেখ করাই যায়। যে কারণে তাঁর মোদীর আস্থা অর্জন করতে খুব বেশি সময় লাগেনি। বিপিন সেনাপ্রধান হয়েও নাগরিক সংশোধন আইন নিয়ে মোদির সুরে কথা বলেছেন, আন্দোলনকারীদের সমালোচনায় সরব হয়েছেন। দিল্লির এক অনুষ্ঠানে আন্দোলনকারীদের বিরুদ্ধে বলেছিলেন, ‘যারা মানুষকে ভুল পথে পরিচালিত করে, তারা নেতা নয়। আমরা দেখছি, প্রচুর মানুষকে ভুল পথে টেনে নিয়ে যাচ্ছেন বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রছাত্রীরা। এটাকে নেতৃত্ব দেওয়া বলে না’। একজন সেনা সর্বাধিনায়ক-এর পক্ষে একটি রাজনৈতিক দলের স্বপক্ষে এই মন্তব্য কতটা যুক্তিযুক্ত! তাঁর পদটি তো রাজনীতির ঊর্ধ্বে।
বিপিনের প্রতিরক্ষা বিষয়ে অভিজ্ঞতা ও দৃষ্টিভঙ্গির থেকেও বিজেপির কাছে গুরুত্বপূর্ণ ছিল পাকিস্তানের বিরুদ্ধে বিপিনের বরাবর আগ্রাসন নিয়ে কথা বলা, জম্মু ও কাশ্মীরেও শত্রুপক্ষকে দমন করতে বিপিন সবসময় অ্যালার্ট করার বিষয়গুলি। যেগুলি মোদী সরকারকে অনেক বেশি সন্তুষ্ট করেছিল। তাছাড়া বিগত কয়েক বছরে বিজেপি ও তার হিন্দু জাতীয়তাবাদী মিত্ররা আমলাতন্ত্র, বিচার বিভাগ, পুলিশ ও সামরিক বাহিনীতে জায়গা দিয়েছে তাদের মতাদর্শে বিশ্বাসী ব্যক্তিদের। তাতে এই বিভাগগুলি তাদের নিরপেক্ষতা খুইয়েছে ঠিকই কিন্তু বিজেপির উদ্দেশ্য অনেকাংশে কর্যকরি হয়েছে। একথা বলাই যায় যে জেনারেল রাওয়াত যদি বিজেপির পক্ষে প্রকাশ্যে কথা না বলতেন, তবে তিনি সিডিএস হতে পারতেন না।
বুধবার তামিলনাড়ুর কুন্নুরে ভারতীয় বায়ুসেনার এমআই-১৭ভি৫ হেলিকপ্টার ভেঙে পড়ে যে মর্মান্তিক দুর্ঘটনা তাতে সিডিএস জেনারেল রাওয়াত ও তাঁর স্ত্রী মধুলিকার ছাড়াও প্রাণ হারিয়েছেন ব্রিগেডিয়ার এল এস লিদার, লেফটেন্যান্ট কর্নেল এইচ সিং, উইং কমান্ডার পি এ চৌহান, স্কোয়াড্রন লিডার কে সিং, জুনিয়র ওয়ারেন্ট অফিসার দাস, প্রদীপ এ, হাবিলদার সাতপাল রাই, নায়েক গুরুসেওয়াক সিং, জিতেন্দার, ল্যান্স নায়েক বিবেক ও এস তেজা।